images2222222222হিজরী নববর্ষ ও আশূরা (১)
সম্মানীত পাঠক মুহররম মাস এবং আশূরা সমাগত। হিজরী সন, মহররম মাস, আশূরা আমাদের ধর্মীয় জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ নিয়ে আমাদের দুই পর্বের বিশেষ আলোচনার আজ ১ম অংশ।

ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর অধ্যাপক, আল-হাদীস বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া চেয়ারম্যান, আস-সুন্নাহ ট্রাস্ট মুর্হারাম মাস ইসলামী পঞ্জিকার প্রথম মাস। রাসূলুল্লাহ সা. সা.-এর সময়ে ও তার পূর্বে রোমান, পারসিয়ান ও অন্যান্য জাতির মধ্যে তাদের নিজস্ব ক্যালেন্ডার বা পঞ্জিকা প্রচলিত ছিল। আরবদের মধ্যে কোনো নির্ধারিত বর্ষ গণনা পদ্ধতি ছিল না। বিভিন্ন ঘটনার উপর নির্ভর করে তারিখ বলা হতো। যেমন, অমুক ঘটনার অত বৎসর পরে…। খলীফা উমারের (রা) খিলাফতের তৃতীয় বা চতুর্থ বৎসর আবূ মূসা আশআরী (রা) তাঁকে পত্র লিখে জানান যে, আপনার সরকারী ফরমানগুলিতে সন-তারিখ না থাকায় প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দেয়; এজন্য একটি বর্ষপঞ্জি ব্যবহার প্রয়োজন। খলীফা উমার (রা) সাহাবীগণকে একত্রিত করে পরামর্শ চান। কেউ কেউ রোম বা পারস্যের পঞ্জিকা ব্যবহার করতে পরামর্শ দেন। কিন্তু অন্যরা তা অপছন্দ করেন এবং মুসলিমদের জন্য নিজস্ব পঞ্জিকার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। এ বিষয়ে কেউ কেউ পরামর্শ দেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মীলাদ বা জন্ম থেকে সাল গণনা শুরু করা হোক। কেউ কেউ তাঁর নুবুওয়াত থেকে, কেউ কেউ তাঁর হিজরত থেকে এবং কেউ কেউ তাঁর ওফাত থেকে বর্ষ গণনার পরামর্শ দেন। হযরত আলী (রা) হিজরত থেকে সাল গণনার পক্ষে জোরালো পরামর্শ দেন। খলীফা উমার (রা) এ মত সমর্থন করে বলেন যে, হিজরতই হক্ক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্যের সূচনা করে; এজন্য আমাদের হিজরত থেকেই সাল গণনা শুরু করা উচিত। অবশেষে সাহাবীগণ হিজরত থেকে সাল গণনার বিষয়ে একমত পোষণ করেন।
কোন্ মাস থেকে বর্ষ গণনা শুরু করতে হবে সে বিষয়ে পরামর্শ চাওয়া হয়। কেউ কেউ রবিউল আউয়াল মাসকে বৎসরের প্রথম মাস হিসেবে গ্রহণ করার পরামর্শ দেন; কারণ রাসূলুল্লাহ (সা.) এ মাসেই হিজরত করে মদীনায় আগমন করেন। ১২ই রবিউল আউয়াল তিনি মদীনায় পৌঁছান। কেউ কেউ রামাদান থেকে বর্ষ শুরুর পরামর্শ দেন; কারণ রামাদান মাসে আল্লাহ কুরআন নাযিল করেছেন। সর্বশেষ তাঁরা মুর্হারাম মাস থেকে বর্ষ শুরুর বিষয়ে একমত হন; কারণ এ মাসটি ৪টি ‘হারাম’ বা সম্মানিত মাসের একটি। এছাড়া ইসলামের সর্বশেষ রুকন হজ্জ পালন করে মুসলিমগণ এ মাসেই দেশে ফিরেন। হজ্জ পালনকে বৎসরের সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ কর্ম ধরে মুর্হারাম মাসকে নতুন বৎসরের শুরু বলে গণ্য করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এভাবে রাসূলুল্লাহ সা.-এর ইন্তেকালের প্রায় ৬ বৎসর পরে ১৬ বা ১৭ হিজরী সাল থেকে সাহাবীগণের ঐকমত্যের ভিত্তিতে হিজরী সালগণনা শুরু হয়। যদিও হিজরত রবিউল আউয়াল মাসে সংঘটিত হয়, তবুও দুমাস এগিয়ে, সে বৎসরের মুর্হারাম থেকে বর্ষ গণনা শুরু হয়। তাবারী, আত-তারীখ ২/৩-৪; ইবনুল জাওযী, আল-মনতাযিম ২/১।
অত্যন্ত দুঃখজন বিষয় যে, আমরা বাংলাদেশের অধিকাংশ মুসলিম আমাদের ধর্মীয় এ পঞ্জিকার বিষয়ে কোনোই খোজ রাখি না। এমনকি আজ কত হিজরী সাল তা অধিকাংশ ধার্মিক মুসলিম বলতে পারবেন না। আমরা যে ‘ইংরেজি সাল’ ব্যবহার করি তা মোটেও ‘ইংরেজি’ নয়; বরং তা খৃস্টধর্মীয়। যীশুখৃস্টের প্রায় ১৬০০ বৎসর পরে ১৫৮২ খৃস্টাব্দে পোপ অষ্টম গ্রেগরী তৎকালে প্রচলিত প্রাচীন রোমান জুলিয়ান ক্যালেন্ডার (ঔঁষরধহ পধষবহফধৎ) সংশোধন করে যীশুখৃস্টের জন্মকে সাল গণনার শুরু ধরে এ পঞ্জিকা প্রচলন করেন, যা গ্রেগরীয়ান ক্যালেন্ডার (এৎবমড়ৎরধহ পধষবহফধৎ) ও খৃস্টীয়ান ক্যালেন্ডার (ঈযৎরংঃরধহ পধষবহফধৎ) নামে পরিচিত। যীশুখৃস্টকে প্রভু ও উপাস্য হিসেবে বিশ্বাসের ভিত্তিতে এতে বৎসরকে বলা হয় আন্নো ডোমিনি (ধহহড় ফড়সরহর) বা এ. ডি. (অউ)। এর অর্থ আমাদের প্রভুর বৎসরে (রহ ঃযব ুবধৎ ড়ভ ড়ঁৎ খড়ৎফ)। শুধু জাগতিক প্রয়োজনেই নয়, জীবনের সকল কিছুই আমরা এ খৃস্টধমীয় পঞ্জিকা অনুসারে পালন করি। আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করুন ও সঠিক পথে পরিচালিত করুন।
ইসলামী পঞ্জিকা অনুসারে আমরা একটি নতুন বৎসর শুরু করেছি। নতুনের মধ্যে আমরা পরিবর্তনের আশা ও কামনা অনুভব করে আনন্দিত হই। তবে আমাদের বুঝতে হবে যে, মানুষের জীবনে প্রতিটি দিনই নবজীবন। মহান আল্লাহ বলেন:
وَهُوَ الَّذِي يَتَوَفَّاكُمْ بِاللَّيْلِ وَيَعْلَمُ مَا جَرَحْتُمْ بِالنَّهَارِ ثُمَّ يَبْعَثُكُمْ فِيهِ لِيُقْضَى أَجَلٌ مُسَمًّى
“তিনিই রাত্রিকালে তোমাদের মৃত্যু ঘটান এবং দিনে তোমরা যা কর তিনি তা জানেন। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে দিনে পুনরায় জাগিয়ে তোলেন যাতে নির্দিষ্ট মেয়াদ পূর্ণ হয়। সূরা আনআম: ৬০ আয়াত।
এজন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, প্রতিদিন ভোরে মহান আল্লাহর দরবারে হৃদয় নিংড়ানো কৃতজ্ঞতা ও শুকরিয়া জানিয়ে, পরিবর্তনের আকুতি ও সফলতা ও বরকতের প্রার্থনা করে নতুন জীবনের শুরু করতে হবে। আর প্রতিদিন শয়নের সময় ক্ষমা ও রহমতের প্রার্থনা করে মহান আল্লাহর করুণাময় আয়ত্বে নিজের আত্মাকে সমর্পনের দুআ পাঠের সাথে ঘুমিয়ে পড়তে হবে।
আমরা অনেকে নববর্ষের শুভেচ্ছা বা শুভ কামনা জানাই। বস্তুত কামনা বা শুভেচ্ছা নয়, দুআ হলো ইসলামী রীতি। শুভেচ্ছা অর্থ আমাদের মনের ভাল ইচ্ছা। আর মানুষের কামনা বা ইচ্ছার মূল্য কী? মূল্য তো মহান আল্লাহর ইচ্ছার। এজন্য তাঁর দরবারে দুআ করতে হবে নতুন বছরের সফলতার জন্য। এছাড়া অন্তসারশূন্য ইচ্ছা বা কামনা কোনো পরিবর্তন আনে না; বরং পরিবর্তনের সুদৃঢ় সংকল্প, নতুন বছরকে নতুনভাবে গড়ার সুদৃঢ় ইচ্ছা ও কর্মই পরিবর্তন আনে। কুরআন ও হাদীসের নির্দেশনা থেকে আমরা জানি যে, সৃষ্টির সেবা ও মানুষের উপকারই জাগতিক জীবনে মহান আল্লাহর রহমত ও বরকত লাভের অন্যতম উপায়। অনুরূপভাবে মানুষের ক্ষতি করা বা ব্যক্তি বা সমাজের অধিকার নষ্ট করা আল্লাহর গযব ও শাস্তি লাভের অন্যতম কারণ। আসুন আমরা সকলে মহান আল্লাহর নির্দেশ মত তাঁর ইবাদাত ও আনুগত্যের মাধ্যমে, মানুষের অধিকার আদায় ও ক্ষতি থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে নতুন বছরের সূচনা করি। মহান আল্লাহ আমাদের তাওফীক দিন।
মুর্হারাম মাস “হারাম” মাসগুলির অন্যতম। ইসলামী শরীয়তে যুলকাদ, যুলহাজ্জ, মুর্হারাম ও রজব- এ ৪টি মাসকে বিশেষ মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। এগুলি ‘হারাম’ অর্থাৎ ‘নিষিদ্ধ’ বা ‘সম্মানিত’ মাস বলে পরিচিত। এ সকল মাসে সকল প্রকার পাপ ও অন্যায় থেকে বিরত থাকতে ও অধিক নেক আমল করতে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে কুরআন ও হাদীসে। এ ৪ মাসের মধ্যে মুর্হারাম মাসকে বিশেষভাবে মর্যাদা প্রদান করে একে ‘আল্লাহর মাস’ বলে আখ্যায়িত করেছেন রাসূলুল্লাহ (সা.)। হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি যে, মুর্হারাম মাসের নফল রোযার সাওয়াব অন্য সকল নফল রোযার সাওয়াবের চেয়ে বেশি। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সা. বলেন:
أَفْضَلُ الصِّيَامِ بَعْدَ شَهْرِ رَمَضَانَ صِيَامُ شَهْرِ اللَّهِ الْمُحَرَّمِ
“রামাদানের পরে সবচেয়ে বেশি ফযীলতের সিয়াম হলো আল্লাহর মাস মুর্হারামের সিয়াম।” মুসলিম, আস-সহীহ ২/৮৬১।

মুর্হারাম মাসের ১০ তারিখকে ‘আশূরা’ বলা হয়। বিশেষভাবে এ দিনটির সিয়াম পালনের উৎসাহ ও নির্দেশনা দিয়েছেন রাসূলুল্লাহ সা.। জাহিলী যুগে মক্কার মানুষেরা আশূরার দিন সিয়াম পালন করত এবং কাবা ঘরের গেলাফ পরিবর্তন করত। হিজরতের পূর্বে মক্কায় অবস্থান কালে রাসূলুল্লাহ সা. নিজেও এ দিন সিয়াম পালন করতেন। মদীনায় হিজরতের পরে তিনি এ দিনে সিয়াম পালনের জন্য মুসলিমদেরকে নির্দেশ দেন। এ বিষয়ে ইবনু আব্বাস (রা) বলেন:
إنَّ رَسُولَ اللَّهِ সা. قَدِمَ الْمَدِينَةَ فَوَجَدَ الْيَهُودَ صِيَامًا يَوْمَ عَاشُورَاءَ فَقَالَ لَهُمْ رَسُولُ اللَّهِ সা. مَا هَذَا الْيَوْمُ الَّذِي تَصُومُونَهُ فَقَالُوا هَذَا يَوْمٌ عَظِيمٌ أَنْجَى اللَّهُ فِيهِ مُوسَى وَقَوْمَهُ وَغَرَّقَ فِرْعَوْنَ وَقَوْمَهُ فَصَامَهُ مُوسَى شُكْرًا فَنَحْنُ نَصُومُهُ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ সা. فَنَحْنُ أَحَقُّ وَأَوْلَى بِمُوسَى مِنْكُمْ فَصَامَهُ رَسُولُ اللَّهِ সা. وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ
“রাসূলুল্লাহ সা. মদীনায় এসে দেখেন যে, ইহূদীরা আশূরার দিনে সিয়াম পালন করে। তিনি তাদেরকে বলেন, এ দিনটির বিষয় কি যে তোমরা এ দিনে সিয়াম পালন কর? তারা বলেন, এটি একটি মহান দিন। এ দিনে আল্লাহ মূসা (আ) ও তার জাতিকে পরিত্রান দান করেন এবং ফিরআউন ও তার জাতিকে নিমজ্জিত করেন। এজন্য মূসা কৃতজ্ঞতা-স্বরূপ এ দিন সিয়াম পালন করেন। তাই আমরা এ দিন সিয়াম পালন করি। তখন রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, মূসার (আ) বিষয়ে আমাদের অধিকার বেশি এরপর তিনি এ দিবস সিয়াম পালন করেন এবং সিয়াম পালন করতে নির্দেশ প্রদান করেন।” বুখারী, আস-সহীহ, ২/৭০৪, ৪/১৭২২; মুসলিম, আস-সহীহ ২/৭৯৬।

রামাদানের সিয়াম ফরয হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আশূরার সিয়াম ফরয ছিল। রামাদানের সিয়াম ফরয হওয়ার পর আশূরার সিয়াম মুস্তাহাব পর্যায়ের ঐচ্ছিক ইবাদাত বলে গণ্য করা হয়। তা পালন না করলে কোনো গোনাহ হবে না, তবে পালন করলে রয়েছে অফুরন্ত সাওয়াব। রাসূলুল্লাহ সা. বলেন:
صِيَامُ يَوْمِ عَاشُورَاءَ أَحْتَسِبُ عَلَى اللَّهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ
“আমি আশা করি, আশূরার সিয়াম-এর কারণে আল্লাহ পূর্ববর্তী বৎসরের কাফ্ফারা করবেন।”
অন্য একটি কারণে ‘আশূরা’ মুসলিম উম্মাহর মধ্যে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে, তা হলো কারবালার ঘটনা। অনেকে ‘আশূরা’ বলতে কারবালার ঘটনাই বুঝেন, যদিও ইসলামী শরীয়তে আশূরার সিয়াম বা ফযীলতের সাথে কারবালার ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে ঐতিহাসিক ঘটনা হিসাবে কারবালার ঘটনা পর্যালোচনা করা আমাদের জন্য অতীব প্রয়োজন। উম্মাতের জন্য এ ঘটনা ছিল অত্যন্ত হৃদয় বিদারক বেদনাদায়ক ঘটনা। রাসূলুল্লাহ সা.-এর ওফাতের মাত্র ৫০ বৎসর পরে ৬১ হিজরী সালের মুর্হারাম মাসের ১০ তারিখ শুক্রবার ইরাকের কারবালা নামক স্থানে তাঁরই উম্মাতের কিছু মানুষের হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন তাঁরই প্রিয়তম দৌহিত্র হযরত হুসাইন ইবনু আলী (রা)। এ ঘটনা মুসলিম উম্মাহর মধ্যে চিরস্থায়ী বিভক্তি ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। অনেক মিথ্যা ও ভিত্তিহীন কাহিনী এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুসলিম উম্মার মধ্যে ছড়ানো হয়েছে। পরবর্তী প্রবন্ধে আমরা নির্ভরযোগ্য প্রাচীন ইতিহাসগ্রন্থের আলোকে ইমাম হুসাইনের শাহাদতের ঘটনা সংক্ষেপে আলোচনা করব।