মুসলমানী নেসাব

সিদ্দিক বংশের উজ্জ্বল নক্ষত্র, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফুরফুরার  পীর, শিরক, কুফর ও বিদ‘আতের বিরুদ্ধে আপোষহীন মুজাহিদ, মুসলিম ঐক্যের অগ্রদূত

হযরত মাও. আব্দুল কাহ্হার সিদ্দিকী আল-কুরাইশী সাহেবের

বাণী  ও নির্দেশনা

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লী ‘আলা রাসূলিহিল কারীম। আম্মাবা’দ, কুরআন ও সুন্নাহর বিশুদ্ধ ইল্ম ও অর্জিত ইলমকে  হৃদয়ের গভীরে ইয়াকীন ও কর্মে পরিণত করে সুন্নাতের পূর্ণ অনুসারী রাসূলুল্লাহ  ও সাহাবীগণের যুগের মতো হৃদয়ের অধিকারী মুসলিম তৈরি করার জন্য সৃষ্টি হয়েছিল মুসলিম সমাজে পীর মাশায়েখগণের দরবার। সমাজের অগণিত সাধারণ মানুষদের জন্য এগুলোই ছিল ইল্ম ও আমলের মাদ্রাসা। বিশেষত ইসলাম ও মুসলিম বিশ্বের দুর্দিনে, ক্রুসেড ও তাঁতার হামলার পরে সাধারণ মানুষদের মধ্যে ইল্ম, ঈমান ও আমল বাঁচিয়ে রেখেছিলেন এসকল ত্যাগী মাশাইখগণ। বাংলা-ভারতে ইসলাম প্রচার, প্রসার ও প্রতিষ্ঠা করেছেন মূলত তাঁরাই।

কুরআন সুন্নাহর আলোকে আল্লাহ্্র পথে চলে হৃদয়কে জাগতিক লোভ, লালসা, হিংসা, বিদ্বেষ থেকে মুক্ত করে আখেরাতমুখী করা ও আল্লাহ্র প্রেমে ভরে তোলাই তাসাউফ। কুরআন ও সুন্নাহর প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন, বিশুদ্ধ ঈমান অর্জন, হালাল উপার্জন, হারাম বর্জন ও ফরয পালনের পরে নফল ইবাদতের মধ্য থেকে সহজ ও অধিকতর উপকারী কিছু ইবাদত বেছে দিয়ে, প্রয়োজনে ইবাদতে মনোযোগ ও তৃপ্তি অর্জনের জন্য কিছু রিয়াযাত বা অনুশীলন শিখিয়ে আগ্রহী মুসলিম বা মুরীদকে আল্লাহ্র পথে নিয়ে যাওয়ার পথই হলো “তরীকত”।

কিন্তু সব ভালো বিষয়ের মতো পীর-মুরীদীর ধারাতেও ভেজাল ঢুকেছে অনেক আগে থেকেই। তাসাউফের নামে অগণিত ভণ্ড, ধোঁকাবাজ টাউট, মিথ্যাবাদী দাজ্জাল, যাদুকর, যিনদীক বা কর্মবিমুখ ভিক্ষুক ধোঁকা দিয়েছে সমাজের অগণিত সরলপ্রাণ মানুষকে। যে পীর মাশাইখগণ মানুষদেরকে আল্লাহ্র পথ দেখাতেন তাঁদের নামে মানুষদেরকে আল্লাহ্কে ছেড়ে মানুষের পূজা করতে শেখানো হচ্ছে। পীর-মুরীদী, তাসাউফ ও তরীকতের নামে চলছে কবর পূজা, পীর পূজা। অপরদিকে সমাজের অগণিত পাপের পঙ্কিলতায় লিপ্ত, পুণ্যের আকুলতায় অতৃপ্ত হৃদয়ের মানুষকে তাদের পাপের স্বীকৃতি দিয়ে বুঝানো হচ্ছে, Ñ যাই করো অসুবিধা নেই, যতটুকু পার কর। পীর সাহেব তো আছেনই! ভক্তি কর, মাঝেমধ্যে ধরণা ও হাদিয়া দাও, তাতেই চলবে! পীরের বেলায়াত ও আমল তো রয়েছে, তোমার কিছু কম হলেও অসুবিধা নেই!

তারপরও কিছু মানুষ কুরআন সুন্নাহর কথা চিন্তা করেন। চিন্তা করেন সুন্নাতে নববী ও সাহাবায়ে কেরামের তাসাউফ তরীকত নিয়ে। তাঁদের পথেই চলতে চান তাঁরা। তাঁদের মতোই আল্লাহ্র বেলায়াত পেয়ে ধন্য হতে চান তাঁরা। এধরনের অনেক মানুষ আমার কাছে মুরীদ হতে আসেন। অনেকেই একটি সংক্ষেপ দিক নির্দেশক বই চান, যে বই অনুসরণ করে তাঁরা চলবেন। আমি বারবার বলেছি, কুরআন কারীম ও সহীহ হাদীস অনুসরণ করে চলুন। কিন্তু তাঁরা বলেন যে, অগণিত সাধারণ মানুষ কিভাবে কুরআন সুন্নাহ থেকে আমল শিখবে। এজন্যই এ সংক্ষিপ্ত বইটি লেখা হলো। এটিই হলো আমার সকল মুরীদের প্রাথমিক আমল ও ওযীফার বই। একটি বইয়ে সব শেখা বা শেখানো যায় না। আমার মুরীদদেরকে আমি সর্বদা পড়া ও বিশুদ্ধ জ্ঞানার্জনের জন্য অনুরোধ করছি। বিশেষ করে “এহ্ইয়াউস সুনান” ও “রাহে বেলায়াত” বই দুটি অবশ্যই পাঠ করবেন, কাছে রাখবেন ও পরিবারের সবাইকে পড়াবেন।

আমি আমার ওয়ালিদ সাহেব রাহিমাহুল্লাহুর ও তাঁর মাধ্যমে আমার দাদাজী রাহিমাহুল্লাহু ও অন্যান্য সকল বুজুর্গ থেকে যে শিক্ষা পেয়েছি এর সার-সংক্ষেপ হলো কুরআন সুন্নাহর বাইরে কোনো তরীকত, তাসাউফ নেই। ইত্তিবায়ে সুন্নাতের বাইরে কোনো ইবাদত, কামালত বা বুজুর্গী নেই। তরীকত অর্থ শুধুমাত্র কিছু যিকির আযকার বা রিয়াযত নয়। ঈমান আকীদা, আমল ও রিয়াযাতের সমন্বয় হলো তরীকত। আকীদা, তাকওয়া, ফরয, ওয়াজিব, সুন্নাত আমল অপরিবর্তনীয়। কিন্তু রিয়াযাত, মুজাহাদা, উপকরণ বা অবলম্বনের পরিবর্তন ঘটে ও ঘটাতে হয়। যুগে যুগে যত তরীকত সৃষ্টি হয়েছে সবই এ রিয়াযাত ও নফল ওযীফার পরিবর্তন হেতু। কারণ নফল ইবাদত ও রিয়াযাতের পদ্ধতির মধ্যে কিছু রয়েছে জায়েয আর কিছু সুন্নাত। অনেক সময় প্রয়োজনের জন্য তরীকতের আমল বা রিয়াযাতের মধ্যে কিছু জায়েয বিষয় রয়ে যায়। এগুলোকে ক্রমান্বয়ে সুন্নাত পদ্ধতিতে উত্তরণ করার চেষ্টা করতে হয়।

আমি আমার পিতা ও পিতামহের কুরআন সুন্নাহ ভিত্তিক আকীদা, তাকওয়া ও আমলকে সুদৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে রেখেছি। তাঁদের রেখে যাওয়া দাওয়াত, ইরশাদ ও সংস্কারের কাজ জোরদার করার চেষ্টা করেছি। আর কুরআন সুন্নাহর আলোকে রিয়াযত ও ওযীফার মধ্যে কিছু পরিবর্তন করেছি। তাঁদের শিক্ষার আলোকেই আমাকে এ পরিবর্তন করতে হয়েছে। তাঁরা আমাদের শিখিয়েছেন যে, সুন্নাতের অনুসরণই কামালাতের একমাত্র পথ। তবে কিছু জায়েয বিষয় তারা বিভিন্ন প্রয়োজনে বজায় রেখেছিলেন। আতিার অনেক জায়েয বিষয় বজায় রাখতে বাধ্য হচ্ছি, যদিও সুন্নাতই উত্তম। সাথে সাথে আমি আমার দায়িত্ব ও সাধ্যের মধ্যে কিছু কিছু বিষয়ে জায়েযের পরিবর্তে সুন্নাত পদ্ধতি প্রদানের চেষ্টা করছি। যেন মুরীদগণ বেশি সাওয়াব অর্জন করতে পারেন এবং তাঁদের জন্য কামালাতের পথ আরো সহজ ও নিশ্চিত হয়। এ পুস্তিকাটি সেভাবেই রচনা করিয়েছি। এতে যা কিছু বলা হয়েছে তা আমার মত ও আমার নির্দেশনা জেনে পালন করবেন।

আমার নির্দেশে ও এজাযতে এ পুস্তিকায় এবং “এহ্ইয়াউস সুনান” ও “রাহে বেলায়াত” গ্রন্থদ্বয়ে যা কিছু আমল ও দিক নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে সবই কুরআন কারীম, সহীহ হাদীস ও সাহাবীগণের আমলের উপর ভিত্তি করে দেয়া হয়েছে। এগুলো অবজ্ঞা করে বা অবহেলা করে ঈমান হারা হবেন না। এগুলোর উপর আমল করুন এবং সর্বান্তকরণে গ্রহণ করুন। সহীহ সুন্নাত জানার পরে মুমিনের উপর তা মেনে নেয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পথ থাকে না। পালন করতে না পারলে সুন্নাতের মহব্বত ও ইজ্জত করতে হবে এবং স্বীকার করতে হবে যে, বিশেষ কারণে আমি সুন্নাত পালন করতে পারছি না। কিন্তু সুন্নাত জানার পরেও তাকে সমাজের প্রচলন বা কোনো মানুষের অজুহাত দিয়ে অবজ্ঞা করলে ঈমান নষ্ট হয়ে যাবে। সাবধান থাকবেন।

এ পুস্তিকার আমল পরিপূর্ণ আয়ত্ব হয়ে গেলে চেষ্টা করবেন “রাহে বেলায়াত” বইটি থেকে আরো আমল শিখে সেগুলো পালন করতে। আল্লাহ্র দরবারে দোয়া করি Ñ তিনি যেন এ পুস্তিকার নির্দেশনা মতো ঈমান, ইসলাম ও ইহসানের পথে যারা চলার চেষ্টা করবেন এবং তার ওযীফাগুলো যারা পালন করবেন তাঁদের সকলকে হেফাজত করেন, দুনিয়া ও আখেরাতে সকল কল্যাণ প্রদান করেন ও তরীকতের পথে পরিপূর্ণ উন্নতি, বরকত ও মর্যাদা প্রদান করেন।

 

আহকারুল এবাদ,

-আবুল আনসার সিদ্দিকী

(পীর সাহেব, ফুরফুরা)

 

 

 

দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকা

প্রশংসা মহান আল্লাহ্র নিমিত্ত। সালাত ও সালাম তাঁর প্রিয়তম রাসূল মুহাম্মাদ ()-এর উপর, তাঁর পরিজন ও সহচরগণের উপর।

ফুরফুরার পীর আবুল আনসার সিদ্দিকী রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন সুন্নাতের পুনরুজ্জীবনে আপোসহীন সিপাহসালার। ১৪২২ হিজরী (২০০২ খৃ) সালে ‘এহইয়াউস সুনান’ বইটি প্রকাশের পর তাঁর নির্দেশে “রাহে বেলায়াত” গ্রন্থটি লেখা হয়। অনেকেই গ্রন্থটি সাদরে গ্রহণ করেন এবং আমল করতে শুরু করেন। কিন্তু তাঁদের অভিযোগ ছিল যে, বইটি অনেক বড়, একটি সংক্ষেপ বই দরকার। সে চাহিদা সামনে রেখে এ পুস্তিকাটি লেখা হয়।

সমাজে একটি উদ্ভট ও অদ্ভুৎ মানসিকতা আমরা দেখি। স্বপ্ন, কাশফ, তরীকা বা বুজুর্গের নামে নতুন কোনো কিছু চালু করলে অধিকাংশ মুসলিম তা সহজেই গ্রহণ করেন। অন্তত কেউ আপত্তি করেন না। কিন্তু সহীহ হাদীস নির্ভর মাসনূন আমল-ওযীফার কথা বললে নানা অজুহাতে তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। উপরন্তু এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। এ মানসিকতার মানুষদের কাছে বইটির বক্তব্য গ্রহণযোগ্য করার জন্য তিনি বইয়ের উপরে তাঁর নাম লেখার নির্দেশ দেন। উপরন্তু তিনি বইটির প্রথম পৃষ্ঠায় লিখেন: “এ কেতাবের সকল বিষয় কুরআন-সুন্নাহর ভিত্তিতে লেখা হয়েছে। তার কোন বিষয়কে একার করলে ঈমান হারানোর সম্ভাবনা আছে।” মহান আল্লাহ্ সুন্নাতে নববীর পুনরুজ্জীবনে তাঁর প্রচেষ্টা কবুল করে তাকে সর্বোত্তম পুরস্কার প্রদান করুন।

২০০৩ সালে বইটি প্রকাশের পর কয়েকবার পুনর্মুদ্রণ করা হয়। ইতোমধ্যে ২০০৭ সালে “সহীহ মাসনূন ওযীফা” প্রকাশিত হয়েছে। এজন্য এ বইটি আর ছাপা হয় নি। কিন্তু অনেকেই বইটি পেতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। বড় বইগুলো পড়া অনেকের জন্য সম্ভব হয় না। এছাড়া সালাত ও আরকানুল ইসলাম বিষয়ক কিছু আলোচনা শুধু এ বইয়েই রয়েছে। এজন্য বইটি পুনঃপ্রকাশের সিদ্ধান্ত নিই। বইয়ের শেষে “যিকরের মাজলিস” নামে একটি অনুচ্ছেদ ছিল। এ সংস্করণে সেটি বাদ দিয়ে “পারিবারিক জীবন” অনুচ্ছেদটি সংযোজন করেছি। এছাড়া প্রথম সংস্করণের ভাষা, বক্তব্য বা বিষয়ের তেএ কোনো পরিবর্তন করা হয় নি। মহান আল্লাহ্ দয়া করে বইটি কবুল করে লেখক, পাঠক ও সকল শুভানুধ্যায়ীকে মাগফিরাত, রহমত, তাওফীক ও কবুলিয়্যাত দান করুন।

- আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর

 

প্রথম সংস্করণের ভূমিকা

بسم اله الرحمن الرحيم. نحمده ونصلي على رسوله الكريم. وعلى آله وصحبه أجمعين.

বর্তমান সময়ে আমরা অধিকাংশ মানুষ অত্যন্ত কর্মব্যস্ত হয়ে পড়েছি। ইচ্ছা থাকলেও বৃহদাকারের বইপুস্তক কেনা বা পাঠ করা অনেক সময় সম্ভব হয় না। এজন্য সংক্ষিপ্ত আকারে আরকানুল ঈমান, আরকানুল ইসলাম, ইহসান, বেলায়াত, সুন্নাত ও ইত্তিবায়ে সুন্নাতের বিবরণ-সহ সাধারণ মুসলমানদের পালনযোগ্য মাসনূন ওযীফার সমন্বয়ে এ বইটি লেখা।

“ওযীফা” অর্থ দৈনন্দিন বা নিয়মিত ও নির্ধারিত কর্ম বা কর্মসূচী। এ অর্থে মুমিনের জীবনের ফরয ও নফল সকল নিয়মিত ও নির্ধারিত কর্মই ওযীফা। ঈমান, নামায, রোযা, দান, যাকাত, তিলাওয়াত, দাওয়াত, জনসেবা ইত্যাদি সকল প্রয়োজনীয় কর্ম থেকে মুমিন নিজের জন্য দৈনন্দিন, সাপ্তাহিক, মাসিক বা বাৎসরিক একটি নির্ধারিত কর্মসূচি ও কর্মতালিকা অর্থাৎ ওযীফা তৈরি করে নেবেন। রাসূলুল্লাহ -এর শিক্ষা ও কর্মের আলোকে এ সামগ্রিক ওযীফার বিভিন্ন দিক আলোচনা করার চেষ্টা করেছি এ পুস্তিকাটিতে। যেন আগ্রহী মুমিন সহজে তার মধ্য থেকে নিজের “ওযীফা” বা নির্ধারিত কর্মসূচী তৈরি করে নিতে পারেন। প্রাণহীন আনুষ্ঠানিকতার পরিবর্তে রাসূলুল্লাহ  ও তাঁর সাহাবীগণ কর্তৃক আচরিত প্রাণবন্ত খাঁটি ইবাদত বন্দেগির উপর গুরুত্ব আরোপের চেষ্টা করা হয়েছে।

একদিকে ইসলামের অগণিত অতিপ্রয়োজনীয় বিষয় আলোচনা করা, অপরদিকে ইসলামের  নামে অগণিত কুসংস্কার বা ভুলেভরা প্রাণহীন আনুষ্ঠানিকতার অসারতা আলোচনা করা এত সংক্ষিপ্ত পরিসরে কখনোই সম্ভব নয়। সংক্ষেপ করার অর্থ অনেক কিছু বাদ দিয়ে অল্প কিছু লেখা। এজন্য অনেক জরুরি বিষয় বাদ দিতে হলো।

পুস্তিকাটিতে শুধুমাত্র সহীহ ও নির্ভরযোগ্য হাদীসের উপর নির্ভর করার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি। হাদীস থেকে ফিকহী মাসআলাহ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ইমামগণের কিছু মতভেদ আছে। এগুলো এড়িয়ে শুধুমাত্র হানাফী ফিকহের আলোকে পুস্তিকাটি রচনা করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ইমাম আবু হানীফা, মুহাম্মাদ, আবু ইউসূফ, সারাখসী, সামারকান্দী, কাসানী, রাহিমাহুমুল্লাহ প্রমুখ প্রাচীন ইমামগণের প্রসিদ্ধ গ্রন্থসমূহের উপর নির্ভর করা হয়েছে। যেন পাঠক নিশ্চিত মনে এগুলো পালন করতে পারেন। সমাজে মযহাবের নামে প্রচলিত অনেক ভুল, কুসংস্কার ও অনির্ভরযোগ্য বিষয়, যা মযহাবের ইমামগণ উল্লেখ করেননি বা পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহে নেই, সেগুলো পরিহার বা প্রতিবাদ করা হয়েছে। কোনো বিষয়ে সন্দেহ হলে অস্থির না হয়ে প্রয়োজনে প্রাচীন গ্রন্থাবলী দেখার চেষ্টা করবেন বা আমাদেরকে প্রশ্ন করবেন।

সংক্ষেপ করার জন্য পুস্তিকায় উল্লেখিত আয়াত ও হাদীসের আরবি লেখা হয়নি, কুরআন-হাদীসের বিস্তারিত দলিলপ্রমাণাদি আলোচনা করা হয়নি এবং আলোচিত সকল হাদীস, মাসআলাহ বা বর্ণনার গ্রন্থনির্দেশনা বা ৎবভবৎবহপব প্রদান করা হয়নি।

পুস্তিকাটি লেখার প্রেরণা, নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধান সবই আমার পরম শ্রদ্ধেয় শ্বশুর ফুরফুরার পীর আলহাজ্ব হযরত মাওলানা আবুল আনসার মুহাম্মাদ আব্দুল কাহ্হার সিদ্দীকী আল-কুরাইশী সাহেবের। আল্লাহ্ তাকে সর্বোত্তম পুরস্কার দান করেন, হেফাযত করেন, সুস্থতা ও নেকআমলপূর্ণ দীর্ঘ জীবন প্রদান করেন এবং দেশের অগণিত মানুষকে কুরআন কারীম ও সহীহ হাদীস অনুসারে ইসলামের  সঠিক নির্দেশনা প্রদানের তাওফীক প্রদান করেন।

পাঠকের কাছে বিশেষ আর্জি হলো, এ বইয়ে যে কোনো প্রকার ভুল ধরা পড়লে অবশ্যই তা লেখক বা প্রকাশককে জানাবেন। আল্লাহ্ আপনাকে সর্বোত্তম পুরস্কার দান করবেন।

আল্লাহ্র দরবারে সকাতর আর্জি, পুস্তিকাটি রচনায় আমার যৎসাএ্য প্রচেষ্টা তিনি দয়া করে কবুল করেন। তাকে আমার, আমার পিতামতা, স্ত্রী-সন্তান, উস্তাদ, পরিজন ও সকল পাঠক-পাঠিকার ক্ষমা, বরকত ও নাজাতের ওসীলা বানিয়ে দেন; আমীন।

 

- আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর

 

আরবি উচ্চারণ ও প্রতিবর্ণায়ন বিষয়ক কিছু তথ্য

আরবি সূরা, দোয়া ইত্যাদির বাংলা উচ্চারণ লিখেছি। এগুলো শুধুমাত্র প্রাথমিক, অলস, তাকে বারে অক্ষম পাঠকদের জন্য। বাংলা উচ্চারণের মাধ্যমে কখনোই বিশুদ্ধভাবে আরবি উচ্চারণ করা যায় না। প্রত্যেক মুমিনের চেষ্টা করতে হবে, বিশুদ্ধ আরবি উচ্চারণ শিখে বিশুদ্ধভাবে সূরা, যিকির ও দোয়াগুলো মুখস্থ করা। আরবি উচ্চারণে বাঙালির দুটি গমস্যা: ক) আরবি ভাষায় এএই অনেকগুলো বর্ণ বা ধ্বনি আছে যা বাংলা ভাষায় নেই। বাঙালি পাঠক আরবি ধ্বনির কাছেবর্তী বাংলা ধ্বনি দিয়ে আরবি উচ্চারণ করেন। খ) আরবি ও অন্যান্য অনেক ভাষায় দীর্ঘ স্বরধ্বনি আছে। বাংলায় কোনো দীর্ঘ স্বর ধ্বনি নেই। এজন্য স্বর উচ্চারণে বাঙালি ভুল করেন।

প্রথম সমস্যা ও তার সমাধানের প্রচেষ্টা :

(১). আরবিতে (স) বা (ঝ) তার কাছাকাছি তিনটি ধ্বনি : (س) (ص) ও (ث)। (س)-তার জন্য আমি সর্বদা (স) ব্যবহার করেছি। (স্কুল), (স্পষ্ট), (ব্যস্ত) ইত্যাদি শব্দের মধ্যে (স)-র যে উচ্চারণ সে উচ্চারণ করতে হবে। যেমন : (সুব‘হা-নাল্লাহ), (সালা-ম) (ص) ধ্বনি বাংলায় নেই। কোনোভাবেই অনুশীলন ছাড়া বাঙালি এ ধ্বনি সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারবেন না। আমি (ص)-তার উচ্চারণের জন্য (স্ব) ব্যবহার করছি। অপারগ পাঠক (স্ব)-কে যথাসম্ভব মোটা  (সোয়া)) হিসাবে উচ্চারণ করবেন।

(ث) বাঙালির জন্য অত্যন্ত কঠিন ধ্বনি। জিহ্বাকে দাতের অগ্রভাগের নিচে দাঁত থেকে বিচ্ছিন্ন রেখে দাঁত ও জিহ্বার মাঝখান দিয়ে বাতাস ছেড়ে দিলে তার উচ্চারণ হয়। এ বর্ণের জন্য আমি (স) ব্যবহার করার চেষ্টা করেছি।

(২). বাংলায় (জ) ধ্বনির জন্য দু’টি বর্ণ: (জ) ও (য) বাঙালি এ দু’টির মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না। আরবিতে তার কাছাকাছি চারটি ধ্বনি (ج), (ز), (ذ), (ظ)। বাঙালি এ চারটি ধ্বনিই ভুল উচ্চারণ করেন। আমি (ج)-তার জন্য (জ) ব্যবহার করেছি। এ উচ্চারণ ইংরেজি (ঔ)-তার মতো, কড়া ও শক্ত ভাবে জিহ্বাকে মুখের মাঝখানে উপরের তালুর কাছে নিয়ে উচ্চারণ করতে হবে।

(ز، ذ، ظ) তিনটি ধ্বনির জন্য (য) ব্যবহার করেছি, ইংরাজি (ত)- তার মতো। জিহ্বা দাঁতের কাছে নিয়ে উচ্চারণ করতে হবে। এতে আরবি (ز)- উচ্চারণ ঠিক হবে। বাকি দুটি ধ্বনির উচ্চারণ অনুশীলন ছাড়া ঠিক করা যায় না।

(৩). বাংলায় (ত) একটি, আরবিতে দু’টি (ت، ط)। আমি দু’টির জন্যই (ত) ব্যবহার করেছি। (ط)-র জন্য (ত্ব) ব্যবহার করেছি, যার উচ্চারণ অনেকটা (তোয়া)।

(৪). বাংলায় (দ) একটি। আরবি (د) বাংলা (দ) তার মতো। এছাড়া (ض) ধ্বনিটিও অনেকটা মোটা (দ)-তার মতো উচ্চারণ করা হয়। আমি (د) তার জন্য (দ) ও (ض) তার জন্য (দ্ব) ব্যবহার করেছি।

(৫). আরবিতে দু’টি (ক)। (ق)-তার জন্য (ক্ব) ব্যবহার করেছি। পাঠক (ক্ব)-কে যথাসম্ভব গলার ভিতর থেকে উচ্চারণ করবেন।

(৬). আরবির কঠিন উচ্চারণগুলোর অন্যতম গলার ভিতর থেকে উচ্চারিত ধ্বনিগুলো। যেমন, – (ح، ع، غ،) এগুলোর জন্য আমি (ح)-তার জন্য (‘হ), (ع) তার জন্য ‘আ/‘ই/ বা ‘উ ব্যবাহার করছি। পাঠক যদি দেখেন কোনো বর্ণের পূর্বে উল্টা কমা তাহলে বর্ণটিকে যথাসম্ভব গলার মধ্যে নিয়ে উচ্চারণ করবেন।

দ্বিতীয় সমস্যা ও সমাধানের চেষ্টা :

দীর্ঘ (ই) বুঝাতে (ঈ) বা ( ী), দীর্ঘ-উ বুঝাতে (ঊ) অথবা ( ূ) এবং দীর্ঘ (আ) বুঝাতে (-) ব্যবহার করেছি। পাঠক এদিকে খুবই খেয়াল রাখবেন। আপনার মাতৃভাষা যেন আরবীর উচ্চারণে বাধা না দেয়। বাংলা দীর্ঘ কারের কোনো উচ্চারণ নেই। কিন্তু আরবি উচ্চারণের সময় অবশ্যই খেয়াল রাখবেন। যেমন,Ñ (আল্লা-হ), (সালা-ম) (সুব‘হা-ন )উচ্চারণে (-) তার স্থলে অবশ্যই একটু টানবেন। (সুব্বূহুন কুদ্দূসুন) উচ্চারণে (বূ) ও (দূ) তার (উ)-কে দীর্ঘ করতে হবে : (সুব,বুউউহুন) (কুদদুউউসুন)। (লা- শারীকা লাহু) উচ্চারণের সময় (লা-) তার আ ও (রী)-তার (ই)-কে দীর্ঘায়িত করতে হবে। (শারিইইকা)।

এ জাতীয় আরেকটি সমস্যা  হলো ‘হসন্ত’ বাংলায় আমরা ‘কাল’ শব্দটির (ল) ধ্বনি দুভাবে পড়তে পারি : কাল্ Ñ আজকাল, অথবা কালো Ñ কাল রঙ। আরবি শব্দের বাংলা উচ্চারণ লিখলে বিষয়টি গমস্যা সৃষ্টি করে। মনে রাখতে হবে কোনো অক্ষর আকার, ওকার, ইত্যাদি থেকে মুক্ত থাকলে তা অবশ্যই হসন্ত হবে, হসন্ত দেয়া থাক বা না থাক। কারণ আরবিতে (অ-কার নেই) কাজেই (সুব‘হা-নাল্লাহ) লেখা থাকলে (সুব্‘হা-নাল্লাহ) পড়তে হবে, (ব)-তার নিচে হসন্ত থাক অথবা না থাক।

সর্বাবস্থায় এ সকল প্রচেষ্টা সহায়ক মাত্র। পাঠক যদি আরবি উচ্চারণ না জানেন তাহলে অবশ্যই একজন আরবি জানা মানুষের সাহায্য নিয়ে নিজের উচ্চারণগুলো ঠিক করে নিবেন। একবার ভুল মুখস্থ করলে পরে ঠিক করতে কষ্ট হয়।

 

সূচীপত্র

প্রথম অধ্যায় : আরকানুল ইসলাম /১৫-১৩০

ইসলাম ও আরকানুল ইসলাম /১৫

ইসলামের  পঞ্চস্তম্ভ /১৬

প্রথম স্তম্ভ : ঈমান /১৮

ঈমানের প্রথম অংশ: তাওহীদ /১৮

তাওহীদের  প্রকারভেদ /১৯

প্রথমত: জ্ঞান পর্যায়ের  তাওহীদ /১৯

(ক) সৃষ্টি  ও প্রতিপালনের একত্ব /২০

(খ) নাম ও গুণাবলীর একত্ব /২০

দ্বিতীয়ত, কর্ম পর্যায়ের (ইবাদতের) একত্ব /২০

ইবাদতের প্রকারভেদ /২৬

আরকানুল ঈমান /২৭

১. আল্লাহ্র উপর বিশ্বাস /২৭

২. মালাইকা বা ফিরিশতাগণে বিশ্বাস /২৭

৩. আল্লাহ্র গ্রন্থসমূহে বিশ্বাস /২৮

৪. আল্লাহ্র নবী-রাসূলগণে বিশ্বাস /২৮

৫. আখেরাতে বিশ্বাস /২৯

৬. তাকদীর বা আল্লাহ্র নির্ধারণে বিশ্বাস /৩০

ঈমানের দ্বিতীয় অংশ : রিসালাত /৩৩

(১) মুহাম্মাদ () /৩৩

(২) ‘আবদুহু /৩৪

(৩) ‘রাসূলূহু /৩৬

রিসালাতে বিশ্বাসের অর্থ /৩৬

তাওহীদ ও রিসালাতের ঈমানের কল্যাণ /৪২

ঈমান বিনষ্টকারী বিষয়াদি /৪৪

সমাজে প্রচলিত কিছু শিরক-কুফর /৪৫

দ্বিতীয় স্তম্ভ : সালাত /৫০

আল্লাহ্র যিকিরের জন্য সালাত /৫১

সালাতের মধ্যে ওয়াসওয়াসা বন্ধের দোয়া /৫৩

সালাত আদায়ের পূর্বে /৫৩

সালাতের পূর্বের ফরয কর্মসমূহ /৫৩

(১) ওয়াক্ত বা সময় হওয়া /৫৩

আযান, ইকামত, আযানের জাওয়াব, দরুদ পাঠ ও দোয়া/ ৫৪

(২) শরীর, পোশাক ও স্থানকে পবিত্র করা /৫৫

(৩) কিবলামুখি হওয়া /৫৫

(৪) নিয়্যাত বা মনের ইচ্ছা ও উদ্দেশ্য বিশুদ্ধ হওয়া /৫৫

(৫) ওযু-গোসলের মাধ্যমে পবিত্র হওয়া /৫৬

ওযুর বিধান /৫৬

ওযু নষ্ট  হওয়ার কারণ ও ওযু বিষয়ক ভুলভ্রান্তি /৫৮

গোসলের বিধান /৫৯

তায়াম্মুতোর বিধান /৫৯

(৬) সতর আবৃত করা /৫৯

সালাত আদায়ের নিয়ম /৬০

সানা’র দোয়া- ১, ২, ৩ /৬৩

কয়েকটি প্রয়োজনীয় সূরা ও আয়াত /৬৭

রুকুর তাসবীহ-১, ২, ৩ /৭১

রুকুর পরে দাঁড়ানো অবস্থায় যিকির-১, ২, ৩, ৪ /৭৩

সাজদার তাসবীহ, সাজদার দোয়া-১, ২ /৭৫

প্রশান্তি ও ভক্তিময় রুকু সাজদা /৭৭

তাশাহহুদ ও দরুদ /৭৮

সালামের পূর্বের মাসনূন দোয়া (দোয়া মাসূরা)-১, ২, ৩ /৮০

সালাতের কার্যাবলীর প্রকারভেদ /৮৩

সালাতের প্রকারভেদ /৮৪

ফরয সালাত /৮৫

ফরয কিফাইয়া সালাত: সালাতুল জানাযা /৮৫

জানাযার মাসনূন দোয়া-১, ২, ৩, ৪, ৫ /৮৬

ওয়াজিব ও সুন্নাত সালাত /৮৮

সালাতুল ঈদ /৮৮

সালাতুল বিতর /৮৯

মাসনূন কুনুত-১ ও ২ /৯১

পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের আগে পরের সুন্নাত সালাত /৯৩

কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদের সালাত /৯৪

রমযান মাসের কিয়ামুল লাইল বা তারাবীহ /৯৬

সালাতুত তারাবীহ বিষয়ক কিছু প্রয়োজনীয় কথা /৯৭

সালাতুদ দোহা (চাশত ও ইশরাকের নামায) /৯৮

মাগরীব ও ইশার সালাতের মধ্যবর্তী নফল সালাত /৯৯

সালাতুত তাসবীহ /৯৯

সালাতুত তারবা, সালাতুল ইস্তিখারা /১০১

অন্যান্য সুন্নাত-নফল সালাত /১০৩

পাঁচ ওয়াক্ত ফরয সালাত জামাতে আদায় করতে হবে /১০৩

জামাতে সালাত আদায়ের কিছু প্রয়োজনীয় বিধান /১০৫

সালাত ভঙ্গ হওয়ার কারণসমূহ /১০৮

তৃতীয় স্তম্ভ : যাকাত /১০৯

যাকাতের গুরুত্ব, সাওয়াব, উপকারিতা ও অবহেলার পরিণতি /১০৯

যাকাত যোগ্য দ্রব্যের শ্রেণীভাগ ও নিয়ম /১১১

(ক) সোনা, রূপা ও নগদ টাকার যাকাত /১১১

(খ) ব্যবসায় বা বিক্রয়ের জন্য রক্ষিত দ্রব্যের যাকাত /১১২

(গ) বিভিন্ন সামগ্রীর একত্রে যাকাত /১১৩

(ঘ) ফল-ফসলের যাকাত/ ১১৩

(ঙ) বাংলাদেশে উশর বা ফসলের যাকাত দিতেই হবে /১১৫

যাকাত কারা পাবেন /১১৬

নফল বা অতিরিক্ত দান, “সাদাকাহ” বা ইনফাক /১১৭

চতুর্থ স্তম্ভ : সিয়াম বা রোযা /১১৯

সিয়াতোর কিছু আহকাম /১২০

যে সকল কারণে সিয়াম নষ্ট হয় /১২১

কতগুলো প্রয়োজনীয় তথ্য /১২২

পঞ্চম স্তম্ভ : হজ্জ /১২৪

হজ্জের ফজিলত /১২৫

হজ্জ বিষয়ক কিছু ভুল ধারণা /১২৫

মাওয়াকীত বা ইহরামের সময় ও স্থান /১২৭

ইহরামের নিয়ম /১২৭

ইহরাম অবস্থায় নিুলিখিত কর্মগুলো নিষিদ্ধ ও বর্জণীয় /১২৮

তিন প্রকার হজ্জের নিয়মাবলী /১২৮

হজ্জের কর্মাবলীর সংক্ষিপ্ত ধারণা /১২৯

দ্বিতীয় অধ্যায়: বেলায়াত, ওসীলাহ, ইহসান ও ওযীফা /১৩১-২০২

বেলায়াত ও ওয়াসীলাহ বা আল্লাহ্র বন্ধুত ও নৈকট্য /১৩১

ফরয, হারাম ও কবীরা গোনাহ /১৩৬

ইহসান বা সৌন্দর্য ও পূর্ণতা /১৪১

সুন্নাত ও ইত্তিবায়ে সুন্নাত /১৪২

(ক) সুন্নাত বনাম খেলাফে সুন্নাত /১৪২

(খ) জায়েয ও সুন্নাত /১৪৪

(গ) সুন্নাতের অনুসরণ বনাম উদ্ভাবন ও বিদ‘আত /১৪৫

(ঘ) সুন্নাতের অনুসরণের গুরুত্ব /১৪৮

(ঙ) বিভিন্ন ইবাদত বন্দেগি বিষয়ক কিছু সুন্নাত ও খেলাফে সুন্নাত /১৪৯

(১) নামায, রোযা ইত্যাদি বিষয়ক কিছু সুন্নাত ও খেলাফে সুন্নাত /১৫০

(২) দোয়া-মুনাজাত বিষয়ক কিছু সুন্নাত ও খেলাফে সুন্নাত /১৫০

(৩) কুরআন তিলাওয়াত বিষয়ক কিছু সুন্নাত ও খেলাফে সুন্নাত /১৫৬

(৪) যিকির বিষয়ক কিছু সুন্নাত ও খেলাফে সুন্নাত /১৫৮

(৫) দরুদ- সালাম বিষয়ক কিছু সুন্নাত ও খেলাফে সুন্নাত /১৫৮

(৬) জানাযা, দাফন ও কবর বিষয়ক কিছু সুন্নাত ও খেলাফে সুন্নাত /১৫৯

(৭) কুলখানী, যিয়ারত ইত্যাদি বিষয়ক কিছু সুন্নাত ও খেলাফে সুন্নাত /১৬০

(৮) কবর যিয়ারত বিষয়ক কিছু সুন্নাত ও খেলাফে সুন্নাত /১৬১

(৯) তাবাররুক ও তাযীম বিষয়ক কিছু সুন্নাত ও খেলাফে সুন্নাত /১৬২

বেলায়াত, ওয়াসীলাহ ও ইহসানের কিছু কর্ম /১৬৫

১. নফল সালাত, সিয়াম, সাদাকাহ ও হজ্জ /১৬৬

২. যে কোনো মানুষ বা প্রাণীর উপকার করা /১৬৬

৩.  সবাইকে ভালবাসা এবং হৃদয়কে হিংসা ও বিদ্বেষ মুক্ত করা /১৬৭

৪. জাগতিক জীবনের অস্থায়িত্ব স্মরণ /১৭১

যিক্র-ওযীফা /১৭৩

যিকিরের প্রকারভেদ /১৭৩

প্রথম ওযীফা : সদা সর্বদা পালনের জন্য /১৭৩

দ্বিতীয় ওযীফা : সকালে, দিবসে ও সন্ধ্যায় পালনের ওযীফা /১৮৩

ক) ফজরের সালাতের পরে /১৮৩

খ) সারাদিন কর্ম ব্যস্ততার মধ্যে /১৮৯

গ) মাগরীবের সালাতের পরে /১৮৯

তৃতীয় ওযীফা : যোহর, আসর ও ইশার পরে পালনের জন্য /১৯০

কুরআন কারীমেরওযীফা /১৯১

চতুর্থ ওযীফা : রাত্রে বিছানায় শয়ন করার আগে ও পরে /১৯২

ক) শয়নের পূর্বে /১৯২

খ) শয়নের পরে /১৯৩

গ) রাত্রে ঘুম ভেঙ্গে গেলে /১৯৬

উপসংহার: পরিবার ও পারিবারিক জীবন /১৯৬

ক. বিবাহ ও পরিবার মানব সভ্যতার ভিত্তি /১৯৬

খ. পরিবার গঠনে ইসলামের  নির্দেশনা /১৯৭

গ. উপভোগ্য সুন্দর পারিবারিক জীবনের জন্য /১৯৮

(১) বাস্তবতা অনুধাবন /১৯৯

(২) সঙ্গী নির্বাচনে সুন্নাহ অনুসরণ ও ধার্মিকতার অনুশীলন /১৯৯

(৩) স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক দায়িত্ববোধ /২০০

(৪) ইবাদতের চেতনা /২০৩

(৫) কৃতজ্ঞতা ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি /২০৩

(৬) ধৈর্য ও বিনম্রতা /২০৫

(৭) সন্তান, পিতামাতা, আত্মীয়-স্বজন ও সমাজের দায়িত্ব পালন /২০৭

 

 

মুসলমানী নেসাব

প্রথম অধ্যায়: আরকানুল ইসলাম

ইসলাম ও আরকানুল ইসলাম

মহান আল্লাহ্ তাঁর প্রিয় সৃষ্টি মানব জাতিকে অত্যন্ত ভালবাসেন। মানুষকে তিনি সৃষ্টির সেরা হিসাবে তৈরী করেছেন। তাকে দায়িত্ব দিয়েছেন এ বিশ্বকে উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাওয়ার। এজন্য তিনি তাকে দান করেছেন জ্ঞান, বিবেক, যুক্তি ও বিবেচনা শক্তি যা তাকে উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করে। মানুষের এ জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা আছে। মানুষ তার জ্ঞান, বিবেক ও বিবেচনা দিয়ে তার পার্থিব জগতের বিভিন্ন বিষয়ে অনেক কিছু জানতে পারে এবং নিজেকে উন্নতী ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে পারে, কিন্তু তার ইন্দ্রিয়ের বাইরের কিছু সে জানতে পারে না। তার অভিজ্ঞতায় ভুল ধরা পড়ে। স্বার্থ চিন্তা, লোভ-লালসা অনেক সময় তাকে অকল্যাণের পথে ধাবিত করে।

এ জন্য মহান স্রষ্টা করুণাময় আল্লাহ্ মানুষকে জ্ঞান, বুদ্ধি ও বিবেক দিয়ে সৃষ্টির সেরা রূপে সৃষ্টি করার পরেও তার পথ প্রদর্শনের জন্য যুগে যুগে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। কিভাবে আল্লাহ্র উপর ঈমান আনতে হবে, কিভাবে নবী রসুলদের উপর ঈমান আনতে হবে, কিভাবে আল্লাহ্র ইবাদাত করতে হবে, কোন কর্ম কিভাবে করলে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি, ক্ষমা ও করুণা লাভ সহজ হবে, কিভাবে জীবন ও সমাজ পরিচালনা করলে মানব সমাজ অধিকতর ভালবাসা ও সমৃদ্ধির পথে অগ্রসর হবে ইত্যাদি বিষয় বিস্তারিতভাবে শিক্ষা প্রদানই নবী ও রাসূলগণের কর্ম। তাঁদের শিক্ষা ও আদর্শের হুবহু অনুকরণই উম্মতের ধর্মের রক্ষাকবজ ও নাজাতের একমাত্র উপায়।

মানব সৃষ্টির শুরু থেকে আল্লাহ্ অগণিত নবী-রাসূলের মাধ্যমে যে পথ মানব জাতিকে জানিয়েছেন তাই ‘ইসলাম’ বা “আল্লাহ্র ইচ্ছার কাছে মানুষের ইচ্ছার আত্মসমর্পন”। সকল যুগের সকল নবী-রাসূল ও তাঁদের অনুসারীগণ ছিলেন মুসলিম।

যুগে যুগে নবী-রাসূলগণের তিরোধানের পর তাঁদের অনুসারীগণ ক্রমান্বয়ে তাঁদের শিক্ষা থেকে বিচ্যুত হয়েছে। নষ্ট করে ফেলেছে তাঁদের প্রকৃত আদর্শ। সবশেষে আল্লাহ্ প্রেরণ করেছেন রাহমাতুল্লিল ‘আলামীন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ()-কে। সকল যুগের সকল দেশের সকল মানুষের জন্য ‘ইসলামের ’ সর্বশেষ ও পরিপূর্ণ রূপ নিয়ে এলেন তিনি। মানব জীবনের সকল বিষয়ের পরিপূর্ণ ও সুন্দরতম বিধান দিয়ে গিয়েছেন তিনি। মানুষের ব্যক্তিগত, আধ্যাত্মিক, শারীরিক, মানসিক, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সকল বিষয়ের সুষ্পষ্ট দিক নির্দেশনা রয়েছে ইসলামে।

ইসলামের অগণিত বিধানের মধ্য থেকে পাঁচটি বিধানকে “আরকানুল ইসলাম” অর্থাৎ ইসলামের  “পাঁচ রুকন” বা “পঞ্চস্তম্ভ” বলে ঘোষণা করেছেন রাসূলুল্লাহ । শুধুমাত্র এগুলোই ইসলাম নয়। ইসলামে আরো অগণিত ফরয দায়িত্ব রয়েছে। তবে এগুলো সকল দায়িত্বের মধ্যে প্রধান ও মূল। আর এ পাঁচটি রুকন বা স্তম্ভ মানব জীবনের ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কেন্দ্রিক ও সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে।

ইসলামের  পঞ্চ স্তম্ভ

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উতার বলেছেন, রাসূলুল্লাহ  বলেছেন : “ইসলামকে  পাঁচটি বিষয়ের উপর প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে, তা হলো: বিশ্বাসের সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন মাবুদ বা উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ্র বান্দা (দাস) ও রাসূল বা প্রেরিত বার্তাবাহক (অন্য বর্ণনায়: একমাত্র আল্লাহ্র ইবাদত করতে হবে, আল্লাহ্ ছাড়া যা কিছু (উপাস্য) আছে সবকিছুকে অবিশ্বাস করতে হবে), সালাত (নামায) কায়েম করা, যাকাত প্রদান করা, রমযান মাসের সিয়াম (রোজা) পালন করা, বাইতুল্লাহর হজ্জ আদায় করা।”-(বুখারী ও মুসলিম)

এ অর্থে আরো অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এক হাদীসে মু‘আয ইবনু জাবাল (রা) বলেন, একদিন চলার পথে আমি রাসূলুল্লাহ  কে বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল, আমাকে এমন কর্ম শিখিয়ে দিন যা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে এবং জাহান্নাম থেকে দূরে সরিয়ে নেবে। তিনি বললেন: “তুমি আমাকে খুব বড় বিষয়ের প্রশ্ন করেছ। আল্লাহ্ যার জন্য সহজ করবেন তার জন্য তা সহজ। তুমি একমাত্র আল্লাহ্র ইবাদত করবে, তার সাথে কোন শরীক করবে না, সালাত প্রতিষ্ঠা করবে, যাকাত প্রদান করবে, রমযানের সিয়াম পালন করবে এবং কাবাঘরের হজ্জ করবে।”-(তিরিমিযী)

আমরা দেখেছি যে, ইসলামই আল্লাহ্র একমাত্র মনোনিত ধর্ম বা জীবন ব্যবস্থা যা মানব সৃষ্টির শুরু থেকে আল্লাহ্র প্রেরিত ও মনোনিত সকল নবী ও রাসূল মানবজাতিকে শিক্ষা দিয়েছেন। যুগ, কাল, দেশ, জাতি ইত্যাদি ভেদে ইসলামের  বিভিন্ন খুটিনাটি বিষয়ে পার্থক্য থাকলেও ইসলামের  মূল ব্যবস্থা মানবেতিহাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই।

কুরআনের বর্ণনা অনুসারে আমরা জানতে পারি যে, মানব সৃষ্টির শুরু থেকে প্রেরিত সকল নবী ও রাসূল (আলাইহিমুস সালাম) মানব জাতিকে মৌলিক কয়েকটি বিষয়ের দিকে আহ্বান করেছেন ও প্রচার করেছেন : ১) বিশুদ্ধ তাওহীদ বা শুধুমাত্র আল্লাহ্র উপর বিশ্বাস, আস্থা ও তারই ইবাদত করা, ২) সালাত বা প্রার্থনা (নামায) প্রতিষ্ঠা করা, ৩) যাকাত প্রদান করা, ৪) সিয়াম বা উপবাস (রোযা) পালন করা, ৫) সৃষ্টির সেবা ও কল্যাণ করা ও ৬) সৃষ্টির অকল্যাণ, ক্ষতি ও অধিকার নষ্ট থেকে বিরত থাকা।

আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু পৃথিবীতে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর প্রতিনিধি হিসাবে এ পৃথিবীকে আবাদ করতে বা সুন্দর ইনসাফপূর্ণ, ভালবাসাময় বসবাসযোগ্য একটি পৃথিবী গড়তে। এজন্য দুটি বিষয়ের প্রয়োজন: প্রথম, মানুষের ব্যক্তিজীবনকে পবিত্র ও তাকওয়া ভিত্তিক করা। দ্বিতীয়, সমাজের অন্যান্য মানুষকে সুন্দরভাবে বাঁচতে সাহায্য করতে মানুষকে উদ্ভুদ্ধ করা। ইসলামের  উপরোক্ত মূল শিক্ষাগুলোর মাধ্যমে এ দু’টি বিষয় কেন্দ্রিক। বিশুদ্ধ ও অবিচল ঈমান বা বিশ্বাস, নিয়মিত সালাত ও সিয়াম মানুষকে সুষম, পবিত্র, কলুষমুক্ত ব্যক্তিত্ব গড়ে দেয়। যাকাত, সেবা ও দানের মাধ্যমে মানুষ সমাজের অন্যান্য মানুষকে সুন্দরভাবে বাঁচতে সাধ্যমত সাহায্য করে।

হজ্জ ইসলামের  সর্বশেষ ও পঞ্চম রুকন। এ ইবাদতের মাধ্যমে ঈমান, হৃদয়ের পবিত্রতা, সেবা ও ধৈর্যের প্রেরণা, বিশ্বমানবতার সাম্য, ভ্রাতৃত্ববোধ ও পরস্পর এমনতাবোধের সৃষ্টি হয়। এথেকে এ পাঁচটি ইবাদতকে ইসলামের মূল ভিত্তি বলে গণ্য করার কারণ অনুমান করতে পারছি। মহান আল্লাহ্ই ভালো জানেন।

প্রথম স্তম্ভ : ঈমান

উপরের হাদীসে আমরা দেখেছি যে, প্রথম রুকন দু’টি সাক্ষ্য বা শাহাদাতাইন :

أَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلا اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ (رَسُوْلُ اللهِ)

ঈমানের প্রথম অংশ: (আল্লাহ্ ছাড়া কোন উপাস্য বা মা’বুদ নেই) -এ সাক্ষ্য প্রদান করা। দ্বিতীয় অংশ হলো: (মুহাম্মদ () আল্লাহ্র বান্দা ও রাসূল) -এ সাক্ষ্য প্রদান করা। প্রথম অংশকে সংক্ষেপে “তাওহীদ” ও দ্বিতীয় অংশকে সংক্ষেপে ”রিসালাত” বলা হয়।

তাওহীদ ও রিসালাতের বিশ্বাসই হলো ইসলামের  মূলমন্ত্র। এ বিশ্বাসের মাধ্যএে একজন মানুষ মুসলিম বলে গণ্য হন। আর এ বিশ্বাস নষ্ট হলে তিনি ইসলাম থেকে বেরিয়ে যান এবং অমুসলিম বলে গণ্য হন। এ বিশ্বাসই সকল কল্যাণ ও মুক্তির  চাবিকাঠি। অতএব  প্রত্যেক মুসলিমের প্রথম কর্তব্য হলো এ শাহাদাইনের অর্থ ও মর্ম সঠিকরূপে জানা এবং তা পরিপূর্ণভাবে বিশ্বাস করা।

কুরআন কারীমে ও হাদীস শরীফে এ বিষয়ে অনেক আলোচনা ও বিবরণ দেয়া হয়েছে। আমি “কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা” নামক গ্রন্থে তাওহীদ ও রিসালাতের বিশ্বাসের বিস্তারিত বিবরণ ও  এ বিষয়ক কুরআনের আয়াত ও সহীহ হাদীস সমূহ আলোচনা করেছি। এখানে যথাসম্ভব সংক্ষেপে শাহাদাতাইন ও আরকানুল ঈমানের আলোচনা করতে চেষ্টা করব। মহান প্রভুর দরবারে সকাতরে তাওফীক প্রার্থনা করছি।

 

ঈমানের প্রথম অংশ: তাওহীদ

ইমানের প্রথম দিক হলো : ‘‘আল্লাহ্ ছাড়া কোন উপাস্য নেই’’  দৃঢ়ভাবে একথা বিশ্বাস করা ও সাক্ষ্য প্রদান করা। আরবীতে  (لا إله إلاالله) আমরা এখানে এ কালিমার শাব্দিক ও ভাষাগত অর্থ বোঝার চেষ্টা করব।

আরবীতে (لا) শব্দের অর্থ: নেই, মোটেও নেই  বা তঠকেবারে নেই।

(إله) শব্দের  অর্থ হলো (মাবুদ ), অর্থাৎ উপাস্য বা পূজ্য, যার কাছে মনের আকুতি পেশ করা হয়, প্রয়োজন মেটানোর জন্য সাহায্য প্রার্থনা  করা হয়। এভাবে (ইলাহাহ্) শব্দ আরবীতে (ইবাদাহ্) শব্দের সমার্থক। এ (ইবাদাহ) শব্দের অর্থ আমরা বাংলায় সাধারণভাবে উপাসনা বা পূজা বলতে পারি। তবে ইসলামের  পরিভাষায়  (ইবাদাহ বা ইবাদাত) অত্যন্ত ব্যাপক  অর্থবহ এবং তার বিভিন্ন প্রকার ও স্তর রয়েছে। এ কারণে আমরা আমাদের আলোচনায় সাধারণভাবে উপাসনা, পূজা, ইত্যাদি শব্দের পরিবর্তে ইবাদাত ব্যবহার করব, যেন আমরা এ ইসলামী গুরুত্বপূর্ণ  শব্দটির সকল অর্থ ও ব্যবহার  ভালভাবে বুঝতে পারি।

( إلا) শব্দের অর্থ :  ব্যতীত, ছাড়া বা ভিন্ন।

এভাবে আমরা দেখছি যে, (لا إله إلا الله ) এ কালেমার অর্থ হলো ঃ আল্লাহ্ ছাড়া কোন উপাস্য নেই। অর্থাৎ সত্যিকারভাবে মহামহিম করুণাময় আল্লাহ্ই উপাসনা, আরাধনা, পূজা, প্রার্থনা, সমর্পণ ইত্যাদি সকল প্রকার ইবাদতের অধিকারী। ইসলামের  পরিভাষায় ইবাদাত বলা হয় এএই সব কিছুই একমাত্র তাঁর জন্য।

তাওহীদের  প্রকারভেদ

আমরা সাধারণত তাওহীদের  বিশ্বাসকে ‘‘এক আল্লাহ্র বিশ্বাস’’ বলে বুঝি এবং তার কোন প্রকার বা পর্যায় আছে বলে আমরা সচেতন নই। পবিত্র কুরআন ও হাদীসের আলোকে আমরা দেখতে পাই যে, তাওহীদের   বিভিন্ন ও পর্যায় রয়েছে এবং সকল পর্যায়ের তারহীদে বিশ্বাস স্থাপন করেই একজন মানুষ মুসলিম বলে গণ্য হতে পারেন। কুরআন কারীমেরবর্ণনার আলোকে তাওহীদের  বিশ্বাসের দু’টি পর্যায় রয়েছে। প্রথম, জ্ঞান পর্যায়ের তাওহীদ। এ পর্যায়ে মানুষ মহান আল্লাহ্কে তাঁর কর্মে এক ও অদ্বিতীয় বলে বিশ্বাস করে। দ্বিতীয় পর্যায় হলো : কর্ম পর্যায়ের তাওহীদ। এ পর্যায়ে মানুষ নিজের কর্মে মহান আল্লাহ্কে এক ও অদ্বিতীয় বলে মানে।

প্রথম:  জ্ঞান পর্যায়ের  তাওহীদ

এ পর্যায়ে আল্লাহ্কে আল্লাহ্র গুণাবলী ও কর্মে তাকে এক ও অদ্বিতীয় বলে বিশ্বাস করা হয়। জ্ঞান পর্যায়ের তাওহীদের  দু’টি মূল বিষয় রয়েছে : ১)  সৃষ্টি  ও প্রতিপালনের একত্ব, ও ২) নাম ও গুণাবলীর  একত্ব।

(ক) সৃষ্টি  ও প্রতিপালনের  একত্ব

আরবীতে তাকে  ‘‘তাওহীদুর রবুবিয়্যাহ্’’ বলা হয়। তার অর্থ হলো, বিশ্বাস করা যে, আল্লাহ্ এ মহাবিশ্বের একমাত্র স্রষ্টা, প্রতিপালক, পরিচালক, সংহারক, রিযিকদাতা,পালনকর্তা।

(খ) নাম ও গুণাবলীর  একত্ব

নাম ও গুণাবলীর তাওহীদ অর্থ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা যে, মহান আল্লাহ্ সকল পূর্ণতার গুণে গুণান্বিত। আল্লাহ্ পবিত্র কুরআনে এবং রাসূলুল্লাহ  বিভিন্ন হাদীসে আল্লাহ্র বিভিন্ন নাম ও গুণাবলীর উল্লেখ করেছেন। এসকল নাম ও গুণাবলীর উপর সুদৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে হবে। যেভাবে কুরআন ও হাদীসে বলা হয়েছে অবিকল সেই ভাবে, সকল প্রকার বিকৃতি, অপব্যাখ্যা থেকে মুক্ত থেকে এসকল নাম ও গুণাবলীতে বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। বিশ্বাস করতে হবে যে, আল্লাহ্র কোন গুণ বা বিশেষণ কোন সৃষ্টজীবের গুণ বা বিশেষণের  মত নয়, তুলনীয় নয় বা সামঞ্জস্যপূর্ণ  নয়।

দ্বিতীয়, কর্ম পর্যায়ের (ইবাদতের) একত্ব

সকল প্রকার ইবাদাত বা উপাসনা আরাধনা মূলক কর্ম যেমন প্রার্থনা, সিজদা, জবাই উৎসর্গ, মানত ইত্যাদি একমাত্র আল্লাহ্র জন্য করা ও আল্লাহ্রই প্রাপ্য বলে বিশ্বাস করা হলো এ পর্যায়ের তাওহীদ।

তাওহীদের এ দু’টি পর্যায় তাকে  অপরের সম্পূরক  ও পরস্পরে  অবিচ্ছিন্নভাবে জড়িত। এক পর্যায় থেকে অন্য পর্যায়কে পৃথক করা যায়না বা একটিকে বাদ দিয়ে  অন্যটির উপর ঈমান এনে মুসলিম হওয়া যায় না। তবে এখানে প্রণিধানযোগ্য যে, শাহাদাতাইন বা ঈমানের প্রথম অংশ (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ)-তে মূলত শেষ পর্যায় বা ‘‘তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ্’’-র বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এখানে বলা হয়নি যে (লা খালিকা ইল্লাল্লাহ) অর্থাৎ (আল্লাহ্ ছাড়া কোন স্রষ্টা নেই) এখানে বলা হয়নি (লা রাযিকা ইল্লাল্লাহু) অর্থাৎ (আল্লাহ্ ছাড়া কোন রিজিকদাতা নেই) অনুরূপভাবে আল্লাহ্ ছাড়া কোন জীবনদাতা নেই, মৃত্যুদাতা নেই, পালনকর্তা নেই ইত্যাদি বিষয়ে সাক্ষ্য দানের নির্দেশ দেয়া হয়নি। বরং আমাদের  এ ঘোষণা  দিতে হবে, এ বিশ্বাস করতে হবে যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন  উপাস্য বা মাবুদ নেই।

কুরআন কারীমে ও হাদীস শরীফে মূলত এ পর্যায়ের তাওহীদ কথাই বলা হয়েছে। সকল নবী ও রাসূল (আলাইহিমুস সালাম) মূলত এ তাওহীদের  আহ্বান করতেই প্রেরিত হয়েছেন বলে কুরআন কারীমে বারবার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এক আয়াতে তারশাদ করা হয়েছে: আমি সকল জাতির কাছে রাসূল বা আমার বাণীবাহক পাঠিয়েছি, যেন তারা  আল্লাহ্র ইবাদাত করে এবং তাগুতকে অর্থাৎ আল্লাহ্ ছাড়া যা কিছুর ইবাদাত করা হয় সবকিছুকে বর্জন করে।’’-(সুরা নাহল: ৩৬)

এভাবে পবিত্র কুরআনে অসংখ্য স্থানে আল্লাহ্ ছাড়া কোন উপাস্য নেই (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু) এ কথা ঘোষণা করা হয়েছে, একমাত্র তাঁরই উপাসনা ইবাদাত করতে এবং অন্য কোন ব্যক্তি বা বস্তুর ইবাদাত-উপসনা সর্বতোভাবে বর্জন করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর এ হলো ইবাদাতের একত্ব বা কর্ম পর্যায়ের তাওহীদ।

তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ বা তাওহীদুল ইবাদাহ, অর্থাৎ উপাসনার একত্বের বিষয়ে এ গুরুত্ব প্রদানের দ্বিবিধ কারণ রয়েছে :

প্রথম কারণ: দ্বিতীয় পর্যায়ের তাওহীদ ,অর্থাৎ কর্ম বা ইবাদতের তাওহীদ  জ্ঞানের তাওহীদের  ফসল ও ফলাফল। যেহেতু আল্লাহ্ একমাত্র স্রষ্টা, প্রতিপালক, জীবনদাতা, মৃত্যুদাতা, রিজিকদাতা, সর্বজ্ঞানী কাজেই একমাত্র তাঁরই ইবাদাত উপাসনা  করা দরকার। যেহেতু  সকল ক্ষমতাই তাঁর , সেহেতু  তাকে ছাড়া অন্য কাউকে উপাসনা করা নিতান্তই  অর্থহীন ও জঘন্য অন্যায়। এজন্য পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্ বারবার আল্লাহ্র সৃষ্টি ও প্রতিপালনের একত্বের (তাওহীদুর রবুবিয়্যাহ্র) কথা উল্লেখ করে একমাত্র তাঁরই ইবাদাতের আহ্বান জানিয়েছেন।

দ্বিতীয় কারণ : এসব কর্ম পযার্য়ের বা ইবাদতের তাওহীদেই বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীর মধ্যে পার্থক্য নির্ধারিত হয়। যুগে যুগে ইসলাম ও কুফুরীর মধ্যে মূলত এ ব্যাপারেই বিরোধ। প্রথম পর্যায়ের তাওহীদ বা আল্লাহ্র সৃষ্টি এবং প্রতিপালনের একত্বে অধিকাংশ মানুষই বিশ্বাস করেন।

এ বিশ্বের একাধিক স্রষ্টা বা প্রতিপালক আছেন, অথবা এ বিশ্বের কোন স্রষ্টা নেই এ ধরণের বিশ্বাস খুবই কম মানুষেই করেছে বা করে। সকল যুগে, সকল দেশের প্রায় সব মানুষই বিশ্বাস করেছেন এবং করেন যে, এ বিশ্বের একজনই স্রষ্টা ও প্রতিপালক আছেন। কিন্তু তারা উপাসনা বা ইবাদতের ক্ষেত্রে তাঁর সাথে অন্যান্য দেবদেবী, পাথর, গাছপালা বা মানুষেরও উপাসনা আরাধনা করেছেন, তাদের কাছে প্রার্থনা করেছেন, তাদের কাছে মুক্তি ও ত্রাণ চেয়েছেন। আমরা যে কোন শিরকে লিপ্ত অমুসলিম সমাজের দিকে তাকালেই বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারব খুব সহজেই। বিভিন্ন যুগের ও জাতির ধর্মীয়  বিশ্বাস নিয়ে যারা গবেষণা করেছেন। তাঁরা সবাই এ বিষয়টি লক্ষ্য করেছেন।

পবিত্র কুরআনে এবং হাদীসে এ বিষয়ে বিশদভাবে বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আমরা দেখতে পাই যে, যুগে যুগে আল্লাহ্ যে সকল নবী ও রাসূল প্রেরণ করেছেন তাঁদের উম্মতেরা কখনই বলেননি যে আল্লাহ্ ছাড়া এ বিশ্বের কোন স্রষ্টা বা পালনকর্তা আছেন। বরং তারা সবাই আল্লাহ্কে একমাত্র স্রষ্টা, প্রতিপালক, সংহারক বলে বিশ্বাস করতেন। তবে তারা মনে করতেন যে, অনেক দেব দেবী, গাছ-পাথর বা মানুষের ঐশ্বরিক শক্তি আছে বা তারা আল্লাহ্র প্রিয়, কাজেই তাদেরকে উপাসনা করলে, তাদের নামে মানত, জবাই, প্রার্থনা করলে মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়, তাই তারা আল্লাহ্র উপাসনার সাথে সাথে তাদেরও উপাসনা করতেন। নবী রাসূলগণ তাদেরকে সকল দেবদেবী পাথর মূর্তি, ফিরিশতা, নবী ওলী বা অন্যান্য মানুষের উপাসনা ত্যাগ করে একমাত্র আল্লাহ্র উপাসনার জন্য আহ্বান জানান। কাফিরেরা  তা মানতে অস্বীকার করে।

কুরআন কারীমে বিভিন্ন কাফির জাতি সম্পর্কে এসকল বিষয় বর্ণনা করা হয়েছে। বিশেষত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাতোর সমসাময়িক আরবের কাফির-মুশরিকগণের এ জাতীয় অসম্পূর্ণ তাওহীদ সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করা হয়েছে।

এ সকল  বর্ণনা অনুসারে আমরা দেখতে পাই যে, কাফিররাও ‘‘এক আল্লাহ্য় বিশ্বাস’’ রাখতো  এবং তারা আল্লাহ্র ইবাদাত উপাসনা করতো। তারা বিশ্বাস করতো  যে, এ বিশ্বের  সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রিজিকদাতা, জীবন ও মৃত্যুর  মালিক একমাত্র আল্লাহ্ তায়ালা। কুরআন করিমে আল্লাহ্ এরশাদ করেছেন: ‘‘আপনি বলুন, আসমান এবং জমিন থেকে কে তোমাদেরকে রিযিক দান করেন? কে দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তির মালিক? কে মৃত থেকে জীবিতকে নির্গত করেন এবং জীবিত থেকে মৃতকে নির্গত করেন? বিশ্ব পরিচালনা করেন কে? তারা (আরবের কাফিরগণ) উত্তরে বলবে: আল্লাহ্। আপনি বলুন, তাহলে কেন তোমরা (আল্লাহ্ ছাড়া অন্য উপাস্যদের উপাসনা পরিত্যাগ করে) আত্মরক্ষা করছ না?’’ (সূরা ইউনুস: ৩১।)

অন্যত্র আল্লাহ্ বলেছেন : ‘‘আপনি বলুন, তোমাদের যদি জ্ঞান থাকে তাহলে বল, এ পৃথিবী ও পৃথিবীর সবকিছুর মালিক কে? তারা (কাফিরগণ) বলবে: আল্লাহ্। আপনি বলুন, তাহলে তোমরা কেন উপদেশ গ্রহণ করছ না (একথা জানার পরেও কেন অন্য উপাস্যের উপাসনা করছ?) আপনি বলুন, আসমানসমূহের ও আরশের মালিক কে? তারা বলবে, আল্লাহ্। আপনি বলুন, তাহলে তোমরা কেন (অন্য উপাস্যের উপাসনা থেকে) আত্মরক্ষা করছ না? আপনি  বলুন, সবকিছুর ক্ষমতা ও রাজত্ব  কার হাতে? কে ত্রাণ ও মুক্তিদানের  ক্ষমতা রাখেন, যার বিরুদ্ধে কাউকে ত্রাণ করার ক্ষমতা কারো নেই ? তারা বলবে, আল্লাহ্। আপনি বলুন, তোমরা  যাদুগ্রস্তের মত কোথায় চলেছ?’’-(সূরা মুমেনুন: ৮৪-৮৯)

কুরআন কারীমে এজাতীয় অনেক অনেক আয়াত রয়েছে, সে সকল আয়াতে বারবার বিবৃত করা হয়েছে যে, মক্কার কাফিররা মহান আল্লাহ্কে এ মহাবিশ্বের একমাত্র, প্রতিপালক, সকল ক্ষমতা ও রাজত্বের অধিকারী ও সর্বশক্তিমান বলে বিশ্বাস করত। তারা বিশ্বাস করত যে, তিনিই এ বিশ্বের সবকিছুর একমাত্র স্রষ্টা। তিনিই একমাত্র জীবনদাতা, বৃষ্টিদাতা, ফসলদাতা, রিযিকদাতা, প্রতিপালক, সংরক্ষক, পরিচালক ও ত্রাণকর্তা। রাসুলে আকরাম -এর বিরোধিতা করা সত্তেও এ কথা তারা অকপটে স্বীকার করতো।-(সূরা আনকাবুত: ৬১- ৬৩, সূরা লুকমান: ২৫, সূরা যুখরূফ: ৯।)

মহান আল্লাহ্র একত্ব বা তাওহীদের এ বিশ্বাস নিয়ে তারা মহান আল্লাহ্র ইবাদাত বা উপাসনা করতো। তাকে সাজদা করত, তাঁর নামে মানত করত, তাঁর কাছে প্রার্থনা করত, সাহায্য চাইত। তবে তারা তার পাশাপাশি অন্যান্য দেবদেবী, নবী, ফিরিশতা, ওলী, পাথর, গাছগাছালি ইত্যাদির পূজা উপাসনা করত। আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত, উপাসনা বা পূজা করা যাবে না এ কথাটি তারা মানতো না।

এভাবে আমরা দেখছি যে, মক্কার কাফিরগণ এবং কুরআনে উল্লেখিত অন্যান্য কাফিরগণ জ্ঞান পর্যায়ের তাওহীদ মেনে নিয়েছিলেন এবং দ্বিতীয় পর্যায়কে বা কর্ম পর্যায়ের তাওহীদ অস্বীকার ও অবিশ্বাস করেছেন, ফলে তারা কাফির বলে গণ্য হয়েছেন।

এখানে আমাদের মনে একটি প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। তা হলো, আল্লাহ্কে একমাত্র স্রষ্টা, প্রতিপালক, সর্বশক্তিমান,সবকিছুর মালিক জানার পরেও কাফিরেরা অন্যান্য দেবদেবী, মূর্তি, ফিরিশতা, নবী, মানুষ ইত্যাদির পূজা উপাসনা বা ইবাদাত করত কেন?

কুরআন করিতোর বিভিন্ন আয়াতের মাধ্যমে আমরা দেখতে পাই যে, এ বিষয়ে তাদের দলীল বা যুক্তি ছিল দু’টি :

প্রথম, তারা বিশ্বাস করত যে, মহান আল্লাহ্ই একমাত্র প্রভু, মালিক, প্রতিপালক ও সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। তবে কিছু মানুষ ও ফিরিশতা আছেন যারা মহান আল্লাহ্র খুবই প্রিয়। এদের ডাকলে, এদের পূজা-উপাসনা করলে আল্লাহ্ খুশি হন ও তাঁর নৈকট্য, প্রেম ও সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়। এ ব্যাপারে আল্ল­াহ বলেছেন :

‘‘আমি আপনার কাছে এ কিতাব (আল কুরআন) যথযথভাবে অবতীর্ণ করেছি; অতএব আপনি বিশুদ্ধ আনুগত্যের সাথে একমাত্র আল্লাহ্রই ইবাদাত করুন। জেনে রাখুন ,অবিমিশ্র বিশুদ্ধ আনুগত্যই আল্লাহ্র প্রাপ্য। আর যারা আল্লাহ্ ছাড়া অন্যান্য আউলিয়া (অভিভাবক বা বন্ধু) গ্রহণ করেছে তারা বলে, আমরা তো এদের শুধু এজন্যই ইবাদাত করি যেন তারা আমাদেরকে আল্লাহ্র সান্নিধ্যে পৌঁছে দেবে।”-(সূরা যুমার ২-৩)

দ্বিতীয়, তারা  বিশ্বাস করত, আল্লাহ্ একমাত্র প্রভু প্রতিপালক এবং সকল ক্ষমতার মালিক। তবে কিছু মানুষ ও ফিরিশতা আছেন যারা আল্লাহ্র অত্যন্ত প্রিয়, তাদের সুপারিশ আল্লাহ্ গ্রহণ করেন। এ সকল ফিরিশতা ও মানুষের অথবা তাদের মূর্তি বা তাদের স্মৃতি বিজড়িত স্থান, গাছ, পাথর ইত্যাদিকে সম্মান করলে, ইবাদাত করলে, সেখানে মানত করলে, সাজদা করলে, প্রার্থনা করলে তারা খুশি হয়ে আল্লাহ্র কাছে শাফা’আত বা সুপারিশ করে মানুষের বিপদ কাটিয়ে দেন, প্রয়োজন পূরণ করেন।

এ বিষয়ে কুরআন কারীমে তারশাদ করা হয়েছে: “তারা আল্লাহ্ ব্যতীত যাদের ইবাদত করে তারা তাদের কোন ক্ষতিও করতে পারে না উপকারও করতে পারে না। তারা বলে তারা আল্লাহ্র কাছে আমাদের সুপারিশকারী। আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহ্কে এএই কিছু জানাচছ যা তিনি জানেন না আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর মধ্যে? সুবহানাল্লাহ! তিনি সুমহান, সুপবিত্র এবং তোমাদের শিরক থেকে তিনি উর্ধেŸ।’’-(সূরা ইউনুস: ১৮)

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, কাফিররা একথা অস্বীকার করত না যে, আল্লাহ্র ইচ্ছার বিরুদ্ধে এ সকল উপাস্যদের কোন ক্ষমতা নেই। তারা শুধুমাত্র সুপারিশ করতে পারে। আল্লাহ্ যদি কোন কল্যাণ অকল্যাণের সিদ্ধান্ত নেন তাহলে তা রোধ করার ক্ষমতা তাদের নেই। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ্ কুরআন মজীদে বলেছেন:

“আপনি যদি এদেরকে (কাফিরদেরকে) জিজ্ঞাসা করেন, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী কে সৃষ্টি করেছেন? তারা উত্তরে অবশ্যই বলবে: আল্লাহ্। আপনি বলুন, তোমরা বলতো, যদি আল্লাহ্ আমার কোন অনিষ্ট করতে চান তাহলে কি তোমরা আল্লাহ্র পরিবর্তে যাদেরকে ডাকছ তারা কি সে অনিষ্ট দূর করতে পারবে? অথবা তিনি যদি আমাকে অনুগ্রহ করতে চান, তাহলে কি তারা সে অনুগ্রহকে রোধ করতে পারবে? আপনি বলুন, আমার জন্য আল্লাহ্ই যথেষ্ট। নির্ভরকারীগণ তার উপরই নির্ভর করে।’’-(সূরা যুমার: ৩৮)

অর্থাৎ কাফিররা মেনে নিচ্ছে যে আল্লাহ্র ক্ষমতাকে রোধ করার মত ক্ষমতা এদের নেই। তার পরও তারা এদের ইবাদত করত শুধুমাত্র এ যুক্তিতে যে, তারা আল্লাহ্র দরবারে সুপারিশ করে তাদের প্রয়োজন মেটাবে এবং এদের ইবাদত করলে আল্লাহ্ খুশি হবেন, কারণ তারা আল্লাহ্র প্রিয়। আল্লাহ্ এখানে এবং কুরআনের সর্বত্র এ অদ্ভুত যুক্তির অসারতা বর্ণনা করেছেন। এদের যখন কোন ক্ষমতাই নেই, সব ক্ষমতাই যখন আল্লাহ্র, তখন আল্লাহ্কে না ডেকে এদেরকে ডাকার মত বোকামি আর কি হতে পারে।

এভাবে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, আল্লাহ্র একত্ব বা তাওহীদের  দু’টি পর্যায় রয়েছে, জ্ঞান পর্যায়ের তাওহীদ ও কর্ম পর্যায়ের তাওহীদ। এ দু’টি পর্যায় অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত এবং উভয় পর্যায়ের তাওহীদকে বিশ্বাস করলেই একজন মানুষ মুসলিম বলে গণ্য হবেন। তবে ইসলামের  মূলমন্ত্র বা কালেমায়ে তাওহীদ মূলত দ্বিতীয় পর্যায়ের তাওহীদের উপর গুরুত্ব দেয়া হযেছে। কারণ, এ পর্যায়ের তাওহীদের স্বীকৃতি দিলে প্রথম পর্যায়ের তাওহীদের  স্বীকৃতি আসবেই। তাছাড়া মূলত এ দ্বিতীয় পর্যায়ের তাওহীদই যুগে যুগে বিভিন্ন সমাজের মানুষেরা বিভিন্ন খোঁড়া যুক্তি দেখিয়ে অস্বীকার করেছে। প্রথম পর্যায়ের তাওহীদ অধিকাংশ মানুষই মেনে নিয়েছে। আর এজন্যই আল্লাহ্ বলেন: ‘‘অধিকাংশ মানুষই শিরকে লিপ্ত থাকা অবস্থায় আল্লাহ্র উপর ইমান আনে।”-(সূরা ইউসূফ: ১০৬)

ইবাদতের প্রকারভেদ

উপরের আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পেরেছি যে, (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু)-র অর্থ হলো এ বিশ্বাস করা যে, আল্লাহ্ছাড়া কোন মাবুদ বা উপাস্য নেই। আল্লাহ্ ছাড়া আর কারো ইবাদত, উপাসনা করা যাবে না। তিনি যেমন একমাত্র স্রষ্টা, প্রতিপালক, সকল পূর্ণতার গুণে গুণান্বিত, তিনিই একমাত্র মাবুদ বা উপাস্য। আমরা  আরো দেখেছি যে, যদি কেহ আল্লাহ্কে একমাত্র স্রষ্টা ও প্রতিপালক হিসাবে বিশ্বাস করে, আল্লাহ্র ইবাদত বা উপাসনা করে এবং সাথে সাথে আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করে তাহলে তিনি মুসলিম বলে গণ্য হবেন না; কারণ তিনি (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু)-তে বিশ্বাস করেননি।

আরবী ভাষায় ইবাদত শব্দের অর্থ হলো চূড়ান্ত বিনয়ে পরিপূর্ণ আনুগত্য। ইসলামী পরিভাষায় ইবাদত বলতে মানুষের সে সব কথা ও কর্মকে বোঝানো হয় যা আল্লাহ্র নিমিত্তে সম্পাদন করতে ইসলামে নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং যে কাজ আল্লাহ্র জন্য করলে আল্লাহ্ সন্তষ্ট হন। ইবাদতের অন্যতম প্রকার হলো: দোয়া, প্রার্থনা, ডাকা, অলৌকিক ত্রাণ, সাহায্য ও বিপদমুক্তি চাওয়া, কুরবাণী করা, উৎসর্গ করা, জবাই করা, মানত করা, সাজদা করা, তাওয়াক্কুল করা বা পরিপূর্ণ সমর্পিত নির্ভরতা, পরিপূর্ণ সমর্পিত আনুগত্য, আশা, ভয় ইত্যাদি। তাওহীদের বিশ্বাসের অর্থ হলো সকল প্রকার ইবাদত শুধুমাত্র আল্লাহ্রই প্রাপ্য বলে সুদৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা ও সাক্ষ্য দেয়া।

আরকানুল ঈমান

তাওহীদ বা আল্লাহ্র একত্বে বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো, মহান আল্লাহ্ কুরআন কারীমে যে সকল বিষয় বিশ্বাস করতে নির্দেশ দিয়েছেন সেগুলোকে বিশ্বাস করা। এগুলোকে আরকানুল ঈমান বা ঈমানের স্তম্ভসমূহ বলা হয়। কুরআন কারীমে বারংবার ছয়টি সুনির্ধারিত বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ বিষয়গুলো একত্রে বিভিন্ন হাদীসেও উল্লেখ করা হয়েছে। ঈমানের এ ছয়টি রুকন নিম্নরূপ:

১. আল্লাহ্র উপর বিশ্বাস

আল্লাহ্র একত্ব বা তাওহীদে উপরে বর্র্ণিত ভাবে বিশ্বাস করতে হবে।

২. মালাইকা বা ফিরিশতাগণে বিশ্বাস

আরবী ভাষায় “মালাক” শব্দকে ফারসী ভাষায় “ফিরিশতা” বলে অনুবাদ করা হয়। বাংলা ভাষায় আমরা ফারসী শব্দটিই ব্যবহার করে থাকি, যদিও ইসলামের পরিভাষাগুলো কুরআন ও হাদীসের অনুরূপ আরবী হওয়াই উচিত। আরবী “মালাক” শব্দের বহুবচন “মালাইকা” আল্লাহ্র মালাইকা বা ফিরিশতাগণের উপর বিশ্বাস স্থাপনের অর্থ হলো সুদৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে বিশ্বাস করা যে, মহান আল্লাহ্ অগণিত মালাইকা সৃষ্টি করেছেন, যাঁরা আল্লাহ্র সম্মানিত সৃষ্টি। তাঁরা নূর বা আলোর উপাদানে তৈরী। তাঁদের স্বাধীন ইচ্ছা নেই। তাঁরা মানবীয় দুর্বলতা ও কামনা বাসনা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। তাঁরা সর্বদা আল্লাহ্র আনুগত্য করেন। আল্লাহ্র নির্দেশের বাইরে যাওয়ার, অমান্য করার, আপত্তি বা প্রতিবাদ করার কোন প্রকার অনুভূতিই তাঁদের মধ্যে নেই। তাঁদের কাজ হলো সর্বদা আল্লাহ্র ইবাদত করা, তাঁর প্রশংসা ও মহত্ত প্রকাশ করা ও তাঁর নির্দেশে সৃষ্টিজগতের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করা, মানুষকে ভালকাজে অনুপ্রাণিত করা, ইত্যাদি।

মক্কার কাফিরগণ ও অন্যান্য মুশরিক জাতি ফিরিশতাগণকে বিভিন্ন বিষয়ের দেবী ও আল্লাহ্র কন্যা মনে করে পূজা করত। কুরআন কারীমে এ সকল শিরক খণ্ডন করা হয়েছে এবং তাঁদের সঠিক পরিচয় প্রদান করা হয়েছে।

আল্লাহ্র মালাইকা বা ফিরিশতাগণে বিশ্বাস স্থাপনের মাধ্যমে আমরা আল্লাহ্র এ সকল সম্মানিত সৃষ্টির পরিচয় লাভ করি, তাঁদের সম্পর্কে কুসংস্কার, অতিভক্তি ও বাড়াবাড়ি থেকে রক্ষা পাই ও আল্লাহ্র সৃষ্টির বিশালতা ও মাহাত্ম্য জানতে পারি। সর্বোপরি মালাইকার উপর বিশ্বাস মুমিনের মনে শান্তি ও আস্থা নিয়ে আসে। মুমিন কখনো নিজেকে একা ও অসহায় মনে করে না। তিনি বিশ্বাস করেন যে, কেউ না থাকলেও আল্লাহ্র অগণিত মালাইকা তার সেবা ও সংরক্ষণে নিয়োজিত, তার জন্য দোয়া করছেন ও তাঁর পাপ পূন্য লিখছেন। এ বিশ্বাস তাকে সততার পথে প্রেরণা যোগায়।

৩. আল্লাহ্র গ্রন্থসমূহে বিশ্বাস

মুমিন বিশ্বাস করেন যে, মহান আল্লাহ্ মানব ইতিহাসের শুরু থেকে মানব জাতিকে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যান ও সফলতার পথ শেখানো জন্য তাঁর মনোনিত নবী রাসূলগণের কাছে “ওহী” বা প্রত্যাদেশের মাধ্যমে নির্দেশ পাঠিয়েছেন। এ সকল নির্দেশের সংকলিত রূপ হলে আসমানী কিতাব। আল্লাহ্ অগণিত কিতাব ওহীর মাধ্যমে পাঠিয়েছেন। সেগুলো পরবর্তী যুগে বিকৃত ও নষ্ট হয়ে গিয়েছে। সর্বশেষ তিনি তাঁর প্রিয়মত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাতোর উপর কুরআন কারীম নাযিল করেছেন। কুরআনের অবতারণের মাধ্যমে পূর্ববর্তী সকল গ্রন্থ রহিত হয়ে গিয়েছে। আল্লাহ্র সর্বশেষ গ্রন্থ কুরআন কারীএ একমাত্র অবিকৃত গ্রন্থ, যা কেয়ামত পর্যন্ত মানবজাতিকে আলোর পথ দেখাবে।

৪. আল্লাহ্র নবী-রাসূলগণে বিশ্বাস

আমরা বিশ্বাস করি যে, মানব ইতিহাসের শুরু থেকে আল্লাহ্ যুগে যুগে মানব সমাজগুলোকে কল্যাণ, মঙ্গল, শান্তি ও সফলতার সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য মানুষদের মধ্য থেকে অসংখ্য মানুষকে মনোনিত করে তাঁদেরকে তাঁর বাণী দান করেন এবং মানুষদেরকে সফলতার পথে আহ্বান করার দায়িত্ব দেন। নবী-রাসূলগণ ছিলেন আল্লাহ্র পথে চলার ক্ষেত্রে মানবজাতির বাস্তব ও পরিপূর্ণ আদর্শ। তাঁরা সবাই ছিলেন মহত্ত্বম চরিত্রের অধিকারী, নিষ্পাপ, সৎ ও কল্যাণময় মানুষ। তাঁরা সবাই তাঁদের দায়িত্ব যথাযথ ভাবে পালন করেছেন। তবে পূর্ববর্তী নবীগণের ইন্তেকালের পরে তাঁদের উম্মতগণ তাঁদের শিক্ষা ও শরীয়ত বিকৃত, পরিবর্তিত, পরিবর্ধিত ও নষ্ট করে ফেলে। শুধুমাত্র শেষ নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ  তার শিক্ষা ও শরীয়ত অবিকৃতভাবে সংরক্ষিত রয়েছে।

সকল যুগে ও সকল দেশেই আল্লাহ্ নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। অগণিত নবী-রাসূলের মধ্য থেকে মাত্র ২৫ জনের নাম কুরআন কারীমে উল্লেখ করা হয়েছে: আদম, নূহ, ইদ্্রীস, সালেহ, ইবরাহীম, হূদ, লূত, ইউনূস, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকূব, ইউসূফ, আইউব, শুআইব, মূসা, হারূন, আল-ইয়াসা’, যুল-কিফল, দাউদ, সুলাইমান, ইলইয়াস, যাকারিয়্যা, ইয়াহইয়া, ঈসা, মুহাম্মাদ আলাইহিমুস সালাতু ওয়াস সালাম। তাঁদেরকে আমরা সুনির্দিষ্টভাবে নবী-রাসূল হিসাবে বিশ্বাস করি। আরো অগণিত নবী ছিলেন। তবে আমরা অন্য কাউকে সুনির্দিষ্টভাবে নবী বলতে পরি না। সকল নবীর শেষ নবী মুহাম্মাদ । আমরা সকল নবীকে শ্রদ্ধাকরি, ভালবাসি এবং শেষ নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ()-তার অনুসরণ করি।

আল্লাহ্র গ্রন্থাবলী ও নবী-রাসূলগণের বিশ্বাস আমাদের হৃদয়কে আল্লাহ্র প্রতি ভালবাসায় উদ্বুদ্ধ করে। মানব জাতির প্রতি তাঁর দয়া ও ভালবাসা আমরা বুঝতে পারি। সাথে সাথে আমরা মানবীয় বুদ্ধির দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা হৃদয়ঙ্গম করি এবং আল্লাহ্র ওহীর উপর নির্ভরতার আবশ্যকতা জানতে পারি। নবী-রাসূলগণকে পরিপূর্ণ আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করে আমরা আল্লাহ্র পথে চলার বাস্তব আদর্শ পাই এবং সকল বিতর্ক ও বিভ্রান্তি থেকে বাঁচতে পারি।

৫. আখেরাতে বিশ্বাস

আখেরাত বা পরকালের উপর ঈমানের অর্থ হলো মৃত্যুর পরে কি ঘটবে সে বিষয়ে পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদীসে যা কিছু বলা হয়েছে তা সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বাস করা। যেমন, মৃত্যু পরবর্তী কবরের জিজ্ঞাসাবাদ, পুরস্কার ও শাস্তির কথা বিশ্বাস করা। কেয়ামত বা মহাপ্রলয়ের আগের আলামত বা চিহ্নসমূহ বিশ্বাস করা। কেয়ামত বা মহাপ্রলয় হবে বা একসময় এ মহাবিশ্ব ধ্বংস হয়ে যাবে বলে বিশ্বাস করা।  হাশর বা পুনরুত্থানে বিশ্বাস করা। অর্থাৎ মহাপ্রলয়ের পরে একসময় আল্লাহ্ বিশ্বকে পুনরায় তৈরী করবেন। সৃষ্টির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবাইকে পুনরায় জীবিত ও একত্রিত করবেন। সকলের কর্মের হিসাব গ্রহণ করবেন, ওজন করবেন ও বিচার করবেন। পুরস্কার বা শাস্তি প্রদান করবেন। আল্লাহ্ পুরস্কার ও শাস্তির জন্য জান্নাত ও জাহান্নাম সৃষ্টি করেছেন। সৎকর্মশীলগণ জান্নাতের পুরস্কার লাভ করবেন। অবিশ্বাসী ও অসৎ মানুষেরা জাহান্নাতোর শাস্তি ভোগ করবে। হাশরের ময়দানে রাসূলুল্লাহ () তাঁর সৎকর্মশীল ও তাঁর সুন্নাতের অনুসারী উম্মতকে “কাউসার”- তার পানি পান করাবেন। তিনি ও অন্যান্য নবী ও নেককার মানুষেরা আল্লাহ্র অনুমতিতে শাফা‘আত বা শুপারিশ করবেন। তাঁদের শাফা‘আতে আল্লাহ্ অনেককে ক্ষমা করবেন ও মুক্তি দিবেন।

৬. তাকদীর বা আল্লাহ্র নির্ধারণে বিশ্বাস

তাকদীর অর্থ নির্ধারণ। তাকদীরে বিশ্বাস অর্থ আল্লাহ্র জ্ঞান, লিখন, সৃষ্টি, ইচ্ছা ও ন্যায় বিচারে বিশ্বাস স্থাপন করা। মুমিন বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহ্র জ্ঞান অসীম, অনন্ত ও সর্বব্যপী। তিনি অনাদিকাল থেকে সৃষ্টির সকল বিষয় জানেন। সৃষ্টির আগেই জানেন কখন কোথায় কি ঘটবে ও কিভাবে ঘটবে। মুমিন আরো বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহ্ তাঁর অসীম জ্ঞান লাওহে মাহফূয বা সংরক্ষিত পত্রে লিখে রেখেছেন। আল্লাহ্র লিখন নির্দেশ নয়, বর্ণনা। লিখনের প্রকৃতি আমরা জানি না। মহান আল্লাহ্ বলেছেন: “তিনি যা ইচ্ছা মুছে ফেলেন আর যা ইচ্ছা রেখে দেন। আর তাঁর কাছেই মূল লেখা।”-(সূরা রাদ: ৩৯)

মুমিন আরো বিশ্বাস করেন যে, বিশ্বের সবকিছু একমাত্র আল্লাহ্রই সৃষ্টি। তিনি ছাড়া সবই তাঁর সৃষ্ট। মানুষের কর্মও আল্লাহ্র সৃষ্টি। বিশ্বে যা কিছু সংঘটিত হয় সবই মহান আল্লাহ্র ইচ্ছা ও জ্ঞানের মধ্যে। তাঁর ইচ্ছা ও জ্ঞানের বাইরে এ মহাবিশ্বের কোথাও সামান্যতম কোন কিছুই ঘটে না।

সর্বোপরি মুমিন বিশ্বাস করেন যে, মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা ও কর্মক্ষমতা রয়েছে। মানুষকে আল্লাহ্ বিবেক, বিচার শক্তি ও জ্ঞান দান করেছেন। মানুষ তার নিজের জ্ঞান ও ইচ্ছা অনুসারে কর্ম করে। তবে তার কর্ম আল্লাহ্র জ্ঞান ও ইচ্ছার মধ্যে সংঘটিত হয়। মহান আল্লাহ্ ইচ্ছা করলে মানুষের ইচ্ছা হরণ করতে পারেন। কিন্তু সাধারণত তিনি তা করেন না। তিনি মানুষকে তাঁর স্বাধীন ইচ্ছা ও কর্মক্ষমতা ব্যবহারের জন্য পুরস্কার বা শাস্তি প্রদান করবেন। তিনি তাঁর সৃষ্টিকে সবচেয়ে বেশী ভালবাসেন। তিনি কখনোই কাউকে জুলুম করবেন না। তিনি মহাকরুণাময় ও শ্রেষ্ঠ ন্যয়বিচারক।

একটি উদাহারণ দেখুন। আল্লাহ্র নির্ধারণ হলো, বিষ মৃত্যু আনে। আল্লাহ্ মানুষকে বিবেক ও জ্ঞান দিয়েছেন। সে জানে যে, বিষপানে মৃত্যু আসে। সে আরো জানে যে, এভাবে মৃত্যুকে গ্রহণ করা কঠিন পাপ। তারপরও কেউ বিষপান করলে সে মৃত্যু বরণ করবে এবং তা হবে আল্লাহ্র ইচ্ছা ও জ্ঞানের মধ্যে।

সর্বজ্ঞানী আল্লাহ্ তাঁর অসীম-অনন্ত জ্ঞানে জানেন যে, অমুক ব্যক্তি নির্দিষ্ট ব্যক্তি নির্দিষ্ট সময়ে বাধ্য না হয়ে, তার স্বাধীন ইচ্ছা শক্তি ও জ্ঞান প্রয়োগ করে মৃত্যু হবে জেনে ও এভাবে মৃত্যু পাপ জেনেও বিষপান করে মৃত্যু বরণ করবে। আল্লাহ্র জ্ঞান ও ইচ্ছার মধ্যেই বিষপানকারীর মৃত্যু হবে এবং সে তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ও কর্মক্ষমতার ব্যবহার অনুসারে শাস্তি পাবে।

মহান আল্লাহ্ ইচ্ছা করলে সে ব্যক্তির ইচ্ছাশক্তি হরণ করে তাকে বিষপান থেকে বিরত রাখতে পারেন। আবার তিনি ইচ্ছা করলে বিষের ক্ষমতা নষ্ট করে বিষপানকারীকে মৃত্যু থেকে রক্ষা করতে পারেন। তবে সাধারণত তিনি তা করেন না। তিনি মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়ে অন্য সকল সৃষ্টি থেকে সম্মানিত ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছেন। এ ইচ্ছাকে তিনি হরণ করেন না বা বাধা দেন না।

ইসলামী তাকদীরে বিশ্বাস ও অনৈসলামিক ভাগ্যে বিশ্বাসকে অনেকে এক করে ফেলেন। অনেকে মনে করেন ভাগ্য অনুসারেই যখন সবকিছু হবে তখন কর্মের কি দরকার! এটি পুরোপুরি ইসলাম বিরোধী বিশ্বাস। কুরআন কারীমেরবর্ণনায় আমরা দেখতে পাই যে, মক্কার কাফিরগণ এধরণের বিশ্বাস পোষণ করতো।

যে অবিশ্বাসী তাকদীর নিয়ে বিবাদ করে, তাকদীরের দোহায় দিয়ে কর্ম ছেড়ে দেয় সে মূলত নিজেকে আল্লাহ্র কর্মের পরিদর্শক ও বিচারক নিয়োগ করেছে। সে বলতে চায়, কর্ম করা আমার দায়িত্ব নয়। আমার কাজ হলো, আল্লাহ্র জ্ঞানের ও কর্মের বিচার করা! আল্লাহ্ কেন তা জানলেন বা করলেন তা হিসাব করে বের করা!!

অপরদিকে মুমিন সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করেন যে, স্রষ্টার কর্মের বিচার করা মানুষের কর্ম বা দায়িত্ব নয়। তিনি কী জানেন, কী লিখেছেন, কিভাবে লিখেছেন, কী মুছেন আর কী রেখে দেন কিছুই মানুষকে জানাননি। কারণ এসব জানা মানুষের কোন কল্যাণে লাগবে না। এ সবকিছুই তাঁর মহান প্রতিপালন বা রুবুবিয়্যাতের অংশ। মানুষের কাজ হলো আল্লাহ্র দয়া, ভালবাসা ও ন্যায়বিচারের উপর অবিচল আস্থা রেখে তাঁর নির্দেশ মত কর্ম করা ও ফলাফলের জন্য কোন প্রকারের উৎকন্ঠা বা উদ্বেগ মনে স্থান না দেয়া।

ইসলামের  তাকদীরে বিশ্বাস মুসলিমকে  কর্মময় করে তোলে, কখনোই কর্মবিমুখ করে না। তাকদীরে বিশ্বাসের ফলে মানুষ সকল হতাশা, অবসাদ ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পায়। তাকদীরে বিশ্বাসী মুসলিম জানে যে, তার দায়িত্ব হলো কর্ম করা, ফলাফলের জন্য দুশ্চিন্তা বা উৎকণ্ঠা তার জীবনে অর্থহীন। কারণ ফলাফলের দায়িত্ব এএই এক সত্ত্বার হাতে যিনি তাকে তাঁর নিজের চেয়েও ভালবাসেন, ভাল জানেন, যিনি দয়াময়, যিনি কাউকে জুলুম করেন না। যিনি তাঁর বান্দাকে কর্মের চেয়ে বেশী পুরস্কার প্রদান করেন। এজন্য প্রকৃত মুমিনের অন্তর সর্বদা দুশ্চিন্তা ও উৎকণ্ঠা মুক্ত।

তাকদীরে বিশ্বাস মানুষকে সকল অহংকার, অতি উল্লাস ও হতাশা থেকে রক্ষা করে। সফলতা বা নেয়ামতে সে অহংকারী হয় না, কারণ সে জানে যে, আল্লাহ্র ইচ্ছা ও রহমতেই তার সফলতা এসেছে। তার হৃদয় কানায় কানায় ভরে উঠে কৃতজ্ঞতায়। কৃতজ্ঞ হৃদয় আর অহংকারী হৃদয়ের পার্থক্য হলো মানবিক ও পাশবিক হৃদয়ের পার্থক্য।

অপরদিকে মুমিন ব্যর্থতা ও পরাজয়ে হতাশ হয় না। সে বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ্র ইচ্ছা ও জ্ঞান অনুযায়ী সে ফল পেয়েছে। প্রেমময় করুণাময় প্রভু চাইলে এ ফল পরিবর্তন করতে পারবেন। নিশ্চয় তার মধ্যে কোন কল্যাণ নিহিত রয়েছে। এছাড়া বিশ্বাসীর জীবনে মূলত ব্যর্থতা বা পরাজয় বলে কোন শব্দই নেই। কারণ সে জানে যে, কোন কর্মের জাগতিক ফলাফলের হিসাবে সে ব্যর্থ হলেও আল্লাহ্র কাছে তার প্রচেষ্টা, কর্ম ও ধৈর্যের অফুরন্ত পুরস্কার সংরক্ষিত রয়েছে। জাগতিক বরকত ও আখেরাতের সাওয়াব হিসাবে সে তা লাভ করবে।

তাকদীরের প্রকৃত ও পূর্ণতম বিশ্বাস ছিল রাসূলুল্লাহ ()-তার। তাঁর পরে তাঁর সাহাবীগণের। আর তাঁদের জীবনের দিকে তাকালেই আমরা বুঝতে পারি যে, তাকদীরের বিশ্বাস কিভাবে মানুষকে কর্মবীর ও প্রত্যয়ী করে তোলে।

তাকদীরের পুর্ণতম বিশ্বাস ছিল নবীজী ()-তার। আর তাই তিনি ছিলেন মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম দৃঢ়প্রত্যয়ী কর্মবীর। তিনি তাঁর সাধ্যমত কর্ম করেছেন, আল্লাহ্র কাছে প্রার্থনা করেছেন তাঁর করুণার জন্য আর ফলাফলের ভার ছেড়ে দিয়েছেন প্রভুর কাছে। এজন্য কঠিনতম বিপদের মুহূর্তের তাঁর হৃদয় থেকেছে প্রশান্ত, অবিচল ও উৎকণ্ঠামুক্ত।

তাঁর সাহাবীগণও ছিলেন তেমনি অকুতোভয় দৃঢ়প্রত্যয়ী কর্মবীর। তাকদীরের বিশ্বাস তাঁদের সকল সংশয়, ভয় ও দুশ্চিন্তা দূর করে বিশ্বজয়ে প্রেরণা যুগিয়েছে।

এভাবেই তাকদীরে বিশ্বাস করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে কুরআন ও হাদীসে। একটিমাত্র হাদীস উল্লেখ করছি। হযরত আবু হুরাইরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ  বলেছেন : “শক্তিশালী মুমিন আল্লাহ্র কাছে দুর্বল মুমিনের চেয়ে বেশি প্রিয় ও বেশি ভালো, যদিও সকল মুমিনের মধ্যেই ভালো রয়েছে। তোমার জন্য কল্যাণকর বিষয় অর্জনের জন্য তুমি ঐকান্তিক আগ্রহ ও সুদৃঢ় ইচ্ছা নিয়ে চেষ্টা করবে এবং আল্লাহ্র কাছে সাহায্য প্রার্থনা করবে। কখনোই দুর্বল হবে না বা হতাশ হবে না। যদি তুমি কোনো গমস্যায় নিপতিত হও (তুমি ব্যর্থ হও বা আশানুরূপ ফল না পাও) তাহলে কখনই বলবে না যে, যদি আমি সে কাজটি করতাম! যদি আমি অমুক-তমুক কাজ করতাম। বরং বলবে: (উপরের বাক্যটি); কারণ, অতীতের আফসোসমূলক ‘যদি করতাম’ ধরনের বাক্যগুলো শয়তানের কর্মের পথ খুলে দেয়।”

তাকদীরে বিশ্বাস হৃদয়ের দরজা শয়তানের জন্য বন্ধ করে দেয়। সেখানে শয়তান হতাশা বা অবসাদের বীজ বপন করতে পারে না। মহান আল্লাহ্ আমাদেরকে দেহ, এ, ঈমান ও কর্ম সকল বিষয়ে শক্তিশালী মুমিন হওয়ার তাওফীক দান করেন ; আমীন!

 

ঈমানের দ্বিতীয় অংশ : রিসালাত

ইমানের দ্বিতীয় অংশ: “ মুহাম্মাদান আব্দুল্লাহ ওয়া রাসূলুহু” এখানে তিনটি শব্দ আছে: মুহাম্মাদ, আবাদ ও রাসূল। রিসালাতের বিশ্বাসের অর্থ বুঝতে হলে এ তিনটি শব্দের অর্থ ও ব্যাখ্যা বুঝা দরকার।

(১) মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)

মহানবী হযরত মুহাম্মাদ  সম্পর্কে আমরা সকলেই জানি। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরব দেশের প্রাণ কেন্দ্র পবিত্র মক্কা শহরে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল আব্দুল্লাহ, আব্দুল্লাহর পিতার নাম ছিল আব্দুল মুত্তালিব, তার পিতা হাশিম। হাশিম ছিলেন কুরাইশ বংশের, কুরাইশ একটি আরব গোত্র, যাঁরা হযরত ইব্রাহীতোর পুত্র ইসমাঈলের বংশধর।

আরবী ‘আমুল ফিলের’ এক সোমবার মহানবী হযরত মুহাম্মাদ  জন্ম গ্রহণ করেন। কুরআন-হাদীসে জন্ম তারিখ বিষয়ে কিছু বলা হয় নি। পরবর্তী ঐতিহাসিকগণ ব্যাপক মতভেদ করেছেন। অধিকাংশের মতে ৫৭১  রবিউল আউয়াল মাসের ২. ৮, ৯, ১০ বা ১২ তারিখ (খৃষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে) তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ৬১০ খৃষ্টাব্দের রমযান (আগস্ট) মাসে, ৪০ বছর বয়সে তিনি নবুয়তের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। আল্লাহ্র পক্ষ থেকে ফেরেশতাদের নেতা হযরত জিবরিল আল- আমীন ওহী বা আল্লাহ্র বাণী নিয়ে হেরা পাহাড়ের গুহায় আসেন এবং তাকে কুরআন কারীমেরসূরা ইকরার প্রথম কয়েক আয়াত শিক্ষা দান করেন।

পরবর্তী ১৩ বছর মক্কায় ও পরের ১০ বছর তিনি মদীনায় ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠিত করেন। বিশ্ব মানবতার জন্য আল্লাহ্র একমাত্র ধর্ম ইসলামের  চূড়ান্ত ও পরিপূর্ণ শরীয়তকে বাস্তব প্রয়োগ ও প্রতিষ্ঠা করে, আল্লাহ্র প্রেম, নৈকট্য, মুক্তি ও সফলতার পূর্ণতম আদর্শ নিজের মহান মুবারক জীবনে বাস্তবায়িত করে মানবজাতিকে শিখিয়ে ৬৩ বছর বয়সে ১১শ হিজরীর (৬৩৩ খৃষ্টাব্দ) রবিউল আউআল মাসের ১২ তারিখ সোমবার তিনি ইন্তেকাল করেন।

(২) ‘আবদুহু

(আবদ) শব্দের ফারসী ভাষায় অর্থ (বান্দা) সাধারণভাবে বাংলাভাষায় এ ফারসী শব্দটি প্রচলিত। আবদ বা বান্দার বাংলা অর্থ ‘‘দাস’’, ‘‘ক্রীতদাস’’ বা “চাকর’’ আরবী ভাষায় সাধারণভাবে (আব্দ) বলতে সৃষ্টি বা মানুষ বুঝানো হয়, কারণ প্রতিটি মানুষই আল্লাহ্র দাস বা বান্দা।

আমরা পূর্বের আলোচনা থেকে জেনেছি যে, যুগে যুগে মানুষের বিশ্বাসের বিভ্রান্তি ও শিরকে নিপতিত হওয়ার একমাত্র কারণ ছিল, বিভিন্ন নেককার মানুষ, তাঁদের স্মৃতি বিজড়িত স্থান, কবর, গাছ, পাথর বা প্রাকৃতিক শক্তির মধ্যে ইশ্বরত্ব বা ঐশ্বরিক শক্তি কল্পনা করে বা এদের সাথে মহান আল্লাহ্র বিশেষ সুপারিশ বা লেনদেনের সম্পর্ক আছে বলে বিশ্বাস করে জাগতিক বিপদ, আপদ, গমস্যা, অনাবৃষ্টি, অসুস্থতা, ফসলহীনতা ইত্যাদি থেকে মুক্তির জন্য এদের কাছে ধর্না দেয়া, প্রার্থনা করা এবং তারা যেন তুষ্ট হয়ে ডাকে সাড়া দেয় সে জন্য এদের নামে বা এদের কবর, মূর্তি বা স্মৃতি বিজড়িত স্থানে মানত, ভেট, ফুল, সাজদা ইত্যাদি প্রদান।

নবী রাসূল আলাইহিমুস সালামগণকে নিয়েও তাঁদের পরবর্তী উম্মতগণ এভাবে অতিভক্তি ও শিরকের মধ্যে নিপতিত হয়েছে। যে নবী রাসূলগণ মানবজাতিকে শিরকের অন্ধকার থেকে তাওহীদের  আলোয় আনতে জীবনপাত করেছেন, তাঁদেরই উম্মতেরা তাঁদের তিরোধানের পরে তাঁদের মধ্যে “ইশ্বরত্ব” কল্পনা করে তাঁদের পূজা আরাধনা শুরু করে। তাঁদের মু’জিজা ও অলৌকিক নিদর্শনাবলীকে তারা তাঁদের ঐশ্বরিক শক্তির প্রমাণ হিসাবে পেশ করে আল্লাহ্র পরিবর্তে তাঁদের কাছেই প্রার্থনা, সাহায্য, বিপদমুক্তি ইত্যাদি চাওয়া, তাঁদের খুশি করতে ভেট, মানত ইত্যাদি প্রদান করা শুরু করে।

সৃষ্টির মধ্যে “ইশ্বরত্ব” কল্পনার প্রধান দু’টি দিক: প্রথমত, সৃষ্টির সাথে স্রষ্টার বিশেষ সম্পর্ক দাবী করা। তাকে ইশ্বরের পুত্র, কন্যা বা বংশধর বলে দাবী করা। এ বিষয়ে খ্রীষ্টানগণের কথা বলা যায়। তাঁরা আল্লাহ্র মহান রাসূল ঈসা আলাইহিস সালামকে  “আল্লাহ্র পুত্র” রূপে দাবী করে। তারা “পুত্রত্ব” বলতে জাগতিক পিতাপুত্র সম্পর্ক বুঝায় না। তাদের কাছে পুত্রত্ব অর্থ স্রষ্টা ঈসাকে (আ.) তার নিজের জাত বা সত্তা (ঝধসব ঝঁনংঃধহপব) থেকে সৃষ্টি করেছেন। কাজেই তাঁর মধ্যে ইশ্বরত্ব রয়েছে। অগণিত বিভ্রান্তি ও জঘন্য মিথ্যা কথা দিয়ে তারা বাইবেলের তাওহীদমূলক অসংখ্য নির্দেশনা ও উক্তিকে অপব্যাখ্যার মাধ্যমে বাতিল করে এ মত প্রতিষ্ঠা করেছেন।

সৃষ্টির মধ্যে ইশ্বরত্ব দাবীর দ্বিতীয় দিক অবতারত্ব (Incarnation) দাবী। অমুকের মধ্যে ¯্রষ্টা বা তাঁর কোন শক্তি মিশে গিয়েছে বা স্রষ্টার সাথে তার মিলন হয়েছে, তিনি তাঁর সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছেন।

এ ধরনের সকল শিরকে মূলোৎপাটন করতে এবং সেগুলোর দরজা বন্ধ করতে ইসলামী ঈমানের মধ্যে “মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূুলূহু” ঘোষণা দেয়া হয়েছে। তিনি আল্লাহ্র মনোনিত রাসূল, তাঁর মহত্তম সৃষ্টি, তাঁর প্রিয়তম। কিন্তু সর্বাবস্থায় তিনি তাঁর বান্দা, দাস ও মানুষ। তিনি স্রষ্টার অবতার নন, স্রষ্টার জাতের অংশ নন, স্রষ্টা বা তাঁর কোন গুণের সাথে মিলে মিশে তিনি একাকার হয়ে যান নি। কোন ঐশ্বরিক ক্ষমতার অধিকারী তিনি নন। তাঁর মর্যাদা আল্লাহ্র পূর্ণতম বান্দা ও উপাসক হওয়ার মধ্যে। তাকে পরিপূর্ণ ভক্তি, ভালবাসা, শ্রদ্ধা ও মর্যাদা প্রদানের সাথে সাথে সকল প্রকার শিরক মূলত বাড়াবাড়ি ও অতিভক্তি থেকে মুসলিম জাতিকে রক্ষা করার জন্য এ বিশ্বাস রক্ষা কবজ।

পূর্ববর্তী নবীগণও তাঁদের উম্মতকে “আল্লাহ্র বান্দা ও রাসূল” বিশ্বাস করতে শিখিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের উম্মতের পরবর্তীতে ভক্তিকে আনুগত্যের উপরে স্থান দিয়ে তাদেরকে পুত্র বা অবতার বলে দাবী করেছে। এভাবে তাঁদের শিক্ষা, ধর্ম ও শরীয়ত বিকৃত ও নষ্ট হওয়ার পরে আল্লাহ্ সর্বশেষ নবীর মাধ্যমে এভাবে তাওহীদের  হেফাযত করেছেন।

(৩) ‘রাসূলূহু

রাসূল শব্দের আভিধানিক অর্থ বার্তাবাহক (Messenger) আল্লাহ্ মানুষকে বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন। মানুষকে জ্ঞান, বিবেক, স্বাধীন ইচ্ছা ও বিচার শক্তি দান করেছেন, যেন মানুষ নিজের জ্ঞান ও বিবেকের মাধ্যমে ভাল-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় নির্ধারণ করে ন্যায় ও ভালর পথে নিজেকে পরিচালিত করে এবং মন্দ ও অন্যায়ের পথ থেকে নিজেকে দূরে রাখে। উপরন্তু মানুষকে সত্য ও ন্যায়ের পথের সন্ধান দেয়ার জন্য আল্লাহ্ যুগে যুগে প্রত্যেক জাতি, সমাজ বা জনগোষ্ঠির মধ্য থেকে কিছু মানুষকে মনোনীত করে তাদের কাছে ওহী বা প্রত্যাদেশের মাধ্যমে তাঁর বাণী ও নির্দেশ প্রেরণ করেছেন। যেন তাঁরা মানুষদেরকে তা শিক্ষা দান করেন এবং নিজেদের জীবনে তাঁর বাস্তব ও পরিপূর্ণ প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষের সামনে বাস্তব আদর্শ তুলে ধরেন। তাঁদেরকে ইসলামের  পরিভাষায় নবী ও রাসূল বলা হয়। সাধারণতঃ আল্লাহ্র সকল ওহী প্রাপ্ত বান্দাকেই ‘‘নবী’’ (সংবাদপ্রাপ্ত, সংবাদ বাহক) বলা হয়। আর যাদেরকে বিশেষভাবে মানুষদের মধ্যে ওহীর শিক্ষা প্রচারের দায়িত্ব দেয়া হয় তাঁদেরকে ‘‘রাসূল’’ (বার্তাবাহক) বলা হয়। কাজেই প্রত্যেক রাসূলই নবী, কিন্তু সকল নবীই রাসূল নন। কাউকে রাসূল বলে বিশ্বাস করার অর্থই হলো তাকে নবী বলে বিশ্বাস করা।

রিসালাতে বিশ্বাসের অর্থ

একজন মানুষকে মুসলিম হতে হলে তাকে তাওহীদের  বিশ্বাসের সাথে সাথে সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করতে হবে এবং সাক্ষ্য প্রদান করতে হবে যে, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহ্র বান্দা ও রাসূল বা বার্তাবাহক। তাকে রাসূল বলে বিশ্বাস করার অর্থই হলো তিনি আল্লাহ্র পক্ষ থেকে যা কিছু শিক্ষা দিয়েছেন, যা কিছু বলেছেন সবকিছুকে সন্দেহাতীত বলে সত্য মনে করা এবং সর্বক্ষেত্রে তা মেনে চলা। কুরআন ও হাদীসের আলোকে রিসালাতের বিশ্বাসের বিষয়গুলো নিুরূপ:

১. একজন মুসলিম সন্দেহাতীতরূপেই বিশ্বাস করে যে, হযরত মুহাম্মাদ  আল্লাহ্র মনোনীত নবী ও রাসূল। মানবজাতির মুক্তির পথের নির্দেশনা দানের জন্য তাদের ইহলৌকিক সকল কল্যাণ ও অকল্যাণের পথ শিক্ষা দেয়ার জন্য আল্লাহ্ তাকে মনোনীত করেছেন। মানবজাতির মুক্তির পথ, কল্যাণ ও অকল্যাণের সকল বিষয় আল্লাহ্ তাকে জানিয়েছেন এবং তা মানুষদেরকে শিক্ষা দেয়ার দায়িত্ব তাকে দান করেছেন।

২. একজন মুসলিম আরো বিশ্বাস করে যে, তিনি আল্লাহ্র মনোনীত সর্বশেষ নবী ও রাসূল, তাঁর পরে আর কোন ওহী নাযিল হবে না, কোন নবী বা রাসূল আসবেন না।

৩. মুসলিমকে  অবশ্যই বিশ্বাস করতে হবে যে, মুহাম্মাদ () বিশ্বের সকল দেশের সকল জাতির সব মানুষের জন্য আল্লাহ্র মনোনীত রাসূল। তাঁর আগমনের দ্বারা পূর্ববর্তী সকল ধর্ম রহিত হয়ে গিয়েছে। তাঁর রিসালাতে বিশ্বাস করা ছাড়া কোন মানুষই মুক্তির দিশা পাবে না।

৪. একজন মুসলিম সর্বান্তঃকরণে বিশ্বাস করেন যে, মুহাম্মদ  পরিপূর্ণ বিশ্বস্ততার সাথে আল্লাহ্র সর্বশেষ ও সর্বজনীন নবী ও রাসূল হিসাবে তাঁর নবুয়তের ও রিসালাতের দায়িত্ব পালন করেছেন। আল্লাহ্র সকল বাণী, শিক্ষা ও নির্দেশ তিনি পরিপূর্ণভাবে তাঁর উম্মতকে শিখিয়ে গিয়েছেন, কোন কিছুই তিনি গোপন করেননি।

৫. মুসলিম বিশ্বাস করেন যে, মুহাম্মাদ () আল্লাহ্র মনোনীত সর্বজনীত সর্বজনীন ও সর্বশেষ নবী ও রাসূল হিসাবে আল্লাহ্র পক্ষ থেকে যা কিছু উম্মতকে শিখিয়েছেন, জানিয়েছেন সবকিছুই তিনি সত্য বলেছেন। তাঁর সকল শিক্ষা, সকল কথা সন্দেহাতীতভাবে সত্য।

৬. মুহাম্মাদ আল্লাহ্র রাসূল একথা বিশ্বাস করার অর্থ হলো আল্লাহ্কে ডাকতে হলে, তাকে পেতে হলে, তাঁর উপাসনা আরাধনা করতে হলে বা তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করতে হলে অবশ্যই মুহাম্মাদ ()-তাঁর শিক্ষা অনুসারে আল্লাহ্কে ডাকতে হবে, ইবাদত উপাসনা করতে হবে। তাঁর শিক্ষার বাইরে ইবাদত করলে তা কখনো আল্লাহ্র কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।

৭. মুহাম্মাদ () আল্লাহ্র রাসূল- এ বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো জীবনের সকল ক্ষেত্রে সার্বিকভাবে তাঁর আনুগত্য করা। জীবনের সকল বিষয়ে, সকল ক্ষেত্রে মহানবীর শিক্ষা, বিধান ও নির্দেশ দ্বিধাহীনচিত্তে মেনে নেয়া। সকল মানুষের কথা ও সকল মতের উর্দ্ধে তাঁর শিক্ষা ও কথাকে স্থান দেয়া।

৮. মুহাম্মাদ ()-কে আল্লাহ্র রাসূল বলে বিশ্বাসকারী প্রতিটি মুসলিমের অন্যতম দায়িত্ব তাদের মধ্যকার সকল মতবিরোধের নিষ্পত্তি করা তাঁর নির্দেশ ও শিক্ষা অনুসারে। মুসলমানদের মধ্যে কোন মতবিরোধ ঘটলে ফয়সালার জন্য তাঁর শিক্ষার, অর্থাৎ কুরআন- হাদীসের শিক্ষার আশ্রয় নিতে হবে। কুরআনের বা হাদীসে যে নির্দেশ থাকবে তা সর্বান্তঃকরণে মেনে নিতে হবে। নিজেদের মতামতের  উর্দ্ধে স্থান দিতে হবে তাঁর মতকে।

৯. মুহাম্মদ ()-কে আল্লাহ্র রাসূল রূপে বিশ্বাসকারী প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব হলো জীবনের সকল পর্যায়ে তাঁর অনুসরণ ও অনুকরণ করা এবং তাঁর সুন্নাত (তাঁর জীবনপদ্ধতি) অনুসারে নিজেকে পরিচালিত করা। তাঁর সুন্নাত বা জীবনাদর্শই মুসলিমের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ।

১০. রিসালাতের সাক্ষের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ ()-কে সম্মান করা। তিনি ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, মানবজাতির নেতা, নবী-রাসূলদের প্রধান। তিনি আল্লাহ্র প্রিয়তম বান্দা, তাঁর হাবীব, তাঁর সবচেয়ে সম্মানিত বান্দা, সর্বযুগের সকল মানুষের নেতা। তিনি ছিলেন নিষ্পাপ। নবুয়ত প্রাপ্তির আগে ও নবুয়তের পরে সর্ব অবস্থায় আল্লাহ্ তাকে সকল পাপ, অন্যায় ও অপরাধ থেকে রক্ষা করেছেন। প্রথম মানব আদম আলাইহিস সালামের সৃষ্টির সময়েই আল্লাহ্ তার জন্য নবুয়ত নির্ধারণ করে রেখেছেন এবং তাকে সর্বশেষ নবী হিসাবে মনোনীত করেছেন। তিনি আল্লাহ্র বান্দা, দাস ও মানুষ ছিলেন। তবে মহান আল্লাহ্ তাকে অগণিত অলৌকিক বৈশিষ্ট দান করেছেন, যা কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।

১১. মুসলিমের দায়িত্ব হলো রাসূলে আকরাম -এর মর্যাদা ও সম্মানের ব্যাপারে পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদীসের উপর নির্ভর করা। রাসূলুল্লাহ ()-এর উপর বিশ্বাস ও তাঁর সম্মান প্রদান মুসলিম বিশ্বাসের মৌলিক বিষয়। পবিত্র কুরআন ও হাদীসে তাঁর সম্মান, মর্যাদা দায়িত্ব ক্ষমতা, অধিকার ও আল্লাহ্র সাথে তাঁর সম্পর্কের কথা অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে শেখান হয়েছে। মুসলিমের দায়িত্ব হলো, তাঁর ব্যাপারে কুরআন কারীমে বা সহীহ হাদীসে যা বলা হয়েছে তা সবকিছু পরিপূর্ণভাবে সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করা। নিজের থেকে কোন কিছু বাড়িয়ে বলা যাবে না, কারণ তা আমাদেরকে মিথ্যা ও বাড়াবাড়ির পথে ঠেলে দেবে, যা কুরআন ও হাদীসে কঠিনভাবে নিষেধ করা হয়েছে। এ জাতীয় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:

ক. কুরআন কারীম ও সহীহ হাদীসের আলোকে একজন মুমিন দৃঢ়ভাবেই বিশ্বাস করেন যে, সকল মর্যাদা ও সম্মান সহ তিনি একজন মানুষ ছিলেন। সৃষ্টির উপাদানে, মানবীয় প্রকৃতি ও স্বভাবে তিনি ছিলেন একজন মানুষ। তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। তাঁর মূল বৈশিষ্ট্য তাঁর মহান কর্মে, তাঁর মহত্তম চরিত্রে। উপাদানে, সৃষ্টিতে, প্রকৃতিতে অন্য সবার মত হয়েও তিনি সকল মানবীয় দুর্বলতা জয় করেছিলেন। আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস, ভক্তি, ভালবাসা, আস্থা, ইবাদত, বিধান পালন, ন্যয়বিচার, সেবা ইত্যাদি সকল দিকে মানবতার পূর্ণতম নিদর্শন ও আদর্শ ছিলেন তিনি। এটিই ছিল তাঁর অন্যতম মু’জিজা। তিনি মানবতার পূর্ণতার শিখরে উঠেছিলেন, তিনি ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ।

এগুলোর সাথে সাথে মহান আল্লাহ্ তাকে অতিরিক্ত কিছু বৈশিষ্ট্য দান করেছিলেন, যেগুলো কোন মানুষকে দেন নি। যেমন সাধারণ মানুষের মত তাঁর শরীরে ঘামে কোন দুর্গন্ধ ছিলনা, বরং তাঁর শরীরের ঘাম ছিল অত্যন্ত সুগন্ধ। তাঁর ঘুম সাধারণ মানুষের মত ছিল না, তিনি ঘুমালে তাঁর চোখ ঘুমাত, আর তার অন্তর সজাগ ও সচেতন থাকত। তিনি তার পিছন দিকেও দেখতে পেতেন। অনুরূপ যত বৈশিষ্ট সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে সবই মুমিন কোনরূপ অপব্যাখ্যা, বাড়াবাড়ি, তুলনা বা সন্দেহ ছাড়া বিশ্বাস করেন।

খ. আল্লাহ্ তাকে দুনিয়া, আখেরাত, বেহেশত দোজখ ইত্যাদির অনেক কিছু জানিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষের জ্ঞানের ঊর্ধ্বে অনেক গোপনীয় ও ভবিষ্যতের জ্ঞান তাকে আল্লাহ্ দান করেন। সাথে সাথে কুরআন ও হাদীসে বারবার ঘোষণা দেয়া হয়েছে যে, সার্বিক ভবিষ্যতের কথা আল্লাহ্ ছাড়া কেউ জানেন না। আল্লাহ্র জানানো বিষয় ছাড়া কোন ভবিষ্যত কথা, মনের গোপন কথা, বর্তমানের লুক্কায়িত কথা, গোপনকৃত তথ্য ইত্যাদি তিনি জানতেন না বলে তিনি আমাদেরকে কুরআন ও হাদীসের মাধ্যমে বারবার জানিয়েছেন। আমরা তাঁর সকল কথা সরলভাবেই বিশ্বাস করি। এক আয়াত দ্বারা আরেক আয়াতকে বা এক হাদীস দ্বারা অন্য হাদীসকে বাতিল বা অপব্যাখ্যা করি না, কোন একটির জন্য বাড়াবাড়ি করি না বা অতি ভক্তি করি না। আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল ()-এর সকল কথা সরলভাবে হুবহু মেনে নেয়াই সর্বোচ্চ ভক্তি।

গ. আল্লাহ্র আবদ (দাস) ও রাসূল হিসাবে তাকে আল্লাহ্ মানবজাতিকে সতর্ক করা ও সুসংবাদ প্রদান করার দায়িত্ব দান করেন। বিশ্ব জগতের পরিচালনা, কারো মঙ্গল বা অমঙ্গল করার দায়িত্ব বা ক্ষমতা আল্লাহ্ তাকে দেন নি। তাকে আল্লাহ্ অনেক মুজিযা বা অলৌকিক নিদর্শন দান করেছেন। তাঁর দোয়ায় আল্লাহ্ অগণিত অলৌকিক কর্ম সম্পন্ন করেছেন। এসকল আয়াত (অলৌকিক নিদর্শনসমূহ) বা মুজিযা সবই আল্লাহ্র ইচ্ছাই ও ক্ষমতায় সংঘটিত হয়েছে। তিনি আল্লাহ্র কাছে দোয়া করতেন, আর দোয়া কবুল করা বা না করা পুরোপুরিই আল্লাহ্র এখতিয়ারে। তিনি আল্লাহ্র প্রিয়তম বান্দা। তাঁর অনেক দোয়া আল্লাহ্ কবুল করেছেন। আবার কখনো কখনো কবুল করেননি। অনেক সময় তিনি বদদোয়া করলে আল্লাহ্ তাকে নিষেধ করেছেন। তাঁর দোয়ায় আল্লাহ্ অসংখ্য মানুষের গোনাহ মাফ করেছেন। আল্লাহ্র অনুমতিতে তিনি শাফায়াত করবেন এবং তাঁর শাফায়াতে অসংখ্য পাপী মুসলিমকে আল্লাহ্ দোযখ থেকে মুক্তি দেবেন। তবে তাঁর দোয়া ও শাফায়াত কবুল করা আল্লাহ্র ইচ্ছা। আল্লাহ্র রহমত ও তার রাসূলের দোয়ার কল্যাণ পাওয়ার যোগ্য কে তা আল্লাহ্ই ভাল জানেন।

ঘ. তিনি অন্যান্য সকল মানুষের মত মরণশীল। তিনি যথা সময়ে মৃত্যু বরণ করেছেন। হাদীস শরীফে বলা হয়েছে, মহান আল্লাহ্ তাকে মৃত্যুর পরে বিশেষ বারযাখী হায়াত বা জীবন দিবেন যাতে তিনি নামায পড়বেন, উম্মতের দরুদ সালাম ফিরিশতাগণ তাঁর কাছে পেীঁছাবেন, তিনি জবাব দিবেন ও দোয়া করবেন। হাদীসে বর্ণিত এসকল বিষয় আমরা সরলভাবেই বিশ্বাস করি। এগুলোর উপর নির্ভর করে বাড়িয়ে অন্য কিছু বলি না। আমরা বলি না যে, যেহেতু তাঁর বিশেষ জীবন আছে, সেহেতু তিনি খাওয়া দাওয়া করেন, অথবা ঘুরে বেড়ান, ইত্যািদ। তিনি আমাদের যতটুকু জানার প্রয়োজন তা জানিয়ে দিয়েছেন, এর বেশি বলার অর্থ তাঁর নামে আন্দাযে মিথ্যা কথা বলা, যা কঠিনতম পাপ ও জাহান্নামের কারণ।

ঙ. তিনি নিজে তাঁর বিষয়ে বাড়াবাড়ি অত্যন্ত অপছন্দ করতেন। ‘‘তোমরা আমার প্রশংসায় ভক্তিতে বাড়াবাড়ি করবে না, যেমনভাবে খৃষ্টানরা ঈসা আলাইহিস সালাতকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছিলে। আমি তো একজন দাস-মানুষ মাত্র, কাজেই তোমরা বলবে: আল্লাহ্র দাস (বান্দা) ও রাসূল।’’  একদিন এক ব্যক্তি তাকে বলেন: ‘‘আল্লাহ্র মর্জ্জিতে এবং আপনার মর্জ্জিতে ..।’’ তিনি সে ব্যক্তিকে ধমক দিয়ে বলেন: ‘‘তুমি আমাকে আল্লাহ্র সমতুল্য বানিয়ে দিচ্ছ? বরং একমাত্র আল্লাহ্রই মর্জ্জিতেই।’’  এক ব্যক্তি বলে: ইয়া মুহাম্মাদ, ইয়া সাইয়েদানা, ইবনা সাইয়েদানা, খাইরানা, ইবনা খাইরানা: হে মুহাম্মাদ, হে আমাদের নেতা, আমাদের নেতার পুত্র, আমাদের শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তি ও শ্রেষ্ঠ মানুষের সন্তান। তখন রাসূলুল্লাহ  বলেন: “হে মানুষেরা, তোমরা তাকওয়া (আল্লাহভীতি) অবলম্বন করে চল। শয়তান যেন তোমাদেরকে বিপথগামী বা প্রবৃত্তির অনুসারী করে না ফেলে। আমি মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল্লাহ: আব্দুল্লাহর পুত্র মুহাম্মাদ, আল্লাহ্র বান্দা ও রাসূল। আল্লাহ্র কসম! আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু আমাকে যে স্থানে রেখেছেন, যে মর্যাদা প্রদান করেছেন তোমরা আমাকে এর উপরে উঠাবে তা আমি পছন্দ করি না।”

১২. (মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ) বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো যে এ বিশ্বাস পোষণকারী অবশ্যই মুহাম্মাদ ()-কে সকল মানুষের ঊর্ধ্বে ভালবাসবেন। তাঁর মহান সাহাবীগণ ও তাঁর আত্মীয় স্বজন ও বংশধরকে ভালবাসা ও শ্রদ্ধা করা তাঁর ভালবাসার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

এখানে বুঝতে হবে যে, রাসূলুল্লাহর ভালবাসা কোন মুখের দাবীর ব্যাপার নয়। তাঁর নির্দেশিত পথে চলা, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলা, তাঁর শরীয়তকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পালন করা, তিনি নিষেধ করেছেন তা থেকে দূরে থাকাই হলো তাঁর মহব্বতের প্রকাশ।  যে যত বেশী তাঁর শরীয়তকে মেনে চলবেন এবং তাঁর সুন্নাত মত জীবন যাপন করবেন, তাঁর ভালবাসা তত বেশী গভীর হবে। সাহাবীগণ, তাবিয়ীগণ, ইমামগণ কর্মও অনুসরণের মাধ্যমে তাকে ভালবেসেছেন।

রাসূলে আকরাম -কে ভালবাসার অর্থ তাঁর উপর ঈমান আনা, তাকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, সকল নবীর নেতা, সর্বশেষ নবী ও রাসূল বলে বিশ্বাস করা, তাঁর সকল আদেশ নিষেধ মেনে চলা, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর অনুসরণ করা এবং সবকিছুর ঊর্ধ্বে তাকে সম্মান দান করা, তাঁর জন্য বেশি বেশি দরুদ-সালাম পাঠ করা, তাঁর জীবনী, শিক্ষা, আদেশ-নিষেধ ভালভাবে জানার জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকা। যথাসম্ভব বেশি বেশি তাঁর জীবনী, আকৃতি, প্রকৃতি, কর্ম ও আদর্শ আলোচনা করা।

এভাবেই মুসলিমের অন্তরে তাঁর প্রতি ভালবাসা গভীর হতে থাকে, তখন জীবনের সবকিছুর ঊর্ধ্বে, সকল মানুষের ঊর্ধ্বে, এএইকি নিজের জীবনের চেয়েও তাকে ভালবাসতে সক্ষম হয় একজন মুসলিম। আমার আল্লাহ্র দরবারে সকাতরে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে মহানবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রকৃত অনুসরণের ও প্রকৃত ভালবাসার তাওফীক দান করেন। আমীন।

তাওহীদ ও রিসালাতের ঈমানের কল্যাণ

কুরআন কারীমেরঅনেক আয়াত ও অগণিত সহীহ হাদীস থেকে আমরা দেখতে পাই যে, তাওহীদ ও রিসালাতের ঈমান মানুষের মুক্তির একমাত্র সোপান। ইহকালের কল্যাণ ও পরকালের মুক্তির একমাত্র পথ তাওহীদের  বিশ্বাস। সকল সফলতার চাবিকাঠি এ বিশ্বাস। মহান আল্লাহ্ বলেছেন: “যদি জনপদবাসীরা ঈমান গ্রহণ করে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে চলত তাহলে আমি তাদের জন্য আসমান ও যমীনের অগণিত বরকত, কল্যাণ ও সমৃদ্ধির দরজা খুলে দিতাম।”  “যদি তোমরা ঈমান গ্রহণ কর ও কৃতজ্ঞ হও তাহলে আল্লাহ্ তোমাদের শাস্তি দিবেন কেন?”

রাসূলুল্লাহ  বলেছেন: ‘‘হে মানুষেরা, তোমরা (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু: আল্লাহ্ ছাড়া কোন উপাস্য নেই) এ কথায় পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন কর, তাহলে তোমরা কল্যাণ লাভ করবে, সফলকাম হবে।’’  “যে ব্যক্তি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করবে, বলবে বা সাক্ষ্য দেবে যে (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহ্ ছাড়া কোন মাবুদ নেই) সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”

‘‘যে ব্যক্তি এ সুদৃঢ় প্রত্যয়ের জ্ঞান নিয়ে মৃত্যুবরণ করবে যে আল্লাহ্ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, সেই ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে।’’  ‘‘যে ব্যক্তি আল্লাহ্ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং আমি আল্লাহ্র রাসূল, তাওহীদ ও রিসালাতের এ কালিমায় সন্দেহাতীত বিশ্বাস নিয়ে আল্লাহ্র সাথে মিলিত হবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’’  ‘‘যে ব্যক্তি আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জনের বিশুদ্ধ ইচ্ছা নিয়ে বলবে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু (আল্লাহ্ ছাড়া কোন মাবুদ নেই) আল্লাহ্ তার জন্য জাহান্নামের আগুন নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন।’’

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবু হুরাইরা প্রশ্ন করেন, ‘‘হে আল্লাহ্র রাসূল, সবচেয়ে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি কে যে কেয়ামতের দিন আপনার শাফায়াত লাভে ধন্য হবে?’’ উত্তরে তিনি বলেন: ‘‘সবচেয়ে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি যে আমার শাফায়াত লাভে ধন্য হবে সে ঐ ব্যক্তি তার অন্তরের বিশুদ্ধতম বিশ্বাস নিয়ে বলেছে যে (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু: আল্লাহ্ ছাড়া কোন মাবুদ নেই)।’’

বস্তুত এ তাওহীদের বিশ্বাসই সকল মানবিক ও আত্মিক পরাধীনতা থেকে মুক্তি দান করে। এ বিশ্বাস মানুষকে মানবীয় পূর্ণতার শিখরে তুলে দেয় এবং মানুষের মনে এনে দেয় পরিপূর্ণ আস্থা, প্রশান্তি। তাওহীদে বিশ্বাসী ও শিরকে লিপ্ত মানুষের আÍিক ও মানসিক অবস্থার পার্থক্য বর্ণনা করে আল্লাহ্ বলেছেন: “আল্লাহ্ একটি দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন, এক ব্যক্তির প্রভু  অনেক, যারা পরস্পর বিরুদ্ধ ভাবাপন্ন এবং এক ব্যক্তির প্রভু  কেবল একজন; এ দু’জনের অবস্থা কি সমান হতে পারে? প্রশংসা আল্লাহ্রই নিমিত্ত, কিন্তু এদের অধিকাংশই তা জানেন না।’’

এখানে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বোঝানো হয়েছে কিভাবে তাওহীদের  বিশ্বাস একজন মানুষকে মানবীয় পূর্ণতার শিখরে তুলে দেয়। যারা শিরকে লিপ্ত রয়েছেন, যারা বিশ্বাস করেন বিভিন্ন মানুষ, দেব-দেবী, গাছ, পাথর বা জিন পরী, ভুত প্রেত ইত্যাদি মানুষের উপকার বা অপকার করতে পারে, মানুষের কল্যাণ বা অকল্যাণে এদের হাত আছে, তারা সর্বদা অস্থির চিত্ত, শংকাগ্রস্ত। তারা বিভিন্ন স্থানে ছুটে বেড়াচ্ছেন কল্যাণের আশায়, অকল্যাণ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য। কোথাও ছুটছেন মঙ্গল অর্জনের জন্য, কোথাও ছুটছেন বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য। তার মনের অস্থিরতার শেষ নেই। তার অবস্থা ঠিক সে কর্মচারীর মত যাকে কয়েকজন পরস্পর বিরোধী মেজাজের কর্মকর্তার অধীনে কাজ করতে হয়, তাদের সবাইকে খুশি করতে গিয়ে বেচারার দুশ্চিন্তা ও ব্যস্ততার অন্ত থাকে না।

অপর পক্ষে যিনি তাওহীদে বিশ্বাসী তিনি এধরণের সকল দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতা থেকে মুক্ত। কারো সামনে তার এ নত হয়না। তিনি জানেন যে, তার সকল কল্যাণ অকল্যাণ ভাল মন্দ, উন্নতি অবনতি সবকিছু একমাত্র আল্লাহ্র হাতে। তিনি জানেন, তার প্রভু সর্বজ্ঞ, জ্ঞানী, পরম করুণাময়। তিনি তার প্রিয়তম, কাছেতম। তিনি তার মঙ্গল করবেনই, কারণ তিনি তাকে তাঁর নিজের চেয়েও বেশী ভালবাসেন। আর তিনি না দিলে কেউই দিতে পারবে না। বান্দার একমাত্র দায়িত্ব হলো আল্লাহ্র নির্দেশিত পথে চলা, তার কছে প্রার্থনা করা।

কাজেই হাসি, আনন্দে ব্যাথা বেদনায়, দুঃখে-কষ্টে সর্বদা তার এ একমাত্র আল্লাহ্র সাথে সম্পৃক্ত। আনন্দে তিনি তাঁরই কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন, বেদনায় তিনি তার একমাত্র কাছেতম ও প্রিয়তম প্রভুর কাছেই মনের আকুতি তুলে ধরেন। আস্থা ও প্রশান্তিতে তার এ ভরপুর। এ পূর্ণতা ও প্রশান্তির গভীরতা নির্ভর করে তাওহীদের বিশ্বাসের গভীরতার উপর। বিশ্বাস ও আস্থার এ গভীরতা অর্জিত হবে বাকী রুকনগুলো ও পরবর্তী ইহসান ও বেলায়াতের পথের কর্মগুলো পালনের মাধ্যমে।

ঈমান বিনষ্টকারী বিষয়াদি

ঈমানের উপরে উল্লেখিত কল্যাণ লাভ করতে হলে ঈমানকে অবশ্যই নির্ভেজাল ও বিশুদ্ধ হতে হবে। ঈমান নষ্টকারী বিষয়াবলী থেকে মুক্ত হতে হবে। চারটি বিষয় ঈমান নষ্ট করে: শিরক, কুফর, নিফাক ও বিদ‘আত। শিরক অর্থ অংশীদারত্ব। আল্লাহ্র কোন কর্ম, গুণ, নাম বা ইবাদতে অন্য কোন সৃষ্টিকে অংশীদার বানানো বা তাঁর সমকক্ষ বলে মনে করা বা আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কোন সৃষ্টি-ফিরিশতা, নবী, ওলী, তাঁদের স্মৃতি বিজড়িত স্থান, দ্রব্য, গাছ, পাথর বা অন্য কিছুর মধ্যে “ইশ্বরত্ব”, “ঐশ্বরিকগুণ” বা আল্লাহ্র মত ক্ষমতা, শক্তি, গুণ বা কল্যাণ-অকল্যাণের ক্ষমতা আছে বলে মনে করা শিরক।

কুফর শব্দের অর্থ অবিশ্বাস করা বা গোপন করা। উপরে বর্ণিত শাহাদাতাইন ও আরকানুল ঈমানের কোন বিষয়কে অবিশ্বাস করাকে কুফরী বলা হয়। শিরক ও কুফর পরস্পর জড়িত ও অবিচ্ছেদ্য।

মনের মধ্যে শিরক-কুফর গোপন রেখে জাগতিক স্বার্থ, ক্ষমতা, প্রয়োজন ইত্যাদির কারণে মুখে ঈমানের দাবী করাকে নিফাক বা মুনাফিকী বলা হয়। বিদ‘আত অর্থ উদ্ভাবন। যে কর্ম, বিশ্বাস, রীতি বা আচার রাসূলুল্লাহ  ও তাঁর সাহাবীগণ ধর্মীয় কর্ম হিসাবে, সাওয়াব, আল্লাহ্র নৈকট্য বা ইবাদত হিসাবে পালন করেননি, এরূপ কোনো কর্ম, বিশ্বাস, রীতি বা আচারকে ধর্মের অংশ বা সাওয়াবের কর্ম বলে মনে করা হলো বিদ‘আত। বিদ‘আত অনেক সময় শিরক ও কুফরীতে নিপতিত করে। এছাড়া বিদ‘আতে লিপ্ত ব্যক্তির ইবাদত, বন্দেগি আল্লাহ্ কবুল করবেন না বলে বিভিন্ন হাদীসে বারংবার বলা হয়েছে।

নিজের ও পরিজনের ঈমান রক্ষা করা দুনিয়া ও আখেরাতের সফলতার মূল চাবিকাঠি। এ সকল বিষয়ের বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও বিবরণ শিক্ষা করা প্রত্যেক মুমিনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। এখানে স্বল্প পরিসরে শুধুমাত্র শিরক-কুফরের ভয়াবহ পরিণতি ও আমাদের সমাজের প্রচলিত কিছু শিরক-কুফর সম্পর্কে অতি সংক্ষেপে আলোচনা করতে চাই। মহান আল্লাহ্র মুবারক দরবারে সকাতরে তাওফীক ও কবুলিয়্যত প্রার্থনা করছি।

কুরআন-হাদীসের অগণিত বর্ণনায় আমরা দেখতে পাই যে, শিরক-কুফর জীবনের ভয়ঙ্করতম পাপ। অন্যান্য পাপ থেকে তার বিশেষত্ব হলো:

প্রথম, তার শাস্তি ভয়ঙ্কতম ও কঠিনতম।

দ্বিতীয়, সকল পাপ আল্লাহ্ ইচ্ছা করলে তাওবা ছাড়া নিজ করুণায় বা নেক আমলের বরকতে ক্ষমা করবেন কিন্তু শিরক-কুফরের পাপ পরিপূর্ণ তাওবা ও শিরক-কুফর বর্জন ছাড়া আল্লাহ্ কখনোই ক্ষমা করেন না।

তৃতীয়, শিরক-কুফরের ফলে মানুষের অন্যান্য সকল নেক কর্ম বিনষ্ট হয়ে যায়। যেমন কেউ যদি নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, যিক্র, দোয়া, সুন্নাত পালন, মানব সেবা ইত্যাদি অগণিত নেক আমল করেন, তারপর তিনি একটি শিরকমূলক কর্ম করেন, তাহলে তার সকল নেক কর্মের সাওয়াব বিনষ্ট ও ধ্বংস হয়ে যাবে। আল্লাহ্র কাছে তার কিছুই থাকবে না। অন্য কোন পাপের ফলে এভাবে নেককর্ম নষ্ট হয় না।

চতুর্থ, শিরক-কুফরে লিপ্ত ব্যক্তির জন্য জান্নাত হারাম। তাকে অনন্তকাল জাহান্নামেই থাকতে হবে।

সমাজে প্রচলিত কিছু শিরক-কুফর

আমাদের মুসলিম সমাজে মুসলিম নামধারী অগণিত মানুষ বিভিন্ন প্রকার শিরক ও কুফরীর মধ্যে নিপতিত। ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতা, প্রচলিত কুসংস্কার ও লোককথায় বিশ্বাস, মাজারের খাদেম টাউট ও ঈমানচোর ধোঁকাবাজদের কথায় বিশ্বাস, ওলী ও বুজুর্গগণ সম্পর্কে ভুলধারণা ও অতিভক্তি, তাদের কারামতকে তাঁদের নিজস্ব ক্ষমতা বলে মনে করা, জীবিত বা মৃত ওলীদের ভালমন্দের ক্ষমতা আছে বলে বিশ্বাস করা, তাঁরা গায়েব জানেন বা মনের কথা বলতে পারেন বলে মনে করা, তাঁদের মাজারে বা তাঁদের কাছে যেয়ে চাইলে কিছু পাওয়া যায় বলে মনে করা ইত্যাদি বিভিন্ন কারণ ও প্রকরণের শিরকে সমাজের অগণিত মুসলিম জড়িত রয়েছেন। “রাহে বেলায়াত” গ্রন্থে শিরকের মূল উৎস ও প্রকাশ সম্পর্কে কিছু লেখা হয়েছে। এখানে সংক্ষেপে কয়েকটি মূলনীতি লিখছি :

১.       উপরে বর্ণিত শাহাদাতাইন বা আরকানুল ঈমানের কোন অংশকে অবিশ্বাস করা।  যেমন আল্লাহ্র একত্বে বিশ্বাস না করা। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাঁর বান্দা, দাস ও মানুষ রূপে বিশ্বাস না করা। অথবা তাকে আল্লাহ্র অবতার, আল্লাহ্ তাঁর সাথে মিশে গিয়েছেন, যে আল্লাহ্ সেই রাসূল ইত্যাদি মনে করা। অথবা তাকে আল্লাহ্র নবী ও রাসূল রূপে না মানা। তাকে কোন বিশেষ যুগ, জাতি বা দেশের নবী মনে করা। তাঁর কোন কথা বা শিক্ষাকে ভুল বা অচল মনে করা। আল্লাহ্র নৈকট্য, সন্তুষ্টি ও মুক্তি পাওয়ার জন্য তাঁর শিক্ষার অতিরিক্ত কোন শিক্ষা, মত বা পথ আছে, থাকতে পারে বা প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করা।

২.       আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কেউ এ বিশ্বের প্রতিপালন বা পরিচালনায় শরীক আছেন বলে বিশ্বাস করা। অন্য কোনো সৃষ্টি, প্রাণী, ফিরিশতা, জীবিত বা মৃত মানুষ, নবী, ওলী, বা কোনো কিছু সৃষ্টি, পরিচালনা, অদৃশ্য জ্ঞান, অদৃশ্য সাহায্য, রিযিক দান, জীবন দান, সুস্থতা বা রোগব্যাধি দান, বৃষ্টি দান, বরকত দান, অনাবৃষ্টি প্রদান, অমঙ্গল প্রদান ইত্যাদি কোনো প্রকার কল্যাণ বা অকল্যাণের কোনো প্রকার ক্ষমতা রাখেন বা আল্লাহ্ কাউকে অনুরূপ ক্ষমতা দিয়ে রেখেছেন বলে বিশ্বাস করা।

৩.      আল্লাহ্ ছাড়া কোন নবী, ওলী বা ফিরিশতা সকল প্রকার গাইব বা অদৃশ্য জ্ঞানের অধিকারী, সদাসর্বদা সর্বত্র বিরাজমান বা হাজির নাযির বলে বিশ্বাস করা শিরক।

৪.       রাসূলুল্লাহ , ঈসা (আ) বা অন্য কাউকে আল্লাহ্র সত্তা বা জাতের অংশ, তাঁর মহান সত্তা, জাতের অংশ (ঝধসব ঝঁনংঃধহপব) বা জাতী নূর থেকে তাঁদের সৃষ্টি বা উৎপত্তি বলে বিশ্বাস করা শিরক।

৫.       অশুভ বা অযাত্রা বিশ্বাস করা। কোনো বস্তু, প্রাণী, কর্ম, বার, তিথি, মাস ইত্যাদিকে অশুভ, অমঙ্গল বা অযাত্রা বলে মনে করা সুস্পষ্ট শিরক। আমাদের দেশে অনেক মুসলিমও ‘কী করলে কী হয়’ জাতীয় অনেক বিষয় লিখেন বা বিশ্বাস করেন। এগুলো সবই শিরক। জন্মদিনে নখ চুল কাটা, ভাঙ্গা আয়নায় মুখ দেখা, রাতে নখ কাটা, পিছন থেকে ডাকা, কাক ডাকা ইত্যাদি অগণিত বিষয়কে অমঙ্গল বা অশুভ মনে করা হয়, যা নিতান্তই কুসংস্কার, মিথ্যা ও শিরকী বিশ্বাস। পাপে অমঙ্গল ও পূণ্যে কল্যাণ। সৃষ্টির সেবায় সকল মঙ্গল নিহিত ও সৃষ্টির ক্ষতি করা বা অধিকার নষ্ট করার মধ্যে নিহিত সকল অমঙ্গল। এছাড়া অমঙ্গল বা অশুভ বলে কিছুই নেই।

৬.       আল্লাহ্ ছাড়া কারো ইবাদত করা। আল্লাহ্ ছাড়া কাউকে বা কোন কিছুকে, যেমন মাযার, কবর, পাথর, গাছ ইত্যাদিকে সাজদা করা, সেখানে অলৌকিক সাহায্য, ত্রাণ, দীর্ঘায়ূ, রোগমুক্তি, বিপদমুক্তি, সন্তান ইত্যাদি প্রার্থনা করা। তাদের নামে মানত করা, কুরবানি বা উৎসর্গ (ংধপৎরভরপব) করা শিরক। আল্লাহ্ ছাড়া কারো জন্য  জীবিত বা মৃত, বিমূর্ত, মূর্ত, প্রস্তরায়িত বা সমাধিত, নবী, ওলী, ফিরিশতা বা যে কোনো নামে বা প্রকারে কারো জন্য এগুলো করা হলে তা শিরক হবে। মূর্তিতে ফুলদান, মূর্তির সামনে নীরবে দাঁড়ানো, বিনয়ে দাঁড়ানো ইত্যাদি সবই শিরক।

৭.       আল্লাহ্র জন্য কোন ইবাদত করে সে ইবাদত দ্বারা আল্লাহ্র সাথে অন্য কারো সন্তুষ্ঠি কামনা বা সম্মান প্রদর্শনও শিরক। যেমন আল্লাহ্র জন্য সাজাদা করা তবে নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তি বা বস্তুকে সামনে রেখে সাজদা করা, যেন আল্লাহ্র সাজদার সাথে সাথে তাকেও সম্মান করা হয়ে যায়। অথবা আল্লাহ্র জন্য মানত করা, অথবা নির্দিষ্ট কোন  জীবিত বা মৃত ওলী, ফিরিশতা, জিন বা কারো স্মৃতি বিজড়িত স্থান, কবর, মাযার, পাথর, গাছ ইত্যাদিকে মানতের সাথে সংযুক্ত করা, যেন মানতের মাধ্যমে আল্লাহ্র সাথে সাথে উক্ত উপাস্যেরও সম্মান প্রদর্শন করা হয় বা তার করুণা লাভ করা যায়।

৮.      আল্লাহ্, তাঁর রাসূল বা তাঁর দ্বীনের মৌলিক কোনো বিষয় অস্বীকার করা, অবিশ্বাস করা, অবজ্ঞা করা বা অপছন্দ করা কুফরী। মুসলিম সমাজের প্রচলিত কুফরীর মধ্যে অন্যতম হলো আল্লাহ্র বিভিন্ন বিধান, যেমন-নামায, পর্দা, বিভিন্ন অপরাধের শাস্তি, ইসলামী আইন ইত্যাদির প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ বা এগুলোকে বর্তমানে অচল মনে করা।

৯.       ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তি জীবনে পালন করতে হবে এবং সমাজ, বিচার, শিক্ষা ইত্যাদি ক্ষেত্রে ইসলাম চলবে না বলে মনে করা, ইসলামের  কোনো বিধান বা রাসূলুল্লাহ ()-এর কোনো সুন্নাতের প্রতি অবজ্ঞা বা ঘৃণা প্রকাশ করা, ওয়াজ, মাহফীল, যিক্র, তিলাওয়াত, নামায, মাদ্রাসা, মসজিদ, বোরকা, পর্দা ইত্যাদির প্রতি অবজ্ঞা বা ঘৃণা অনুভব করা, রাসূলুল্লাহ  বা পূর্ববর্তী অন্য কোনো নবী-রাসূলের প্রতি সামান্যতম অবজ্ঞা প্রকাশ করা।

১০.     মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ -এর সর্বশেষ নবী হওয়ার বিষয়ে সামান্যতম সন্দেহ পোষণ করা, তাঁর পরে কারো কাছে কোনো প্রকার ওহী এসেছে বলে বিশ্বাস করা কুফরী।

১১.     সামাজিক, অর্থনৈতিক, পারিবারিক, রাষ্ট্রীয় বা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ ()-তার শেখানো নিয়ম, পদ্ধতি, রীতি, নীতি, আদর্শ, আইন ইত্যাদি ছাড়া অন্য কোন নিয়ম, নীতি, মতবাদ বা আদর্শ বেশী কার্যকর, উপকারী বা উপযোগী বলে মনে করা। যুগের প্রয়োজনে তাঁর শেখানো পদ্ধতিতে কিছু পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মনে করা।

১২.     যে কোনো প্রকার কুফরীর প্রতি সন্তুষ্ট থাকাও কুফরী। উপরে বর্ণিত কোন কুফুরী বা শিরকে লিপ্ত মানুষকে মুসলিম মনে করা বা তাঁদের আকীদার প্রতি সন্তুষ্ট থাকাও কুফরী। যেমন যারা রাসূলুল্লাহ  কে সর্বশেষ নবী বলে মানেন না, বা তাঁর পরে কোন নবী থাকতে পারে বা ওহী আসতে পারে বলে বিশ্বাস করে তাদেরকে কাফির মনে না করা বা মুসলিম উম্মাহর অন্তর্ভুক্ত মনে করা কুফরী। অনুরূপভাবে ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্মকে সঠিক বা পারলৌকিক মুক্তির মাধ্যম বলে মনে করা, সব ধর্মই ঠিক মনে করা, অন্যান্য ধর্মের শিরক বা কুফরীমূলক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা, সেগুলোর প্রতি মনের মধ্যে ঘৃণাবোধ না থাকা, অন্য ধর্মাবলম্বীগণকে আন্তরিক বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করা, তাদের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের অনুকরণ করা, ক্রিসমাস (বড়দিন), পূজা ইত্যাদিতে আনন্দ করা বা উদ্যাপন করা ইত্যাদি বর্তমান যুগে অতি প্রচলিত কুফরী কর্ম ও বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত।

১৩.     আরেকটি প্রচলিত কুফরী গণক, জ্যোতিষী, হস্তরেখাবিদ, রাশিবিদ, জটা ফকির ইত্যাদি সকল প্রকার ভাগ্য, গোপন বিষয় বা ভবিষ্যত গণনা করা, অথবা এসকল মানুষের কথায় বিশ্বাস করা। এ ধরনের কোনো কোনো কর্ম ইসলামের  নামের করা হয়। যেমন, ‘এলেম দ্বারা চোর ধরা’ ইত্যাদি। যে নামে বা যে পদ্ধতিতেই করা হোক গোপন তথ্য, গায়েব, অদৃশ্য, ভবিষ্যৎ বা ভাগ্য গণনা বা বলা জাতীয় সকল কর্মই আরবি (কাহানা)-র অন্তর্ভুক্ত ও কুফরী কর্ম। অনুরূপভাবে কোনো দ্রব্য, ধাতু, অষ্টধাতু, গ্রহ বা এ জাতীয় কোনো কিছু মানুষের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে অথবা দৈহিক বা মানসিক ভালমন্দ করতে পারে বলে বিশ্বাস করা শিরক।

১৪.     রাসূলুল্লাহ  -এর শেখানো বা আচরিত কোন কর্ম, পোশাক, আইন, বিধান, রীতি, সুন্নাত, কর্মপদ্ধতি বা ইবাদত পদ্ধতিকে অবজ্ঞা বা উপহাস করা।

১৫.     কোন মানুষকে রাসুলুল্লাহ  এর শরীয়তের উর্ধ্বে মনে করা বা বিশ্বাস করা যে কোন কোন মানুষের জন্য শরীয়তের বিধান পালন করা জরুরী নয়। যেমন, মারিফাত অর্জন হলে, আল্লাহ্র প্রেম অর্জন হলে, বিশেষ মাকামে পৌঁছালে আর শরীয়ত পালন করা লাগবে না বলে মনে করা। এগুলো সবই কুফরী বিশ্বাস। অনুরূপভাবে নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, হালাল উপার্জন, পর্দা ইত্যাদি শরীয়তের যে সকল বিধান প্রকাশ্যে পালন করা ফরয তা কারো জন্য গোপনে পালন করা চলে বলে বিশ্বাস করাও কুফরী। এ ধরণের মত পোষণ কারী মূলত নিজেকে বা নিজের ধারণার উক্ত বুজুর্গকে রাসূলুল্লাহ  ও তাঁর মহান সাহাবীগণের চেয়েও বড় বুজুর্গ মনে করে। এ ব্যক্তি কাফির বলে গণ্য হবেন, যদিও তিনি ইসলামের  কোন কোন বিধান পালন করেন।

১৬.     যাদু, টোনা, বান ইত্যাদি ব্যবহার করা বা শিক্ষা করা।

১৭.     ইসলাম ধর্মকে জানতে বুঝতে আগ্রহ না থাকা। ইসলামকে জানা ও শিক্ষা করাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে না করা বা এ বিষয়ে  মনোযোগ না দেয়া।

১৮.     আল্লাহ্ ও তাঁর বান্দার মাঝখানে কোন মধ্যস্থ আছে, যার মধ্যস্থতা ছাড়া আল্লাহ্র কাছে ক্ষমালাভ, করুণালাভ বা মুক্তিলাভ সম্ভব নয় বলে বিশ্বাস করা শিরক।

দ্বিতীয় স্তম্ভ : সালাত

প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নর-নারীর উপর দৈনিক পাঁচ বার নির্ধারিত সময়ে নির্দিষ্ট কয়েক রাক‘আত (মোট ১৭ রাক‘আত) সালাত আদায় করা ফরয বা অবশ্য কর্তব্য। ঈমানের পরে মুসলিমের সবচেয়ে বড় করণীয় হলো নিয়মিত সালাত আদায় করা। কুরআন মজীদে প্রায় ৭০ স্থানে আল্লাহ্ সালাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন, যা থেকে আমরা এর গুরুত্ব বুঝতে পারি। অসংখ্য হাদীসে সালাতের গুরুত্ব বোঝান হয়েছে।

কুরআনের আলোকে জানা যায় যে সালাতই সকল সফলতার চাবিকাঠি। মহান আল্লাহ্ বলেছেন: “মুমিনগণ সফলকাম হয়েছেন, যারা অত্যন্ত বিনয় ও মনোযোগিতার সাথে সালাত আদায় করেন।”

অন্যত্র তিনি বলেন: “সে ব্যক্তিই সাফল্য  অর্জন করে, যে নিজেকে পবিত্র করে এবং নিজ প্রভুর নাম স্মরণ করে সালাত আদায় করে।”

নামায মুমিন ও কাফিরের মধ্যে মাপকাঠি। নামায ত্যাগ করলে মানুষ কাফিরদের দলভুক্ত হয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ  বলেছেন, “একজন মানুষ ও কুফরী-শিরকের মধ্যে রয়েছে নামায ত্যাগ করা।”  তিনি আরো বলেন: “যে ব্যক্তি নামায ছেড়ে দিল সে কাফির হয়ে গেল।”

কুরআন ও হাদীসের শিক্ষার আলোকে একথা নিশ্চিত যে, নামায মুসলিমের মূল পরিচয়। নামায ছাড়া মুসলিমের অস্তিত্ব কল্পনাতীত। নামায পরিত্যাগকারী কখনোই মুসলিম বলে গণ্য হতে পারেন না।

যে ব্যক্তি মনে করেন যে, নামায না পড়লেও ভাল মুসলমান থাকা যায় সে ব্যক্তি সন্দেহাতীতভাবে কাফির। আর যিনি সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করেন যে, নামায কাযা করলে কঠিনতম গোনাহ হয়, দিনরাত শুকরের গোশত ভক্ষণ করা, মদপান করা, রক্তপান করা ইত্যাদি সকল ভয়ঙ্কর গোনাহের চেয়েও বেশী গোনাহ হলো ইচ্ছাপূর্বক এক ওয়াক্ত নামায কাযা করা, সে ব্যক্তি যদি ইচ্ছা করে কোন নামায ত্যাগ করেন তাহলে তাকে মুসলমান বলে গণ্য করা হবে কিনা সে বিষয়ে মতভেদ আছে। সাহাবী-তাবেয়ীগণের যুগে এ প্রকারের মানুষকেও কাফির বা অমুসলিম বলে গণ্য করা হত। চার ইমামের মধ্যে ইমাম আহমদ ও আরো অনেক ফকীহ এ মত পোষণ করেন। এদের মতে মুসলিম কোন পাপকে পাপ জেনে পাপে লিপ্ত হলে কাফির বলে গণ্য হবে না। একমাত্র ব্যতিক্রম নামায ত্যাগ করা। যদি কেউ নামায ত্যাগ করাকে কঠিনতম পাপ জেনেও এক ওয়াক্ত ফরয নামায ইচ্ছা পূর্বক ত্যাগ করেন তাহলে তিনি কাফির ও মুরতাদ বলে গণ্য হবেন। ইমাম আবু হানীফা, ইমাম শাফিয়ী প্রমুখ ইমাম বলেন যে, এ দ্বিতীয় ব্যক্তিকে সরাসরি কাফির বলা যাবে না, তবে তাকে নামায ত্যাগ্যের শাস্তি স্বরূপ জেল ও মৃত্যুদণ্ড প্রদান করতে হবে।

আল্লাহ্র যিকিরের জন্য সালাত

আমরা এ পুস্তিকার ক্ষুদ্র পরিসরে সালাত বা নামাযের মূল নিয়ম পদ্ধতি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করব। তবে প্রথমে কয়েকটি মূল বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে :

প্রথম, মহান প্রতিপালম মালিক আল্লাহ্র স্মরণ ও তাঁর কাছে প্রার্থনার মাধ্যমে হৃদয়কে পবিত্র, পরিশুদ্ধ, আবিলতামুক্ত ও ভারমুক্ত করার জন্য সালাত বা নামায। সালাতের ফরয, ওয়াজিব, সুন্নাত ইত্যাদি অনেক বিধান রয়েছে। সবই সাধ্য অনুসারে। এজন্য সাধ্যের বাইরে হলে এগুলো রহিত ও মাফ হয়ে যায়, কিন্তু নামায মাফ হয় না।

প্রয়োজনে মুমিন ওযু ছাড়া, বসে, শুয়ে, অপবিত্র পোশাকে, উলঙ্গ অবস্থায়, যে কোন দিকে মুখ করে, হাঁটতে হাঁটতে, দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে, সুরা-কিরাত ছাড়া, শুধু সুবহানাল্লাহ্, আল্লাহু আকবার ইত্যাদি যিকিরের মাধ্যমে সালাত আদায় করতে পারবেন। কিন্তু কোন কারণেই তিনি সেচ্ছায় এক ওয়াক্ত নামাযও পরিত্যাগ বা কাযা করতে পারবেন না। যতক্ষণ হুশ আছে বা হৃদয়ের আল্লাহ্র স্মরণ করার ক্ষমতা আছে ততক্ষণ তার নামায রহিত বা মাফ হবে না। তাকে সময় মত তাঁর প্রভুর দরবারে হাজিরা দিয়ে তাকে স্মরণ করে হৃদয়কে প্রশান্ত করতেই হবে। নইলে তার হৃদয় ও আত্মা মৃত্যুবরণ করবে।

মানুষকে স্বভাবত সমাজের মধ্যে বাস করতে হয়। সারাদিনের কর্মময় জীবনে বিভিন্নমুখি আবেগ, ভালবাসা, ঘৃণা, হিংসা, রাগ, বিরাগ, ভয়, লোভ ইত্যাদির মধ্যে পড়তে হয়। এগুলো তার হৃদয়কে ভারাক্রান্ত, অসুস্থ ও কলুষিত করে তোলে। শুধুমাত্র মাঝে মাঝে আল্লাহ্র স্মরণ, তাঁর কাছে প্রার্থনার মাধ্যমে নিজের আবেগ, বেদনা ও আকুতি পেশ করার মাধ্যমে মানুষ এ ভয়ানক ভার থেকে নিজের হৃদয়কে মুক্ত করতে পারে।

দ্বিতীয়, এথেকে আমরা বুঝতে পারি যে, মহান আল্লাহ্র যিক্র বা স্মরণই হলো সালাতের মূল বিষয়। যিক্র বা স্মরণ হৃদয় দিয়ে করতে হয় এবং মুখ তাকে পূর্ণতা দেয়। এজন্য নামাযের মধ্যে মনোযোগ দিয়ে আল্লাহ্র স্মরণ করা ও নামাযের মধ্যে যা কিছু পাঠ করা হয় তার অর্থের দিকে লক্ষ্য রাখা ও অর্থের সাথে হৃদয়কে আলোড়িত করা অতীব প্রয়োজন। মহান আল্লাহ্ বলেছেন: “এবং আমার যিক্র বা স্মরণের জন্য সালাত কায়েম কর।”  হৃদয়হীন স্মরণহীন নামায মুনাফিকের নামায। মহান আল্লাহ্ মুনাফিকদের সম্পর্কে বলেন: “আর যখন তারা সালাতের জন্য দণ্ডায়মান হয় তখন অলসতাভরে দাঁড়ায়, মানুষকে দেখায় এবং খুব কমই আল্লাহ্র যিক্র (স্মরণ) করে।”

তৃতীয়, নামাযের অন্যান্য নিয়মাবলী পালনের ক্ষেত্রে ওযর বা অসুবিধা থাকলেও যিক্র বা স্মরণের ক্ষেত্রে কোন অসুবিধা কখনোই থাকে না। আমরা যে অবস্থায় থাকি না কেন, যেভাবেই নামায আদায় করি না কেন, যে যিক্র বা কিরাআতই পাঠ করি না কেন, নামাযের মধ্যে পঠিত দোয়া, যিক্র বা কিরাআতের অর্থের দিকে এ দিয়ে তাকে  আল্লাহ্র দিকে রুজু করে অন্তরের আবেগ দিয়ে নামায আদায়ের চেষ্টা করতে পারি। মনোযোগ নষ্ট হলে আবারো মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করতে পারি। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, আমরা নামাযের অন্যান্য প্রয়োজনীয়, অল্পপ্রয়োজনীয়, অপ্রয়োজনীয় অনেক বিষয়ে অতি সচেতন হলেও মনোযোগ, আবেগ ও ভক্তির বিষয়ে কোন আগ্রহ দেখাই না।

চতুর্থ, আরো দু:খজনক বিষয় হলো, অনেক ধার্মিক মুসলিম দ্রুত নামায আদায়ের জন্য অস্থির হয়ে পড়েন। ধীর ও শান্তভাবে পরিপূর্ণ আবেগ ও মনোযোগ সহকারে নামায আদায় করাই কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষা। মাত্র কয়েক রাক‘আত নামায এভাবে মাসনূন পদ্ধতিতে আদায় করলে হয়ত ১০ মিনিট সময় লাগবে। আর তাড়াহুড়ো করে আদায় করলে হয়ত ৩/৪ মিনিট কম লাগবে। আমরা সারাদিন গল্প করতে পারি। মসজিদ থেকে বেরিয়ে গল্প করে সময় নষ্ট করতে পারি, কিন্তু নামাযের মধ্যে তাড়াহুড়ো করি ও অস্থির হয়ে পড়ি। এ তাড়াহুড়া নামাযকে প্রাণহীন করে দেয়।

সালাতের মধ্যে ওয়াসওয়াসা বন্ধের দোয়া

সাহাবীগণ নামাযে মনোযোগের জন্য খুবই সচেষ্ট থাকতেন। এক সাহাবী তাকে বলেন, শয়তান আমার ও আমার নামাযের (মনোযোগ আনয়নের) মধ্যে বাধ সাধে এবং আমার কিরাআত এলোমেলো করে দেয়। তখন রাসূলুল্লাহ  বলেন : “সে শয়তানের নাম: খিনযিব। যখন এরূপ অনুভব করবে তখন: (আ‘ঊযু বিল্লা-হি মিনাশ শাইত্বা-নির রাজীম, অর্থাৎ: আমি আল্লাহ্র আশ্রয় গ্রহণ করছি বিতাড়িত শয়তান থেকে) পাঠ করে তোমার বাম দিকে থুথু ফেলবে। তিনবার করবে।” এতে মনোযোগ ফিরে আসে।

সালাতের পূর্বের ফরয কর্মসমূহ

সালাত শুরু করার পূর্বে প্রস্তুতিমূলকভাবে কিছু কাজ করতে হয়। এগুলো সালাতের পূর্বশর্ত। এগুলো পূর্ণ না হলে সালাত আদায় হবে না। তবে অক্ষমতার জন্য সবগুলোই রহিত হতে পারে। মুমিন যে শর্ত পূরণে অক্ষম হবেন সেটি বাদ দিয়েই সালাত আদায় করবেন। সালাতের শর্তগুলো হলো :

(১) ওয়াক্ত বা সময় হওয়া। পাঁচ ওয়াক্ত ফরয সালাতের জন্য সময় নির্ধারিত রয়েছে। এ বিষয়ে হাদীস ও ফিকহের গ্রন্থে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। মূলত সকল মুসলিম এ বিষয়ে কমবেশী জানেন। অতি সংক্ষেপে শুধুমাত্র সাধারণ ধারণা হিসাবে বলতে পারি :

ফজর বা প্রভাতের সালাত ভোর থেকে সূর্যোদয়ের পূর্ব পর্যন্ত প্রায় দেড় ঘণ্টা। যোহর বা দ্বিপ্রহরের সালাতের সময় ঠিক দ্বিপ্রহরের পর থেকে প্রায় ৪ ঘণ্টা। আসরের বা বিকালের সালাত সূর্যাস্তের প্রায় দুই ঘণ্টা পূর্ব থেকে সূর্যাস্তের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত। মাগরিবের বা সন্ধ্যার সালাতের সময় সূর্যাস্তের পর থেকে প্রায় সোয়া এক ঘন্টা। ইশা বা রাতের সালাতের সময় সূর্যাস্তের সোয়া একঘণ্টা পর থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত প্রায় ৪/৫ ঘণ্টা। তবে মধ্যরাতের পর থেকে ফজরের ওয়াক্তের পূর্ব পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ইশার সালাত আদায় করলে মাকরুহভাবে আদায় হবে। বিতরের সালাতের সময় ঈশার সালাত আদায়ের পর থেকে ফজরের ওয়াক্ত শুরুর পূর্ব পর্যন্ত।

নফল সালাত সাধারণভাবে সবসময় আদায় করা যায়। কিছু সময়ে সালাত আদায় করা নিষিদ্ধ। সূর্যোদয়, ঠিক দ্বিপ্রহর ও সূর্যাস্তের সময় সালাত আদায় নিষিদ্ধ। এছাড়া ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পরে সূর্যোদয় পর্যন্ত ফজরের দুই রাক‘আত সুন্নাত সালাত ব্যতীত অন্য কোন সুন্নাত-নফল সালাত আদায় করা মাকরুহ। আসরের ফরয সালাত আদায়ের পরে সুর্যাস্ত পর্যন্ত কোন নফল সালাত আদায় করা মাকরুহ।

আযান, ইকামত, আযানের জাওয়াব, দরুদ পাঠ ও দোয়া

সালাতের ওয়াক্ত শুরু হলে আযান দেয়া হয়। আযান দেয়া অত্যন্ত সাওয়াবের কাজ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে, আযানের শব্দের সাথে মুয়াযযিনকে ক্ষমা করে দেয়া হবে এবং জড়বস্তু, প্রাণী, জীবজানোয়ার বা মানুষ যারাই আযানের শব্দ শুনতে পাবে সকলেই তাঁর জন্য কেয়ামতে সাক্ষ্য প্রদান করবে।

আমরা সকলেই আযান দেয়ার সুযোগ পাই না। আমাদের জন্যও আল্লাহ্ সাওয়াব অর্জনের পথ করে দিয়েছেন। তা হলো আযানের জওয়াব দেয়া, আযানের পরে দরুদ শরীফ পাঠ করা ও রাসূলুল্লাহ  এর জন্য ওসীলার দোয়া করা।

আযানের জওয়াব অর্থ মুয়াযযিনের সাথে সাথে অর্থের প্রতি দ্ঢ় আস্থা ও বিশ্বাস নিয়ে তাঁর কথাগুলো বলা। মুয়াযযিন আযানের মধ্যে যা যা বলবেন মুমিন শ্রোতার তাই বলবেন। শুধুমাত্র একটি ব্যতিক্রম: তা হলো, মুয়াযযিন ‘হাইয়া আলাস সালাহ’ ও ‘হাইয়া আলাল ফালাহ’ বললে, শ্রোতা ‘লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ বলবেন। রাসূলুল্লাহ  এভাবে আযানের জওয়াবের নির্দেশ দিয়েছে এবং বলেছেন, মুয়াযযিন যা বলল, তা যদি কেউ দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে বলে তাহলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

আযানের পরে দরুদ (সালাত) পাঠ করতে ও ওসীলার দোয়া করতে নির্দেশ ও উৎসাহ দিয়েছেন রাসূলুল্লাহ । তিনি বলেছেন : “যখন তোমরা মুয়াযযিনকে আযান দিতে শুনবে, তখন সে যেরূপ বলে তদ্রƒপ বলবে। তারপর আমার উপর সালাত পাঠ করবে ; কারণ যে ব্যক্তি আমার উপর একবার সালাত পাঠ করবে, আল্লাহ্ তাকে দশবার রহমত প্রদান করবেন। তারপর আমার জন্য ‘ওসীলা’ চাইবে ; কারণ ‘ওসীলা’ হলো জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থান, আল্লাহ্র একজন মাত্র বান্দাই এ মর্যাদা লাভ করবেন এবং আমি আশা করি আমি হব সেই বান্দা। যে ব্যক্তি আমার জন্য ‘ওসীলা’ চাইবে তাঁর জন্য শাফায়াত প্রাপ্য হয়ে যাবে।”

‘ওসীলা’ শব্দের অর্থ হলোÑনৈকট্য। জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তর যা আল্লাহ্র আরশের সবচেয়ে কাছেবর্তী তাকে ‘ওসীলা’ বলা হয়। এ স্থানটি আল্লাহ্র একজন বান্দার জন্যই নির্ধারিত, তিনি হলেন নবীয়ে মুসতাফা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ । অন্যান্য হাদীসে ‘ওসীলা’ প্রার্থনার পদ্ধতি ও বাক্য তিনি শিখিয়ে দিয়েছেন। দোয়াটি নি¤œরূপ :

اللَّهُمَّ رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ وَالصَّلاةِ الْقَائِمَةِ آتِ مُحَمَّدًا الْوَسِيلَةَ وَالْفَضِيلَةَ وَابْعَثْهُ مَقَامًا مَحْمُودًا الَّذِي وَعَدْتَهُ

উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা, রাব্বা হা-যিহিদ দা‘অ্ওয়াতিত তা-ম্মাতি ওয়াস স্বালা-তিল ক্বা-য়িমাতি, আ-তি মু‘হাম্মাদান আল-ওয়াসীলাতা ওয়াল ফাদীলাতা, ওয়াব‘আসহু মাকা-মাম মা‘হমুদানিল্লাযী ও‘য়াদতাহু।

অর্থ: “হে আল্লাহ্, এ পরিপূর্ণ আহ্বান এবং আগত সালাতের প্রভু, আপনি প্রদান করুন মুহাম্মাদকে () ওসীলা (নৈকট্য) এবং মহা মর্যাদা এবং তাকে উঠান সম্মানিত অবস্থানে, যা আপনি তাকে ওয়াদা করেছেন।”

(২) শরীর, পোশাক ও স্থানকে পবিত্র করাঃ মল, মূত্র, রক্ত ইত্যাদি সকল প্রকার নাপাকি থেকে শরীয়ত সম্মতভাবে ধৌত করে এগুলোকে পরিষ্কার ও পবিত্র করতে হবে।

(৩) কিবলামুখি হওয়াঃ মুসলিম উম্মাহর কিবলাহ পবিত্র কা’বাঘর। কাবাঘর দেখতে পেলে ঠিক তাকে সামনে রেখে দাঁড়াতে হবে। নইলে যে দিকে কা’বা সে দিকে মুখ করে দাঁড়াতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ পশ্চিম দিকে মুখ করে দাঁড়াবেন। কোথাও সঠিক ভাবে কিবলা চিনতে অসুবিধা হলে কাউকে জিজ্ঞাসা করে বা নিজে দেখে শুনে অনুমান করে সেভাবে নামায পড়তে হবে। চেষ্টার পরেও যদি ভুল হয় তাহলে অসুবিধা নেই। তবে সালাতের মধ্যে যদি ভুল ধরা পড়ে তাহলে নামায রত অবস্থাতেই সঠিক দিকে ঘুরে যেতে হবে। গাড়ী, ফেরী, নৌকা, বিমান ইত্যাদি যানবাহনে সালাত আদায়ের সময় যদি যানবাহন ঘুরে যায় তাহলে মুসল্লীকে সালাতরত অবস্থাতেই কিবলার দিকে ঘুরে যেতে হবে। ক্ষমতা থাকা সত্বেও না ঘুরলে সালাত আদায় হবে না। যানবাহনে চলা অবস্থায় নফল সালাত বসে কিবলা ছাড়া অন্য দিকে মুখ করে আদায় করা যায়।

(৪) নিয়্যাত বা মনের ইচ্ছা ও উদ্দেশ্য বিশুদ্ধ হওয়াঃ নিয়্যাত হলো মানুষের অন্তরের অভ্যন্তরীণ সংকল্প বা ইচ্ছা, যা মানুষকে উক্ত কর্মে উদ্বুদ্ধ বা অনুপ্রাণিত করেছে। নিয়্যাত, উদ্দেশ্য বা সংকল্প করতে হয়, বলতে, পড়তে বা উচ্চারণ করতে হয় না।

সালাতের নিয়্যত করার অর্থ শুধু আল্লাহ্র সন্তুষ্টির জন্য সালাত আদায়ের ইচ্ছা ও কোন ওয়াক্তের কত রাক‘আত সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়েছেন তা মনের মধ্যে জাগরুক থাকা। প্রকৃত পক্ষে মুসল্লী যখন সালাতের প্রস্তুতি নেন তখনই তাঁর নিয়্যাত স্থির হয়ে যায়। মুখে নিয়্যাত উচ্চারণ করা খেলাফে সুন্নাত কাজ। রাসূলুল্লাহ () কখনো জীবনে একটিবারের জন্যও ওযু, গোসল, নামায, রোযা ইত্যাদি কোনো ইবাদতের জন্য কোনো প্রকার নিয়্যাত মুখে বলেননি। তাঁর সাহাবীগণ, তাবেয়ীগণ, ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-সহ চার ইমাম বা অন্য কোনো ইমাম ও ফকীহ কখনো কোনো ইবাদতের নিয়্যাত মুখে বলেননি বা বলতে কাউকে নির্দেশ দেননি। নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, ওযু, গোসল, ইত্যাদি ইবাদতের জন্য “নাওয়াইতুআন..” ইত্যাদি শব্দ দিয়ে যত নিয়্যাত আমাদের দেশে প্রচলিত সবই অনেক পরের যুগে বানানো হয়েছে। কেউ বানিয়েছেন আর কেউ প্রতিবাদ করেছেন। কেউ মুস্তাহাব বলেছেন আর কেউ মাকরুহ বলেছেন। সর্বাবস্থায় তা সুন্নাত বিরোধী। এগুলোর পিছনে সময় নষ্ট করবেন না।

(৫) ওযু-গোসলের মাধ্যমে পবিত্র হওয়াঃ বাহ্যিক নাপাক বস্তু থেকে দেহকে পবিত্র করা ছাড়াও সালাতের জন্য দ্বিতীয় প্রকার পবিত্রতা হলো ওযু, গোসল বা তায়াম্মুমের মাধ্যমে নিজেকে পবিত্র করা।

ওজুর বিধান

১. মনে মনে পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যমে আল্লাহ্র ইবাদত করার উদ্দেশ্য বা নিয়্যাত করুন।

২. মিসওয়াক, ব্রাশ বা অনুরূপ কিছু দ্বারা দাঁত ও মুখের অভ্যন্তর পরিস্কার করুন।

৩. “বিসমিল্লাহ” বা “আল্লাহ্র নামে শুরু করছি” বলুন।

৪. দুই হাতের কব্জি পর্যন্ত তিন বার ধৌত করুন।

৫. ডান হাতে মুখের মধ্যে পানি দিয়ে তিন বার ভালভাবে কুলি করুন।

৬. ডান হাত দিয়ে নাকের মধ্যে পানি দিন এবং পানি নাকের মধ্যে টেনে নিয়ে বাম হাতের দ্বারা ভালভাবে নাকের অভ্যন্তর পরিস্কার করুন এবং নাক ঝেড়ে ফেলুন।

৭. কপালের চুলের গোড়া থেকে থুতনির শেষ প্রান্ত পর্যন্ত এবং এক কান থেকে অপর কান পর্যন্ত সম্পূর্ণ মুখমণ্ডল ভালভাবে তিনবার ধুয়ে নিন। দাড়ির ভিতরে আঙুল দিয়ে পানি প্রবেশ করিয়ে নাড়াচাড়া করুন।

৮. কনুই সহ ডান হাত তিন বার ভালভাবে ধৌত করুন। বাম হাতের আঙুল ডান হাতের আঙুলের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে নাড়াচাড়া করুন।

৯. উপরে বর্ণিত একই নিয়মে কনুই সহ বাম হাত তিন বার ধুয়ে নিন।

১০. ভিজে হাত দিয়ে সম্পুর্ণ মাথা একবার মুছে নিন। দুহাত দিয়ে মাথার সম্মুখভাগ থেকে মুছতে শুরু করুন। একবারে ঘাড় পর্যন্ত মোছার পর আবার হাতদু’টি আগের স্থানে ফিরিয়ে আনুন। হাতের ভিজে আঙুল দিয়ে কানের ভিতরে ও বাইরে মুছে নিন।

১১. পায়ের গোড়ালির উপরের উঁচু হাড় বা টাখনু সহ ডান পা তিনবার ধুয়ে নিন। পায়ের আঙুলের মধ্যে হাতের আঙুল প্রবেশ করিয়ে নাড়াচাড়া করে আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে ভালভাবে পানি যেতে সাহায্য করুন।

১২. উপরের একই নিয়মে বাম পা তিনবার ধুয়ে নিন।

১৩. ওজুর পরে বলুন:

أَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي مِنَ التَّوَّابِينَ وَاجْعَلْنِي مِنَ الْمُتَطَهِّرِينَ

উচ্চারণ : আশহাদু আল্ লা- ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়া‘হদাহু লা- শারীকা লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মু‘হাম্মাদান ‘আবদুহু ওয়া রাসূলুহু। আল্লা-হুম্মাজ্ ‘আলনী মিনাত তারয়া-বীন ওয়াজ্ ‘আলনী মিনাল মুতাতাহ্ হিরীন।

অর্থ : “আমি সাক্ষ্য প্রদান করছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই [তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক নেই। এবং সাক্ষ্য প্রদান করছি যে, মুহাম্মাদ () তাঁর বান্দা ও রাসূল। “হে আল্লাহ্ আপনি আমাকে তাওবাকারীগণের অন্তর্ভুক্ত করুন এবং যারা গুরুত্ব ও পূর্ণতা সহকারে পবিত্রতা অর্জন করেন আমাকে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করুন।”

রাসূলুল্লাহ  বলেছেন, “যদি কেউ সুন্দরভাবে এবং পরিপূর্ণভাবে ওযু করে তারপর উক্ত যিক্র পাঠ করে তাহলে জান্নাতের আটটি দরজাই তাঁর জন্য খুলে দেয়া হবে, সে যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা করবে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।”

ওজু নষ্ট  হওয়ার কারণ ও ওজু বিষয়ক ভুলভ্রান্তি

একবার ওযু করলে সে অযু নষ্ট না হওয়া পর্যন্ত একাধিক সালাত আদায় করা যায়। নি¤েœর কোন একটি কাজ করলে ওযু ভেঙে যাবে বা নষ্ট হয়ে যাবে এবং সালাত আদায়ের জন্য নতুন করে ওযু করা দরকার হবে:

১. পেশাব বা পায়খানার পথ দিয়ে কোন কিছু বেরিয়ে আসা। এ দু’স্থান থেকে পেশাব, পায়খানা, বীর্য, বায়ু বা অন্য যা কিছুই বের-হোক তাতে ওযু ভেঙে যাবে।

২. গভীর ঘুম যাতে মানুষ নিজের সম্পর্কে স্বাভাবিক অনুভূতি হারিয়ে ফেলে। সাধারণভাবে শুয়ে বা হেলান দিয়ে ঘুমালে ওযু নষ্ট হয়। বসে বসে তন্দ্রাতে ওযু নষ্ট হয় না।

৩. জ্ঞান হারান। পাগলামি, অসুস্থতা, মাদকতা বা অন্য কারণে জ্ঞান হারালে ওযু ভেঙে যাবে।

৪. ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করা। ঈমান নষ্ট হয় এএই কোন কথা বললে, বিশ্বাস করলে বা ইসলামের  মৌলিক কোন বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করলে সে ইসলাম ত্যাগী বলে গণ্য হবে এবং তার ওযু নষ্ট হয়ে যাবে। এমনতাবস্থায় তাকে পুনরায় ইসলাম গ্রহণ করতে হবে এবং সালাত ইত্যাদির প্রয়োজনে নতুন করে ওযু করতে হবে।

৫. রক্তপাত হলে। মুখভরে বমি করলে।

সন্দেহ বা ওয়াসওয়াসার জন্য ওযু যাবে না। উপরের কোন কারণ ঘটেছে বলে নিশ্চিত হলেই পুনরায় ওযু করতে হবে।

অনেক মুসলিম অজ্ঞতার কারণে ওজুর সময় এমন কিছু কাজ করেন যা রাসুলুল্লাহ  করেন নি বা তাঁর সুন্নাতের খেলাফ। এতে মুমিন সুন্নাত অনুসারে আমলের সাওয়াব থেকে বঞ্চিত হন বা গোনাহগার হন। যেমন:

১. মুখে নিয়্যাত উচ্চারণ করা। নিয়্যাত অর্থ ইচ্ছা। মনের মধ্যে ইচ্ছা পোষণ করতে হয়। মুখে উচ্চারণ অর্থহীন ও সুন্নাতের খেলাফ।

২. অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করা বা পানির অপচয় করা। রাসুলুল্লাহ () এক সেরের চেয়ে কম পানি দিয়ে ওজু করতেন।

৩. ওজুর কোন স্থান শুকনো রয়েছে কিনা এ ব্যাপারে সতর্ক না হওয়া।

৪. ওয়াসওসার কারণে বারবার ওজু করা বা ওজুর সময় তিনবারের বেশী কোন অঙ্গ ধোয়া।

গোসলের বিধান

বির্যপাত, দাম্পত্য মিলন, মহিলাদের নিয়মিত অপবিত্রতা ও সন্তান প্রসব পরবর্তী অপবিত্রতার জন্য গোসল করা ফরয হয়। গোসল অর্থ সম্পূর্ণ শরীর পরিপূর্ণরূপে ধৌত করা। রাসূলুল্লাহ ()-এর গোসলের পদ্ধতি নিুরূপ:

মনে মনে আল্লাহ্র নির্দেশানুসারে পবিত্রতা অর্জনের জন্য গোসলের নিয়্যাত করুন। তারপর বিসমিল্লাহ বলে দুইহাত কব্জি পর্যন্ত ধৌত করুন। শরীরের কোন স্থানে নাপাকী লেগে থাকলে বা থাকার অনুভূতি হলে তা ভাল করে ধুয়ে ফেলুন। তারপর মাসনূন পদ্ধতিতে ওজু করুন। ওযুর পরে মাথায়, ডানকাঁধে ও বামকাঁধে পানি ঢালুন ও সমস্ত শরীরে ভালভাবে ঢেলে ধুয়ে ফেলুন।

তায়াম্মুমের বিধান

পানি অবর্তমানে বা পানি ব্যবহারে ক্ষতি হলে পবিত্রতার জন্য মাটি ব্যবহার করে তায়াম্মুম করতে হয়। যদি মুসল্লীর কাছে ওযুর পানি না থাকে বা পানির দাম খুব বেশী হয়, বা পানি সংগ্রহ করতে গেলে বিপদের ভয় থাকে অথবা পানি ব্যবহার করলে রোগব্যধি হওয়ার বা বৃদ্ধি পাওয়ার নিশ্চিত ভয় থাকে তাহলে ওযু ও গোসল উভয়ের পরিবর্তে তায়াম্মুম করতে হবে।

সংক্ষেপে তায়াম্মুম করার নিয়ম হলো মনেমনে নিয়েত করে বিসমিল্লাহ বলে দুই হাত মাটি, পাথর, ধুলা বা মাটি জাতীয় কিছুর উপর রাখতে হবে। তারপর দুই হাত দিয়ে সমস্ত মুখে হাত বুলাতে হবে। দ্বিতীয়বার দুই হাতে মাটিতে রেখে তারপর দুই হাত কনুই পর্যন্ত মুছতে হবে। হাদীস ও ফিকহের গ্রন্থে এবিষয়ক বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।

(৬) সতর আবৃত করা

“সতর” বলতে বুঝানো হয় “শরীরের গোপনাংশ (ঢ়ৎধরাধঃব ঢ়ধৎঃং), বা শরীরের যে অংশ আবৃত করা মুসলিম নারী পুরুষের জন্য ফরয বা অত্যাবশ্যকীয়। ইসলামের  নিদের্শনা অনুসারে মুসলিম নরনারীর জন্য শরীরের বিশেষ কিছু অংশ সদা সর্বদা অন্য মানুষের দৃষ্টি থেকে আবৃত করে রাখা অত্যাবশ্যক। এ অংশগুলো সালাতের মধ্যে আবৃত করে রাখা ফরয। এছাড়া আরো কিছু অংশ আবৃত করা উত্তম। পুরুষ ও নারীদের জন্য এবিষয়ে পৃথক বিধান রয়েছে।

পুরুষদের জন্য সদাসর্বদা নাভী থেকে হাঁটু পর্যন্ত শরীর অন্য মানুষের দৃষ্টি থেকে আবৃত করে রাখা ফরয। এ অংশটুকু স্ত্রী ছাড়া অন্য কাউকে দেখানো হারাম। সালাতের মধ্যে এ অংশটুকু আবৃত করে রাখা ফরয। কেউ দেখুক বা না দেখুক শরীরের এ অংশের মধ্যে কোন স্থান অনাবৃত হলে নামায নষ্ট হয়ে যাবে। তবে কাপড় না থাকলে উলঙ্গ হয়েই সালাত আদায় করতে হবে। এছাড়া কাঁধ ও শরীরের উপরিভাগ আবৃত করা সুন্নাত। মুমিনের উচিত মহান প্রভুর সামনে দাঁড়ানোর জন্য মর্যাদাময়, মহান আল্লাহ্ ও তাঁর মহান রাসূলের () পছন্দনীয়, পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি পোষাক পরিধান করা।

মহিলাদের পোষাকের মূলত ৪টি স্তর রয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোন পোশাকের বাধ্যবাধকতা নেই। অন্য মুসলিম মহিলাদের দৃষ্টি থেকে নাভী থেকে হাঁটু পর্যন্ত স্থান আবৃত করে রাখা মুসলিম মহিলার জন্য ফরয। পিতা, আপন চাচা, মামা, ভাতিজা, ভাগিনেয়, শ্বশুর প্রমুখ মাহরাম (বিবাহ সম্ভব নয়) আত্মীয়দের সামনে মোটামুটি কাঁধ থেকে হাঁটু পর্যন্ত শরীর আবৃত করতে হবে। বাকী সকল পুরুষের দৃষ্টি থেকে মুসলিম মহিলা মাথার চুলসহ মাথা ও পুরো শরীর আবৃত করে রাখবেন। এগুলো তাদের সামনে অনাবৃত করা হারাম ও কঠিন গোনাহের কারণ। সালাতের মধ্যেও এ অংশটুকু আবৃত করতে হবে। শুধুমাত্র মুখমণ্ডল ও কব্জি পর্যন্ত দুই হাত বাদে পুরো শরীর আবৃত করতে হবে।

সালাতের মধ্যে যদি কোন মহিলার কান, চুল, মাথা, গলা, কাঁধ, পেট, পায়ের নলা ইত্যাদি অনাবৃত হয়ে যায় তাহলে সালাত নষ্ট হয়ে যাবে। সাধারণভাবে শাড়ী মুসলিম মহিলার জন্য অসুবিধাজনক পোশাক। ঢিলেঢালা পুরো হাতা সেলোয়ার-কামিজ বা ম্যাক্সি মুসলিম মহিলার জন্য উত্তম ও আদর্শ পোশাক। সর্বাবস্থায় সাধারণ পোশাকের উপর অতিরিক্ত বড় চাদর দিয়ে ভালভাবে নিজেকে আবৃত করে সালাত আদায় করতে হবে। মাথার চুল, কান গলা ইত্যাদি ভালভাবে আবৃত রাখার দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

সালাত আদায়ের নিয়ম

কুরআন-হাদীসের আলোকে আমরা জানি যে, আল্লাহ্কে খুশি করার জন্য কোন ইবাদত করা হলে তা কবুল হওয়ার জন্য কয়েকটি শর্ত রয়েছে। সেগুলোর অন্যতম হলো যে, উক্ত ইবাদত রাসুলুল্লাহ  এর সুন্নাত বা শিক্ষা ও পদ্ধতি অনুসারে পালন করতে হবে। তাঁর শিক্ষার বাইরে ইবাদত করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। কাজেই আমাদেরকে রাসুলুল্লাহ () এর শেখান পদ্ধতিতে সালাত আদায় করতে হবে। তিনি বলেছেন: “আমাকে  যেভাবে সালাত আদায় করতে দেখ, সেভাবে তোমরা সালাত আদায় করবে।”  হাদীসের আলোকে মুসলিম উম্মাহর প্রাজ্ঞ ইমাম ও ফকীহগণ সালাত আদায়ের নিয়মাবলী বিস্তারিত লিপিবদ্ধ করেছেন। এখানে সংক্ষেপে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো আলোচনা করছি। কয়েকটি বিষয়ে হাদীসের বর্ণনা বিভিন্ন প্রকারের হওয়ার কারণে ফকীহগণ মতভেদ করেছেন। এ প্রকারের বিষয় আমি এড়িয়ে গিয়েছি। এগুলো মূলত মুসতাহাব বিষয়ক। এগুলোর মধ্যে কোন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নেই। এখানে যা লেখা হয়েছে সেভাবে সালাত আদায় করলে আমরা আশা করতে পারব যে, রাসূলুল্লাহ -এর অনুসরণে আমরা সালাত আদায় করতে পেরেছি এবং মহান আল্লাহ্ দয়া করে আমাদের এ প্রচেষ্টা কবুল করবেন। আগ্রহী পাঠককে এ বিষয়ক বৃহৎ গ্রন্থাবলী পাঠের অনুরোধ করছি।

১. সালাত শুরু করার আগে ওজু, গোসল বা তায়াম্মুম করে পবিত্র হয়ে, পবিত্র কাপড় পরে সতর আবৃত করে, বিনম্র ও শান্ত মনে কিবলামুখী হয়ে নামাযে দাঁড়ান।

২. সামনে সুতরা বা আড়াল রাখুন। দেয়াল, খুঁটি, পিলার বা যে কোন কিছুকে সামনে আড়াল হিসাবে রাখুন। না হলে অন্তত একহাত বা আধাহাত লম্বা সরু কোন লাঠি, কাঠ ইত্যাদি সামনে রাখলেও সুতরার সুন্নাত আদায় হবে। সুতরার যথাসম্ভব কাছে  দাঁড়াতে হবে, যেন সাজদা করলে সুতরার নিকটে হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুতরার তিনহাতের মধ্যে দাঁড়াতেন।

রাসূলুল্লাহ   বলেছেন: “আড়াল বা সুতরা ছাড়া সালাত আদায় করবে না, আর কাউকে তোমার সামনে দিয়ে (সুতরার ভিতর দিয়ে ) যেতে দিবে না। যদি সে জোর করে তাহলে তার সঙ্গে মারামারি করবে, কারণ তার সাথে শয়তান রয়েছে।”  তিনি আরো বলেছেন : “যখন তোমরা সালাত আদায় করবে, তখন সামনে আড়াল রাখবে এবং আড়ালের কাছাকাছি দাঁড়াবে।”

ইসলামের  প্রথম যুগে সুতরার এত গুরুত্ব প্রদান করা হতো যে, প্রয়োজনে মাথার টুপি খুলে সুতরা বানিয়ে নামায আদায় করা হতো। ইবনু আব্বাস (রা:) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে বলা হয়েছে, “রাসূলুল্লাহ  অনেক সময় নামায আদায়ের জন্য মাথা থেকে টুপি খুলে টুপিটাকে নিজের সামনে সুতরা বা আড়াল হিসাবে ব্যবহার করতেন।”  প্রখ্যাত তাবে-তাবেয়ী সুফিয়ান ইবনু উয়াইনাহ (১৯৮হি:) বলেন, “আমি শারীক ইবনু আবদিল্লাহ ইবনু আবী নামিরকে (১৪০হি:) দেখলাম, তিনি একটি জানাযায় উপস্থিত হয়ে আসরের সময় হলে আমাদেরকে নিয়ে জামাতে আসরের নামায আদায় করেন। তখন তিনি তাঁর টুপিটি তার সামনে রেখে (টুপিটিকে সুতরা বানিয়ে) নামায আদায় করলেন।”

৩. মনে মনে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি ও সাওয়াবের জন্য সালাত আদায়ের নিয়েত করুন।

৪. তাকবীর (আল্লাহ্ আকবার) বলে দু হাত কাঁধ পর্যন্ত অথবা কান পর্যন্ত  উঠান। এসময়ে হাতের আঙুলগুলো স্বাভাবিকভাবে সোজা থাকবে। তাকে বারে মিলিত থাকবে না, আবার বিচ্ছিন্নও থাকবে না। হাতের তালু কিবলার দিকে থাকবে।

৫. বাঁ হাতের পিঠ, কব্জি ও বাজুর উপর ডান হাত রাখুন, অথবা ডান হাত দিয়ে বাঁ হাত কব্জা করে ধরুন। এভাবে হাতদু’টি নাভী বা পেটের উপরে রাখুন।

৬. নামাজের মধ্যে বিনয় ও মনোযোগের সাথে মাথা নিচু করে সিজদার স্থানে দৃষ্টি রাখুন। এদিক-সেদিক  দৃষ্টিপাত করবেন না, উপরের দিকে তাকাবেন না। হাদীসে বলা হয়েছে, “যারা নামায রত অবস্থায় উপর দিকে তাকায়, তাদের অবশ্যই তা থেকে বিরত হতে হবে, অন্যথায় তাদের দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হতে পারে।

৭. তাকবীরে তাহরীমার পরে নামায শুরুর দোয়া বা সানা পাঠ করুন। এ সময়ে রাসূলুল্লাহ  বিভিন্ন আবেগময় মর্মস্পর্শী দোয়া ও যিক্র পাঠ করতেন। এগুলোর মধ্য থেকে একটি মাত্র দোয়া আমরা সানা হিসাবে পাঠ করি। হানাফী মাযহাবের ইমামগণ ফরয নামাযের ক্ষেত্রে এ ‘সানা’ ও দ্বিতীয় আরেকটি দোয়া পাঠ করতে বলেছেন। সুন্নাত-নফল নামাযের ক্ষেত্রে সকল মাসনূন ‘সানা’ পাঠ করা যায়। এ সকল মাসনূন সানা বা শুরুর দোয়া অর্থসহ মুখস্থ করে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দোয়া পাঠ করলে নামাযের মনোযোগ, বিনয় ও আন্তরিকতা বহাল থাকে। নইলে মুসল্লী অভ্যস্তভাবে খেয়াল না করেই কখন সানা পড়ে শেষ করেন তা টেরও পান না। এখানে সানার তিনটি দোয়া লিখছি।

সানা’র দোয়া- ১

سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَتَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَالَى جَدُّكَ وَلا إِلَهَ غَيْرُكَ

উচ্চারণ: সুব‘হা-নাকাল্লা-হুম্মা, ওয়া বি‘হামদিকা, ওয়া তাবা-রাকাসমুকা, ওয়া তা‘আ-লা- জাদ্দুকা, ওয়া লা- ইলা-হা গ¦াইরুকা।

অর্থ:  “আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি, হে আল্লাহ্, এবং আপনার প্রশংসাসহ। আর মহাবরকতময় আপনার নাম, মহা-উন্নত আপনার মর্যাদা। আর কোনো মা’বুদ নেই আপনি ছাড়া।”

সানা’র দোয়া- ২

وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضَ حَنِيفًا وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ إِنَّ صَلاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ لا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ اللَّهُمَّ أَنْتَ الْمَلِكُ لا إِلَهَ إِلاَّ أَنْتَ أَنْتَ رَبِّي وَأَنَا عَبْدُكَ ظَلَمْتُ نَفْسِي وَاعْتَرَفْتُ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي ذُنُوبِي جَمِيعًا إِنَّهُ لا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلا أَنْتَ وَاهْدِنِي لأَحْسَنِ الأَخْلاقِ لا يَهْدِي لأَحْسَنِهَا إِلا أَنْتَ وَاصْرِفْ عَنِّي سَيِّئَهَا لا يَصْرِفُ عَنِّي سَيِّئَهَا إِلاَّ أَنْتَ لَبَّيْكَ وَسَعْدَيْكَ وَالْخَيْرُ كُلُّهُ فِي يَدَيْكَ وَالشَّرُّ لَيْسَ إِلَيْكَ أَنَا بِكَ وَإِلَيْكَ تَبَارَكْتَ وَتَعَالَيْتَ أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوبُ إِلَيْكَ

উচ্চারণ :  ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাযী ফাত্বারাস সামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদা হানীফাও ওয়া মা- আনা মিনাল মুশরিকীন। ইন্না স্বালা-তী ওয়া নুসূকী ওয়া মাহইয়া-ইয়া ওয়া মামা-তী লিল্লা-হি রাব্বিল ‘আলামীন। লা- শারীকা লাহু, ওয়া বিযা-লিকা উমিরতু, ওয়া আনা মিনাল মুসলিমীন। আল্লা-হুম্মা, আনতা রাব্বী, ওয়া আনা ‘আবদুকা। যালামতু নাফসী, ওয়া‘অ-তারাফতু বিযানবী, ফাগ¦ফিরলী যুনূবী জামিয়ান; ইন্নাহু লা- ইয়াগ¦ফিরুয যুনূবা ইল্লা-আনতা। ওয়াহ্দিনী লিআহসানিল আখলা-ক; লা- ইয়াহ্দী লিআহসানিহা- ইল্লা- আনতা। ওয়াসরিফ ‘আন্নী সাইয়িআহা-; লা- ইয়াসরিফু ‘আন্নী সাইয়িআহা- ইল্লা- আনতা। লাব্বাইকা ওয়া সা‘অ্দাইকা। ওয়াল খাইরু কুল্লহু ফী ইয়াদাইকা। ওয়াশ-শাররু লাইসা ইলাইকা। আনা বিকা ওয়া ইলাইকা। তাবা-রাকতা ওয়া তা‘আ-লাইতা। আস্তাগ¦ফিরুকা ওয়া আতূবু ইলাইকা।

অর্থ : “আমি সুদৃঢ়ভাবে আমার মুখমণ্ডল নিবদ্ধ করেছি তাঁর দিকে যিনি সৃষ্টি করেছেন আসমান ও জমিন এবং আমি শিরকে লিপ্ত মানুষদের অন্তর্ভুক্ত নই। নিশ্চয় আমার সালাত, আমার উৎসর্গ উপাসনা, আমার জীবন ও আমার মরণ আল্লাহ্র জন্যই, তিনি মহাবিশ্বের প্রতিপালক প্রভু। তাঁর কোনো শরীক নেই। এবং এ জন্যই আমাকে আদেশ করা হয়েছে। এবং আমি আত্মসমর্পণকারীগণের অন্তর্ভুক্ত। হে আল্লাহ্, আপনিই সম্রাট। আপনি ছাড়া কোনো মা’বুদ নেই। আপনি আমার প্রভু এবং আমি আপনার দাস। আমি অত্যাচার করেছি আমার আত্মার উপর এবং আমি আমার পাপ স্বীকার করছি। অতএব আপনি আমার সকল পাপ ক্ষমা করে দিন। নিশ্চয় আপনি ছাড়া কেউ পাপ ক্ষমা করতে পারে না। আর আপনি পরিচালিত করুন আমাকে উত্তম আচরণ ও ব্যবহারের পথে, আপনি ছাড়া কেউ উত্তম আচরণের পথে পরিচালিত করতে পারে না। আর আপনি আমাকে খারাপ ব্যবহার ও আচরণ থেকে দূরে রাখুন, আপনি ছাড়া আর কেউ খারাপ আচরণ ও ব্যবহার থেকে দূরে রাখতে পারে না। আপনার ডাকে আমি সাড়া প্রদান করছি, আমি সানন্দে সাড়া প্রদান করছি। সকল কল্যাণ আপনার হাতে এবং অকল্যাণ আপনার দিকে নয়। আমি আপনারই সাহায্যে ও আপনারই দিকে। বরকতময় আপনি এবং সুমহান আপনি। আমি আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং আপনারই দিকে প্রত্যাবর্তন (তাওবা) করছি।”

হানাফী মযহাবের ইমাম ও ফকীহগণ ফরয নামাযের সানা এ দু’টির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উত্তম বলে মতপ্রকাশ করেছেন। তবে হানাফী ফিকহের অধিকাংশ গ্রন্থে “আনা মিনাল মুসলিমীন” পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে। ইমাম আবু ইউসূফ (রহ.) দু’টি সানা একত্রে প্রত্যেক নামাযের শুরুতে পাঠ করা উত্তম ও মুসতাহাব বলে উল্লেখ করেছেন।

জায়নামাযের দোয়া সুন্নাতের খেলাফ

আমাদের দেশে দ্বিতীয় সানাটি জায়নামাযের দোয়া বলে অতি প্রচলিত। নামায শুরু করার আগে নামাযে বা জায়নামাযে দাঁড়িয়ে এ দোয়াটি পাঠ করার রীতি সুন্নাত বিরোধী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেটা তাকবীরে তাহরীমার পরে পাঠ করেছেন। একদিনও তিনি তাকবীরে তাহরীমার আগে তা পাঠ করেননি। আমাদের মযহাবের ইমামগণও তাকবীরে তাহরীমার পরে পাঠ করা সুন্নাত বলেছেন।

সানা’র দোয়া- ৩

اللَّهُمَّ بَاعِدْ بَيْنِي وَبَيْنَ خَطَايَايَ كَمَا بَاعَدْتَ بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ اللَّهُمَّ نَقِّنِي مِنْ خَطَايَايَ كَمَا يُنَقَّى الثَّوْبُ الأَبْيَضُ مِنَ الدَّنَسِ، اللَّهُمَّ اغْسِلْنِي مِنْ خَطَايَايَ بِالثَّلْجِ وَالْمَاءِ وَالْبَرَدِ

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা, বা-‘ইদ বাইনী ওয়া বাইনা খাত্বা-ইয়া-ইয়া কামা- বা-‘আদ্তা বাইনাল মাশরিক্বি ওয়াল মাগরিব। আল্লা-হুম্মা, নাক্কিনী মিন খাতা-ইয়া-য়া কামা- ইউনাক্কাস সাওবুল আব্ইয়াদু মিনাদ দানাস। আল্লা-হুম্মাগসিল খাতা-ইয়া-ইয়া বিলমা-ই ওয়াস সাল্জি ওয়াল বারাদ।

অর্থ : “হে আল্লাহ্, আপনি দূরত্ব সৃষ্টি করে দিন আমার ও আমার পাপের মধ্যে যেমন দূরত্ব আপনি রেখেছেন পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে (আমাকে সকল প্রকার পাপ থেকে শত যোজন দূরে থাকার তাওফীক প্রদান করুন)। হে আল্লাহ্, আপনি আমাকে পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র করুন আমার পাপরাশি থেকে, যেমনভাবে পরিচ্ছন্ন করা হয় ধবধবে সাদা কাপড়কে ময়লা ও নোংরা থেকে। হে আল্লাহ্ আপনি ধৌত করুন আমার পাপরাশী পানি, বরফ এবং শিল দ্বারা (আমার হৃদয়কে পাপমুক্তি ও অনন্ত প্রশান্তি প্রদান করুন)।”

৮. তারপর অনুচ্চস্বরে (মনে মনে) বলুন :

أَعُوذُ بِاللَّهِ السَّمِيعِ الْعَلِيمِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ مِنْ هَمْزِهِ وَنَفْخِهِ وَنَفْثِهِ

“আ‘ঊযু বিল্লা-হি মিনাশ শায়ত্বা-নির রাজীম, মিন হাম্যিহী, ওয়া নাফ্খিহী ওয়া নাফ্সিহী।” অর্থাৎ “আমি বিতাড়িত শয়তান থেকে, তার প্রবঞ্চনা, জ্ঞান নষ্টকারী ও অহংকার সৃষ্টিকারী প্ররোচনা থেকে আল্লাহ্র কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।” অথবা বলুন (আ‘ঊযু বিল্লা-হি মিনাশ শায়ত্বা-নির রাজীম) অর্থাৎ “আমি বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহ্র আশ্রয় প্রার্থনা করছি।”

৯. তারপর অনুচ্চস্বরে (মনে মনে) বলুন: “বিসমিল্লাহির রাহমা-নির রাহীম।” অর্থাৎ (পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে শুরু করছি।)

১০. তারপর অর্থের দিকে লক্ষ্য রেখে প্রার্থনার আবেগে ফাতিহা পড়–ন:

الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ. الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ. مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ. إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ. اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ. صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ. غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلا الضَّالِّينَ.

উচ্চারণ: “আল ‘হামদু লিল্লা-হি রাব্বিল ‘আ-লামীন। আর রা‘হমা-নির রাহীম। মা-লিকি ইয়াওমিদ্দীন। ইয়য়া-কা না‘অ্বুদু ওয়া ইয়য়া-কা নাসতা‘য়ীন। ইহদিনাস স্বিরা-ত্বাল মুসতাক্বীম। স্বিরা-ত্বাল লাযীনা  আন ‘আমতা ‘আলইহিম। ‘গাইরিল মা‘গদূবি ‘আলাইহিম ওয়ালাদ দ্বোয়া-ল্লীন।”

অর্থ: সকল প্রশংসা আল্লাহ্র জন্য। যিনি মহাবিশ্বের প্রভু প্রতিপালক। পরম করুণাময় মহা দয়ালু। প্রতিদান দিবসের সম্রাট। শুধুমাত্র আপনারই ইবাদত করি আমরা এবং শুধুমাত্র আপনারই সাহায্য প্রার্থনা করি। পরিচালিত করুন আপনি আমাদেরকে সরল সঠিক পথে।  তাঁদের পথে যাদের উপর আপনি নেয়ামত বর্ষণ করেছেন। যারা আপনার ক্রোধের মধ্যে অবস্থান করেননা এবং যারা পথভ্রষ্ঠ নন।

রাসুলুল্লাহ  সূরা ফাতিহা থেমে থেমে ও টেনে টেনে পড়তেন। তিনি প্রলম্বিত করে “আল্‘হামদুল্লিা-হি রাব্বিল ‘আ-লামীন” বলে থেমে যেতেন। তারপর প্রলম্বিত করে পড়তেন: “আররা‘হমা- নিররাহীম” এবং থামতেন। তারপর বলতেন: “মা-লিকি ইয়াওমিদ্দীন” এবং থামতেন। এভাবেই তিনি প্রতিটি আয়াতের শেষে থামতেন। এছাড়া তিনি সর্বদা নামাযের মধ্যে ও বাইরে কুরআন তিলওয়াত করতেন খুবই ধীরে ধীরে, প্রলম্বিত করে ও প্রত্যেক আয়াতে থেমে থেমে।

সূরা ফাতিহা পাঠ শেষ হলে “আমীন” বলবেন। “আমীন” শব্দের অর্থ “হে আল্লাহ্ আমাদের প্রার্থনা কবুল করুন।”

প্রার্থনাই ধর্মের মূল। আর সূরা ফাতিহা মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম প্রার্থনা। সূরা ফাতিহা পাঠ করা সালাতের জন্য অতীব প্রয়োজনীয়। তবে যদি কেহ সূরা ফাতিহা না জানেনে, তাহলে তা শিখতে থাকবেন। যতদিন শেখা না হবে ততদিন সূরা পাঠের পরিবর্তে তাসবীহ তাহলীল করবেন। বলবেন : (সুব‘হা-নাল্লা-হ), (আল‘হামদু লিল্লাহ), (লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ), আল্লা-হু আকবার), ( লা- ‘হাওলা ওয়ালা- ক্বুওয়াতা ইল্লা- বিল্লা-হ)।

কয়েকটি প্রয়োজনীয় সূরা ও আয়াত

১১. সুরা ফাতিহার পর কুরআনের অন্য কোন সুরা বা কিছু আয়াত পাঠ করুন। এখানে কয়েকটি আয়াত ও ছোট সূরা লিখছি, যা সালাতের মধ্যে পাঠ করা যাবে এবং পরবর্তী যিক্র ওযীফার জন্য প্রয়োজনীয়।

(১) আয়াতুল কুরসী:  ২য় সূরার (সূরা বাকারার) ২৫৫ নং আয়াত

اللَّهُ لا إِلَهَ إِلا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ لا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلا نَوْمٌ لَهُ مَا فِيْ السَّمَاوَاتِ وَمَا فِيْ الأَرْضِ مَنْ ذَا الَّذِيْ يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلاَّ بِإِذْنِه يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيْهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ ولاَ يُحِيْطُوْنَ بِشَيْئٍ مِّنْ عِلْمِهِ إِلاَّ بِمَا شَاءَ وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضَ وَلاَ يَؤُوْدُهُ حِفْظُهُمَا وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيْمُ

উচ্চারণ: আল্লা-হু লা- ইলা-হা ইল্লা- হুআল ‘হাইউল ক্বাইঊম। লা- তাঅ্খুযুহূ সিনাতুওঁ ওয়ালা- নাওম। লাহু মা- ফিসসামা-ওয়া-তি ওয়ামা- ফিল আরদ্বি। মান যাল্লাযী ইয়াশফা‘উ ‘ইনদাহু ইল্লা- বিইযনিহী ইয়া‘অ্লামু মা- বাইনা আইদীহিম ওয়ামা- খালফাহুম। ওয়ালা- ইউ‘হীতূনা বিশাইয়িম মিন ‘ইলমিহী ইল্লা- বিমা- শা--আ। ওয়াসি‘আ কুরসিয়্যুহূস সামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদ্বা। ওয়ালা- ইয়াঊদুহু ‘িহফযুহুমা। ওয়াহুআল ‘আলিয়্যুল ‘আযীম।

অর্থ: আল্লাহ্ নেই কোন মা’বুদ তিনি ছাড়া। চিরঞ্জীব সর্বসংরক্ষক। স্পর্শ করে না তাকে কোন তন্দ্রা বা ঘুম। তাঁরই জন্য (তাঁরই অধীন) যা কিছু আকাশমণ্ডলীর মধ্যে ও যা কিছু যমীনের মধ্যে। কে সে যে শাফা‘আত (সুপারিশ) করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া? তিনি জানেন যা কিছু আছে তাদের সামনে ও তাদের পিছনে। এবং তারা জানে না কিছুই তাঁর জ্ঞানের, শুধুমাত্র যতটুকু তিনি চান ততটুকু বাদে। তাঁর আসন আকাশমণ্ডলী ও যমীন ব্যাপী। কোন কষ্ট হয় না তাঁর আসমান-যমীনের সংরক্ষণ করতে। এবং তিনি মহা উচ্চ, মহান মহিমান্বিত।

(২) সূরা বাকারার (২য় সূরার) শেষ দু (২৮৫ ও ২৮৬ নং) আয়াত

آمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْهِ مِنْ رَبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ كُلٌّ آمَنَ بِاللَّهِ وَمَلائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ لا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْ رُسُلِهِ وَقَالُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ لا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلا وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ رَبَّنَا لا تُؤَاخِذْنَا إِنْ نَسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا رَبَّنَا وَلا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِنَا رَبَّنَا وَلا تُحَمِّلْنَا مَا لا طَاقَةَ لَنَا بِهِ وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا أَنْتَ مَوْلانَا فَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ

উচ্চারণ: আ-মানার রাসূলু বিমা- উনযিলা ‘আলাইহি মির রাব্বিহী ওয়াল মুঅ্মিনূন। কুল্লুন আ-মানা বিল্লা-হি ওয়া মালা-ইকাতিহী ওয়া কুতুবিহী ওয়া রুসুলিহ। লা- নুফাররিক্বু বাইনা আ‘হাদিম মির রুসুলিহ। ওয়া ক্বা-লু সামি‘অ্না ওয়া আতা‘অ্না ‘গুফরা-নাকা রাব্বানা- ওয়া ইলাইকাল মাসীর। লা-ইউকাল্লিফুল্লাহু নাফসান ইল্লা- উস‘আহা-। লাহা- মা- কাসাবাত ওয়া ‘আলাইহা- মাকতাসাবাত। রাব্বানা- লা তুআখিযনা- ইন নাসীনা আউ আখতাঅ্না। রাব্বানা- ওয়ালা- তা‘হ্মিল ‘আলাইনা ইসরান কামা ‘হামালতাহূ ‘আলাল্লাযীনা মিন ক্বাবলিনা- রাব্বানা- ওয়ালা- তু‘হাম্মিলনা- মা- লা- ত্বা-ক্বাতা লানা- বিহী ওয়া‘অ্ফু ‘আন্না ওয়া‘গফির লানা- ওয়ার‘হাএা- আনতা মাউলা-না ফানস্বূরনা- ‘আলাল ক্বাউমিল কা-ফিরীন।

অর্থ: বিশ্বাস স্থাপন করেছেন রাসূল তাতে যা তাঁর উপর অবতীর্ণ হয়েছে তাঁর উপর তাঁর প্রভুর কাছে থেকে এবং মুমিনগণও (অনুরূপভাবে বিশ্বাস স্থাপন করে)। তাঁরা সকলেই বিশ্বাস স্থাপন করে আল্লাহ্র উপর, তাঁর ফিরিশতাগণের উপর, তাঁর গ্রন্থসমূহের উপর, তাঁর রাসূলগণের উপর। (তাঁরা বলেন) আমরা তারতম্য করি না রাসূলগণের মধ্যে। এবং তাঁরা বলেন, আমরা শুনেছি এবং আমরা আনুগত্য করেছি, আমরা আপনার ক্ষমা চাই, হে আমাদের প্রতিপালক, এবং আপনার কাছেই আমাদের প্রত্যাবর্তন। আল্লাহ্ কাউকে তাঁর সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন না। সে তাই পায় যা সে উপার্জন করে এবং তাঁর উপর তাই বর্তাবে যা সে করে। হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের অপরাধ নেবেন না, যদি আমরা ভুলে যায় বা ভুল করি। হে আমাদের প্রতিপালক, এবং আমাদের উপর কষ্টকর দায়িত্ব চাপিয়ে দিবেন না, যেরূপ চাপিয়ে দিয়েছেন পূর্ববর্তী মানুষদের উপর। হে আমাদের প্রভু, আর আমাদেরকে দায়িত্ব দিবেন না তার যা পালনের ক্ষমতা আমাদের নেই। এবং পাপমোচন করুন আমাদের, ক্ষমা করুন আমাদেরকে, করুণা করুন আমাদেরকে, আপনিই আমাদের প্রভু, অতএব আপনি আমাদেরকে কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাহায্য করুন।

(৩) সূরা কাউসার : কুরআন কারীমের১০৮ নং সূরা

إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ إِنَّ شَانِئَكَ هُوَ الأَبْتَرُ

উচ্চারণ: ইন্না- আ‘অ্তাইনা-কাল কাউসার। ফাস্বাল্লিলি রাব্বিকা ওয়ান‘হার। ইন্না শা-নিআকা হুআল আবতার।

অর্থ: নিশ্চয় আমি আপনাকে কাওসার প্রদান করেছি। অতএব আপনি আপনার প্রভুর জন্য সালাত পালন করুন এবং কুরবানী করুন। নিশ্চয় আপনাকে যে ঘৃণা করে সে আঁটকুড়ে ধ্বংসগ্রস্ত।

(৪) সূরা কাফিরূন : কুরআন কারীমের১০৯ নং সূরা

قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ لا أَعْبُدُ مَا تَعْبُدُونَ وَلا أَنْتُمْ عَابِدُونَ مَا أَعْبُدُ وَلاَ أَنَا عَابِدٌ مَا عَبَدتُّم وَلا أَنْتُمْ عَابِدُونَ مَا أَعْبُدُ لَكُمْ دِينُكُمْ وَلِيَ دِينِ

উচ্চারণ: ক্বুল ইয়া- আইউহাল কা-ফিরূন। লা- আঅ্বুদু মা- তাঅ্বুদূন। ওয়ালা- আনতুম ‘আ-বিদূনা মা- আঅ্বুদু। ওয়ালা- আনা ‘আবিদুম মা ‘আবাত্তুম। ওয়ালা- আনতুম ‘আ-বিদূনা মা- আঅ্বুদু। লাকুম দীনুকুম ওয়ালিয়া দীন।

অর্থ: বলুন, হে কাফিরগণ, আমি ইবাদত করি না তোমরা যার ইবাদত কর। এবং তোমরা ইবাদতকারী নও যাঁর ইবাদত আমি করি। এবং আমি ইবাদতকারী নই যার ইবাদত তোমরা কর। এবং তোমরা ইবাদতকারী নও যাঁর ইবাদত আমি করি। তোমাদের কর্ম ও কর্মফল তোমাদের জন্য এং আমার কর্ম ও কর্মফল আমার জন্য।

 

(৫) সূরা ইখলাস: কুরআন কারীমের১১২ নং সূরা

قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ. اللَّهُ الصَّمَدُ. لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ. وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ

উচ্চারণ: ক্বুল হুআল্লা-হু আ‘হাদ। আল্লা-হুস্ব স্বামাদ। লাম ইয়ালিদ ওয়ালাম ইউলাদ। ওয়ালাম ইয়াকুল্লাহূ কুফুওয়ান আ‘হাদ।

অর্থ: আপনি বলুন, তিনি আল্লাহ্ এক ও অদ্বিতীয়। তিনি অমুখাপেক্ষী, সবাই তাঁর মুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেন নি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয় নি। আর তাঁর সমকক্ষ বা তুল্য কেউ নেই।

(৬) সূরা ফালাক : কুরআন কারীমের১১৩ নং সূরা

قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ وَمِنْ شَرِّ غِاسِقٍ إِذَا وَقَب وَمِنْ شَرِّ النَّفَّاثَاتِ فِيْ الْعُقَدِ وَمِنْ شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ

উচ্চারণ: “ক্বুল আ‘ঊযুু বিরাব্বিল ফালাক্ব। মিন শাররি মা- খালাক্কা। ওয়ামিন শাররি ‘গা-সিক্বিন ইযা- ওয়াক্বাব। ওয়ামিন শাররিন নাফফা-সা-তি ফিল ‘উক্বাদ। ওয়ামিন শাররি ‘হাসিদিন ইযা- ‘হাসাদ।

অর্থ: বলুন, আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি প্রভাতের প্রভুর, তিনি যা সৃষ্টি করেছেন এর অকল্যাণ (অমঙ্গল ও ক্ষতি) থেকে। এবং রাতের অকল্যাণ থেকে যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়। এবং (যাদুর) গিরার মধ্যে ফুঁকদানকারিনীগণের অকল্যাণ থেকে। এবং হিংসুকের অকল্যাণ থেকে যখন সে হিংসা করে।

(৭) সূরা নাস : কুরআন কারীমের১১৪ নং সূরা

قُلْ أَعُوْذُ بِرَبِّ النَّاسِ مَلِكِ النَّاسِ إِلَهِ النَّاسِ مِنْ شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ الَّذِيْ يُوَسْوِسُ فِيْ صُدُوْرِ النَّاسِ مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ.

উচ্চারণ: “ক্বুল আ‘ঊযুু বিরাব্বিন না-স। মালিকিন না-স। ইলা-হিন না-স। মিন শাররিল ওয়াসওয়া-সিল খান্না-স। আল্লাযী ইউআসবিসু ফী স্বুদূরিন না-স। মিনাল জিন্নাতি ওয়ান না-স।

অর্থ: বলুন, আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি মানুষের প্রভুর, মানুষে বাদশাহের, মানুষের মা’বুদের। অকল্যাণ (অমঙ্গল ও ক্ষতি) থেকে কুমন্ত্রণাদানকারী লুক্কায়িতের। যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের হৃদয়ে। জীন ও মানবজাতির মধ্য থেকে।

১২. তিলাওয়াত শেষ হলে সামান্য একটু থামুন। তারপর  “আল্লাহ্ আকবার” বলে রুকু করুন। রুকু অবস্থায় দুই হাত দুই হাঁটুর উপর দৃঢ়ভাবে রাখুন, হাতের আঙুল ফাঁক করে হাঁটু আঁকড়ে ধরুন। দুই বাহুকে ও দু’হাতের কুনুইকে ও দেহ থেকে সরিয়ে রাখুন। এ অবস্থায় পিঠ লম্বা করে দিতে হবে, পিঠ কোমর ও মাথা এমনভাবে সোজা ও সমান্তরাল থাকবে পিঠের উপর পানি ঢেলে দিলে তা গড়িয়ে পড়বে না। এ ভাবে রুকুতে পুরোপুরি শান্ত ও স্থির হয়ে যেতে হবে।

১৩. রাসুলুল্লাহ  রুকুতে দীর্ঘক্ষণ থাকতেন এবং বিভিন্ন জিকির বা দোয়া পাঠ করতেন। তিনি একেক সময় একেক দোয়া পড়তেন। হযরত ইবনু আব্বাস (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ  তাঁর (ইন্তেকালের পূর্বে, সোমবার ফজরের নামাযের সময়) তাঁর ঘরের পর্দা সরান। তখন মানুষেরা হযরত আবু বকরের (রা.) পিছনে কাতারবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে নামাযে রত ছিলেন। তিনি বলেন, হে মানুষেরা ... আমাকে রুকু ও সাজদার মধ্যে কুরআন পাঠ করতে নিষেধ করা হয়েছে। কাজেই, তোমরা রুকুর মধ্যে প্রভুর তা’যীম  মহত্ব ঘোষণা করবে। আর সাজদার মধ্যে প্রাণপণে বেশি বেশি দোয়া করবে ; এ সময়ে তোমাদের দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি।”

এখানে রুকুর মাসনূন তিনটি যিক্র উল্লেখ করছি। রাসূলুল্লাহ  এগুলো রুকুতে পাঠ করতেন এবং পাঠ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি প্রথম যিক্রটি কমপক্ষে তিনবার পড়তে নির্দেশ দিয়েছেন। কাজেই প্রথম যিক্রটি কমপক্ষে তিনবার পাঠ করবেন। যথাসম্ভব বেশী পাঠ করা উত্তম। সাথেসাথে সময়, সুযোগ ও আবেগ অনুসারে অন্যান্য তাসবীহ আদায় করবেন।

রুকুর তাসবীহ-১    سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ

উচ্চারণ : সুব‘হা-না রাব্বিয়াল ‘আযীম।

অর্থ : “মহাপবিত্র আমার মহান প্রভু।”

রুকু (ও সাজদার) তাসবীহ- ২

سُبُّوحٌ قُدُّوسٌ رَبُّ الْمَلاَئِكَةِ وَالرُّوْح

উচ্চারণ : সুব্ব‘ূহুন ক্বুদ্দূসুন রাব্বুল মালা-ইকাতি ওয়াররূ‘হ।

অর্থ : “মহাপবিত্র, মহামহিম, ফিরিশতাগণের এবং পবিত্রাত্মার প্রভু।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রুকু ও সাজদায় এ তাসবীহ বলতেন।

রুকুর তাসবীহ- ৩

اللَّهُمَّ لَكَ رَكَعْتُ وَبِكَ آمَنْتُ وَلَكَ أَسْلَمْتُ خَشَعَ لَكَ سَمْعِي وَبَصَرِي وَمُخِّي وَعَظْمِي وَعَصَبِي

উচ্চারণ : আল্ল-হুম্মা, লাকা রাকা‘অ্তু, ওয়া বিকা আ-মানতু, ওয়া লাকা আস্লামতু। খাশা‘আ লাকা সাম‘ই ওয়া বাসারী ওয়া মুখখী, ওয়া ‘আযমী, ওয়া ‘আসাবী।

অর্থ : “হে আল্লাহ্, আপনারই জন্য অবনত হয়েছি (রুকু করেছি), এবং আপনার উপরেই ঈমান এনেছি এবং আপনারই কাছে সমর্পিত হয়েছি। ভক্তিতে অবনত হয়েছে আপনার জন্য আমার কর্ণ, আমার চক্ষু, আমার মস্তিষ্ক, আমার অস্থি ও আমার ¯œায়ুতন্ত্র।”

১৪. তারপর রুকু থেকে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলুন :

سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ   উচ্চারণ : “সামি‘আল্লা-হু লিমান ‘হামিদাহ।

অর্থ: শ্রবণ করেছেন আল্লাহ্ তাকে যে তাঁর প্রশংসা করেছে।

১৫. রুকু থেকে উঠে পরিপূর্ণ সোজা হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকুন। রুকু থেকে উঠে কয়েক মুহূর্ত পরিপূর্ণ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সালাতের অন্যতম ওয়াজিব বা আবশ্যকীয় কাজ। কেউ যদি রুকু থেকে উঠে পুরোপুরি সোজা হয়ে না দাঁড়িয়ে সাজদায় চলে যায় তাহলে তার সালাত নষ্ট হয়ে যাবে।

রাসুলুল্লাহ () বলেছেন, সালাত শুদ্ধ হতে হলে অবশ্যই রুকু থেকে (সামি‘আল্লা-হু লিমান ‘হামিদাহ) বলে উঠে সম্পূর্ণ সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে।”  এক ব্যক্তি তাড়াহুড়া করে রুকুর পরে পরিপূর্ণ না দাঁড়িয়ে ও দুই সাজদার মাঝে পরিপূর্ণরূপে না বসে  অসম্পূর্ণভাবে সালাত আদায় করে। রাসূলুল্লাহ () তাকে বলেন যে তোমার সালাত শুদ্ধ হয়নি, তোমাকে আবার সালাত আদায় করতে হবে। তারপর তিনি তাকে সালাত শেখাতে গিয়ে বলেন : “... তারপর তুমি রুকু থেকে পুরোপুরি সোজা হয়ে দাঁড়াবে, যেন তোমার শরীরের প্রতিটি অস্থি নিজ নিজ স্থানে শান্ত হয়ে যায়।”  এভাবে অসংখ্য হাদীসে তিনি শিক্ষা দিয়েছেন যে, সালাতের মধ্যে ধীরতা, প্রশান্তি ও মনোযোগই হলো সালাতের মূল। তাড়াহুড়া করলে সালাত নষ্ট হয়ে যায়।

১৬. রুকুর পরে রাসুলুল্লাহ () দীর্ঘক্ষণ দাাঁড়িয়ে থেকে বিভিন্ন বরকতময় বাক্যদ্বারা মহান আল্লাহ্র প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন। বিভিন্ন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি যতক্ষণ রুকুতে থাকতেন প্রায় ততক্ষণ রুকু থেকে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন।  এসময়ে দাঁড়ানো অবস্থায় তিনি যে সকল দোয়া ও যিক্র পাঠ করতেন সেগুলোর মধ্য থেকে ৪ টি বাক্য উল্লেখ করছি। মনের আবেগ দিয়ে অর্থের দিকে লক্ষ্য রেখে এগুলো পাঠ করবেন। বিশেষত: সুন্নাত-নফল নামায যেহেতু একা আদায় করতে হয় সেহেতু সেক্ষেত্রে দীর্ঘ দোয়া পাঠের সুযোগ বেশী।

রুকুর পরে দাঁড়ানো অবস্থায় যিক্র-১

رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ উচ্চারণ : রাব্বানা- লাকাল ‘হামদ।

অর্থ : হে আমাদের প্রভু, আপনারই প্রশংসা।

রুকুর পরে দাঁড়ানো অবস্থায় যিক্র-২

اللَّهُمَّ رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ مِلْءُ السَّمَاوَاتِ وَمِلْءُ الأَرْضِ وَمِلْءُ مَا شِئْتَ مِنْ شَيْءٍ بَعْدُ

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা, রাব্বানা- লাকাল ‘হামদু, মিলউস সামা-ওয়া-তি ওয়া মিলউল আরদি ওয়া মিলউ মা- শি‘তা মিন শাইয়িন বা’অ্দ।

অর্থ : “হে আল্লাহ্, আমাদের প্রভু, আপনার জন্যই প্রশংসা, আকাশসমূহ পরিপূর্ণ করে, পৃথিবী পরিপূর্ণ করে, এবং তারপর আপনি যা কিছু ইচ্ছা করেন তা পরিপূর্ণ করে প্রশংসা আপনার।”

রুকুর পরে দাঁড়ানো অবস্থায় যিক্র-৩

اللَّهُمَّ رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ مِلْءُ السَّمَاوَاتِ وَمِلْءُ الأَرْضِ [وَمَا بَيْنَهُمَا] وَمِلْءُ مَا شِئْتَ مِنْ شَيْءٍ بَعْدُ أَهْلَ الثَّنَاءِ وَالْمَجْدِ لا مَانِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ وَلا مُعْطِيَ لِمَا مَنَعْتَ وَلا يَنْفَعُ ذَا الْجَدِّ مِنْكَ الْجَدُّ

উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা, রাব্বানা- লাকাল ‘হামদু, মিলউস সামা-ওয়া-তি ওয়া মিলউল আরদি, ওয়া মা- বাইনাহুমা, ওয়া মিলউ মা- শি‘তা মিন শাইয়িন বা’অ্দ, আহ্লাস্ সানা-ই ওয়াল মাজ্দি। লা- মা-নি‘আ লিমা- আ‘অ্ত্বাইতা, ওয়ালা- মু‘অ্ত্বিয়া লিমা- মানা‘অ্তা, ওয়ালা- ইয়ান্ফা‘উ যাল জাদ্দি মিনকাল জাদ্দু।

অর্থ : “হে আল্লাহ্, আমাদের প্রভু, আপনার জন্যই প্রশংসা, আকাশসমূহ পরিপূর্ণ করে, পৃথিবী পরিপূর্ণ করে, উভয়ের মধ্যে যা কিছু আছে সব পরিপূর্ণ করে এবং তারপর আপনি যা কিছু ইচ্ছা করেন তা পরিপূর্ণ করে প্রশংসা আপনার। সকল মর্যাদা ও প্রশংসার মালিক আপনিই। আপনি যা প্রদান করেন তা কেউ রোধ করতে পারে না। আর আপনি যা রোধ করেন তা কেউ প্রদান করতে পারে না। অধ্যবসায়ীর অধ্যবসায় ও পরিশ্রমকারীর পরিশ্রম আপনার পরিবর্তে (আপনার ইচ্ছার বাইরে) তার কোনো উপকারে আসে না।”

রুকুর পরে দাঁড়ানো অবস্থায় যিক্র-৪

رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ حَمْدًا كَثِيرًا طَيِّبًا مُبَارَكًا فِيهِ

উচ্চারণ: রাব্বানা- ওয়া লাকাল ‘হামদু, ‘হামদান কাসীরান ত্বাইয়িবান মুবা-রাকান ফীহি।

অর্থ: “হে আমাদের প্রভু, এবং আপনারই প্রশংসা, অশেষ প্রশংসা, পবিত্র ও বরকতময় প্রশংসা।”

১৭. তারপর আল্লাহু আকবার বলতে বলতে সাজদা করবেন। সাজদায় যাওয়ার সময় শান্ত ভাবে প্রথমে দুই হাঁটু মাটি স্পর্শ করবে, তারপর দুই হাত মাটিতে রাখতে হবে।

সাজদা অবস্থায় দুই পা, দুই হাঁটু, দইু হাত, কপাল ও নাক মাটিতে দৃঢ়ভাবে লেগে থাকবে। দুই পা জোড়া অবস্থায় খাড়া থাকবে। পায়ের আঙুল কিবলামুখি থাকবে। দুই হাতের আঙুল মিলিত অবস্থায় সোজা কিবলামুখি থাকবে। দু হাতের  পাতা  দু কানের নীচে অথবা দু কাঁধের নীচে থাকবে। দু হাতের বাজু ও কনুই মাটি থেকে উপরে থাকবে এবং কোমর থেকে দূরে সরে থাকবে। সিজদার সময়ে নাক মাটি থেকে উঠবে না। হাদীসে বলা হয়েছে: “যতক্ষণ কপাল মাটিতে থাকবে, ততক্ষণ নাকও মাটিতে থাকবে, অনথ্যায় সালাত শুদ্ধ হবে না।”

১৮. সাজদায় গিয়ে একেবারে বারে স্থির ও শান্ত হতে হবে। রাসুলুল্লাহ () বলেন: “… সিজদা করবে এবং সিজদায় এমন ভাবে শান্ত হবে যেন তোমার সকল অস্থি ও শরীরের জোড় শান্ত ও শিথিল হয়ে যায়।”  তিনি আরো বলেছেন, “দৃঢ়ভাবে কপাল, নাক ও দুই হাত মাটিতে রেখে সিজদায় গিয়ে স্থির থাকবে, যেন তোমার দেহের সকল অস্থি নিজনিজ স্থানে যায়।”

১৯. সিজদার তাসবীহ পাঠ করুন এবং সিজদারত অবস্থায় আল্লাহ্র কাছে দোয়া করুন। আমরা দেখেছি যে, রাসুলুল্লাহ () সাজদার মধ্যে বেশি বেশি দোয়া করতে নির্দেশ দিয়েছেন, কারণ এ সময়ের দোয়া কবুল হয়। অন্য হাদীসে তিনি বলেন: “বান্দা যখন সাজদায় রত থাকে তখন সে তার প্রভুর সবচেয়ে কাছেবর্তী হয়, কাজেই তোমরা এ সময়ে বেশি বেশি দোয়া করবে।”

সাজদায় থাকা অবস্থায় রাসুলুল্লাহ () বিভিন্ন দোয়া ও তাসবীহ পড়তেন। একেক সময় একেক দোয়া পড়তেন। এখানে কয়েকটি তাসবীহ ও দোয়া লেখা হল:

সাজদারত অবস্থায় তাসবীহ : سُبْحَانَ رَبِّيَ الأَعْلَى

উচ্চারণ : সুব‘্হা-না রাব্বিয়াল আ‘অ্লা।

অর্থ : “মহাপবিত্র আমার প্রভু যিনি সর্বোচ্চ।”

অর্থের দিকে খেয়াল রেখে আবেগ ও ভক্তির সাথে এ তাসবীহ কমপক্ষে তিনবার বলতে হবে। বেশিবেশি বলা উত্তম।

উপরে রুকুর তাসবীহের মধ্যে উল্লেখ করেছি যে তিনি “সুব্বূহুন কুদ্দূসুন রাব্বুল মালাইকতি ওয়ার রূহ” রুকু ও সাজাদায় বলতেন।

সাজদা রত অবস্থায় দোয়া-১

اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذَنْبِي كُلَّهُ دِقَّهُ وَجِلَّهُ وَأَوَّلَهُ وَآخِرَهُ وَعَلانِيَتَهُ وَسِرَّهُ

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মাগ্ ফির লী যাম্বী কুল্লাহু, দিক্কাহু ওয়া জিল্লাহু, ওয়া আউআলাহু ওয়া আ-খিরাহু, ওয়া ‘আলা-নিয়্যাতাহু ওয়া সিররাহু।

অর্থ : “হে আল্লাহ্, আপনি ক্ষমা করুন আমার সকল পাপ, ছোট পাপ, বড় পাপ, প্রথম পাপ, শেষ পাপ, প্রকাশ্য পাপ, গোপন পাপ।”

সাজদারত অবস্থায় দোয়া-২

اللَّهُمَّ أَعُوذُ بِرِضَاكَ مِنْ سَخَطِكَ وَبِمُعَافَاتِكَ مِنْ عُقُوبَتِكَ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْكَ لا أُحْصِي ثَنَاءً عَلَيْكَ أَنْتَ كَمَا أَثْنَيْتَ عَلَى نَفْسِكَ

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা, আ‘ঊযু বিরিদা-কা মিন সাখাতিক, ওয়া বি মু‘আ-ফা-তিকা মিন ‘উকূবাতিকা, ওয়া আ‘ঊযু বিকা মিনকা, লা- উহসী সানা-আন ‘আলাইকা। আনতা কামা- আসনাইতা ‘আলা- নাফসিকা।

অর্থ : “হে আল্লাহ্, আমি আপনার ক্রোধ থেকে আপনার সন্তুষ্টির আশ্রয় প্রার্থনা করছি এবং আপনার শাস্তি থেকে আপনার ক্ষমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। এবং আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি আপনার কাছে আপনার থেকে। আমি আপনার প্রশংসা করে শেষ করতে পারি না। আপনি ঠিক তেমনি যেমন আপনি আপনার নিজের প্রশংসা করেছেন।”

এছাড়া কুরআন ও হাদীসের যে কোন দোয়া সাজদার মধ্যে বলা যাবে। বিশেষত সুন্নাত-নফল সালাতের মধ্যে বেশি করে এ সকল দোয়া পাঠের চেষ্টা করতে হবে।

২০.“আল্লাহ্ আকবার” বলতে বলতে সাজদা থেকে উঠে বসতে হবে এবং বসে সম্পূর্ণ স্থির হতে হবে যেন শরীরের সকল অস্থি নিজনিজ স্থানে স্থির হয়ে যায়। রাসুুলুল্লাহ () বলেছেন, সালাত শুদ্ধ হতে হলে দুই সাজদার মাঝে অবশ্যই শান্ত ও স্থির হয়ে বসতে হবে।  বিভিন্ন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যতক্ষণ সাজদায় থাকতেন, দুই সিজদার মাঝে প্রায় ততক্ষণ বসে থাকতেন।

২১.এসময়ে বাম পা বিছিয়ে দিয়ে এর উপর শান্ত হয়ে বসতে হবে। ডান পায়ের আঙুলগুলোকে কিবলামুখি করে পা সোজা রাখতে হবে। দুই হাত দুই উরু ও হাঁটুর উপরে থাকবে। আঙ্গুলগুলো স্বাভাবিক সামান্য ফাঁক অবস্থায় কিবলামুখি থাকবে।

২২.প্রথম সাজদার পরে দ্বিতীয় সাজদার আগে বসা অবস্থায় নি¤েœর দুটি দোয়া রাসূলুল্লাহ  বলতেন। একেক সময় একেকটি বলুন:

رَبِّي اغْفِرْ لِي رَبِّي اغْفِرْ لِي

উচ্চারণ : রাব্বিগ্-ফিরলী, রাব্বিগ্-ফিরলী।

অর্থ : “হে আমার প্রভু আমাকে ক্ষমা করুন, হে আমার প্রভু, আমাকে ক্ষমা করুন।”

اللَّهُمَّ [رَبِّ] اغْفِرْ لِي وَارْحَمْنِي وَاجْبُرْنِي وَاهْدِنِي وَارْزُقْنِي [وَارْفَعْنِيْ]

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা, রাব্বিগ্-ফিরলী, ওয়ার‘হামনী, ওয়াজবুরনী, ওয়াহদিনী, ওয়ারযুকনী [ওয়ার ফা’অ্নী]।

অর্থ : “হে আল্লাহ্, হে আমার প্রভু, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন, রহমত করুন, আমাকে পূর্ণতা দান করুন, আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন, আমাকে রিযিক দান করুন [এবং আমাকে সুউচ্চ করুন]।”

২৩.    তারপর “আল্লাহু আকবার” বলে দ্বিতীয়বার সাজদা করতে হবে। দ্বিতীয় সাজদাতে প্রথম সাজদার মত শান্ত ও স্থিরভাবে অবস্থান করতে হবে এবং উপরে বর্ণিত যিকির ও দোয়া পাঠ করতে হবে।

প্রশান্তি ও ভক্তিময় রুকু সাজদা

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে রুকু, সাজদা, রুকু থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ও দুই সাজদার মাঝে বসে শান্ত হওয়া এবং তাড়াহুড়া না করা নামাযের জন্য অতীব গুরুত্বপুর্ণ এবং এতে অবহেলা করলে নামায নষ্ট হয়ে যাবে। কষ্ট করে নামায পড়েও তা যদি নবীজির () শিক্ষার বিরোধিতার কারণে আল্লাহ্ কবুল না করেন তাহলে এর চেয়ে দুঃখের বিষয় আর কিছুই হতে পারে না। রাসুলুল্লাহ () বলেছেন, “যে মুসাল্লী পুরোপুরি শান্তভাবে রুকু সাজদা আদায় করে না, তার সালাতের দিকে আল্লাহ্ তাকান না।  তিনি একব্যক্তিকে তাড়াতাড়ি অপূর্ণভাবে রুকু সিজদা করতে দেখে বলেন : “যদি সে এ অবস্থায় মারা যাায় তাহলে মুহম্মদের () ধর্মের উপর তার মৃত্যু হবে না। কাক যেমন রক্তে ঠোকর দেয় তেমনি তারা সালাতে ঠোকর দেয়। যে ব্যক্তি পরিপূর্ণ ভাবে রুকু করে না এবং ঠুকরে ঠুকরে সাজদা করে তার অবস্থা হলো সে ব্যক্তির মত যে অত্যাধিক ক্ষুধার্ত অবস্থায় একটি বা দুটি খেজুর খেল, যাতে তার কোন রকাম ক্ষুধানিবৃত্তি হল না।

তিনি আরো বলেছেন, “সবচেয়ে খারাপ চোর যে নিজের সালাত চুরি  করে।” সাহাবীরা প্রশ্ন করেন,  “হে আল্লাহ্র রাসুল, নিজের নামাজ (সালাত) থেকে কিভাবে চুরি করে?” তিনি বলেন, “সালাতের রুকু ও সাজদা পুরোপুরি আদায় করে না।”

তিনি একদিন সালাত আদায় করতে করতে লক্ষ্য করেন যে একব্যক্তি রুকু ও সিজদা করার সময় স্থির হচ্ছে না। তিনি সালাত শেষে বলেন, “হে মুসলিমগণ, যে ব্যক্তি রুকুতে এবং সিজদায় পুরোপুরি স্থির ও শান্ত না হবে, তার সালাত আদায় হবে না।”

২৪.তারপর “আল্লাহ্ আকবার” বলতে বলতে দ্বিতীয় রাক‘আতের জন্য উঠে দাঁড়াতে হবে। সাজদা থেকে উঠে দাঁড়ানর সময় পরিপূর্ণ আদব ও ভক্তির সাথে শান্তভাবে প্রথমে দুই হাত, এরপর দুই হাঁটু মাটি থেকে উপরে উঠাতে হবে।

২৫. দ্বিতীয় রাক‘আতে উঠে দাঁড়িয়ে বিসমিল্লা-হির রা‘হমা-নির রাহীম পড়ে উপরে বর্ণিত নিয়মে সূরা ফাতিহা ও অন্য কোন সূরা বা আয়াত পাঠ করতে হবে। তারপর উপরের নিয়মে রুকু ও সাজদা করে দ্বিতীয় রাক‘আত আদায় করতে হবে।

তাশাহহুদ ও দরুদ

২৬. দ্বিতীয় রাক‘আত পূর্ণ হলে তাশাহহুদের জন্য বসতে হবে। দুই সাজদার মাঝে মাঝে যেভাবে বসতে হয়, সেভাবে বাম পা বিছিয়ে ডান পা খাড়া করে আঙুলগুলো কিবলামুখি করে বসতে হবে। বাম হাত স্বাভাবিকভাবে বাম উরু বা হাঁটুর উপর বিছানো থাকবে। ডান হাত ডান উরুর উপর থাকবে, ডান হাতের আঙ্গুলগুলো মুঠি করে শাহাদাত আঙ্গুলী বা তর্জনী দিয়ে তাশাহহুদ ও দোয়ার সময় কিবলার দিকে ইঙ্গিত করা সুন্নাত। চোখের দৃষ্টি ইঙ্গিতরত তর্জনীর দিকে থাকবে। এ সময়ে “তাশাহহুদ” পড়তে হবে:

التَّحِيَّاتُ لِلَّهِ وَالصَّلَوَاتُ وَالطَّيِّبَاتُ السَّلامُ عَلَيْكَ أَيُّهَا النَّبِيُّ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ السَّلامُ عَلَيْنَا وَعَلَى عِبَادِ اللَّهِ الصَّالِحِينَ أَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلا اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ

উচ্চারণ: আত্তা‘িহয়্যা-তু লিল্লা-হি ওয়াস্ব স্বালা-ওয়াতু ওয়াত্ব ত্বাইয়্যিবা-তু, আস সালা-মু ‘আলাইকা আইউহান নাবিয়্যু ওয়া রাহমাতুল্লা-হি ওয়া বারাকা-তুহূ, আস সালা-মু ‘আলাইনা- ওয়া ‘আলা- ‘ইবা-দিল্লা-হিস্ব স্বা-লিহীন। আশহাদু আল্লা- ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান ‘আবদুহূ ওয়া রাসূলুহ।

অর্থ : “সকল মহান মর্যাদা জ্ঞাপন আল্লাহ্র জন্য এবং উপাসনা-আরাধনা ও প্রার্থনাসমূহ এবং পবিত্র বাক্য, কর্ম ও দানসমূহ। সালাম আপনার উপর, হে নবী; এবং আল্লাহ্র রহমত ও তাঁর বরকতসমূহ। সালাম আমাদের উপর এবং আল্লাহ্র নেককার বান্দাগণের উপর। আমি সাক্ষ্য প্রদান করছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। এবং সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তাঁর দাস ও প্রেরিত বার্তাবাহক।

২৭.দুই রাকাত সালাত  হলে তাশাহহুদের পর দরুদ ও দোয়া পড়তে হবে। তিন বা চার রাকতের সালাতে তাশাহহুদের পরে উঠে দাঁড়াতে হবে। উপরে বর্ণিত নিয়মে ৩য় ও ৪র্থ রাকাত আদায় করতে হবে। উঠে দাঁড়িয়ে প্রথমে সুরা ফাতিহা পাঠ করতে হবে। তারপর অন্য কোন সূরা বা কিছু আয়াত পাঠ করে সঠিক নিয়মে রুকু ও সিজদা করতে হবে। তবে রাসুল্লাহ () সাধারণত ফরয সালাতের ৩য় ও ৪র্থ রাকাতে শুধুমাত্র সুরা ফাতিহা পাঠ করেই রুকু করতেন। ৩য় বা ৪র্থ রাকাতের শেষে বসে উপরের নিয়মে তাশাহ্হুদ পাঠ করতে হবে। তারপর দরূদ ও দোয়া পড়তে হবে।

২৮. সালাতের শেষ বৈঠকে বসে তাশাহহুদের পরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর সালাত বা দরুদ পাঠ করতে হবে:

اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ. اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ.

উচ্চারণ: “আল্লা-হুম্মা স্বাল্লি ‘আলা- মু‘হাম্মাদিওঁ ওয়া ‘আলা- আ-লি মু‘হাম্মাদিন কামা স্বল্লাইতা ‘আলা- ইবরা-হীমা ওয়া ‘আলা- আ-লি ইবরা-হীমা ইন্নাকা ‘হামীদুম্ মাজীদ। আল্লা-হুম্মা বা-রিক ‘আলা মু‘হাম্মাদিওঁ ওয়া ‘আলা- আ-লি মু‘হাম্মাদিন কামা বা-রাকতা ‘আলা- ইবরা-হীমা ওয়া ‘আলা- আ-লি ইবরা-হীমা ইন্নাকা ‘হামীদুম মাজীদ।

অর্থ : “হে আল্লাহ্ আপনি সালাত (দরুদ: রহমত, কল্যাণ, শান্তি ও মর্যাদা) প্রেরণ করুন মুহাম্মাদের উপর ও তাঁর পরিজনের (বংশধর ও অনুসারীগণের) উপর, যেমন আপনি সালাত প্রেরণ করেছেন ইবরাহীম ও তাঁর পরিজনের উপর, নিশ্চয় আপনি মহাপ্রশংসিত মহাসম্মানিত। হে আল্লাহ্, আপনি বরকত প্রদান করুন মুহাম্মাদের উপরে এবং মুহাম্মাদের পরিজনের উপরে যেমন আপনি বরকত প্রদান করেছেন ইবরাহীমের উপরে এবং ইবরাহীমের পরিজনের উপরে। নিশ্চয় আপনি মহাপ্রশংসিত মহা সম্মানিত।”

২৯. দরুদ পাঠের পর মুসাল্লী, অর্থাৎ সালাত আদায় কারী আল্লাহ্র কাছে নিজের ও অন্যান্যদের ধর্মীয়, জাগতিক ও পারলৌকিক মঙ্গল ও কল্যাণ চেয়ে দোয়া বা প্রার্থনা করবেন। এ সময়ে দোয়া করতে বিশেষভাবে নির্দেশ ও শিক্ষা দিয়েছেন রাসূলুল্লাহ । এ সময়ের দোয়া মহান আল্লাহ্ কবুল করবেন বলে তিনি বিভিন্ন হাদীসে জানিয়েছেন।  এসময়ে কুরআন ও হাদীসে শব্দে বা অর্থে যে কোন দোয়া করা যায়। রাসূলুল্লাহ  এ সময়ে বিভিন্ন দোয়া করতেন এবং করতে শিখিয়েছেন। এ ধরণের তিনটি মাসনূন দোয়া এখানে উল্লেখ করছি। মুমিন নিজের সুযোগ ও আবেগ মত সকল দোয়া বা কিছু দোয়া পাঠ করবেন।

সালামের পূর্বের মাসনূন দোয়া (দোয়া মাসূরা)-১

اللَّهُمَّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي ظُلْمًا كَثِيرًا وَلا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلا أَنْتَ فَاغْفِرْ لِي مَغْفِرَةً مِنْ عِنْدِكَ وَارْحَمْنِي إِنَّك أَنْتَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ

উচ্চারণ: “আল্লা-হুম্মা ইন্নী যালামতু নাফসী যুলমান কাসীরান, ওয়ালা- ইয়া‘গফিরুয যুনূবা ইল্লা-আনতা, ফা‘গফিরলী মা‘গফিরাতাম মিন ‘ইনদিকা ওয়ার‘হামনী ইন্নাকা আনতাল ‘গাফুরুর রাহীম।”

অর্থ: হে আল্লাহ্ আমি আমার আত্মার উপর খুবই অত্যাচার (পাপ) করেছি, আর আপনি ছাড়া কেউই পাপ ক্ষমা করতে পারে না। আপনি আপনার পক্ষ থেকে আমাকে ক্ষমা করে দিন এবং আমাকে রহমত করুন। নিশ্চয় আপনি ক্ষমাশীল দয়ালু।

নামাযের শেষে সালামের পূর্বের মাসনূন দোয়া (দোয়া মাসূরা)-২

اللَّهُمَّ أَلِّفْ بَيْنَ قُلُوبِنَا وَأَصْلِحْ ذَاتَ بَيْنِنَا وَاهْدِنَا سُبُلَ السَّلامِ وَنَجِّنَا مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ وَجَنِّبْنَا الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَبَارِكْ لَنَا فِي أَسْمَاعِنَا وَأَبْصَارِنَا وَقُلُوبِنَا وَأَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا وَتُبْ عَلَيْنَا إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ وَاجْعَلْنَا شَاكِرِينَ لِنِعْمَتِكَ مُثْنِينَ بِهَا قَابِلِيهَا وَأَتِمَّهَا عَلَيْنَا

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা, আল্লিফ বাইনা কুলুবিনা-, ওয়া আসলিহ যা-তা বাইনিনা-, ওয়াহদিনা- সুবুলাস সালা-ম, ওয়া নাজ্জিনা- মিনায যুলুমা-তি ইলান নূর। ওয়া জান্নিবনাল ফাওয়া-‘িহশা মা যাহারা মিনহা- ওয়া মা- বাতান। ওয়া বা-রিক লানা- ফী আগমনা-‘ইনা-, ওয়া আবসা-রিনা-, ওয়া কুলুবিনা-, ওয়া আযওয়া-যিনা, ওয়া যুররিয়্যা-তিনা-। ওয়া তুব ‘আলাইনা-, ইন্নাকা আনতাত তাওয়া-বুর রাহীম। ওয়াজ্ ‘আলনা- শা-কিরীনা লিনি’মাতিকা, মুসনীনা বিহা- কাবিলীহা, ওয়া আতমিমহা- ‘আলাইনা-।

অর্থ : “হে আল্লাহ্, আপনি আমাদের (মুসলিমগণের) অন্তরের মধ্যে পরস্পরের প্রতি ভালবাসা ও সম্প্রীতি সৃষ্টি করে দিন। আপনি আমাদের মধ্যে সুসম্পর্ক ও সৌহার্দ প্রদান করুন। আপনি আমাদেরকে শান্তির পথে পরিচালিত করুন, আমাদেরকে অন্ধকার থেকে মুক্ত করে আলোয় নিয়ে আসুন, আমাদেরকে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সকল অশ্লীলতা থেকে রক্ষা করুন। আপনি আমাদের শ্রবণযন্ত্রে, আমাদের দৃষ্টিশক্তিতে, আমাদের অন্তরে, আমাদের দাম্পত্য সঙ্গীগণের মধ্যে এবং আমাদের সন্তানগণের মধ্যে বরকত প্রদান করুন। আপনি আমাদের তওবা কবুল করুন। নিশ্চয় আপনি তওবা কবুলকারী পরম করুণাকারক। আপনি আমাদেরকে আপনার নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা আদায়ের, নেয়ামতের জন্য আপনার প্রশংসা করার এবং নেয়ামতকে সসম্মানে গ্রহণ করার তাওফীক প্রদান করুন এবং আপনি আমাদের জন্য প্রদত্ত আপনার নেয়ামতকে পূর্ণ করুন।”

নামাযের শেষে সালামের পূর্বের মাসনূন দোয়া (দোয়া মাসূরা)-৩

اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي مَا قَدَّمْتُ وَمَا أَخَّرْتُ وَمَا أَسْرَرْتُ وَمَا أَعْلَنْتُ وَمَا أَسْرَفْتُ وَمَا أَنْتَ أَعْلَمُ بِهِ مِنِّي أَنْتَ الْمُقَدِّمُ وَأَنْتَ الْمُؤَخِّرُ لا إِلَهَ إِلا أَنْتَ

উচ্চারণ: “আল্লা-হুম্মা‘গফিরলী  মা- ক্কাদ্দামতু ওয়া মা- আখ্খারতু, ওয়ামা- আসরারতু ওয়ামা- আ‘অলানতু ওয়ামা- আনতা আ‘অলামু বিহী মিন্নী, আনতাল মুক্কাদ্দিমু ওয়া আনতাল মুআখখিরু ওয়া আনতা ‘আলা- কুল্লি শাইয়িন ক্কাদির।”

অর্থ: “হে আল্লাহ্, আপনি ক্ষমা করে দেন আমার আগের পাপ, পরের পাপ, গোপন পাপ, আমার  প্রকাশ্য পাপ, আমার বাড়াবাড়ি এবং যে সকল পাপের কথা আপনি আমার চেয়ে বেশী জানেন। আপনিই অগ্রবর্তী করেন এবং আপনিই পিছিয়ে দেন। আপনি ছাড়া কোন উপাস্য নেই।”

সালাত আদায়কারীর উচিত এ সকল দোয়া ও অন্যান্য মাসনূন দোয়া মুখস্থ করে আল্লাহ্র দরবারে প্রার্থনা করা। আবারো উল্লেখ করতে হয়, দোয়া বা প্রার্থনায় অন্তরই হলো মূল, মুখের উচ্চারণ হলো অন্তরের আকুতির প্রকাশ মাত্র, তাই সালাতের সকল দোয়া যিক্র অবশ্যই অর্থের দিকে সার্বিক মনোযোগ দিয়ে, মনের আকুতি দিয়ে উচ্চারণ করতে হবে। তাহলেই আমরা আশানুরূপ ফল পেতে পারি।

৩০. দোয়ার পরে সালামের মাধ্যমে সালাত শেষ করতে হবে। ডান দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলতে হবে “আস্সালামু  আ‘লাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ’ অতঃপর বাম দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলতে হবে “আস্সালামু আ‘লাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ”।

৩১. সালামের সাথে সাথে সালাত শেষ হয়ে যায়। সালামের পরে নামাযের আর কোন কর্ম- ফরয, ওয়াজিব, সুন্নাত, মুস্তাহাব কিছুই বাকী থাকে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফরয সালাতের সালাম ফেরানোর পরে কখনো সাথে সাথে উঠে ঘরে চলে যেতেন। কখনো সালামের পরেই উঠে দাঁড়িয়ে ওয়ায করতেন। কখনো সালামের পরেই মুক্তাদীগণের দিকে ঘুরে বসে তাসবীহ তাহলীল ও দোয়া করতেন। “রাহে বেলায়াত” গ্রন্থে আমি ২৯ প্রকার মাসনূন মা’সূর যিক্র ও মুনাজাত উল্লেখ করেছি, যেগুলো রাসূলুল্লাহ  ও সাহাবীগণ পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের পরে পালন করতেন। আগ্রহী পাঠককে তা পড়তে, মুখস্থ করতে ও পালন করতে অনুরোধ করছি। এ বইয়ের শেষে অংশে আমরা এ জাতীয় কিছু যিক্র-মুনাজাত উল্লেখ করব ইনশা আল্লাহ্।

সালাতের কার্যাবলীর প্রকারভেদ

উপরে বর্ণিত নিয়মে রাসূলুল্লাহ  বা নামায আদায় করেছেন ও করতে নির্দেশ দিয়েছেন। উপরে বর্ণিত কাজগুলোর মধ্যে গুরুত্বের দিক থেকে পার্থক্য আছে। রাসূলুল্লাহ  শিক্ষার আলোকে মুসলিম উম্মাহর প্রাজ্ঞ ফকীহ ও ইমামগণ এ সকল কর্মের গুরুত্ব নির্ধারণ করেছেন ও  গুরুত্বের আলোকে ফরয, ওয়াজিব সন্নাত হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। গুরুত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে ইমাম ও ফকীহগণ অনেক মতবিরোধ করেছেন। আমাদের দেশের প্রচলিত মতানুসারে সালাতের ফরয ও ওয়াজিব বা জরুরী ও আবশ্যকীয় কাজগুলো নি¤œরূপ:

তাকবীরে তাহরীমা (আল্লাহু আকবার) বলে সালাত শুরু করা, দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করা, কিছু পরিমাণ কুরআন পাঠ করা, রুকু করা, সাজাদা করা ও সালাতের শেষে বসা সালাতের মধ্যে ফরয। ফরয-নফল সকল প্রকার সালাতেই এগুলো ফরয। তবে নফল সালাতের জন্য দাঁড়ানো ফরয নয়, উত্তম। কোন ফরয সালাত দাঁড়ানোর ক্ষমতা থাকা সত্বেও বসে আদায় করলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে। আর নফল সালাত বসে পালন করতে তা আদায় হবে, তবে মুসল্লী দাঁড়িয়ে আদায় করলে সে সাওয়াব অর্জন করতেন এর অর্ধেক সাওয়াব পাবেন।

সালাতের মধ্যে ওয়াজিব বা আবশ্যকীয় কাজের মধ্যে রয়েছে: সূরা ফাতিহা পাঠ করা, সূরা ফাতিহার পরে অন্য কোন সূরা বা কিছু পরিমাণ কুরআন পাঠ করা, সালাতের ফরযগুলো যথাযথ ক্রমসহ পালন করা, দুই রাক‘আত পূর্ণ করে বসা, দ্বিতীয় রাক‘আতে ও শেষ রাক‘আতে বসে “আত-তাহিয়্যাতু” পাঠ করা, “সালাম” বলে সালাত শেষ করা, ধীরে সুস্থে সালাত আদায় করা রুকু, সাজদা, রুকু থেকে উঠে ও দুই সাজদার মাঝে বসে স্থির ও শান্ত হওয়া। জামাতবদ্ধ সালাতে ইমামের জন্য ওয়াজিব হলো ফজর, মাগরিব, ইশা (প্রথম দুই রাক‘আতে), জুম‘আ ও ঈদের সালাতের মধ্যে সশব্দে বা জোরে কুরআন পাঠ করা। একাকী সালাত আদায় করলে এভাবে জোরে পড়া উত্তম ও সুন্নাত।

ফরয ওয়াজিব বাদে অন্য কাজগুলো সুন্নাত-মুসতাহাব বলে গণ্য করা হয়। ইতিপূর্বে বলেছি যে, এ গুরুত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে মতভেদ আছে, তবে সবগুলোই পালন করতে হবে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণে সালাত আদায় করতে হবে সে বিষয়ে কোন মতবিরোধ নেই। এজন্য মুমিনের উচিত উপরের নিয়ম পরিপূর্ণ পালন করে সালাত আদায় করা। ইচ্ছা করে কোনটিই বাদ না দেয়া। অক্ষমতার জন্য যে কোন ফরয, ওয়াজিব, সুন্নাত ত্যাগ করা যাবে। কিন্তু ইচ্ছা করে কোনটিই বাদ না দেয়া উচিত। অক্ষমতা ছাড়া ফরয ত্যাগ করলে সালাত নষ্ট হবে। ওয়াজিব কর্ম ভুলে নষ্ট হলে সালাতের শেষে দু’টি সাজদা সাহউ বা ভুলের সাজদা দিতে হবে। সুন্নাত, মুস্তাহাব ইত্যাদি ত্যাগ করলে অপরিসীম সাওয়াব থেকে বঞ্চিত হতে হবে। এছাড়া সুন্নাত-মুসতাহাব ত্যাগ করাকে রীতি বানালে বা সবসময় ত্যাগ করলে তা বড় অন্যায় হবে।

সালাতের প্রকারভেদ

সালাত, প্রার্থনা বা নামায সকল যুগের সকল মানুষের অন্যতম ইবাদত। মহান স্রষ্টাকে স্মরণ করার ও তাঁর কাছে প্রার্থনার মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি, করুণা ও ক্ষমা অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। সালাত মহান আল্লাহ্র সাথে বান্দার ঐকান্তিক সম্পর্কের অন্যতম পথ। সালাত মানুষের মানবিক মূল্যবোধ, কল্যাণমুখি আচরণ ও সুষম ভারসম্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব গঠনের প্রধান অবলম্বন।

মহান আল্লাহ্ তাঁর প্রিয় সৃষ্টি মানুষকে অত্যন্ত ভালবাসেন। তিনি মানুষের প্রশান্তি, পবিত্রতা, জাগতিক, মানসিক, আত্মিক ও পারলৌকিক কল্যাণের জন্য অতি প্রয়োজনীয় কিছু বিষয়কে তার জন্য ফরয বা অত্যাবশ্যকীয় বলে নির্দেশ দিয়েছেন। সেগুলো মধ্যে সালাত অন্যতম। মহান আল্লাহ্ মানুষের সার্বিক সফলতা ও কল্যাণ অর্জনের জন্য তার উপর প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ে নির্ধারিত পরিমাণ সালাত আদায় ফরয করেছেন।

উক্ত নির্ধারিত ফরয ছাড়াও এ মহাকল্যাণময় কর্মটিকে অতিরিক্ত পালনের জন্য উৎসাহ দিয়েছেন মহান আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল । মানুষ যত বেশি সালাত আদায় করবে ততবেশী কল্যাণ, বরকত, রহমত ও সাওয়াব অর্জন করবে।

ফরযের অতিরিক্ত কর্মকে “নফল” বলা হয়। কিছু সময়ে কিছু পরিমাণ “নফল” সালাত পালন করতে রাসূলুল্লাহ  উৎসাহ দিয়েছেন। এগুলোকে “সুন্নাত” ও বলা হয়। যে সকল নফল সালাতের বিষয়ে তিনি বেশী গুরুত্ব দিয়েছেন সেগুলোকে “সন্নাতে মুয়াক্কাদাহ” ও অন্যগুলোকে সুন্নাতে গাইর মুয়াক্কাদাহ বলা হয়। এ ধরণের কিছু সুন্নাত সালাত সম্পর্কে হাদীসে বেশী গুরুত্ব প্রদানের ফলে কোন ইমাম ও ফকীহ তাকে ওয়াজিব বলেছেন। এখানে সংক্ষেপে এগুলোর বিবরণ প্রদান করছি।

ফরয সালাত

পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে ১৭ রাক‘আত সালাত আদায় প্রত্যেক মুমিন নরনারীর জন্য ফরয: ফজরে ২, যোহরে ৪, আসরে ৪, মাগরীবে ৩ ও ইশায় ৪ রাক‘আত। প্রতি সপ্তাতের শুক্রবারে জুম‘আর নামায আদায় করা ফরয।

এখানে উল্লেখ্য যে, সফর বা ভ্রমণের অবস্থায় যোহর, আসর ও ইশার নামায দু রাক‘আত করে আদায় করা ফরয। কেউ নিজ স্থায়ী আবাসস্থল বা বাড়ি থেকে কমবেশি ৪৮ মাইল (প্রায় ৮০ কিলোমিটার) দূরে কোথাও সফরের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হলেই তিনি ইসলামী পরিভাষায় মুসাফির বা ভ্রমণকারী বলে বিবেচিত। বাড়িতে ফিরে আসা অথবা অন্য কোথাও ১৫ দিন বা এর বেশি সময় অবস্থানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত নে ব্যক্তি মুসাফির বা ভ্রমণরতব্যক্তি বলে বিবেচিত হবেন এবং এভাবে চার রাক‘আত বিশিষ্ট নামায ২ রাক‘আত আদায় করবেন। রাসূলুল্লাহ   সফররত অবস্থায় ফজরের দুই রাক‘আত সুন্নাত নামায ছাড়া কোনো সুন্নাত মুআক্কাদা নামায সাধারণত পড়তেন না।

ফরয কিফাইয়া সালাত: সালাতুল জানাযা

ফরয কিফাইয়া অর্থ সামষ্টিক ফরয। কিছু মানুষ আদায় করলে অন্যদের গোনাহ হবে না। তবে সাওয়াব পাবেন শুধু যিনি আদায় করলেন। পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামাযের পরেই অন্যতম ফরয ইবাদত হলো জানাযার নামায। আমাদের সমাজের অনেক ধার্মিক মুসলিম এ ইবাদতের ক্ষেত্রে অবহেলা করেন। অনেকে মনে করেন, যেহেতু ফরযে কেফায়া সেহেতু কেউ পালন করলেই তো হলো। এ হলো পলায়ন মনোবৃত্তি। মুমিনের এ দৃষ্টিতে দেখা উচিত নয়। মুমিন দেখবেন, এ কর্মে আল্লাহ্ কত খুশি হবেন এবং কত সাওয়াব, রহমত ও বরকত আমি লাভ করব। জানাযার নামাযের জন্য অচিন্তনীয় সাওয়াব ও বরকতের কথা বিভিন্ন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ  বলেন, যে ব্যক্তি (নিয়মিত) নফল রোযা পালন করবে, দরিদ্রকে সাহায্য করবে বা খাওয়াবে, অসুস্থ মানুষকে দেখতে যাবে ও জানাযায় শরীক হবে, সে ব্যক্তি জান্নাতী হবে।

৪টি তাকবীর ও সালামের মাধ্যমে এ নামায আদায় করা হয়। ইমাম ও মুক্তাদীগণ সকলেই এ তাকবীরগুলো ও সালাম মুখে উচ্চারণ করবেন। প্রথমে মৃতের জন্য দোয়া করার আন্তরিক আবেগ ও মনের সংকল্প (নিয়্যাত) সহ তাকবীরে তাহরীমার মাধ্যমে নামায শুরু করবেন। তাকবীরে তাহরীমার পরে সানা পাঠ করবেন। এ সময়ে সূরা ফাতিহা পাঠের কথা সহীহ হাদীসে বলা হয়েছে। হানাফী ফিকহের সকল গ্রন্থেই সূরা ফাতিহা পাঠ অনুমোদন করা হয়েছে। তারপর দ্বিতীয় তাকবীরের পরে উপরে উল্লেখিত দরুদে ইবরাহীমী পাঠ করবেন। তারপর তৃতীয় তাকবীর বলে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করবেন। তারপর ৪র্থ তাকবীর বলবেন। তারপর সালামের মাধ্যমে নামায শেষ করবেন।

জানাযার নামাযের তৃতীয় তাকবীরের পরে রাসূলুল্লাহ  বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দোয়া পাঠ করতেন। যে কোনো দোয়া পাঠ করলে, বা শুধুমাত্র (اللهم اغفر له) (আল্লা-হুম্মাগফিরলাহু) “আল্লাহ্ তাকে মাফ করে দিন” বললেই দোয়ার ন্যূনতম দায়িত্ব পলিত হবে। তবে মুমিনের উচিত একাধিক মাসনূন দোয়া মুখস্থ করে তা এ সময়ে পাঠ করা।

জানাযার মাসনূন দোয়া-১

اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ وَعَافِهِ وَاعْفُ عَنْهُ وَأَكْرِمْ نُزُلَهُ وَوَسِّعْ مُدْخَلَهُ وَاغْسِلْهُ بِالْمَاءِ وَالثَّلْجِ وَالْبَرَدِ وَنَقِّهِ مِنَ الْخَطَايَا كَمَا نَقَّيْتَ الثَّوْبَ الأَبْيَضَ مِنَ الدَّنَسِ وَأَبْدِلْهُ دَارًا خَيْرًا مِنْ دَارِهِ وَأَهْلا خَيْرًا مِنْ أَهْلِهِ وَزَوْجًا خَيْرًا مِنْ زَوْجِهِ وَأَدْخِلْهُ الْجَنَّةَ وَأَعِذْهُ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ [أَوْ مِنْ عَذَابِ النارِ]

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মাগফির লাহূ, ওয়ার‘হামহূ, ওয়া‘আ-ফিহী, ওয়া‘অ্ফু ‘আনহু, ওয়া আকরিম নুযুলাহূ, ওয়া ওয়াসসি‘য় মুদখালাহূ, ওয়াগসিলহু বিলমা-ই ওয়াস্সালজি ওয়াল বারাদি। ওয়া নাক্বক্বিহী মিনাল খাতা-ইয়া- কামা- নাক্বক্বাইতাস সাওবাল আবইয়াদ্বা মিনাদ দানাস। ওয়া আবদিলহূ দা-রান খাইরাম মিন দা-রিহী, ওয়া আহলান খাইরাম মিন আহলিহী, ওয়া যাওজান খাইরাম মিন যাওজিহী, ওয়া আদখিলহুল জান্নাতা ওয়া আ‘ইযহু মিন আযাবিল ক্বাবরি (আযাবিন না-র)।

অর্থ : “হে আল্লাহ্, আপনি তাকে ক্ষমা করুন, রহমত করুন, নিরাপত্তা দান করুন, তাকে মাফ করে দিন, তাকে সম্মানের সাথে আপনার কাছে স্থান দান করুন, তার প্রবেশস্থান (আবাসস্থান) প্রশস্ত করুন, তাকে পানি, বরফ ও শীল দিয়ে ধৌত করুন, তাকে পাপরাশি থেকে এমনভাবে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন করুন যেভাবে সাদা কাপড়কে ময়লা থেকে পরিচ্ছন্ন ও ঝকঝকে করেছেন। তাকে দান করুন তার (ফেলে যাওয়া) বাড়ির চেয়ে উত্তম বাড়ি, তার পরিজনের চেয়ে উত্তম পরিজন, তার দাম্পত্য সঙ্গীর চেয়ে উত্তম সঙ্গী। তাকে আপনি জান্নাত প্রদান করুন এবং কবরের বা জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করুন।”

জানাযার মাসনূন দোয়া-২

اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِحَيِّنَا وَمَيِّتِنَا وَشَاهِدِنَا وَغَائِبِنَا وَصَغِيرِنَا وَكَبِيرِنَا وَذَكَرِنَا وَأُنْثَانَا. اللَّهُمَّ مَنْ أَحْيَيْتَهُ مِنَّا فَأَحْيِهِ عَلَى الإِسْلامِ وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلَى الإِيمَانِ

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মাগফিরলি ‘হাইয়িনা- ওয়ামাইয়িতিনা- ওয়া শা-হিদিনা- ওয়াগা-ইবিনা- ওয়া স্বাগীরিনা- ওয়া কাবীরিনা- ওয়া যাকারিনা ওয়া উনসা-না। আল্লা-হুম্মা, মান আ‘হইয়াইতাহূ মিন্না- ফাআ‘হয়িহী ‘আলাল ইসলা-ম। ওয়ামান তাওয়াফফাইতাহূ মিন্না- ফাতাওয়াফফাহু ‘আলাল ঈমা-ন।

অর্থ : “হে আল্লাহ্, আপনি ক্ষমা করুন আমাদের মৃতকে এবং জীবিতকে, উপস্থিতকে এবং অনুপস্থিতকে, ছোটকে এবং বড়কে, পুরুষকে এবং নারীকে। হে আল্লাহ্, আমাদের মধ্য থেকে যাকে আপনি জীবিত রাখবেন, তাকে ইসলামের উপর জীবিত রাখুন এবং যাকে আপনি মৃত্যু দান করবেন, তাকে আপনি ঈমানের উপর মৃত্যু দান করুন।”

জানাযার মাসনূন দোয়া-৩

اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبُّهَا وَأَنْتَ خَلَقْتَهَا وَأَنْتَ هَدَيْتَهَا لِلإِسْلامِ وَأَنْتَ قَبَضْتَ رُوحَهَا وَأَنْتَ أَعْلَمُ بِسِرِّهَا وَعَلَانِيَتِهَا جِئْنَاكَ شُفَعَاءَ فَاغْفِرْ لَهُا

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা, আনতা রাব্বুহা-, ওয়া আনতা খালাক্বতাহা-, ওয়া আনতা হাদাইতাহা- লিল ইসলা-ম, ওয়া আনতা ক্বাবাদ্বতা রূহাহা-, তা‘অ্লামু সিররাহা ওয়া ‘আলা-নিয়্যাতাহা-, জিয়্না শুফা‘আ-আ ফাগফির লাহা-।

অর্থ : “হে আল্লাহ্, আপনি তার প্রভু, আপনিই তাকে সৃষ্টি করেছেন, আপনিই তাকে ইসলামের পথ প্রদর্শন করেছেন, আপনিই তার রূহ গ্রহণ করেছেন, আপনি তার গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছু জানেন। আমরা তার জন্য সুপারিশ করতে এসেছি, অতএব আপনি তাকে ক্ষমা করে দেন।”

জানাযার মাসনূন দোয়া-৪

হাসান বসরী (রহ) শিশুর জানাযায় সূরা ফাতিহা এবং এ দোয়াটি পড়তেন:

اللهم اجُعَلْهُ لَنَا فَرَطًا وَّسَلَفًا وَّأَجْرًا

উচ্চারণ: “আল্লা-হুম্মাজ‘আলহূ লানা- ফারাত্বাও ওয়া সালাফাও ওয়া আজরান।”

অর্থ : “হে আল্লাহ্, আপনি তাকে  আমাদের জন্য (জান্নাতের দিকে) অগ্রবর্তী, অগ্রগামী ও পুরস্কার হিসাবে সংরক্ষিত করুন।”

ওয়াজিব ও সুন্নাত সালাত

সালাতুল ঈদ

ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার সালাত মুসলিম উম্মাহর বিশেষ সালাত। দু রাক‘আত করে সালাত প্রতি ঈদে আদায় করতে হয়। উপরে বর্ণিত নিয়মে সালাত আদায় করতে হবে। ব্যতিক্রম অতিরিক্ত তাকবীর। তাকবীরের সংখ্যা ও নিয়ম সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ  ও সাহাবীগণ থেকে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। আমাদের দেশে সাধারণভাবে প্রচলিত অতিরিক্ত ছয় তাকবীরের বিষয়টি বিভিন্ন সাহাবী থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে। এ বর্ণনা অনুযায়ী প্রথম রাক‘আতে তাকবীরে তাহরীমার পরে সানা পাঠ শেষ হলে তিনটি অতিরিক্ত তাকবীর বলতে হবে। দ্বিতীয় রাক‘আতে সূরা পাঠ শেষে রুকুতে যাওয়ার আগে অতিরিক্ত ৩টি তাকবীর বলে ৪র্থ তাকবীর বলে রুকুতে যেতে হবে।

ঈদের দিন সকাল সকাল গোসল করে, সুন্দর পোশাক পরে, আতর মেখে তাকবীর বলতে বলতে ঈদের মাঠে যাওয়া, সালাতের পরে অন্য পথে বাড়ীতে ফেরা, সবার সাথে দেখা সাক্ষাত করে শুভেচ্ছা বিনিময় করা সুন্নাত। ঈদুল ফিতরের দিন সালাতের আগে কয়েকটি খেজুর বা অন্য কিছু খেয়ে যাওয়া ও ঈদুল আযহার দিন তাড়াতাড়ি সালাত সেরে কুরবানী করে কুরবানীর গোশত দিয়ে দিনের প্রথম খাওয়া শুরু করা সুন্নাত।

সমাজের সচ্ছল ও অসচ্ছল সকল মানুষই যাতে ঈদের আনন্দে শরীক হতে পারে এজন্য দু’টি ঈদের সাথে সম্পৃক্ত দু’টি ওয়াজিব ইবাদত রয়েছে, দু’টিই দান ও সামাজিক সহযোগিতা বিষয়ক। একটি কুরবানী ও অন্যটি ফিতরা। ঈদুল আযহা বা কুরবানীর ঈদে কুরবানী দেয়া সক্ষম মুসলিমের জন্য ওয়াজিব। যদি কোনো মুসলিমের কাছে ঈদের দিন নিজের বাড়ি ও আবশ্যকীয় দ্রব্যাদি বাদে নগদ ১২/১৩ হাজার টাকা (যাকাতের নিসাব) বা এ পরিমান টাকার মাঠান জমিন বা অন্য সম্পত্তি আছে তার জন্য কুরবানী দেয়া জরুরী। দরিদ্র ব্যক্তি কুরবানী দিলে তিনি সাওয়াব পাবেন, তবে তাঁর জন্য তা ওয়াজিব নয়। নিজের পক্ষ থেকে কুরবানী দেয়ার পরে মাতাপিতা ও অন্যদের পক্ষ থেকে কুরবানী দেয়া যায়।

ছাগল, ভেড়া ইত্যাদির ক্ষেত্রে ন্যূনতম ১ বছর ও গরুর ক্ষেত্রে ন্যূনতম ২ বছর বয়সের বাহ্যিক দোষত্র“টি মুক্ত সুন্দর ও সবল জানোয়ার জবাই করতে হবে। একান্তই আল্লাহ্র নির্দেশ পালন করে আল্লাহ্কে খুশি করার উদ্দেশ্যে কুরবানী দিতে হবে। কুরবানীর গোশত নিজেরা খেতে হবে এবং আত্মীয় ও দরিদ্রদেরকে প্রদান করতে হবে। ঈদের দিন ঈদের নামাযের পর থেকে পরের দুই দিন পর্যন্ত কুরবানী দেয়া যায়।

ঈদুর ফিতরের সাথে সম্পৃক্ত ইবাদত হলো যাকাতুল ফিতর বা ফিতরা প্রদান। ঈদুল ফিতরের দিন সকালে যে ব্যক্তির কাছে উপরের নিয়মে ১২ হাজার টাকা বা সেই মূল্যের জমিন বা সম্পত্তি আছে তার জন্য ফিতরা প্রদান করা ওয়াজিব। ঈদের দিন ঈদের নামাযের আগেই ফিতরা প্রদান করতে হবে। আরো আগে প্রদান করা যায়। বিভিন্ন হাদীসের নির্দেশ অনুসারে পরিবারের সকল সদস্যের পক্ষ থেকেই ফিতরা দিতে হবে। প্রত্যেকের জন্য এক সা’ বা প্রায় তিন কেজি যব, খেজুর, কিসমিস বা পনির দরিদ্রদেরকে প্রদান করতে হবে। গমের ক্ষেত্রে আধা সা’ বা দেড় কেজি গম প্রদান করলেও চলবে।

সালাতুল বিতর

পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের অতিরিক্ত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সালাত “সালাতুল বিতর” হাদীস শরীফে তার বিশেষ গুরুত্ব বর্ণনা করার কারণে এ সালাতকে “ওয়াজিব” বলা হয়। ইশার সালাতের পর থেকে ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বিতির নামাযের সময়। বিতির নামায আদায়ের সর্বোত্তম সময় হলো শেষ রাত্র। শেষ রাত্রে তাহাজ্জুদ নামাযের শেষে বিতির আদায় করা বেশি সাওয়াবের এবং রাসূলুল্লাহ -এর আচরিত সুন্নাত। তবে কেউ শেষ রাতে উঠতে পারবেন না বলে সন্দেহ করলে তাঁর জন্য ঘুমানোর আগে বিতির আদায় করা ভালো।

আমরা সাধারণত ইশা’র নামাযের পরপরই বিতির আদায় করে নেই। এতে কোনো দোষ নেই, তবে আমরা দু’টি উত্তম সময়ের কোনোটিরই বরকত অর্জন করতে পারলাম না। যারা শেষ রাতে উঠতে পারবেন না বলে ভয় পান তাদের উচিত রাত ১০ বা ১১ টা বা যখনই ঘুমাতে যাওয়ার সময় হবে, তখন ওযু করে সম্ভব হলে কয়েক রাক’আত নফল নামায আদায় করে তারপর বিতির আদায় করে ঘুমাতে যাওয়া। কারণ শেষ রাতে বিতর আদায় করতে না পারলে ঘুমানোর আগে তা আদায় করা উত্তম। এছাড়া ঘুমানোর পূর্বে বিতরের পূর্বে ২/৪ রাক‘আত নফল সালাত আদায় করে বিতর আদায় করলে সালাতুল্লাইল বা তাহাজ্জুদের নামাযের সাওয়াব পাওয়া যাবে।

সর্বোপরি এভাবে ঘুমানোর আগে বিতর আদায় করলে ওযু অবস্থায় ঘুমাতে যাওয়ার জন্য বিশেষ সাওয়াব লাভ হবে। রাসূলুল্লাহ () বলেছেন : “তোমরা তোমাদের দেহগুলোকে পবিত্র রাখবে, আল্লাহ্ তোমাদের পাবিত্র করুন। যদি কোনো বান্দা ওযু অবস্থায় ঘুমান, তাহলে তার পোশাকের মধ্যে একজন ফিরিশতা শুয়ে থাকেন। রাত্রে যখনই এ ব্যক্তি নড়াচড়া করে তখনই এ ফিরিশতা বলেন : হে আল্লাহ্ আপনি এ ব্যক্তিকে ক্ষমা করে দিন, কারণ সে ওযু অবস্থায় ঘুমিয়েছে।”   অন্য হাদীসে তিনি বলেছেন : “যে কোনো মুসলিম যদি ওযু অবস্থায় (আল্লাহ্র যিকিরের উপর) ঘুমায় ; তারপর রাত্রে কোনো সময় হঠাৎ তাঁর ঘুম ভেঙ্গে যায় এবং সে (সে অবস্থায় শুয়ে শুয়ে) আল্লাহ্র কাছে তাঁর জাগতিক বা পারলৌকিক কোনো কল্যাণ কামনা করে, তাহলে আল্লাহ্ তাকে তাঁর প্রার্থিত বস্তু দিবেনই।”

হাদীসের পরিভাষায় বিতরের পূর্বের তাহাজ্জুদ (কিয়ামুল্লাইল) সহ পুরো সালাতকেই “বিতর” বলা হয়। হাদীসে সালাতুল বিতরের বিভিন্ন পদ্ধতি ও রাকআত সংখ্যা বর্ণিত হয়েছে। বিভিন্ন হাদীসে শুধু তিন রাকআত বিতর আদায় না করে বিতরের পূর্বে ২/৪ রাকআত সালাত আদায় করতে উৎসাহ দেয়া হয়েছে। আবূ দাউদ সংকলিত সহীহ হাদীসে আয়েশা (রা) উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ () ৪+৩=৭ রাকআতের কম বিতর পড়তেন না।

বিতরের বিশেষ ইবাদত “কুনুত” কুনুত অর্থ দোয়া বা সকাতর প্রার্থনা। সালাতুল বিতরের শেষ রাক‘আতে রুকুর আগে দোয়া করতে হয় বা কুনুত পাঠ করতে হয়। উবাই ইবনে কা’বা (রা.) বলেছেন : রাসূলুল্লাহ  তিন রাক’আত বিতির নামাজ আদায় করতেন। প্রথম রাক’আতে সূরা আ’লা, দ্বিতীয় রাক’আতে সূরা কাফিরূন ও তৃতীয় রাক’আতে সূরা ইখলাস পাঠ করতেন। রুকুর পূর্বে কুনূত পাঠ করতেন। বিতির শেষ করে তিনি তিন বার বলতেন ‘সুবহানাল মালিকুল কুদ্দুস’, শেষবারে টেনে বলতেন।”

যে কোন প্রকার দোয়া পাঠ করলেই কুনুত আদায় হবে। (رَبِّ اغْفِر لِيْ) “রাব্বিগফিরলী” বললেও চলবে। ইমাম আবু হানীফা, আবু ইউসূফ ও মুহাম্মাদ (রাহ) বলেছেন: কুনুতের জন্য কোন নির্ধারিত দোয়া নেই বা নির্ধারিত করা যাবে না। কারণ সবসময়ের জন্য একটি দোয়া নির্দিষ্ট করে নিলে সে দোয়াটি অতি সহজেই মুসল্লাীর যবানে উচ্চারিত হতে থাকে, বেছে নেয়া ও মনোযোগ দানের প্রয়োজন হয় না, এতে অন্তরের নম্রতা, বিনয় ও আকুতি নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া যেহেতু রাসূলুল্লাহ  ও সাহাবীগণ সর্বদা একই দোয়া পাঠ করতেন না, সেহেতু সর্বদা একই দোয়া পাঠ না করা উচিত। এজন্য উত্তম হলো কুনুতের শুরুতে আল্লাহ্র প্রশংসা, ও রাসূলুল্লাহ -এর উপর দরুদ পাঠ করা। তারপর যে কোনো দোয়া করা।

তবে এ সময়ে রাসূলুল্লাহ  কুনুতের জন্য যে দোয়াগুলো পাঠ করতেন তা পাঠ করা উত্তম। এখানে কুনুতের দু’টি মাসনূন দোয়া উল্লেখ করছি। আমাদের উচিত অর্থের দিকে লক্ষ্য রেখে একেক সময় তাকে কটি বা দু’টি একত্রে পাঠ করা।

মাসনূন কুনুত-১

اَللَّهُمَّ إِنَّا نَسْتَعِيْنُكَ وَنَسْتَغْفِرُكَ وَنُؤْمِنُ بِكَ وَنَتَوَكَّلُ عَلَيْكَ وَنُثْنِيْ عَلَيْكَ الْخَيْرَ. وَنَشْكُرُكَ وَلاَ نَكْفُرُكَ وَنَخْلَعُ ونَتْرُكُ مَنْ يَفْجُرُكَ. اَللَّهُمَّ إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَلَكَ نُصَلِّيْ وَنَسْجُدُ وَإِلَيْكَ نَسْعَى وَنَحْفِدُ. وَنَرْجُوْ رَحْمَتَكَ وَنَخْشَى عَذَابَكَ، إِنَّ عَذَابَكَ بِالْكُفَّارِ مُلْحِقٌ.

উচ্চারণ: “আল্লা-হুম্মা ইন্না- নাসতা‘ঈনুকা, ওয়া নাসতা‘গফিরুকা, ওয়া নুঅ্মিনু বিকা, ওয়া নাতাওয়াক্কালূ ‘আলাইকা, ওয়া নুসনী ‘আলাইকাল খাইরা। ওয়া নাশকুরুকা, ওয়ালা- নাকফুরুকা, ওয়া নাখলা‘উ ওয়া নাতরুকু মাইঁ ইয়াফজুরুকা। আল্লা-হুম্মা ইয়ইয়া-কা না‘অ্বুদু, ওয়া লাকা নুস্বাল্লী ওয়া নাসজুদু, ওয়া ইলাইকা নাস‘আ- ওয়া না‘হফিদু, ওয়া নারজূ বা‘হমাতাকা, ওয়া নাখশা- ‘আযা-বাকা; ইন্না ‘আযা-বাকা বিল কুফফা-রি মুল‘িহক।

অর্থ: হে আল্লাহ্, নিশ্চয় আমরা আপনারই কাছে সাহায্য চাই, এবং আপনারই কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি, এবং আপনারই উপর বিশ্বাস স্থাপন করি, এবং আপনারই উপর নির্ভর করি, এবং আপনার প্রশংসার গুণবর্ণনা করি। এবং আমরা আপনার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি, এবং আমরা আপনার অকৃতজ্ঞতা করি না। আর আমরা দূর করে দিই এবং পরিত্যাগ করি তাদেরকে যারা আপনার অবাধ্য ও অন্যায়ে লিপ্ত। হে আল্লাহ্, শুধু আপনারই আমরা ইবাদত করি, এবং আপনারই জন্য সালাত পালন করি, এবং শুধু আপনার জন্যই সাজদা করি। এবং আপনার দিকেই আমার দিকে আমরা ছুটে চলি এবং আপনারই সেবা করি। আমরা আপনার করুণা আশা করি, এবং আপনার শাস্তিকে ভয় পাই। নিশ্চয় আপনার শাস্তি অবিশ্বাসীগণের উপর নিপতিত হবে।

মাসনূন কুনুত-২

اللَّهُمَّ اهْدِنِي فِيمَنْ هَدَيْتَ وَعَافِنِي فِيمَنْ عَافَيْتَ وَتَوَلَّنِي فِيمَنْ تَوَلَّيْتَ وَبَارِكْ لِي فِيمَا أَعْطَيْتَ وَقِنِي شَرَّ مَا قَضَيْتَ فَإِنَّكَ تَقْضِي وَلا يُقْضَى عَلَيْكَ وَإِنَّهُ لا يَذِلُّ مَنْ وَالَيْتَ وَلا يَعِزُّ مَنْ عَادَيْتَ  تَبَارَكْتَ رَبَّنَا وَتَعَالَيْتَ

উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মাহ্ দিনী ফীমান হাদাইতা, ওয়া ‘আ-ফিনী ফীমান ‘আ-ফাইতা, ওয়া তাওয়াল্লানী ফীমান তাওয়াল্লাইতা, ওয়া বা-রিক লী ফীমা- আ‘অ্ তাইতা, ওয়া ক্বিনী র্শারা ক্বাদ্বাইতা, ফাইন্নাকা তাক্বদ্বাী, ওয়ালা- ইউক্বদ্বা ‘আলাইকা, ইন্নাহু লা- ইয়াযিল্লু মান ওয়া-লাইতা, [ওয়ালা- ইয়া‘ইয্যু মান ‘আ-দাইতা] , তাবা-রাক্তা রাব্বানা- ওয়া তা‘আ-লাইতা।

অর্থ: “হে আল্লাহ্, আমাকে হেদায়েত প্রদান করুন, যাঁদেরকে আপনি হেদায়েত করেছেন তাদের সাথে। আমাকে পরিপূর্ণ নিরাপত্তা ও সুস্থতা দান করুন, যাদেরকে আপনি নিরাপত্তা দান করেছেন তাদের সাথে। আমাকে ওলী হিসাবে গ্রহণ করুন (আমার অভিভাবকত্ব গ্রহণ করুন), যাদেরকে আপনি ওলী হিসাবে গ্রহণ করেছেন তাঁদের সাথে। আপনি আমাকে যা কিছু প্রদান করেছেন তাতে বরকত প্রদান করুন। আপনি যা কিছু আমার ভাগ্যে নির্ধারণ করেছেন এর অকল্যাণ থেকে আমাকে রক্ষা করুন। কারণ আপনিই তো ভাগ্য নির্ধারণ করেন, আপনার বিষয় কেউ নির্ধারণ করে দিতে পারে না। আপনি যাকে ওলী হিসাবে গ্রহণ করেছেন সে অপমানিত হবে না। আর আপনি যাকে শত্র“ হিসাবে গ্রহণ করেছেন সে কখনো সম্মানিত হবে না। মহা মহিমান্বিত বরকতময় আপনি, হে আমাদের প্রভু, এবং মহামর্যাদাময় ও সর্বোচ্চ আপনি।”

এছাড়া যে কোন মাসনূন দোয়া কুনুত হিসাবে পাঠ করা যায়।

পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের আগে পরের সুন্নাত সালাত

পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামাযের আগে পরে ১২ রাক‘আত নামায রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিয়মিত পড়তেন ও পড়তে উৎসাহ প্রদান করেছেন। তিনি বলেছেন, যদি কেউ নিয়মিত এ ১২ রাক‘আত সালাত আদায় করে, তাহলে আল্লাহ্ তার জন্য জান্নাতে বাড়ী বানিয়ে রাখবেন। ফজরের আগে ২, যোহরের আগে ৪, পরে ২, মাগরীবের পরে ২ ও ইশার পরে ২ রাক‘আত। এছাড়া জুম‘আর নামাযের পরে তিনি ৪ রাক‘আত বা ২ রাক‘আত নামায আদায় করতেন বলে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।

পাঁচ ওয়াক্ত ফরয সালাতের আগে ও পরের এ ১২ রাক‘আত সুন্নাত সালাত রাসূলুল্লাহ  বাড়ীতে আদায় করতেন। আগের সুন্নাত ঘরে আদায় করে মসজিদে যেয়ে জামাতে ফরয সালাত আদায় করতেন। তারপর ঘরে ফিরে পরের সুন্নাত আদায় করতেন। সুন্নাত সালাতগুলো নিজের বাড়িতে আদায় করা উত্তম ও সুন্নাত। তবে মসজিদে আদায় করলেও অসুবিধা নেই। মসজিদে সুন্নাত আদায় করলে ফরয সালাতের পরে ফরযের স্থান থেকে আগে-পিছে বা ডানে-বামে সরে সুন্নাত আদায় করা উত্তম। ইমাম আবু হানীফা (রা.) উল্লেখ করেছেন যে, ইমামের জন্য যে স্থানে দাঁড়িয়ে ফরয পড়েছেন সে স্থানে দাঁড়িয়ে সুন্নাত আদায় করা মাকরুহ। মুক্তাদীদের জন্য স্থান পরিবর্তন উত্তম ও মুসতাহাব।

কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদের সালাত

মুমিনের জীবনে সর্বোত্তম ও মহোত্তম সুন্নাত সালাত হলো রাতের নফল নামায। তাকে  কিয়ামুল্লাইল, সালাতুল লাইল বা তাহাজ্জুদের সালাত বলা হয়। রাসূলুল্লাহ  বলেছেন, রমযানের ফরয সিয়াম বা রোযার পরে সর্বোত্তম রোযা হলো মুহাররাম মাসের সিয়াম। আর ফরয সালাতের পরে সর্বোত্তম সালাত হলো রাতের সালাত।

ইশার সালাতের পর থেকে ফজরের সালাতের ওয়াক্ত শুরুর পূর্ব পর্যন্ত যা কিছু “নফল” বা অতিরিক্ত নামায আদায় করা হবে সবই “রাতের সালাত” বলে গণ্য হবে। রাতে কিছু সময় ঘুমিয়ে উঠে সালাত আদায় করলে তাকে “তাহাজ্জুদের সালাত” বলা হয়।

সকল যুগের সকল বিশ্বাসীর অন্যতম ইবাদত, অন্যতম যিক্র ও অন্যতম আনন্দ রাতের নামায বা তাহাজ্জুদের নামায। কুরআন কারীমে কোনো নফল নামাযের উল্লেখ করা হয়নি, এএইকি পাঁচ ওয়াক্ত নামাযেরও বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়নি। কিন্তু রাতের বা তাহাজ্জুদের নামাযের কথা বারংবার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ও মুমিন জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআন ও হাদীসের নির্দেশনার দিকে দৃষ্টি দিলে আমরা নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারি যে, রাতের একাকী মুহূর্তে কিছু সময় আল্লাহ্র যিকিরে, তাঁর সাথে মুনাজাতে এবং তাঁরই (আল্লাহ্র) আরাধনায় ব্যয় করা মুমিনের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এছাড়া বিশ্বাসী জীবন পূর্ণতা পায় না।

রাসূলুল্লাহ  সাধারণত কখনোই তাহাজ্জুদের নামায ত্যাগ করতেন না। সাহাবীগণকে তিনি নিয়মিত তাহাজ্জুদ আদায়ের উৎসাহ প্রদান করতেন এবং তাহাজ্জুদ পরিত্যাগ করতে নিষেধ করতেন।

আয়েশা (রা) বলেন: “কখনো রাতের সালাত (তাহাজ্জুদ) ত্যাগ করবে না; কারণ রাসূলুল্লাহ () কখনো তা ত্যাগ করতেন না। যদি কখনো অসুস্থ বা ক্লান্ত থাকতেন তাহলে তিনি বসে তা আদায় করতেন।”

অনেক হাদীসে আমরা দেখতে পাই যে, কোনো সাহাবী তাহাজ্জুদ পালনে সামান্য অবহেলা করলে রাসূলুল্লাহ  আপত্তি করেছেন।

তাহাজ্জুদের ফযীলত, গুরুত্ব, সাওয়াব ও রূহানী প্রভাব সম্পর্কিত হাদীস আলোচনার জন্য একটি বৃহৎ বইয়ের প্রয়োজন। ফরয নামাযের পরে সকল সুন্নাত-নফল নামাযের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ নামায রাতের নামায। রাতের নামায জান্নাতের অন্যতম ওসীলা ও জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদার মাধ্যম। রাতের নামায সকল যুগের সকল উম্মতের নেককার আল্লাহ্ওয়ালা মানুষদের প্রধান বৈশিষ্ট্য, দু রাক’আত তাহাজ্জুদও যিনি আদায় করেন তিনি আল্লাহ্র শ্রেষ্ঠ যিক্রকারী বলে গণ্য হন- ইত্যাদি অগণিত হাদীসের বিস্তারিত আলোচনা আমাদের এ বইয়ের পরিসরে সম্ভব নয়।

রাসূলুল্লাহ  সাধারণত ‘বিতির’-সহ মোট এগার রাক’আত তাহাজ্জুদ আদায় করতেন। কখনো তের রাকআত আদায় করতেন। সুনানে আবূ দাউদের সংকলিত সহীহ হাদীসে আয়েশা (রা) বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ () চার রাকআত সালাতুল্লাহই ও তিন রাকআত বিতর মোট সাত রাকআতের কম তাহাজ্জুদ আদায় করতেন না। তিনি অধিকাংশ সময় শেষ রাতে তাহাজ্জুদ আদায় করতেন। তিনি তাহাজ্জুদের আগে অনেক সময় কুর’আনের কিছু আয়াত তিলাওয়াত করতেন। কখনো কিছু তাসবীহ, তাহলীল ইত্যাদি যিক্র করার পর তাহাজ্জুদ শুরু করতেন। তিনি তাহাজ্জুদের নামাযের তিলাওয়াত খুব লম্বা করতেন। এক রাক’আতে অনেক সময় ৪/৫ পারা কুরআন তিলাওয়াত করতেন। রুকু ও সাজদাও অনুরূপভাবে দীর্ঘ করতেন। যতক্ষণ তিনি তিলাওয়াত করতেন প্রায় ততক্ষণ রুকুতে ও সাজদায় থাকতেন। আর তিলাওয়াতের সময় তিনি কুরআনের আয়াতের অর্থ অনুসারে থেমে থেমে দোয়া করতেন। তাহাজ্জুদের নামাযের মধ্যে তিনি ক্রন্দন করতেন। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে তাহাজ্জুদ আদায় করার কারণে অনেক সময় তাঁর মুবারক পদযুগল ফুলে যেত।

প্রত্যেক মুমিনের উচিত তাহাজ্জুদ পালনে সচেষ্ট হওয়া। শেষ রাতে তাহাজ্জুদ আদায়ে অসুবিধা হলে, ঘুমাতে যাওয়ার আগে সাধ্যমত ২/৪/৮ রাক‘আত সালাত আদায় করে তারপর বিতর আদায় করবেন। তারপর মনের আবেগ ও ভালবাসা দিয়ে আল্লাহ্র কাছে সারাদিনের নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, নিজের, বন্ধুদের ও শত্র“দের পাপের জন্য ক্ষমা চেয়ে, গমস্যাদির জন্য সাহায্য চেয়ে এবং তাঁর সার্বিক রহমত ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করে ঘুমাতে যাবেন। আল্লাহ্ আমাদেরকে তাওফীক দান করেন।

রমযান মাসের কিয়ামুল লাইল বা তারাবীহ

এভাবে আমরা দেখছি যে, রাতের সালাত, অর্থাৎ কিয়ামুল লাইল বা সালাতুল লাইল বা তাহাজ্জুদ সারা বছর নিয়মিত পালন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত। রমযান মাসে রাতের সালাতের গুরুত্ব আরো বেড়ে যায়। রমযান মাসের কিয়ামুল্লাইল সাধারণত “তারাবীহ” নামে পরিচিত। রাসূলুল্লাহ  বিভিন্ন হাদীসে বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করেছেন রমযানে এ সালাত আদায়ের জন্য। তিনি সাধারণত সারা বছরই মাঝরাতে বা শেষ রাতে এ সালাত আদায় করতেন। অনেক সাহাবী  প্রথম রাতেই ইশার সালাতের পরে তা আদায় করতেন। রাসূলুল্লাহ  রমযান মাসে ৩/৪ দিন জামাতে এ সালাত আদায় করেন। তারপর তিনি ফরয হয়ে যাওয়ার ভয়ে জামাত বন্ধ করে দেন এবং একাকী আদায়ের নির্দেশ দেন।

তাঁর ইন্তেকালের পরে আবু বকর (রা) প্রায় দুই বছর খলিফা ছিলেন। তারপর উমর (রা) খলিফা হন। তিনি দেখেন যে, অনেকে ইশার সালাতের পরেই একাকী বা ছোট জামাতে কিয়ামুল্লাইল পালন করেন। উমর (রা) শেষ রাতে কিয়ামুল্লাইল আদায় করা বেশী ভালবাসতেন। তবুও যারা প্রথম রাতেই কিয়ামুল্লাইল আদায় করতেন তাঁদের জন্য তিনি দু’জন কারী (হাফিজ) ইমাম ঠিক করে দেন: একজন পুরুষদেরকে এবং অন্যজন মেয়েদেরকে জামাতে কিয়ামুল্লাইল পড়াতেন। তাঁরা দীর্ঘ কিরা‘আত দিয়ে তারাবীহ আদায় করতেন। তাঁদের জামাত ইশার পরে শুরু হলেও শেষ হতে প্রায় ভোর হয়ে যেত। তারাবীহ শেষ করে কোন রকমে সাহরী খাওয়ার সুযোগ থাকত।

তাঁরা বিতর সহ ১১ বা ২৩ রাক‘আত কিয়ামুল্লাইল (তারাবীহ) আদায় করতেন। পরবর্তী কালে সাহাবী, তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীগণের মধ্যে ২৩ রাক‘আত কিয়ামুল্লাইল পালনের প্রচলন ছিল। কিয়ামুল্লাইল বা তারাবীহর সালাতের মধ্যে পূর্ণ কুরআন কারীম একাধিকবার বা অন্তত একবার খতম করা তাঁরা পছন্দ করতেন। যেহেতু দীর্ঘ কিরা‘আত পড়া হতো এজন্য ৪ রাক‘আত পরে বেশ অনেকক্ষণ বিশ্রাম করতেন। এজন্য পরবর্তী যুগে এ সালাত “তারাবীহ” বা বিশ্রামের সালাত হিসাবে প্রসিদ্ধি লাভ করে।

প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব রমযান মাসে তারাবীহ আদায়ে সচেষ্ট হওয়া। যথাসম্ভব জামাতের সাথে কুরআন খতম করে তারাবীহ আদায় করতে হবে।

সালাতুত তারাবীহ বিষয়ক কিছু প্রয়োজনীয় কথা

(১) এক বা একাধিক সূরা বারাবার পাঠ করে তারাবীহ আদায় করা যায়। তবে কুরআন খতম উত্তম। কুরআন তিলাওয়াতকারী ও শ্রবণকারী সমান সাওয়াব পাবেন। তবে শর্ত হলো উপরে বর্ণিত সুন্নাত পদ্ধতিতে ধীরে ধীরে আদব ও তারতীলের সাথে তিলাওয়াত করতে হবে। অনেকে দ্রুত তিলাওয়াত করে তাড়াতাড়ি সালাত শেষ করা পছন্দ করেন। এতে সাওয়াবের চেয়ে গোনাহ অর্জনের ভয় বেশি। দ্রুত পাঠ করলে কুরআনের অনেক অংশই শোনা হয় না, বেয়াদবী হয়, উপরন্তু সালাত নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে। এরূপ খতম তারাবীহের চেয়ে সূরা তারাবীহ উত্তম হবে।

(২) প্রতি চার রাক‘আত সালাতের পরে বিশ্্রাম করা হয়। এ বিশ্রাম ইবাদতের অংশ নয় বা কোন সাওয়াবের কাজ নয়। শুধুমাত্র ক্লান্তি দূর করার জন্যই এ বিশ্রাম। কোন রকম বিশ্রাম ছাড়া তারাবীহ আদায় করলেও কোন প্রকার অসুবিধা নেই।

(৩) এ বিশ্রামের সময় কোন নির্ধারিত যিক্র বা দোয়া নেই। আগের যুগের মানুষেরা এ সময়ে একাকী ২/৪ রাক‘আত নামায পড়ে নিতেন। অথবা একটু হাঁটাচলা করে নিতেন। আমাদের দেশে “সুবহানাযিল মুলকি…” বলে একটি দোয়া এ সময় পাঠ করা হয়। অনেকে প্রতি চার রাক‘আত পরে, অনেকে একেবারে শেষে “আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকাল জান্নাতা…” বলে একটি মুনাজাত পাঠ করেন। এ দোয়া ও মুনাজাতে কোন দোষ নেই। তবে তারাবীহের এ বিশ্রামের সময় এ দোয়া ও মুনাজাত পাঠ করার কোন সুন্নাত ভিত্তি নেই বা পাঠ না করলেও কোন দোষ হবে না। বরং তার পরিবর্তে দরুদ শরীফ পাঠ করা উত্তম। সাধারণ যে কোন তাসবীহ তাহলীল পাঠ করতে পারেন। চুপ করে বসে থাকলেও কোন অসুবিধা নেই। এগুলোর সাথে তারাবীহের কোন মাসনূন সম্পর্ক নেই।

(৪) তারাবীহের রাকআত নিয়ে ঝগড়া বা বিদ্বেষ অত্যন্ত দুঃখজনক ও কঠিন কবীরা গোনাহ। ২০ রাকআত তারাবীহকে বিদআত বলা, এতে আপত্তি করা অথবা ২০ রাকআতের কম পড়লে বিদ্বেষ বা ঝগড়া করা উভয়ই একইরূপ অপরাধ। হাদীস ও সালফে সালেহীন ফকীহগণের মতামত সম্পর্কে অজ্ঞতাই তার মূল কারণ। রাসূলুল্লাহ ১১ বা ১৩ রাক‘আত কিয়ামুল্লাইল আদায় করতেন বলে সহীহ হাদীসে প্রমাণিত। তিনি সারা বছর মাঝ রাতে বা শেষ রাতে দীর্ঘ সূরা দিয়ে প্রায় ৩/৪ ঘন্টা ধরে তা আদায় করতেন। শুধু রমযানে অর্ধ ঘন্টায় আট রাকআত আদায় করলে সুন্নাত পালিত হবে বলে ধারণা করা সঠিক নয়।

(৫) ২০ রাকআত তারাবীহ জামাতে আদায় করা হলে অনেকে অনেকে ৮ রাক‘আত তারাবীহ আদায় করে চলে যান। আমরা চিন্তা করি এটুকু পড়লেই তো সুন্নাত হয়ে গেল বা গোনাহ থেকে বাঁচা গেল। অথচ আমাদের চিন্তা করা উচিত ছিল কি করলে বেশী সাওয়াব হবে। আমরা পার্থিব অল্প কয়েকটি টাকা, নম্বর বা স্বার্থের জন্য কত কষ্ট করি। অথচ আল্লাহ্র সাওয়াবের বিষয়ে আমাদের কত অনীহা। তখন চিন্তা করি কত কম করলে চলে! রাসূলুল্লাহ  বলেছেন: “যে ব্যক্তি ইমাতোর সাথে শেষ পর্যন্ত কিয়ামুল্লাইল আদায় করবে আল্লাহ্ তাকে সারারাত সালাত আদায়ের সাওয়াব দান করবেন।

 

সালাতুদ দোহা (চাশত ও ইশরাকের নামায)

সূর্য উদয়ের সময় নামায আদায় করা নিষিদ্ধ। সূর্য পরিপূর্ণ রূপে উদিত হওয়ার পরে, অর্থাৎ সূর্যোদয়ের মুহূর্ত থেকে প্রায় ২৫ মিনিট পরে দোহা বা চাশ্তের নামাযের সময় শুরু। এ সময় থেকে শুরু করে দ্বিপ্রহরের পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ের মধ্যে যে কোনো সময়ে এ নামায আদায় করা যায়। দোহার নামায দুই রাক’আত থেকে বার রাক’আত পর্যন্ত আদায় করা যায়। তাহাজ্জুদ নামাযের পরে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাসনূন নফল নামায হলো দোহার নামায। বিভিন্ন সহীহ হাদীসে এ নামাযকে ‘আওয়াবীনের নামায’ বা ‘আল্লাহ্ওয়ালাগণের নামায’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। আমাদের দেশে এ নামায ‘ইশরাকের নামায’ বা ‘সূর্যোদয়ের নামায’ বলে পরিচিত। অনেকে সূর্যোদয়ের পরের নামাযকে ‘ইশরাকের নামায’ এবং পরবর্তী সময়ের নামাযকে ‘দোহা বা চাশ্তের নামায’ বলেন। হাদীস শরীফে ‘সালাতুদ দোহা’ বা ‘দোহার নামায’ শব্দটিই ব্যবহার করা হয়েছে ; “ইশরাকের নামায” শব্দটি হাদীসে পাওয়া যায় না। এছাড়া হাদীসে ইশরাক ও দোহার মধ্যে কোনোরূপ পার্থক্য করা হয়নি। সূর্যোদয় থেকে দুপুরের পূর্ব পর্যন্ত যে কোনো সময় নফল নামায আদায় করলে তা ‘সালাতুদ দোহা’ বা দোহার নামায বলে গণ্য হবে।

সবচেয়ে উত্তম হলো ফজরের সালাত জামাতে আদায় করে যিক্র ওযীফায় রত থাকা এবং সুর্যোদয়ের পরে সালাতুদ দোহা আদায় করে মসজিদ থেকে বের হওয়া। বিভিন্ন হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি ফজরের নামায জামা’আতে আদায় করে বসে বসে আল্লাহ্র যিক্র করবে সূর্যোদয় পর্যন্ত, তারপর দুই রাক’আত নামায আদায় করবে, সে একটি হজ্ব ও একটি ওমরার সাওয়াব অর্জন করবে: পরিপূর্ণ, পরিপূর্ণ, পরিপূর্ণ (হজ্ব ও ওমরার সাওয়াব অর্জন করবে।)”।  মহিলারা ঘরের মধ্যে সালাতের স্থানে বসে এ হাদীস পালন করলে ইনশা আল্লাহ্ এ সাওয়াব পাবেন।

এভাবে অপেক্ষা সম্ভব না হলেও সকল মুমিনের উচিত কর্মব্যস্ততার ফাঁকে কয়েক মিনিট সময় নিয়ে দোহার সালাত আদায় করা। এ সালাতের ফযীলতে অনেক সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এ সালাতের মাধ্যমে আল্লাহ্র কৃতজ্ঞতা আদায় হয়, অগণিত সাওয়াব ও গনীমত লাভ হয়, আল্লাহ্র নৈকট্যের মর্যাদা পাওয়া যায়, আল্লাহ্ সারাদিন হেফাযত করেন ইত্যাদি বিভিন্ন মর্যাদা ও সাওয়াবের সুসংবাদ আমরা পাই।

 

মাগরিব ও ইশার সালাতের মধ্যবর্তী নফল সালাত

মাগরীব ও ইশার মধ্যবর্তী সময়ে রাসূলুল্লাহ  ও সাহাবীগণ বেশিবেশি নফল সালাত আদায় করতে ভালবাসতেন। আমাদের সকলেরই চেষ্টা করা উচিত এ সময়ে সুযোগমত কিছু নফল সালাত আদায় করা।

সালাতুত তাসবীহ

রাসূলুল্লাহ  তাঁর চাচা আব্বাস (রা)-কে বলেন: “চাচাজি, আমি আপনাকে একটি বিশেষ উপহার ও বিশেষ অনুদান প্রদান করব, যা পালন করলে আল্লাহ্ আপনার ছোট, বড়, ইচ্ছাকৃত, অনিচ্ছাকৃত, প্রকাশ্য, গোপন সকল গোনাহ ক্ষমা করবেন। Ñ তা হলো এ যে, আপনি চার রাক’আত নামায আদায় করবেন। প্রত্যেক রাক’আতে সূরা ফাতিহা ও অন্য যে কোনো একটি সূরা পাঠ করবেন। প্রথম রাক’আতে সূরা ফাতিহা ও অন্য যে কোনো সূরা পাঠের পর দাঁড়ানো অবস্থায় ১৫ বার বলবেন :

سُبْحَانَ اللَّهِ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ وَلا إِلَهَ إِلا اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ

উচ্চারণ: ‘সুব‘হা-নাল্লাহ্, ওয়াল‘হামদুলিল্লাহ, ওয়ালা- ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আল্লা-হু আকবার। ’ অর্থ: “আল্লাহ্ পবিত্র, এবং সকল প্রশংসা আল্লাহ্র, এবং নেই কোন মা’বুদ আল্লাহ্ ছাড়া, এবং আল্লাহ্ সর্বশ্রেষ্ঠ।”

এরপর রুকুতে যেয়ে রুকু অবস্থায় উপরের যিক্রগুলো ১০ বার, রুকু থেকে উঠে দাঁড়ানো অবস্থায় ১০ বার, সাজদায় ১০ বার, প্রথম সাজদা থেকে উঠে বসা অবস্থায় ১০ বার, দ্বিতীয় সাজদায় ১০ বার এবং দ্বিতীয় সাজদা থেকে উঠে (বসা অবস্থায়) ১০ বার। মোট এক রাক’আতে ৭৫ বার (চার রাক’আতে মোট ৩০০ বার)। সম্ভব হলে আপনি প্রতিদিন একবার, না হলে প্রতি সপ্তাহে একবার, না হলে প্রতি মাসে একবার, না হলে প্রতি বছর একবার, না হলে অন্তত সারা জীবনে একবার এ নামায আপনি আদায় করবেন।”

“সালাতুস তাসবীহ” সংক্রান্ত অধিকাংশ হাদীসই অত্যন্ত যয়ীফ বা দুর্বল সনদে বর্ণিত। একমাত্র এ হাদীসটিকে কোনো কোনো মুহাদ্দিস সহীহ বা গ্রহণযোগ্য হিসাবে গণ্য করেছেন।

ইমাম তিরমিযী প্রখ্যাত তাবে-তাবেয়ী আব্দুল্লাহ ইবনু মুবারাক (মৃত্যু ১৮১ হি) থেকে “সালাতুত তাসবীহ” আদায়ের আরেকটি নিয়ম উল্লেখ করেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনু মুবারকের মতে এ অতিরিক্ত যিক্র আদায়ের নিয়ম হলো: নামায শুরু করে শুরুর দোয়া বা সানা পাঠের পরে ১৫ বার, সূরা ফাতেহা ও অন্য কোনো সূরা শেষ করার পরে ১০ বার, রুকুতে ১০ বার, রুকু থেকে উঠে ১০ বার, প্রথম সাজদায় ১০ বার, দুই সাজাদার মাঝে ১০ বার ও দ্বিতীয় সাজদায় ১০ বার মোট ৭৫ বার প্রতি রাক’আতে।

অর্থাৎ, এ নিয়মে কিরাআতের পূর্বে ও পরে দাঁড়ানো অবস্থায় ২৫ বার তাসবীহ পাঠ করা হয় আর দ্বিতীয় সাজাদার পরে বসা অবস্থায় কোনো তাসবীহ পড়া হয় না। পূর্বের হাদীসে বর্ণিত নিয়মে কিরাআতের পূর্বে কোনো তাসবীহ নেই। দাঁড়ানো অবস্থায় শুধু কিরাআতের পরে ১৫ বার তাসবীহ পড়তে হবে। প্রত্যেক রাক’আতে দ্বিতীয় সাজদার পরে বসে ১০ বার তাসবীহ পড়তে হবে।

আব্দুল্লাহ ইবনু মুবারক বলেন, যদি এ সালাত রাত্রে আদায় করে তাহলে দু রাক’আত শেষে সালাম ফিরিয়ে আবার দু রাক’আত পৃথকভাবে আদায় করবে। “সালাতুত তাসবীহ” আদায়ের সময় রুকু ও সাজদায় প্রথমে রুকু ও সাজদার মাসনূন তাসবীহ ‘সুবহানার রাব্বিয়্যাল আযীম’ ও ‘সুবহানা রাব্বিয়্যাল আ’লা’ নূন্যতম  তিন বার করে পাঠ করার পরে অতিরিক্ত তাসবীহগুলো পাঠ করতে হবে।

সালাতুত তাওবা

রাসূলুল্লাহ  বলেছেন, “যে কোনো বান্দা যদি কোনো গোনাহের কর্ম করে সাথে সাথে সুন্দর করে ওযু করে দুই রাক’আত নামায আদায় করে, তারপর আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা চায় তাহলে আল্লাহ্ তাকে অবশ্যই ক্ষমা করে দিবেন।”

সালাতুল ইস্তিখারা

ইস্তিখারার অর্থ হলো কারো কাছে সঠিক বিষয় বেঁছে দেয়ার প্রার্থনা করা। যে ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা একাধিক বিষয়ের মধ্য থেকে একটি বেছে নেয়ার অবকাশ আছে সেখানে আল্লাহ্র সাথে পরামর্শ না করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা মুমিনের উচিত নয়। ছোট, বড়, গুরুত্বপূর্ণ বা গুরুত্বহীন সকল বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে আল্লাহ্র সাথে পরামর্শ করা, অর্থাৎ তাঁর মহান দরবারে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের তাওফীক চাওয়া মুমিনের অন্যতম দায়িত্ব। জাবির (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ () আমাদেরকে সকল বিষয়ে ‘ইস্তিখারা’ করতে শিক্ষা দিতেন, যেমন গুরুত্বের সাথে তিনি আমাদেরকে কুরআনের সূরা শিক্ষা দিতেন। তিনি বলতেন : যখন তোমাদের কেউ কোনো কাজের ব্যাপারে মনের মধ্যে চিন্তা করবে তখন ফরয নয় এরূপ (নফল )দুই রাক’আত নামায আদায় করবে অতঃপর বলবে:

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْتَخِيرُكَ بِعِلْمِكَ وَأَسْتَقْدِرُكَ بِقُدْرَتِكَ وَأَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ الْعَظِيمِ فَإِنَّكَ تَقْدِرُ وَلا أَقْدِرُ وَتَعْلَمُ وَلا أَعْلَمُ وَأَنْتَ عَلامُ الْغُيُوبِ اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الأَمْرَ [يسمي حاجته] خَيْرٌ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي [أَوْ قَالَ عَاجِلِ أَمْرِي وَآجِلِهِ] فَاقْدُرْهُ لِي وَيَسِّرْهُ لِي ثُمَّ بَارِكْ لِي فِيهِ. [اللهم] وَإِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الأَمْرَ شَرٌّ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي [أَوْ قَالَ فِي عَاجِلِ أَمْرِي وَآجِلِه]فَاصْرِفْهُ عَنِّي وَاصْرِفْنِي عَنْهُ وَاقْدُرْ لِيَ الْخَيْرَ حَيْثُ كَانَ ثُمَّ أَرْضِنِي بِهِ

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা, ইন্নী আসতাখীরুকা বি‘ইলমিকা, ওয়া আসতাক্বদিরুকা বিক্বুদরাতিকা, ওয়া আসআলুকা মিন ফাদ্বলিকাল ‘আযীম। ফাইন্নাকা তাক্বদিরু, ওয়ালা- আক্বদিরু, ওয়া তা‘অ্লামু ওয়ালা- আ‘অ্লামু, ওয়া আনতা ‘আল্লা-মুল গ¦ুইঊব। আল্লা-হুম্মা, ইন কুনতা তা‘অ্লামু আন্না হা-যাল আমরা (উদ্দিষ্ট বিষয়ের নাম বলবে) খাইরুল লী ফী দীনী ওয়ামা‘আ-শী ওয়া ‘আ-ক্বিবাতি আমরী ফাক্বদুরহু লী, ওয়া ইয়াসসিরহু লী, সুম্মা বা-রিক লী ফীহি। আল্লা-হুম্মা, ওয়া ইন কুনতা তা‘অ্লামু আন্না হা-যাল আমরা শাররুল লী ফী দীনী ওয়ামা‘আ-শী ওয়া ‘আ-কিবাতি আমরী ফাস্বরিফহূ ‘আন্নী, ওয়াস্বরিফনী ‘আনহু ওয়াক্ব দুর লিয়াল খাইরা হাইসু কা-না, সুম্মা আরদ্বিনী বিহী।

অর্থ : “হে আল্লাহ্, আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করি যে, আপনি আপনার জ্ঞান থেকে আমার জন্য সঠিক বিষয় নির্বাচন করবেন, আমি আপনার কাছে ক্ষমতা চাই আপনার ক্ষমতা থেকে এবং আমি আপনার কাছে চাই আপনার মহান করুণা ও বরকত থেকে। কারণ আপনি ক্ষমতাবান আর আমি অক্ষম, আপনি জানেন আর আমি জানি না, আর আপনি সকল গাইবের মহাজ্ঞানী। হে আল্লাহ্, যদি আপনি জানেন যে, এ বিষয়টি (নির্দিষ্ট বিষয়টির উল্লেখ করবে) কল্যাণ ও মঙ্গলময় আমার জন্য, আমার ধর্ম, আমার পার্থিব জীবন এবং আমার পরিণতির জন্য (অথবা বলেন : আমার নিকটবর্তী ও দূবরর্তী পরিণতির জন্য), তাহলে আপনি একে আমার জন্য নির্ধারণ করে দিন, সহজ করে দিন এবং আমার জন্য এতে বরকত প্রদান করুন। হে আল্লাহ্, আর আপনি যদি জানেন যে, এ কর্মটি অমঙ্গলকর বা অকল্যাণকর আমার জন্য, আমার ধর্ম, জাগতিক জীবন ও আমার ভবিষ্যৎ পরিণতির জন্য (অথবা তিনি বলেন : আমার নিকটবর্তী ও দূরবর্তী পরিণতির জন্য) তাহলে একে  আমার কাছে থেকে সরিয়ে নিন এবং আমাকে এর কাছে থেকে সরিয়ে নিন। আর যেখানেই কল্যাণ ও মঙ্গল থাকুক তাকে আমার জন্য নির্ধারণ করে দিন এবং আমাকে তার প্রতি সন্তুষ্ট করে দিন।”

 

অন্যান্য সুন্নাত-নফল সালাত

হাদীসে যোহরের পরে চার রাক‘আত, আসরের পূর্বে চার রাক‘আত, ইশার পূর্বে চার রাক‘আত ও অন্যান্য নফল সালাতের বিশেষ সাওয়াব উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া সাধারণভাবে সুযোগ ও সাধ্যমত নিষিদ্ধ সময় ছাড়া অন্য যে কোন সময়ে বেশিবেশি নফল সালাত আদায়ের উৎসাহ দেয়া হয়েছে।

পাঁচ ওয়াক্ত ফরয সালাত জামতে আদায় করতে হবে

পাঁচ ওয়াক্ত ফরয সালাত অবশ্যই জামাতবদ্ধভাবে আদায় করতে হবে। মুসলিম উম্মাহ একমত যে ফরয সালাত জামাতে আদায় করা জরুরী ও ওযর ছাড়া জামাত পরিত্যাগ করে একাকী সালাত আদায়কারী গোনাহগার হবেন। তবে এ গুরুত্ব বুঝানোর জন্য তাঁদের ফিকহী পরিভাষা বিভিন্ন প্রকারের। “বাদাইউস সানাইয়” ও হানাফী মাযহাবের অন্যান্য প্রাচীন গ্রন্থে জামাতে নামাযকে ওয়াজিবই লিখা হয়েছে। পরবর্তী কোনো কোনো গ্রন্থে সুন্নাত লিখা হলেও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তা ওয়াজিবের পর্যায়ের।

রাসূলুল্লাহ  নিজে এবং সাহাবীগণ কখনোই কঠিন ওযর ছাড়া জামা’আত পরিত্যাগ করেননি। জামা’আতে অনুপস্থিত থাকাকে তাঁরা নিশ্চিত মুনাফিকের পরিচয় বলে জানতেন। অন্ধ ও পরিচালকহীন ব্যক্তিকেও তিনি জামাত ছেড়ে একাকী ঘরে ফরয সালাত আদায়ের অনুমতি দেন নি। বরং বলেছেন: “আযান শুনলে হামাগুড়ি দিয়ে বা বুকে ছেঁচড়ে হলেও মসজিদে এসে তোমাকে জামাতে নামায পড়তে হবে।” যারা জামাতে নামাযে শরীক হয় না, তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিতে চেয়েছেন তিনি। তিনি বলেছেন, “যে ব্যক্তি নামাযের আহ্বান (আযান) শুনতে পেল কিন্তু আহ্বানে সাড়া দিয়ে জামাতে এলো না, তার নামাযই হবে না। তবে যদি ওযর থাকে তাহলে হতে পারে। ওযর হলো ভয় ও অসুস্থতা।”

ইবনু মাস’ঊদ (রা) বলেন: “যার ভালো লাগে যে, সে আগামীকাল মুসলিম হিসাবে আল্লহার সাথে দেখা করবে, সে যেন এ নামাযগুলোকে যে মসজিদে আযান দেয়া হয় সেখানে নিয়মিত জামাতে আদায় করে। কারণ আল্লাহ্ তোমাদের নবীর জন্য হেদায়েতের সুন্নাত প্রচলন করেছেন। আর এসকল হেদায়েতের সুন্নাতের মধ্যে অন্যতম হলো নামাযগুলোকে মসজিদে জামাতে আদায় করা। তোমরা যদি বাড়িতে নামায পড় তাহলে তোমরা তোমাদের নবীর () সুন্নাত ছেড়ে দেবে। আর তোমাদের নবীর সুন্নাত ছেড়ে দিলে তোমরা গোমরাহ হয়ে যাবে। … আমাদের সময়ে আমরা দেখেছি একমাত্র সুপরিচিত মুনাফিক ছাড়া কেউই জামাতে অনুপস্থিত থাকতেন না।..”

জামাতে নামায ত্যাগ করা যেমন ভয়ঙ্কর অপরাধ ও গোনাহের কাজ, তেমনি জামাতে নামায আদায় অপরিমেয় সাওয়াব ও বরকতের কাজ। জামাতে নামায আদায় করলে আল্লাহ্ ২৭ গুণ বেশি সাওয়াব দান করবেন, যারা সর্বদা জামাতে নামায আদায়ের জন্য মসজিদের দিকে এ দিয়ে রাখেন তাঁদেরকে আল্লাহ্ কেয়ামতের দিন আল্লাহ্র প্রিয়তম বান্দাদের সাথে আরশের ছায়ায় আশ্রয় দিবেন, জামাতের অপেক্ষা করা জিহাদের সমতুল্য, ইত্যাদি বিভিন্ন মর্যাদার কথা হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ  বলেন: “যে ব্যক্তি চল্লিশ দিন ইমামের সাথে প্রথম তাকবীরসহ পরিপূর্ণ নামায জামাতে আদায় করবে, তার জন্য আল্লাহ্ দুটি মুক্তি লিখে দিবেন: ১.  জাহান্নাম থেকে মুক্তি ; ২.  মুনাফিকী থেকে মুক্তি।”

ফজরের নামাযের জামা’আতের অতিরিক্ত গুরুত্ব ও ফযীলত হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ  বলেছেন: মুনাফিকদের জন্য সবচেয়ে কষ্টের নামায হলো ফজর ও ইশা’র জামা’আত। ফজর ও ইশা’র নামায জামাতে আদায় করলে কত ফযীলত তা যদি তারা বুঝত, তাহলে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও তারা এ দুই নামাযে উপস্থিত হতো।” “যে ব্যক্তি ফজরের নামায জামাতে আদায় করবে, সে আল্লাহ্র জিম্মাদারীর মধ্যে প্রবেশ করবে।” “যে ব্যক্তি ইশা’র নামায জামাতে আদায় করবে সে যেন অর্ধেক রাত্র (তাহাজ্জুদের) আদায় করল (সে অর্ধ রাত্র তাহাজ্জুদের নামায পড়ার সাওয়াব পাবে) আর যে ব্যক্তি ফজরের নামাযও জামাতে আদায় করবে সে ব্যক্তি যেন সারা রাত (তাহাজ্জুদের) নামায আদায় করল (অর্থাৎ, যে ব্যক্তি ইশা ও ফজর জামাতে আদায় করবে, সে ব্যক্তি সারা রাত তাহাজ্জুদ নামায আদায়ের সাওয়াব অর্জন করবে)।”

জামাতে সালাত আদায়ের কিছু প্রয়োজনীয় বিধান

১. মসজিদে প্রবেশ করে বসার আগে ‘দুখুলুল মাসজিদ’ বা ‘তাহিয়্যাতুল মাসজিদ’ নামায আদায় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত। রাসূলুল্লাহ  মসজিদে প্রবেশ করে বসার আগে অন্তত দু রাক’আত নামায পড়তে বলেছেন। মাকরুহ ওয়াক্ত ছাড়া অন্য যে কোন সময়ে মসজিদে প্রবেশ করলে কোন না কোন সালাত আদায় না করে বসবেন না। যদি সুন্নাতে মু’আক্কাদা সালাত যিম্মায় থাকে তাহলে মসজিদে প্রবেশ করে তা আদায় করে বসুন। নইলে, দু রাক’আত তাহিয়্যাতুল মসজিদ সুন্নাত নামায আদায় করতে হবে। সরাসরি জামাতে দাঁড়িয়ে গেলেও তাহিয়্যাতুল মসজিদের সুন্নাত আদায় হবে। কোনো নামায না পড়ে মসজিদে বসে গেলে এ সুন্নাত পালনের সাওয়াব থেকে আমরা বঞ্চিত হব।

২. মসজিদে প্রবেশ করার পর আগের কাতারে জায়গা থাকা সত্ত্বেও পিছনের কাতারে দাঁড়ানো গোনাহের কাজ। যথাসম্ভব ধীর স্থিরভাবে আগের কাতারে দাঁড়াতে হবে। এতে ইমাম এক রাক’আত শেষ করে ফেললে কোনো ক্ষতি নেই। আমরা মসজিদে রাক’আত গণনা করতে যাই না, সাওয়াব অর্জন করতে যাই। তাড়াহুড়া করলে, পিছনের কাতারে দাঁড়ালে গোনাহ হবে। শান্তভাবে আগের কাতারে দাঁড়ালে সাওয়াব বেশি হবে।

৩. নামাযের কাতারে যথাসম্ভব গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়াতে, মাঝের ফাঁক বন্ধ করতে ও কাতার সোজা করতে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নির্দেশ দিয়েছেন রাসূলুল্লাহ । তিনি ইকামতের পরে মুক্তাদীগণকে কাতার সোজা করার ও কাতারের মাঝের ফাঁক বন্ধ করার নির্দেশ দিতেন এবং তা পালিত হয়েছে কিনা পরীক্ষা করতেন। এরপর সালাত শুরু করতেন।

৪. জামাতে সালাত আদায়ের সময় মুক্তাদী ইমামের অনুসরণ করবেন  এবং ইমামের পিছে পিছে সালাত আদায় করবেন। কোন অবস্থাতেই ইমামের আগে সালাতের কোন কর্ম করা যায়েয নয়। কোন কোন মুসাল্লী ইমামের আগেই  রুকুতে চলে যান, ইমামের আগেই সাজদা করেন বা ইমাতোর আগেই রুকু সাজদা থেকে উঠে পড়েন। এগুলো কঠিন অন্যায় এবং অনেক সময় সালাত নষ্ট হওয়ার কারণ। রাসূলুল্লাহ () এ ধরণের কর্ম থেকে কঠোর ভাবে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন: “যে ব্যক্তি ইমামের আগেই রুকু বা সিজদা থেকে মাথা উঠায় তার কি ভয় হয়না যে আল্লাহ্ তার মাথাকে গাধার মাথার মত বানিয়ে দেবেন, অথবা তার আকৃতি গাধার মত করে দেবেন?!”

বারা ইবনে আযিব (রা.) বলেছেন : “আমরা রাসূলুল্লাহ () এর পিছে সালাত আদায় করতাম। তিনি যখন “সামিয়াল্লাহু লিমান হামিদাহ” বলে রুকু থেকে উঠতেন তখন আমরাও উঠে দাঁড়াতাম এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর কপাল মাটি স্পর্শ করার আগে আমাদের কেউ তার পিঠ বাঁকাত না। তারপর আমরা সবাই সিজদা করতাম।”

৫. জামাতে সালাত আদায় করলে মুক্তাদীকে ইমাতোর পিছে পিছে সালাতের তাকবীরগুলো বলতে হবে। অর্থাৎ তাহরীমা, রুকু, সাজদা ইত্যাদির জন্য মুক্তাদীও “আল্লাহু আকবার” বলবেন। তবে রুকু থেকে উঠার সময় ইমাম যখন (সামিয়াল্লাহু লিমান হামিদাহ) বলবেন তখন মুক্তাদী বলবেন “রাব্বানা লাকাল হামদু…”।

৬. জামাতে গমন করার সময় তাড়াহুড়া করা হাদীসে বিশেষভাবে নিষেধ করা হয়েছে। হাদীস শরীফে বলা হয়েছে, নামাযের ইকামত হওয়ার পরেও যদি তোমরা মসজিদে যাও তাহলে মানসিক অস্থিরতা বা দৌড়াদৌড়ি করে মসজিদে যাবে না। শান্তভাবে ও ধীরে ধীরে যাবে। যতটুকু নামায ইমামের সাথে পাবে তা আদায় করবে, বাকিটা পরে নিজে আদায় করবে। হাদীস শরীফে বলা হয়েছে, ঘর থেকে নামাযের জন্য বের হওয়ার সময় থেকেই মুসল্লী নামাযের মধ্যেই থাকেন এবং আল্লাহ্র কাছে তিনি নামাযরত বলে গণ্য হন। যদি কেউ মসজিদে যেয়ে দেখেন যে পুরো জামাত শেষ হয়ে গিয়েছে তাহলেও তিনি জামাতের সাওয়াব পাবেন।

৭. মুক্তাদী যদি কোন রাক‘আতের রুকুতে ইমামের সাথে শরীক হতে পারেন তাহলে তিনি সে রাক‘আত জামাতে আদায় করতে পেরেছেন বলে গণ্য করা হবে। মসজিদে প্রবেশ করে যদি দেখেন যে, ইমাম রুকু রত অবস্থায় আছেন, তাহলে তাড়াহুড়া করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ লঙ্ঘনের গোনাহে লিপ্ত হবেন না। আমাদের উদ্দেশ্য আল্লাহ্র কাছে সাওয়াব লাভ, রাক‘আতের সংখ্যা গণনা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। যথাসম্ভব শান্তভাবে আগের কাতারে জায়গা দেখে সেখানে দাঁড়ান। দাঁড়ানো অবস্থায় পূর্ণভাবে তাকবীরে তাহরীমা (আল্লাহু আকবার) বলুন। তারপর দ্বিতীয়বার আল্লাহু আকবার বলতে বলতে রুকু করুন। এভাবে রুকু করে যদি ইমামের উঠে পড়ার বা (সামিয়াল্লাহু লিমান হামিদাহ) বলার পূর্বে একবারও তাসবীহ বলতে পারেন তাহলে সে রাক‘আত আপনি জামাতের পেয়েছেন বলে গণ্য করবেন।

৮. অনেকে ইমাম রুকু থেকে উঠে পড়লে বা সাজদা করলে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন। ইমাম পরবর্তী রাক‘আত শুরু করলে জামাতে শরীক হন। এতে তিনি অগণিত সাওয়াব থেকে বঞ্চিত হন। ইমামকে যে অবস্থায় পাওয়া যাবে সে অবস্থায় তাঁর পিছনে ইকতিদা করতে হবে বা সালাত শুরু করতে হবে। আল্লাহ্র সবচেয়ে প্রিয় ইবাদত তাঁর জন্য সাজদা করা। কাজেই ইমামকে  সাজদায় রত পেলে সাথে সাথে দাঁড়ানো অবস্থায় তাকবীরে তাহরীমা বলে দ্বিতীয় তাকবীর বলে সাজদায় ইমামের সাথে শরীক হতে হবে। উদ্দেশ্য সাওয়াব অর্জন। রাক‘আত গণনা উদ্দেশ্য নয়।

৯. যে ব্যক্তি ইমামের সাথে পুরো সালাত আদায় করতে পারেন না, প্রথমে দুই/এক রাক‘আত বাদ পড়ে তাকে “মাসবূক” বলা হয়। ইমামের উভয় দিকে দু’টি সালাম আদায়ের পরে তিনি উঠে দাঁড়াবেন এবং যে কয় রাক‘আত প্রথমে বাদ পড়েছে তা একাকী আদায় করবেন। তাকে দুই রাক‘আত পূর্ণ হলে ও শেষ রাক‘আতে পুনরায় বসে উপরের নিয়মে সালাত শেষ করতে হবে। যেমন মনে করুন এক ব্যক্তি ইমামের সাথে আসরের এক রাক‘আত সালাত আদায় করেছেন। তিনি ইমামের উভয় সালামের পরে উঠে দাঁড়িয়ে সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা পাঠ করে উপরের নিয়মে এক রাক‘আত সালাত আদায় করে বসে “আত-তাহিয়্যাতু” পাঠ করবেন। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে সূরা ফাতিহা ও অন্য সূরা পাঠ করে রুকু ও সাজাদা করে সরাসরি পরবর্তী রাক‘আতে উঠে দাঁড়াবেন। শুধুমাত্র সূরা ফাতিহা দ্বারা এ রাক‘আত আদায় করে রুকু সাজদার পরে বসে “আত-তাহিয়্যাতু”, দরুদ ও দোয়া পড়ে সালামের মাধ্যমে সালাত শেষ করবেন।

১০. জামাতে সালাত আদায়ের সময় মুক্তাদীগণের জন্য সুতরার প্রয়োজন নেই, ইমামের সুতরা যথেষ্ঠ। তবে সুন্নাত-নফল সালাত আদায়ের সময় সুতরার বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে, যেন মুসল্লীদের চলাচলে অসুবিধা না হয় এবং সামনে দিয়ে কেউ না যায়।

সালাত ভঙ্গ হওয়ার কারণসমূহ

উপরের বর্ণিত নিয়মে মনোযোগ, আবেগ ও ভক্তির সাথে দেহ ও মনের ধীরতা সহ সালাত আদায় করতে হবে। যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে মাসনূন পদ্ধতির কোন কিছুই স্বেচ্ছায় ত্যাগ না করা। তবে সালাতের পূর্বের বা মধ্যে ফরয কর্মগুলো সক্ষমতা সত্বেও ত্যাগ করলে সালাত ভঙ্গ হয়ে যাবে। এছাড়া নিুের কাজগুলো সালাত নষ্ট করে দেয়:

১. সালাতের মধ্যে জাগতিক কথা বলা। সালাতের মধ্যে বান্দা আল্লাহ্র সাথে কথা বলবে। জাগতিক বা মানুষের সাথে বলার মত কোন কথা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করলে সালাত নষ্ট হয়ে যাবে। অনুরূপভাবে সালামের জবাব দিলে, কারো হাঁচির জওয়াব দিলে, দু:সংবাদে “ইন্না লিল্লাহি…” পড়লে, সুসংবাদে আলহামদু লিল্লাহ বললে বা অনুরূপ জাগতিক বিষয়ক যে কোন কথাবার্তা বললে সালাত ভেঙ্গে যাবে।

২. জাগতিক কারণে, কষ্ট বা  ব্যথা বেদনার জন্য কাঁদলে বা কাতরালে সালাত ভেঙ্গে যাবে। তবে কুরআন তিলাওয়াতের আবেগের ফলে, জান্নাতের আগ্রহে, জাহান্নামের ভয়ে, আল্লাহ্র ভালবাসায় বা ভয়ে কাঁদলে সালাত নষ্ট হবে না। তবে নিজেকে যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রিত করার চেষ্টা করা উচিত। রাসূলুল্লাহ  ও সাহাবীগণ সালাতের মধ্যে আবেগে কাঁদতেন। তবে তাঁদের কান্না গলার মধ্যে অস্পষ্ট শব্দ ও চোখের পানির মধ্যে সীমিত রাখতে চেষ্টা করতেন।

৩. সালাতের মধ্যে “আমলে কাসীর” বা বেশি কাজ করলে। সালাতের মধ্যে বান্দা আল্লাহ্র সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। পরিপূর্ণ আদবের সাথে দাঁড়াতে হবে এবং সালাতের প্রয়োজন ছাড়া যথাসম্ভব কম নড়াচড়া করতে হবে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত নড়াচড়া, হাত, পা, পোষাক, দাড়ি ইত্যাদি নাড়া পরিহার করতে হবে। বিনা প্রয়োজনে বেশি কর্মে সালাত ভেঙ্গে যায়। বেশি কর্ম বা আমলে কাসীরের সংজ্ঞা হিসাবে বলা হয় যে, যদি কেউ সালাতের মধ্যে বারবার এরূপভাবে হাত পা, পোশাক ইত্যাদি নাড়তে থাকেন বা নড়াচাড়া করতে থাকেন যে, একজন অভিজ্ঞ মানুষ দেখে মনে করেন যে, লোকটি নামাযের মধ্যে নেই বা নামায পড়ছে না তাহলে তা “আমলে কাসীর” এবং তাতে সালাত নষ্ট হবে।

সালাত মুমিনের জীবনের অন্যতম সম্পদ। তার খুঁটিনাটি বিষয়য়াবলী বিস্তারিত জানা প্রত্যেক মুমিনের অন্যতম দায়িত্ব। এ পুস্তিকার উদ্দেশ্য প্রাথমিক পরিচয় ও নিয়ম শিক্ষাদান। আমি পাঠককে বিস্তারিত জানার জন্য সর্বদা সচেষ্ট হতে অনুরোধ করছি।

তৃতীয় স্তম্ভ : যাকাত

“যাকাত” শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো পবিত্রতা ও বৃদ্ধি। ইসলামী পরিভাষায় যাকাত বলতে বোঝানো হয় সম্পদশালীর সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ দরিদ্র ও অভাবীদের মধ্যে বণ্টন করা। যেহেতু যাকাত প্রদানের ফলে যাকাত প্রদানকারীর অন্তর সঞ্চয়ের অতিলোভ থেকে পবিত্র হয়, তার সম্পদ দরিদ্রের অধিকার থেকে পবিত্র হয়, উপরন্তু আল্লাহ্র বরকতের ফলে তা বৃদ্ধি পায়, সেহেতু আল্লাহ্ তাকে  “যাকাত” নাম দিয়েছেন। কুরআন ও হাদীসে যাকাতকে প্রায়শ “সাদাকাহ” বা দান ও কখনো কখনো “ইনফাক” বা ব্যয় বলে অভিহিত করা হয়েছে।

যাকাতের গুরুত্ব, সাওয়াব, উপকারিতা ও অবহেলার পরিণতি

কুরআনের বিভিন্ন নির্দেশনা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, সম্পদ সঞ্চয় ও সংরক্ষণের মানবীয় দুর্বলতা ও কৃপণতার অনুভূতি থেকে মুক্ত হওয়া মুমিনের অত্যাবশ্যকীয় গুণ। আর সম্পদের অতিরিক্ত লোভ ও কৃপণতা মানুষকে কুফুরী ও মুনাফিকীর পথে পরিচালিত করার অন্যতম শক্তি। মানুষ বাহ্যিক অবস্থার বিচারে অর্থ ও সম্পদ সঞ্চয় করতে চায় এবং সঞ্চয়কেই বাহ্যিক বৃদ্ধি বলে বিশ্বাস করে। কুরআন তার বিপরীত কথা বিশ্বাস করতে নির্দেশ দিয়েছে মুমিনগণকে। যাকাত প্রদানই সম্পদ বৃদ্ধি করে আর অবৈধ উপার্জন ও সঞ্চয় সম্পদ ধ্বংস করে।

রাসূলুল্লাহ -এর অসংখ্য বাণী ও নির্দেশনা রয়েছে যাকাতের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তার বর্ণনায়। হাদীসের আলোকে ঈমানের মজা লাভ করার অন্যতম উপায় হলো যাকাত প্রদান। খুশি মনে ও পবিত্র হৃদয়ে যাকাত প্রদান করা জান্নাতে প্রবেশের অন্যতম মাধ্যম। তিনি আরো বলেছেন: “যদি কেউ তার সম্পদের যাকাত প্রদান করে তাহলে তার সম্পদের অকল্যাণ ও অমঙ্গল দূর হয়ে যাবে।”

কুরআন থেকে আমরা জানি যে, যাকাত প্রদান না করা মূলত কাফিরদের অন্যতম পরিচয়। যাকাত প্রদান না করা জাহান্নামের শাস্তির অন্যতম কারণ। হাদীসের আলোকে আমরা জানি যে, প্রথম যে তিন ব্যক্তি জাহান্নামে প্রবেশ করবে এর একজন হলো যাকাত প্রদান থেকে বিরত থাকে যে সম্পদশালী মুসলিম। যাকাত প্রদান থেকে যে মুসলিম বিরত থাকে বা যাকাত দিতে টালবাহনা ও দ্বিধা করে তাকে হাদীসে অভিশপ্ত বা মাল‘ঊন বলা হয়েছে। যাকাত প্রদান না করে যে সম্পদ লোভী মানুষ সঞ্চয় করে রাখে কেয়ামতের দিন সে সম্পদ দিয়েই উক্ত ব্যক্তিকে কঠিন শাস্তি প্রদান করা হবে।

রাসূলুল্লাহ  জানিয়েছেন যে, যাকাত প্রদান না করা হলো সে কঠিন ৫টি পাপের অন্তর্ভুক্ত যার শাস্তি শুধু আখেরাতেই নয়, দুনিয়াতেও ভোগ করতে হয়। আর সেই শাস্তি ব্যক্তিগত জীবনেই নয় সমাজের সকলকেই ভোগ করতে হয়। যে সকল পাপের ফলে সমাজের মানুষ কষ্ট পায়, মানুষের, বিশেষত: দুর্বল শ্রেণীর মানুষের অধিকার নষ্ট হয় সে সকল পাপ যদি সমাজে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে তাহলে সে সমাজের উপরে আল্লাহ্র গজব ও শাস্তি নেমে আসে। সে শাস্তি থেকে পূণ্যবানগণও রক্ষা পান না। কারণ অন্যায়ের প্রতিরোধের দায়িত্বে তারা অবহেলা করেছেন বলেই এসকল পাপ প্রসার লাভ করেছে। তাই এ সকল পাপে সরাসরি পাপী না হলেও নীরবতার পাপে তারা পাপী। দুনিয়ার শাস্তি তাই তাদেরকেও পেতে হবে। হযরত ইবনু উমর (রা:) বলেন, রাসূলুল্লাহ  বলেছেন:

“হে মুহাজিরগণ, পাঁচটি কর্ম যদি তোমাদের মধ্যে দেখা দেয়  তাহলে তা হবে কঠিনতম বিপদ, আমি আল্লাহ্র কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, যেন তোমাদের মধ্যে এগুলো দেখা না দেয়। (১) যখন কোন সম্প্রদায়ের মধ্যে অশ্লীলতা এমন ভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে তারা প্রকাশ্যে অশ্লীলতায় লিপ্ত হতে থাকে, তখন তাদের মধ্যে এমন সব রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে যা তাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে প্রসারিত ছিল না। (২) যখন কোন সম্প্রদায়ের মানুষেরা ওজনে কম বা ভেজাল দিতে থাকে, তখন তারা দুর্ভিক্ষ, জীবনযাত্রার কাঠিন্য ও প্রশাসনের বা ক্ষমতাশীলদের অত্যাচারের শিকার হন। (৩) যদি কোন সম্প্রদায়ের মানুষেরা যাকাত প্রদান না করে, তাহলে তারা অনাবৃষ্টির শিকার হয়। যদি পশুপাখি না থাকতো তাহলে তারা বৃষ্টি থেকে তাকে বারেই বঞ্চিত হতো। (৪) যখন কোন সম্প্রদায়ের মানুষ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসুলের ওয়াদা বা আল্লাহ্র নামে প্রদত্ত ওয়াদা ভঙ্গ করে, তখন তিনি কোন বিজাতীয় শত্র“কে তাদের উপর ক্ষমতাবান করে দেন, যারা তাদের কিছু সম্পদ নিয়ে যায়। (৫) যদি কোন সম্প্রদায়ের শাসকবর্গ ও নেতাগণ আল্লাহ্র কিতাব (পবিত্র কুরআন) অনুযায়ী বিচার শাসন না করেন এবং  আল্লাহ্র বিধানের সঠিক ও ন্যায়ানুগ প্রয়োগের জন্য সাধ্যমত চেষ্টা না করে, তখন আল্লাহ্ তাদের মধ্যে পরস্পর শত্র“তা ও মতবিরোধ সৃষ্টি করে দেন, তারা তাদের বীরত্ব ও শক্তিমত্তা তাকে  অপরকে দেখাতে থাকে।”

যাকাতযোগ্য দ্রব্যের শ্রেণীভাগ ও নিয়ম

কুরআন-হাদীসের নির্দেশ অনুসারে মোট ৫ প্রকার সম্পদের যাকাত প্রদান করতে হয়: (১) স্বর্ণ, রৌপ্য ও নগদ টাকা পয়সা, (২) ব্যবসায়ের পণ্য, (৩) চারণভুমিতে পালিত পশু (৪) ভূমির উৎপন্ন ফসল (৫) খনিজ সম্পদ (মা’দিন) ও মাটির নীচে সঞ্চিত সম্পদ (রিকায) বাংলাদেশ মুসলিমগণ চারণভুমিতে পশুপালন করেন না এবং সাধারণভাবে খনিজ সম্পদও এদেশে ব্যক্তি মালিকানায় নেই। বাকী খাতগুলোর বিবরণ এখানে লিপিবদ্ধ করা হলো। বিস্তারিত বিধান ও দলীল প্রমাণাদি জানতে আমি পাঠককে আমার লেখা অন্য গ্রন্থ: “বাংলাদেশে উশর বা ফসলের যাকাত” নামক বইটি পাঠ করতে অনুরোধ করছি।

(ক) সোনা, রূপা ও নগদ টাকার যাকাত

কমপক্ষে যে পরিমাণ দ্রব্য থাকলে যাকাত ফরয হয় একে “নিসাব” বলে। সোনার নিসাব হলো ৮৫ গ্রাম, এবং যাকাতেরর পরিমাণ হলো ২.৫% (শতকরা আড়াই) যদি কোন মুসলিম পুরুষ বা মহিলার কাছে ৮৫ গ্রাম বা এর চেয়ে বেশী সোনা বা সোনার  অলঙ্কার এক বছর থাকে, তাহলে তিনি বছরের শেষে তার কাছে মোট যতটুকু সোনা আছে তার মুল্যের শতকরা ২.৫ ভাগ যাকাত প্রদান করবেন। যেমন, যদি তার কাছে ১০০ গ্রাম সোনা থাকে তাহলে তিনি ২.৫ গ্রাম সোনা বা তার মূল্য যাকাত প্রদান করবেন।

এক্ষেত্রে মূলত ২৩ বা ২৪ ক্যারেটের সোনার হিসাব ধরা হয়। যদি নি¤œমানের সোনা (২২, ২১,১৮ বা ১৪ ক্যারেটের) থাকে তাহলে ২৩ ক্যারেটের সোনার মূল্যের উপর নির্ভর করে যাকাত প্রদান করতে হবে।

রূপার নিসাব হলো ৬০০ গ্রাম । যাকাতের পরিমাণ ২.৫% যদি কারো কাছে ৬০০ গ্রাম বা বেশী রূপা থাকে তাহলে প্রতি বছর শেষে তিনি মোট রূপার ২.৫% ভাগ যাকাত প্রদান করবেন।

নগদ টাকার ক্ষেত্রে রূপার নিসাবের উপর নির্ভর করতে হবে। হাদীস শরীফে মূলত রূপার নিসাবই উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া সর্বদা ন্যুনতম নিসাবকে গ্রহণ করতে হয়। এজন্য নগদ টাকা, ব্যবসায়ী দ্রব্য ইত্যাদির জন্য রূপার নিসাবের উপর নির্ভর করতে হবে।যদি কারো কাছে ৬০০ গ্রাম রূপার মূল্য পরিমাণ বা এর বেশী পরিমাণ নগদ অর্থ নিজের ঘরে, ব্যাংকে বা অন্য কারো কাছে সঞ্চিত বা গচ্ছিত থাকে তাহলে তাকে মোট অর্থের ২.৫% ভাগ যাকাত প্রদান করতে হবে।

(খ) ব্যবসায় বা বিক্রয়ের জন্য রক্ষিত দ্রব্যের যাকাত

ব্যবসায়ের বা বিক্রয়ের জন্য নির্ধারিত সকল দ্রব্যের যাকাত দিতে হবে। ব্যবসায়ের দ্রব্যের নিসাব উপরোল্লিখিতভাবে রূপার নিসাব দ্বারা নির্ধারিত হবে। যদি কেউ বিক্রয়ের জন্য বা ব্যবসা করার জন্য কোন কিছু নির্ধারিত করে রাখেন, যার মূল্য ৬০০ গ্রাম রূপা বা তার বেশী হয় এবং তা এক বছর তার কাছে থাকে তাহলে তাকে উক্ত দ্রব্যের মোট বাজার মূল্যের ২.৫% ভাগ যাকাত হিসাবে প্রদান করবেন।

যেমন কেউ বিক্রয়ের জন্য বা ব্যবসা করার জন্য গাড়ী, কম্পিউটার, পুকুরে মাছ, দোকানে ব্যবসায়ের পণ্য ইত্যাদি রেখে দেন তাহলে বছর পূর্ণ হলে তাকে রক্ষিত দ্রব্যের মোট বাজার মূল্যের উপর ২.৫% ভাগ যাকাত দিতে হবে। উক্ত দ্রব্য যদি পরের বছরও থাকে তাহলে আবারও বর্ষপুর্তিতে তার যাকাত প্রদান করতে হবে।

এখানে উল্লেখ্য যে, ব্যবহারের দ্রব্যের যাকাত প্রদান করতে হবে না। যদি কারো নিজের ব্যবহারের জন্য এক বা একাধিক গাড়ি থাকে তাহলে এর কোন যাকাত নেই। যদি কারো এক বা একাধিক গাড়ি থাকে ভাড়ায় ব্যবহারের জন্য, তাহলে তিনি উপার্জিত অর্থ থেকে প্রতি বছর হিসাব মত যাকাত প্রদান করবেন, গাড়ীর মূল্যের কোন যাকাত দিতে হবে না। আর যদি কারো এক বা একাধিক গাড়ি থাকে যা তিনি বিক্রয়ের জন্য রেখেছেন, অর্থাৎ তিনি গাড়ি ক্রয়-বিক্রয় করে ব্যবসা করেন, তিনি গাড়ি বা গাড়িগুলোর মূল্য হিসাব করে মোট মূল্যের শতকরা ২.৫ ভাগ যাকাত প্রদান করবেন।

অনুরূপভাবে কারো যদি নিজের ব্যবহারের জন্য এক বা একাধিক বাড়ি থাকে, তাহলে তাকে কোন যাকাত দিতে হবে না। আর যদি ভাড়া দেয়ার জন্য বাড়ি থাকে তাহলে উপার্জিত অর্থ নিসাব পুর্ণ হলে বছর শেষে যাকাত প্রদান করতে হবে, বাড়ীর মূল্যে যাকাত দিতে হবে না। আর যদি বিক্রয়ের জন্য কোন বাড়ি থাকে, তাহলে প্রতি বছর বাড়ির মোট মূল্যের যাকাত প্রদান করতে হবে।

ব্যবসায়ের সামগ্রীর যাকাত হিসাবে মূলধন ও লভ্যাংশ সবকিছুর যাকাত প্রদান করতে হবে, শুধু লভ্যাংশের যাকাত নয়। অন্যদিকে যে মূলধন ক্রয়-বিক্রয়ে নিয়োজিত এরই যাকাত দিতে হবে। যেমন কেহ ব্যবসায়ে ৫লাখ টাকা বিনিয়োগ করলেন। ১ লাখ টাকায় ঘর তৈরী করলেন বা ভাড়া করলেন, ৫০ হাজার টাকার আসবাব পত্র তৈরী করলেন, এক লাখ টাকায় ব্যবসায়ের দ্রব্যাদি পরিবহনের জন্য গাড়ী ক্রয় করলেন, বাকী আড়াই লাখ টাকায় তিনি ব্যবসায়ের দ্রব্য খরিদ করে ব্যবসা শুরু করলেন। এক্ষেত্রে তাকে এ আড়াই লাখ টাকা ও অন্যান্য উপার্জনের বা লভ্যাংশের যাকাত প্রতি বছর আদায় করতে হবে। দোকান, আসবাব ইত্যাদিতে ব্যয়িত আড়াই লাখ টাকার যাকাত প্রদান করতে হবে না।

(গ) বিভিন্ন সামগ্রীর একত্রে যাকাত

যদি কারো পৃথকভাবে নিসাবের চেয়ে কম পরিমাণ সোনা, রূপা, নগদ টাকা বা ব্যবসায়ী সামগ্রী থাকে এবং সবকিছু একত্রিত করলে ৮৫ গ্রাম সোনা বা ৬০০ গ্রাম রূপার মুল্যের সমান বা বেশী হয়, তাহলে তাকে যাকাত দিতে হবে। আমরা দেখেছি যে, যেহেতু রূপার মূল্য কম, সেহেতু রূপাকেই নিসাব ধরতে হবে। এজন্য এগুলোর মোট মূল্য ১২,০০০ টাকা- বা তার বেশি হলে তাকে যাকাত দিতে হবে।

(ঘ) ফল-ফসলের যাকাত

যাকাতযোগ্য দ্রব্যের অন্যতম হলো ফল ও ফসল। ফল-ফসলের যাকাতের পরিমাণ বেশি। মোট ফল-ফসলের দশভাগের একভাগ বা বিশভাগের একভাগ, অর্থাৎ ১০% বা ৫% ভাগ যাকাত প্রদান করতে হয়। এজন্য ফসলের যাকাতকে “উশর” বা “একদশামাংশ যাকাত” বলা হয়।

আল্লাহ্ বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা তোমাদের পবিত্র উপার্জন থেকে (যাকাত) ব্যয় কর এবং আমি তোমাদের জন্য ভূমি থেকে যা বের করেছি তা থেকে।”   আরো বলেছেন: “তোমরা যে দিন ফসল কেটে ঘরে তুলবে সে দিন উৎপাদিত ফল-ফসলের হক (যাকাত) আদায় করবে।”

রাসূলুল্লাহ  বলেছেন : “বৃষ্টির পানি, প্রবাহিত ঝর্ণার পানি বা মাটির স্বাভাবিক আর্দ্রতা থেকে যে ফল বা ফসল উৎপাদিত হয়, সে ফল ও ফসলের এক দশমাংশ (১০%) যাকাত হিসাবে প্রদান করতে হবে। আর সেচের মাধ্যমে যে ফল বা ফসল উৎপন্ন করা হয় তা থেকে একদশমাংশের অর্ধেক (৫%) যাকাত প্রদান করতে হবে।”

এ মর্মে আরো অনেক হাদীস অন্যান্য সাহাবী থেকে বর্ণিত হয়েছে। এ সকল হাদীসের আলোকে মুসলিম উম্মাহর সকল ইমাম ও আলেম ইজমা’ বা ঐক্যবদ্ধভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন যে, অতিরিক্ত সেচ ব্যবস্থা ছাড়া স্বাভাবিক বৃষ্টি, ঝর্ণা, বা নদীর প্রবাহমান পানির মাধ্যমে উৎপাদিত ফসল ও ফলের ১০% যাকাত প্রদান করা মুমিনের উপর ফরয। আর যদি উৎপাদনের ক্ষেত্রে মানবীয় প্রচেষ্টার মাধ্যমে অথবা যন্ত্র বা জীবজানোয়ারের মাধ্যমে সেচের পানি সরবরাহ করা হয় তাহলে এভাবে উৎপাদিত ফল ও ফসলের ৫% যাকাত প্রদান করা মুমিনের উপর ফরয।

মুসলিম উম্মাহর ফকীগণ বলেছেন যে, সংরক্ষণযোগ্য সকল ফল ও ফসল, যেমন ধান, পাট, গমন, যব, ভুট্টা, ছোলা, মসুরী, কলাই, শরিষা, আখ, তুলা, মধু, লবন ইত্যাদি সকল ফল, ফসল ও ভূমিতে উৎপাদিত দ্রব্যের যাকাত প্রদান করা ফরয। শুধুমাত্র টাটকা শব্জি ও মৌসুমী ফলকে অনেক ইমাম ও ফকীহ যাকাতের আওতার বাইরে রেখেছেন। ইমাম আবু হানীফা ও অন্যান্য ইমাম বলেছেন যে, সবকিছুরই উশর বা যাকাত প্রদান করতে হবে। এজন্য বেগুন, লাউ, টমাটো, শাক, কলা, আম, জাম, লিচু, কাঁঠালসহ যাবতীয় মৌসুমি ফল ও শাকশব্জির ১০% বা ৫% ভাগ যাকাত প্রদান করতে হবে।

ফসলের যাকাতের নিসাব হলো  ৬৫৩ কিলোগ্রাম বা প্রায় ১৭ মণ। এ পরিমাণ বা এর বেশী ফল, ফসল, মধু, লবন বা কৃষি উৎপাদন থেকে উপরের হিসাবে যাকাত প্রদান করতে হবে। তবে ইমাম আবু হানীফা বলেছেন যে, তার কম ফল ফসলেরও যাকাত দিতে হবে। অল্পবেশি সব ফসলের যাকাত দিতে হবে।

যদি কেউ একই মৌসুমে একাধিক ফসল উৎপাদন করেন এবং এককভাবে কোন ফসল নিসাব পরিমাণ না হয়, কিন্তু সবফসল মিলালে নিসাব পূর্ণ হয়, তাহলে সব ফসল মিলিয়ে নিসাব পূর্ণ করে যাকাত দিতে হবে। যেমন কেউ ১০ মণ ছোলা ও ১০ মণ মসুর পেলে তাকে ২০ মণ শস্যের ১০% বা ৫% ভাগ যাকাত-পানির উৎস অনুযায়ী-প্রদান করতে হবে। বর্গার ক্ষেত্রে মালিক ও কৃষক প্রত্যেকে নিজ অংশ থেকে যাকাত প্রদান করবেন। জমি, ফসল, গাছ, ফল ইত্যাদি লীজ নেয়ার ক্ষেত্রে সাধারণত ক্রেতা বা লীজ গ্রহীতা যাকাত প্রদান করবেন।

(ঙ) বাংলাদেশে উশর বা ফসলের যাকাত দিতেই হবে

আল্লাহ্র কুরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশ, অগণিত হাদীসের নির্দেশ ও মুসলিম উম্মাহর ঐক্যমত বা ইজমাকৃত এ ফরয ইবাদতটি ও ইসলামের অন্যতম রুকনটি আমাদের দেশের অধিকাংশ ধার্মিক মুসলিম পালন করেন না। অনেকে অনেক নফল দান সাদকাহ করেন, কিন্তু ফল ও ফসলের ফরয যাকাত বা উশর প্রদান করেন না। তার পিছনে রয়েছে একটি জঘন্য ও মারাত্মক ভুল ধারণা। আমরা মনে করি যে, আমরা খাজনা ও অন্যান্য কর প্রদান করি এজন্য যাকাত প্রদানের প্রয়োজন নেই। কথাটি জঘন্য মিথ্যা ও আল্লাহ্র দ্বীনকে বাতিল করার অন্যতম পথ। এভাবে কেউ ব্যায়ামের কারণে সালাত বাতিল করবে, ট্যাক্স, ঘরভাড়া, ভ্যাট, চাঁদা ইত্যাদির কারণে সম্পদের যাকাত বাতিল করবে, কর্মব্যস্ততা, অতিকষ্ট, পুষ্টিহীনতা, অনাহার ইত্যাদি কারণে সিয়াম বাতিল করবে, টেলিভিশনের প্রচারের জন্য, দেশের অভাবের জন্য হজ্জ বাতিল করবে… নাঊযু বিল্লাহ!

আল্লাহ্র দেয়া ফরয দায়িত্ব ও ইসলামের রুকন কখনোই বাতিল বা রহিত হয় না। মুসলিম উম্মাহ একমত যে, কোন অবস্থাতেই কোন দেশে বা জমিতে উৎপন্ন ফসলের যাকাত রহিত হবে না। শুধুমাত্র ইমাম আবু হানীফা (রহ) একটি ক্ষেত্রে উশর না দিলে চলবে বলে মত প্রকাশ করেছেন। ইসলামী বিজয়ের সময় কোন কোন জমিতে “ইসলামী খারাজ” আরোপ করা হয়। “খারাজ” সর্বদা উশর বা যাকাতের দ্বিগুণ বা বেশি হয়। এজন্য ইমাম আবু হানীফা (রহ) বলেন যে, তিনটি শর্তে এইরূপ খারাজী জমির ফসলের উশর বা যাকাত না দিলেও চলবে:

১ম শর্ত : ইসলামী পদ্ধতিতে ভূমিটি খারাজী হতে হবে এবং ইসলামী বিজয়ের সময় খারাজী বলে নির্ধারিত হয়েছিল বলে নিশ্চিত জানতে হবে। কোন জমি খারাজী না উশরী এ বিষয়ে সন্দেহ হলে তার উশর দিতেই হবে।

২য় শর্ত: খারাজ ফিকহ অনুসারে ধার্য্যকৃত হবে। খারাজের পরিমাণ ইসলামী নিয়মে উৎপন্ন ফসলের একপঞ্চমাংশ বা অনুরূপ হতে হবে।

৩য় শর্ত: খারাজ গ্রহণকারী সরকার বা রাষ্ট্র ইসলামী সরকার, ইসলামী রাষ্ট্র ও শরীয়ত পালনকারী ও শরীয়ত অনুসারে খারাজ বণ্টনে অঙ্গিকারাবদ্ধ হতে হবে। যদি কোন অনৈসলামিক সরকার ইসলামী পদ্ধতিতে ও ইসলামী পরিমাণ খারাজ মুসলিম নাগরিকের কাছে থেকে সংগ্রহ করে, তাহলে সে নাগরিককে পুনরায় নিজের পক্ষ থেকে খারাজ বা উশর ইসলামী পদ্ধতিতে বিতরণ করতে হবে।

এ তিনটি শর্তের একটিও বাংলাদেশে পাওয়া যায় না। এজন্য বাংলাদেশের সকল প্রকার কৃষি উৎপাদনের যাকাত বা উশর প্রদান করা প্রত্যেক ভূমি মালিক বা ভূমি ব্যবহারকারী মুসলিমের উপর ফরয। হানাফী মাযহাবের ফকীহগণ-সহ সকল মাযহাবের ফকীহ মত প্রকাশ করেছেন যে, আধুনিক যুগে কোনো মুসলিম বা অমুসলিম দেশে ইসলামী খারাজ ব্যবস্থা প্রচলন নেই। এজন্য মুসলিম মালিকানাধীন সকল ভূ-সম্পত্তির উৎপাদিত ফল ও ফসলের যাকাত প্রদান করা ফরয। পাঠককে “বাংলাদেশে উশর বা ফসলের যাকাত” বইটি পড়তে আবার অনুরোধ করছি। আল্লাহ্ আমাদেরকে দ্বীনের অন্যতম ফরয ও রুকনটিকে পালন ও জীবিত করার তাওফীক দান করুন।

যাকাত কারা পাবেন

মহান আল্লাহ্ পবিত্র কুরআনের সুরা তাওবার ৬০ নং আয়াতে ৮ শ্রেণির মানুষকে যাকাত প্রদানের কথা বলেছেন। বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে এখানে শুধু তিন শ্রেণির উল্লেখ করা হলো

অত্যন্ত দরিদ্র বা কপর্দকহীন, যিনি উপার্জন করতে পারেন না বা অতি সামান্যই উপার্জন করেন। এ ধরনের ব্যক্তিরা যাকাতের অর্থ পাবেন।

অসচ্ছল ব্যক্তি, যিনি উপার্জন করেন, বা যার নির্দিষ্ট পরিমাণ আয় রয়েছে, কিন্তু তাঁর আয়ে তাঁর প্রয়োজনীয় ব্যয় চালাতে পারেন না, এ শ্রেণির মানুষেরা যাকাত পাবেন।

ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি। যদি কেউ মুলত দরিদ্র নন, কিন্তু শরীয়তসঙ্গত কারণে বা পাপ নয় এমন কারণে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন, যে ঋণ শোধ করা তার জন্য সম্ভব নয়, তাহলে তাকে ঋণ পরিশোধের জন্য যাকাতের অর্থ প্রদান করা যাবে।

এখানে মনে রাখতে হবে যে, যাকাত একমাত্র মুসলিমদের প্রাপ্য। কোন অমুসলিম যাকাত পাবেন না। মুসলিম নামধারী কোন ব্যক্তি যদি নামাজ না পড়েন বা প্রকাশ্য শিরক বা কুফরীতে লিপ্ত থাকেন তাহলে তাকে যাকাত দেয়া যাবে না।

যাকাতের টাকা বা দ্রব্য ব্যক্তিকে নিঃশর্তে পূর্ণ মালিকানা প্রদান করে দিতে হবে। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া প্রতিবেশীদের মধ্যে কেউ যাকাত গ্রহণের যোগ্য থাকলে তাকে আগে দিতে হবে। যাকাত এবং সকল দানের ক্ষেত্রে একটি মূলনীতি হলো তার উপকার যত ব্যাপক হবে সাওয়াবও তত বেশী হবে। যেমন যে কোন মুসলিম দরিদ্রকে যাকাত প্রদান করা যাবে। তবে একজন দরিদ্র তালেবে এলেম বা আলেমকে  যাকাত প্রদান করলে তিনি একদিকে দরিদ্র ব্যক্তি হিসাবে অন্য যে কোন ব্যক্তির ন্যায় উপকৃত হবেন, উপরন্তু এ সাহায্য তাকে অধিকতর ইলম চর্চা ও প্রসারের সুযোগ দেবে, যা উক্ত যাকাত দ্বারা অর্জিত অতিরিক্ত উপকার। এজন্য যাকাত দাতার সাওয়াব বৃদ্ধি পাবে। উশর প্রদানের সময় এ মূলনীতির দিকে লক্ষ্য রাখা দরকার, যেন আমাদের যাকাত শুধুই ব্যক্তিগত আর্থিক সাহায্য না হয়ে অধিকতর কিছু কল্যাণে পরোক্ষভাবে হলেও অবদান রাখে।

 

নফল বা অতিরিক্ত দান, “সাদাকাহ” বা ইনফাক

নফল দান, সাদকা, সাহায্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। প্রত্যেক মুমিনের নিয়মিত ও অনিয়মিত দানের অভ্যাস রাখা প্রয়োজন। মানুষের অভাব চিরন্তন। মনের অভাব থেকে কেউই মুক্ত নয়। মুমিন সর্বদা চেষ্টা করবেন অতি প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত ও পারিবারিক গমস্যা মেটানোর পর প্রতিদিন, প্রতি সপ্তাহে, প্রতি মাসে নিয়মিত কিছু নির্ধারিত ইয়াতিম, বিধবা, অসহায় বা অভাবী মানুষকে সাহায্য করার। এছাড়া সর্বদা সাধ্যমতো দান করার চেষ্টা করতে হবে। দানের প্রয়োজনীয়তা, গুরুত্ব ও সাওয়াব বিষয়ে হাদীস আলোচনা করার জন্য পৃথক বই প্রয়োজন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনার অধিপতি ছিলেন। আল্লাহ্র নির্ধারিত বিধান অনুসারে তিনি যুদ্ধলব্ধ গনীমত থেকে এক পঞ্চমাংশ পেতেন। পাওয়ার সাথে সাথে তিনি তা অভাবী মানুষদের মধ্যে বিতরণ করে দিতেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সন্ধ্যার আগেই তাঁর সব সম্পদ নিঃশেষ হয়ে যেত। মাসের পর মাস তাঁর স্ত্রীগণের ঘরে রান্না করার মতো কিছুই থাকত না। শুধুমাত্র ২/১ টি শুকনো খেজুর ও পানি খেয়েই তাঁদের মাসের পর মাস চলে যেত। এ সকল ঘটনা বিস্তারিত বলতে গেলে বিশাল আকারের বই লিখতে হবে।

সাহাবায়ে কেরাম সর্বদা এ ধরনের ব্যয়ের জন্য আগ্রহী ছিলেন। তাঁদের জীবনে এ ধরনের অগণিত ঘটনা রয়েছে, যা আলোচনা করলে আমাদের পার্থিব সম্পদ ও বিলাসিতার লোভ কিছুটা কমতে পারে। এ বইয়ের ক্ষুদ্র পরিসরে শুধু দু’টি ঘটনা উল্লেখ করছি। উমর (রা) জাবির (রা)-এর হাতে একটি দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) দেখতে পান। তিনি জিজ্ঞাসা করেন: দিরহাম দিয়ে কী করবে? জাবির বলেন: আমার সন্তানরা খুবই শখ করেছে গোশত খাওয়ার, তাই তাদের জন্য কিছু গোশত ক্রয় করব। উমর অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বারবার বলতে থাকেন Ñ ‘শখ করেছে ?’ জাবির (রা) বলেন: আমি মনে মনে কামনা করছিলাম, আমার হাতের দিরহামটি যদি হারিয়ে যেত এবং উমর তা না দেখতেন ! উমর (রা) বলেন: “তোমাদের যা শখ হবে তাই কিনবে? তোমাদের মধ্যে কেউ কি চায় না যে, তার ভাইয়ের জন্য ও প্রতিবেশীর জন্য একটু ক্ষুধার্ত থাকবে (নিজে ক্ষুধার্ত থেকে সে অর্থ তার ভাইকে প্রদান করবে)? আল্লাহ্ বলেছেন: যেদিন কাফিরদেরকে জাহান্নামের কাছে উপস্থিত করা হবে, সেদিন বলা হবে) তোমরা তোমাদের সুখ ও মজাদার সব কিছু তো পার্থিব জীবনেই ভোগ করে শেষ করে ফেলেছ, সুতরাং আজ তোমাদেরকে অপমানকর আযাবের শাস্তি প্রদান করা হবে।”  তোমরা কি কুরআনের এ বাণী ভুলে গেলে ?

অন্য এক ঘটনায় আব্দুল্লাহ ইবনু উমর (রা.) বলেন, একদিন তিনি খাবারের মাজলিসে বসে খাচ্ছিলেন, এমনতাবস্থায় তাঁর পিতা উমর (রা.) তাঁর ঘরে প্রবেশ করেন। তিনি সরে গিয়ে তাঁর জন্য মাজলিসের সামনে স্থান করে দেন। উমর (রা.) বসে বিসমিল্লাহ বলে এক লোকমা গ্রহণ করেন। দ্বিতীয় লোকমা মুখে দেয়ার পরে তিনি বলেন, আমি খাদ্যের মধ্যে চর্বির গন্ধ পাচ্ছি, যা গোশতের চর্বি বলে মনে হচ্ছে না। তখন আব্দুল্লাহ বলেন, আমি বাজারে গিয়েছিলাম মোটাতাজা ছাগলের গোশত কেনার আশায়। কিন্তু বাজারে গিয়ে দেখলাম এর মূল্য বেশি। এজন্য এক দিরহাম দিয়ে রোগাপটকা বকরির গোশত কিনলাম এবং এক দিরহাম দিয়ে ঘি কিনে তার সাথে মিশালাম, যেন ছেলেমেয়েরা ভালোভাবে গোশতটুকু চেটেপুটে খেতে পারে। তখন উমর (রা.) বলেন : “যখনই রাসূলুল্লাহ -এর কাছে দু’টি দিরহাম জমা হতো, তখনই তিনি তার একটি দিরহাম দিয়ে খাদ্য ক্রয় করতেন এবং অন্যটি তিনি দান করতেন।” এ কথা শুনে আব্দুল্লাহ (রা) বলেন : “হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি খানা গ্রহণ করুন। ভবিষ্যতে কখনোই আমি তার ব্যতিক্রম করব না। যদি কখনো আমি দু’টি দিরহামের মালিক হই তাহলে ঠিক রাসূলুল্লাহ () যেভাবে ব্যয় করেছেন (একটি সংসারের জন্য ও অপরটি সমাজের জন্য) সেভাবেই আমি ব্যয় করব।”

কুরআন-হাদীসের আলোকে নফল দানের অভাবনীয় সাওয়াবের কথা আলোচনা করতে হলে পৃথক বৃহৎ বইয়ের প্রয়োজন। তবে এক্ষেত্রে বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, কুরআন-হাদীসের বর্ণনা থেকে নফল দানের যে বৈশিষ্ট দেখা যায়, তা হলো অন্যান্য সকল ইবাদতের ন্যায় নফল দানেও অগণিত সাওয়াব, মর্যাদা, গোনাহের ক্ষমা ও আল্লাহ্র রহমত লাভ করেন বিশ্বাসী বান্দা। উপরন্তু তিনি লাভ করবেন এ পার্থিব জীবনে বিপদমুক্তি, উন্নতি ও বরকত। তার কারণ হলো নফল দান আল্লাহ্র সৃষ্টির সেবা ও সৃষ্টির উপকার কেন্দ্রিক। আর আল্লাহ্ তাঁর সৃষ্টির ও বিশেষত মানুষের উপকারে ও সেবায় সবচেয়ে বেশি খুশি হন এবং এজন্য পার্থিব জগতেই তাকে পুরস্কৃত করেন।

চতুর্থ স্তম্ভ : সিয়াম বা রোযা

প্রভাত (সুবহে সাদেক) থেকে সূর্যাস্ত (মাগরিব) পর্যন্ত আল্লাহ্র এবাদত ও সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পানাহার, দাম্পত্য মিলন ইত্যাদি সকল সিয়াম (রোযা) ভঙ্গকারী কর্ম থেকে বিরত থাকা হল সিয়াম বা রোযা। আত্মার পরিশুদ্ধি, আধ্যাত্মিক উন্নতি, মানবিক এমনতাবোধের বিকাশ, তাকওয়া ও সততা অর্জনের জন্য সকল যুগের সকল বিশ্বাসী মানুষের অন্যতম প্রধান অবলম্বন হলো সিয়াম। রমযানের সিয়াম ফরয ও ইসলামের  রুকন। এছাড়া যথাসম্ভব বেশি অতিরিক্ত বা নফল সিয়াম পালনে উৎসাহ দেয়া হয়েছে।

চিন্তাহীন, অনুধাবনহীন, সৎকর্মহীন পানাহার বর্জন উপবাস বলে গণ্য হতে পারে তবে ইসলামী সিয়াম বলে গণ্য হবে না। সিয়াম অর্থ সকল নিষিদ্ধ, হারাম কাজে রত থেকে হালাল খাদ্য ও পানীয় থেকে নিজেকে বঞ্চিত রাখা নয়। সিয়াম অর্থ মহান আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সকল নিষিদ্ধ, অন্যান্য পাপ ও অপছন্দনীয় কর্ম বর্জন করার সাথে সাথে হালাল ও সিদ্ধ খাদ্য, পানীয় ও সম্ভোগ থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এভাবে মানব হৃদয়ে সার্বক্ষণিক আল্লাহ্ সচেতনতা ও আল্লাহ্র সন্তুষ্টির দিকে লক্ষ্য রেখে শত প্রলোভন ও আবেগ দএ করে সততা ও নিষ্ঠার পথে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য সিয়াম।

যদি আপনি কঠিন ক্ষুধা বা পিপাসায় কাতর হয়েও আল্লাহ্র ভয়ে ও তাঁর সন্তুষ্টির আশায় নিজেকে খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত রাখেন, অথচ সামান্য রাগের জন্য গালি, ঝগড়া ইত্যাদি হারাম কাজে লিপ্ত হন, মিথ্যা অহংবোধকে সমুন্নত করতে পরনিন্দা, গীবত, চোগলখুরী ইত্যাদি ভয়ঙ্কর হারামে লিপ্ত হন, সামান্য লোভের জন্য মিথ্যা, ফাঁকি, সুদ, ঘুষ ও অন্যান্য যাবতীয় হারাম নির্বিচারে ভক্ষণ করেন, তাহলে আপনি নিশ্চিত জানুন যে, আপনি সিয়ামের নামে আত্মপ্রবঞ্চনার মধ্যে লিপ্ত আছেন। ধার্মিকতা ও ধর্ম পালনের মিথ্যা অনুভতি ছাড়া আপনার কিছুই লাভ হচ্ছে না।

রাসলুল্লাহ () বলেছেন: “যে ব্যক্তি পাপ, মিথ্যা বা অন্যায় কথা, অন্যায় কর্ম, ক্রোধ, মূর্খতাসুলভ ও অজ্ঞতামুলক কর্ম ত্যাগ করতে না পারবে, তার পানাহার ত্যাগ করাতে আল্লাহ্র কোন প্রয়োজন নেই।”  তিনি আরো বলেন: “অনেক সিয়াম পালনকারী আছে যার সিয়াম থেকে শুধুমাত্র ক্ষুধায় কষ্ট করা ছাড়া আর কোন লাভ হয় না।”

অপর দিকে সিয়াম শুধু বর্জনের নাম নয়। সকল নিষিদ্ধ ও অপছন্দনীয় কর্ম ও চিন্তা বর্জনের সাথে সাথে সকল ফরয- ওয়াজিব ও যথাসম্ভব বেশি নফল মুস্তাহাব কর্ম করা। তিনি পাঁচ ওয়াক্ত সালাত যথাসময়ে আদায় করবেন, জামাতে সালাত আদায় করবেন। ঝগড়া, গালাগালি, রাগারাগি, মিথ্যা, গিবত বা পরনিন্দা-পরচর্চা, ধোঁকা, সুদের কারবার ও অন্যান্য সকল প্রকার নিষিদ্ধ কথা ও কর্ম পরিহার করবেন। এসকল অন্যায় কাজ পরিত্যাগ না করে শুধুমাত্র পানাহার ত্যাগ করলে সে সিয়াম আল্লাহ্র কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না, তাতে বরং ক্ষুধা ও পিপাসায় কষ্ট করাই সার হবে।

সিয়ামের কিছু আহকাম

প্রাপ্ত রয়স্ক (বালেগ), সজ্ঞান, সক্ষম ও নিজ এলাকায় বসবাস কারী (মুসাফির নয়) প্রত্যেক মুসলিমের উপর রমযান মাসের সিয়াম পালন করা ফরয। কাফির বা অমুসলমান সিয়াম পালন করবে না। কোন অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করলে তাকে আগের সিয়ামের কাজা করতে হবে না। অপ্রাপ্ত বয়স্ক (নাবালেগ) বালক বালিকাদের জন্য সিয়াম ফরয নয়, তবে অভ্যস্ত করার জন্য তাদেরকে সিয়াম পালনের নির্দেশ দিতে হবে। পাগল বয়স্ক (সাবালগ) হলেও তার জন্য সিয়াম ফরয নয়, আর তার পক্ষ থেকে কোন মিসকিন খাওয়ান বা ফিদইয়া-কাফ্ফারা দিতে হবে না। কান্ডজ্ঞানহীন ব্যক্তি যার কোন ভালমন্দ জ্ঞান নেই এবং কাণ্ডজ্ঞান রহিত অতি বৃদ্ধেরও একই হুকুম।

যে ব্যক্তি স্থায়িভাবে সিয়াম পালনে অক্ষম, যেমন বৃদ্ধ, বৃদ্ধা বা স্থায়িভাবে অসুস্থ ব্যক্তি, তিনি প্রতিদিনের সিয়ামের পরিবর্তে একজন মিসকিন বা দরিদ্রকে খাওয়াবেন। অসুস্থ ব্যক্তি সিয়াম পালন কষ্টসাধ্য হলে সিয়াম ভাঙবেন। তিনি যদি তাঁর রোগ মুক্তির আশা রাখেন তাহলে তাকে মিসকিন বা দরিদ্রকে খাওয়াতে হবে না, বরং তিনি সুস্থ হওয়ার পর কাজা করবেন। গর্ভবর্তী মহিলা এবং যে মহিলা শিশুকে বুকের দুধ পান করাচ্ছেন তাঁরা নিজেদের বা সন্তানের ক্ষতির ভয় থাকলে সিয়াম ভাঙতে পারবেন এবং গমস্যা দূর হবার পর কাজা করবেন। ঋতুবতী মহিলা (হায়েজ বা নিফাস অবস্থায়) সিয়াম পালন করতে পারবেন না, পরে কাজা করবেন।

পানিতে ডুবে যাওয়া বা আগুনে পুড়ে যাওয়া থেকে কোন মানুষকে উদ্ধারের প্রয়োজনে সিয়াম ভাঙ্গা যাবে, পরে কাজা করতে হবে।

মুসাফির বা ভ্রমনরত ব্যক্তি ইচ্ছা করলে সিয়াম পালন করবেন; ইচ্ছা করলে সিয়াম ভঙ্গ করতে পারেন, পরে কাজা করবেন। যারা অস্থায়ী সফর করছেন- যেমন ওমরা পালন করতে যাচ্ছেন- এবং যারা স্থায়ী সফরে থাকেন- যেমন ভাড়াটে ট্যাক্সি বা ট্রাকের চালকগণ- সবার জন্যই এ হুকুম। তাঁরা সবাই যতক্ষণ নিজ এলাকার বাইরে থাকবেন, ইচ্ছা করলে সিয়াম ভাঙতে পারবেন এবং পরে কাজা করবেন।

যে সকল কারণে সিয়াম নষ্ট হয়

ভুলে বা না জেনে পানাহার করলে সিয়াম নষ্ট হবে না। অনুরূপভাবে যদি ঘুমন্ত অবস্থায় স্খলন হয়, তাহলেও সিয়াম নষ্ট হবে না। কারণ এসবকিছুই জ্ঞান বা ইচ্ছার বাইরে। নি¤েœর কারণগুলোতে সিয়াম নষ্ট হবে:

১. কোন কিছু আহার বা পান করলে সিয়াম নষ্ট হবে। এমনকি ধুমপান অথবা কোন বিষাক্ত বা ক্ষতিকর কিছু পানাহার করলেও সিয়াম ভেঙে যাবে।

শরীরে পুষ্টি সরবরাহকারী ইনজেকশন বা সালাইন যা খাদ্যের অভাব মেটায় তা ব্যবহার করলে সিয়াম ভেঙে যাবে, কারণ তা পানাহারের সমতুল্য। অন্যান্য সাধারণ ইনজেকশন ব্যবহারে সিয়াম নষ্ট হবে না তা পেশীতেই ব্যবহার করা হোক বা শিরায় ব্যবহার করা হোক। এমনকি ইনজেকশন গ্রহণের পরে ঔষধের স্বাদ গলায় অনুভব করলেও তাতে সিয়াম নষ্ট হবে না। শরীরে রক্ত সরবরাহ করলে, অর্থাৎ সিয়াম পালনকারীর দেহে রক্ত দেয়া হলে তাতে সিয়াম নষ্ট হবে।

২. স্ত্রী সহবাস করলে সিয়াম নষ্ট হবে। এছাড়া জাগ্রত অবস্থায় ইচ্ছাধীন কোন কাজের মাধ্যমে স্খলন ঘটালে সিয়াম নষ্ট হবে।

৩. মহিলাদের নিয়মিত বা সন্তান প্রসব পরবর্তী রক্ত দেখা দিলে সিয়াম ভেঙে যাবে। সাধারণ রক্তপাতে, যেমন নাক থেকে রক্ত বের হলে বা দাঁত উঠিয়ে ফেলাতে রক্তপাত হলে বা কেটে যাওয়ার ফলে রক্ত বাহির হলে সিয়াম নষ্ট হবে না।

৪. ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করলে সিয়াম নষ্ট হবে। অনিচ্ছাকৃত বমিতে সিয়ামের ক্ষতি হবে না।

কতগুলো প্রয়োজনীয় তথ্য

রমযানের সিয়াম পালনের সময় বেশিবেশি কুরআন তিলাওয়াত, দরিদ্রদের সাহায্য করা, দান করা, ইফতার করানো ইত্যাদির জন্য বিশেষভাবে উৎসাহ দিয়েছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

সিয়ামের জন্য মনে মনে নিয়্যাত অর্থাৎ সিয়ামের সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা ইচ্ছা পোষণ করতে হয়। তবে মুখে “নাওয়াতুআন..” ইত্যাদি পাঠ বাতুলতা মাত্র। সিয়াম পালনকারী নাপাক (গোসল ফরজ থাকা) অবস্থায় সিয়ামের সিদ্ধান্ত গ্রহণ (নিয়েত) করতে পারেন। সুবহে সাদেকের পরে গোসল করে ফজরের সালাত আদায় করে নেবেন। কারণ সিয়াম শুরু করার জন্য পবিত্রতা জরুরী নয়, সালাত আদায়ের জন্য পবিত্রতা অর্জন করা জরুরি।

কোন মহিলা রমাযান মাসের কোন দিনে সুবহে সাদেকের আগে  (মাসিক বা শিশু জন্মদান পরবর্তী) রক্ত থেকে মুক্ত হলে তাকে অবশ্যই ঐ দিনের সিয়াম পালন করতে হবে। প্রয়োজনে তিনি সুবহে সাদেকের পরে ফজরের সালাতের আগে গোসল করবেন।

সিয়াম পালনকারীর জন্য প্রয়োজনে নখকাটা, দাঁত ওঠানো, ক্ষতস্থানে ঔষধ লাগান ইত্যাদি জায়েয, এতে সিয়াম ভঙ্গ হবে না। হাঁপানি বা শ্বাসকষ্ট কমানোর জন্য প্রয়োজনে ¯েপ্র ব্যবহার করা জায়েয হবে বলে কোনোকোনো আলেম মত প্রকাশ করেছেন।

সিয়াম পালনকারী সকালে, দুপুরে, বিকালে, সন্ধ্যায় যখন ইচ্ছা মেসওয়াক করতে পারেন। সর্বাবস্থার ন্যায় সিয়াম পালনরত অবস্থায়ও মেসওয়াক করা সুন্নাত। সিয়াম পালনকারী তাঁর গরমের কষ্ট বা পিপাসার কষ্ট কমানোর ব্যবস্থা নিতে পারেন, যেমন পানি দিয়ে ঠান্ডা হওয়া, এয়ার-কনডিশনার ব্যবহার করা ইত্যাদি। সিয়াম পালনকারী তাঁর ঠোঁট শুকিয়ে গেলে তা পানি দিয়ে ভিজিয়ে নিতে পারেন এবং মুখের ভিতর শুকিয়ে গেলে কুলি করতে পারেন। তবে তিনি গড়গড়া করতে পারবেন না।

সিয়াম পালকারীর জন্য সুন্নাত হলো যে, তিনি সেহেরী যথাসম্ভব দেরী করে সুবহে সাদেকের সামান্য আগে খাবেন, আর সূর্যাস্তের সাথে সাথে বিলম্ব না করে ইফতার করবেন। ইফতারের সুন্নাত হলো সূর্যস্তের সাথে সাথে তিনটি টাটকা খেজুর দিয়ে ইফতার করা, না হলে খোরমা দিয়ে ইফতার করা। খেজুর বা খুরমা না থাকলে পানি মুখে দিয়ে ইফতার করতে হবে। না হলে যে কোন হালাল খাদ্য দিয়ে ইফতার করা। কোন খাবার বা পানীয় না থাকলে মনে মনে ইফতারের নিয়েত করবেন এবং পরে যখনই সম্ভব হবে পানাহার করবেন।

রমযান মাসের শেষ দশদিন সারারাত জেগে ইবাদত করা, ইতিকাফ করা, লাইলাতুল কদর সন্ধান করা, শেষ দিন বা এর আগে যাকাতুল ফিতর বা ফিতরা প্রদান করা ইত্যাদি বিশেষ ইবাদত।

নফল বা অতিরিক্ত সিয়াম

ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, ফরযের অতিরিক্ত সকল ইবাদতকে “নফল” বলা হয়, যার মধ্যে সুন্নাত, মুসতাহাব সবই এসে যায়। হাদীস শরীফে সাধারণভাবে নফল সিয়াম পালনের বিশেষ উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের ও তাঁর সাহাবীগণ বছরের সকল মাসেই বেশী করে নফল সিয়াম পালন করতে ভালবাসতেন। তাঁরা নিয়মিত ও অনিয়মিত নফল সিয়াম পালন করতেন। প্রতি দু’দিন পর একদিন, বা একদিন পর একদিন, বা প্রতি সপ্তাহে সোমবার ও বৃহস্পতিবার, প্রতি আরবি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ, প্রতি মাসের প্রথমে ও শেষে নিয়মিত নফল রোযা পালনের বিশেষ উৎসাহ প্রদান করেছেন রাসূলুল্লাহ । মুহাররাম মাসে আশুরার রোযা, শা’বান মাসের প্রথম ১৫ দিন রোযা, শাওয়াল মাসে ৬টি রোযা, জিলহজ্জ মাসের ১ থেকে ৯ তারিখ পর্যন্ত, বিশেষত ৯ তারিখে আরাফাতের দিনের রোযা পালন করতে হাদীস শরীফে বিশেষভাবে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। এ সকল রোযার জন্য মুমিন লাভ করেন অপরিমেয় সাওয়াব ও আল্লাহ্র বিশেষ রহমত, বরকত ও মাগফিরাত।

পঞ্চম স্তম্ভ : হজ্জ

হজ্জ অর্থ ইচ্ছা করা। নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে পবিত্র কাবা ঘর ও মক্কার কিছু এলাকা যিয়ারত করা ও কিছু ইবাদত পালনের নাম হজ্জ। মক্কা মুকাররামাহ পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম এমন প্রত্যেক মুসলিম পুরুষ ও মহিলার জন্য জীবনে একবার হজ্জ আদায় করা ফরজ। বারবার হজ্জ আদায় করা মুস্তাহাব। কেউ হজ্জের আবশ্যকীয়তা বা ফরয হওয়া অস্বীকার করলে তাকে অমুসলিম বলে গণ্য করা হবে। আর যদি কোন সক্ষম ব্যক্তি হজ্জ ফরয মানা সত্বেও তা আদায় না করেন তাহলে তিনি কঠিন পাপের মধ্যে নিপতিত হবেন এবং ঈমান নষ্ট হওয়ার ভয় রয়েছে।

হজ্জ বেশ কিছুদিন ধরে আদায় করতে হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্ধারিত স্থান থেকে ইহরাম করতে হয়। ইহরাম অর্থ হজ্জের নিয়্যাত করে হজ্জ শুরুর সিদ্ধান্ত নেয়া। সালাতের তাকবীরে তাহরীমা বললে যেমন নামায শুরু হয় এবং নামাযের বাইরের সকল কাজ নিষিদ্ধ হয়ে যায়, তেমনি হজ্জের ইহরাম করলে হজ্জ শুরু হয় এবং হজ্জ বহির্ভূত সকল কাজ নিষিদ্ধ হয়ে যায়। ইহরাম করে মক্কায় পৌঁছানর পরে হজ্জের বিধানগুলো পালন করতে হয়।

জিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখে মক্কার প্রান্তরে “আরাফাত” নামক স্থানে অবস্থান করা ও তার আগে ও পরে কাবাঘর তাওয়াফ করা, সাফা-মারওয়া সাঈ করা, মিনায় অবস্থান করা, মিনার জামারাতগুলোতে কাঁকর নিক্ষেপ করা, হজ্জের কুরবানী বা হাদী জবাই করা, মাথা মুণ্ডন করা, এ সকল কর্মের মধ্যে আল্লাহ্র যিক্র করা, দোয়া করা  ইত্যাদি হলো হজ্জের কার্যসমূহ। উমরাহ হলো সংক্ষিপ্ত হজ্জ। বছরের যে কোন সময়ে নির্ধারিত স্থান থেকে ইহরাম করে মক্কায় যেয়ে নির্দিষ্ট নিয়মে আল্লাহ্র যিকিরের সাথে কাবাঘর সাতবার তাওয়াফ করা, সাফা মারওয়ার মাঝে সাতবার সাঈ করা ও তারপর মাথার চুল কাটা বা ছাঁটা হলো উমরা। জীবনে একবার উমরাহ আদায় করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ বা ওয়াজিব। তারপর নফল উমরাহ পালন করা যায়।

হজ্জে আল্লাহ্র একত্ববাদের মহত্তম নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়। কারণ একমাত্র আল্লাহ্র উপাসনার জন্য তৈরী প্রথম উপসনা-গৃহ হল পবিত্র কাবা ঘর। তাওহীদ বা একত্ববাদের চূড়ান্ত বিজয়ের সূচনা হয় হযরত ইবরাহীম (আ.) কর্তৃক এ ঘরের নির্মাণের মধ্য দিয়ে, আর তার সমাপ্তি ঘটে মহানবী () কর্তৃক এ ঘরের পবিত্রতা ও তাওহীদী ধর্মের প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। হজ্জে আমরা তাঁদের অগণিত নিদর্শন দেখতে পাই। হজ্জের মাধ্যমে ঈমানের পরীক্ষা হয়। তার মধ্য দিয়ে আল্লাহ্ প্রমাণিত করেন তাঁর কোন বান্দা সম্পদ ও শরীরের ত্যাগ ও কষ্ট স্বীকার করে তা আদায় করে। হজ্জের মাধ্যমে ব্যক্তির মানসিকতা প্রশস্ততা লাভ করে, বৃহৎ মানব গোষ্ঠীর সকল জাতি ও বর্ণের পাশাপাশি সমাবেশ ঘটে। পরস্পরে বর্ণগত, ভাষাগত, দেশগত, জাতিগত সকল হিংসা, বিদ্বেষ ও রেষারেষি হজ্জপালনকারীর হৃদয় থেকে মুছে যায়। সে হৃদয় দিয়ে অনুভব করে বিশ্ব কত বড় আর সকল মুসলিম কত আপন। মুসলিম জাতির মধ্যে সাম্য, ঐক্য ও সহযোগিতার প্রবণতা সৃষ্টি হয়।

হজ্জের ফজিলত

হজ্জের ফজিলতে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ  বলেছেন: “যে ব্যক্তি নিবেদিতভাবে, সর্বপ্রকার পাপ, অন্যায় ও অশ্লীলতা মুক্ত হয়ে হজ্জ আদায় করলো, সে নবজাতক শিশুর মত নিষ্পাপ হয়ে ঘরে ফিরল।”  তিনি আরো বলেছেন:  “একবার উমরা আদায়ের পরে দ্বিতীয়বার যখন উমরা আদায় করা হয়, তখন দুই উমরার মধ্যবর্তী গোনাহ আল্লাহ্ মাফ করে দেন। আর পুণ্যময় হজ্জের একমাত্র পুরস্কার হলো জান্নাত।”  তিনি আরো বলেছেন:  “তোমরা বারবার হজ্জ ও উমরা আদায় কর, কারণ কর্মকারের ও স্বর্ণকারের আগুন যেমন লোহা ও সোনা-রূপার ময়লা মুছে ফেলে  তেমনিভাবে এ দুটি ইবাদত দারিদ্র্য ও পাপ মুছে ফেলে। আর পুণ্যময় হজ্জের একমাত্র পুরস্কার হলো জান্নাত।

হজ্জ বিষয়ক কিছু ভুল ধারণা

আমাদের দেশে অনেক কৃষক, ব্যবসায়ী ও চাকুরীজীবির উপর হ্জ্জ ফরয। কারণ অনেকেরই প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমি, বাড়ী ও সঞ্চিত অর্থ রয়েছে। হজ্জ আর যাকাতের বিষয় এক নয়। যাকাতের ক্ষেত্রে স্থাবর সম্পতির যাকাত দিতে হয় না। কিন্তু হজ্জের ক্ষেত্রে প্রয়োজনের অতিরিক্ত স্থাবর সম্পত্তি ধর্তব্য। অনেক আলেম লিখেছেন যে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত বাড়ী বা জমি বিক্রয় করে হজ্জ পালন করা ফরয।

অনেকে মনে করেন পিতামাতার অনুমতি ছাড়া হজ্জ পালন করা যায় না। চিন্তাটি ভুল। পিতামাতার আনুগত্য প্রত্যেক সন্তানের উপর ফরয। কিন্তু তাদের নির্দেশে আল্লাহ্র দেয়া ফরয, ওয়াজিব পিছানো বা নষ্ট করা যাবে না। ফরয দায়িত্ব পালনে তাঁদের অনুমতিও প্রয়োজন নয়। ফরয নামায আদায় এবং ফরয হজ্জ আদায়ের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। তবে পিতামাতার কাছে থেকে দোয়া নেয়া, এজাজত নেয়া খুবই ভাল ও বরকতের কাজ।

অনেকে পিতামাতাকে হজ্জ না করিয়ে হজ্জ করাকে অনুচিত মনে করেন। এটিও ভুল। পিতামাতার ভরণপোষণ সন্তানের উপর ফরয দায়িত্ব। তবে হজ্জ ফরয হবে যার অর্থ আছে তার উপর। যদি পিতার নিজস্ব অর্থ থাকে তবে তাকে নিজের দায়িত্বে হজ্জ করতে হবে। সন্তান তাকে সাহায্য করবেন। আর যদি সন্তান অর্থ উপার্জনের কারণে বা কাছেবর্তী কোন দেশে গমনের কারণে তার উপর হজ্জ ফরয হয় তাহলে তাকে আগে নিজের হজ্জ পালন করতে হবে। পরে সম্ভব হলে পিতামাতাকে হজ্জ করানো খুবই ভাল কাজ।

অনেকে মনে করেন মেয়ের বিবাহ বা এ জাতীয় পারিবারিক দায়িত্ব পালন না করে হজ্জে যাওয়া ঠিক না। বিষয়টি পুরোপুরি ঠিক নয়। মেয়ের বিবাহ দানের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের অতিরিক্ত হজ্জে গমনের অর্থ যদি থাকে তাহলে আগেই হজ্জ করতে হবে। আগের যুগে রাস্তার নিরাপত্তার অভাবে এদেশের মুসলমান সকল সামাজিক দায়িত্ব পালনের পরে চির বিদায় নিয়ে হজ্জে গমন করতেন। বর্তমানে সেই অবস্থা নেই।

অনেকে মনে করেন হজ্জ বৃদ্ধ বয়সের বা শেষ জীবনের ইবাদত। হজ্জের পরে আর কোন সাংসারিক কাজ করা যায় না। অনেকে বলেন, অল্প বয়সে হজ্জ করলে রাখবে কিভাবে! এ সবই শয়তানী ওয়াসওয়াসা ও ইসলামী চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীত। কেউ যদি মনে করে যে, সারাজীবন কাফির থাকব, শেষ জীবনে ইমান এনে সকল গোনাহর ক্ষমা লাভ করে মৃত্যু বরণ করব, অথবা চিন্তা করে যে, সারাজীবন বেনামাযী থাকব আর শেষ জীবনে নামায পড়ে গোনাহের ক্ষমা নিয়ে নিব, তাহলে তার চিন্তা যেমন ইসলাম বিরোধী, তেমনি ইসলাম বিরোধী চিন্তা যে, হজ্জ ফরয হওয়ার পরেও তা পালন না করে ভালমন্দ সকল কাজ করতে থাকব তারপর শেষ বয়সে হজ্জ করে ক্ষমা লাভ করে মৃত্যু বরণ করব। এ সবই শয়তানী চিন্তা। নামায, রোযা, যাকাত ইত্যাদির মত হজ্জও একটি ফরয আঈন ইবাদত। যখন যে বয়সেই তা ফরয হোক তা যতশীঘ্র সম্ভব আদায় করতে হবে। আর সর্বাবস্থায় আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা চাইতে হবে ও আল্লাহ্র পথে থাকার চেষ্টা করতে হবে।

 

মাওয়াকীত বা ইহরামের সময় ও স্থান

হজ্জ শুরু করার জন্য সময় ও স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছেন আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল । হজ্জের ইহরাম করার সময় শাওয়াল, যিলকাদ ও যিলহাজ্জ মাসের প্রথম ৯ দিন। হজ্জ বা উমরার ইহরাম করার স্থান নি¤œরূপ :

প্রথম মীকাত যুল হুলাইফা বা আবারে আলী। মক্কা শরীফ থেকে ৪২০ কি. মিন. উত্তরে, মদীনার প্রান্তে। মদীনার পথে আগত হাজীরা এখান থেকে ইহরাম করবেন। দ্বিতীয় মীকাত জুহফা। মক্কা শরীফ থেকে ১৮৬ কি. মিন. উত্তর পশ্চিমে। সিরিয়া, প্যালেস্টাইনের পথে আগত হাজীরা এখান থেকে ইহরাম করবেন। তৃতীয় মীকাত কারনুল মানাযেল বা সাইল কবীর। মক্কা শরীফ থেকে ৭৮ কি. মিন. পূর্বে নজদের পথে আগত হাজীরা এখান থেকে ইহরাম করবেন। চতুর্থ মীকাত ইয়ালামলাম। মক্কা শরীফ থেকে ১২০ কি. মিন. দক্ষিণ-পশ্চিমে লোহিত সাগরের ধারে। ইয়েমেনের দিক থেকে আগত হাজীরা এখান থেকে ইহরাম করবেন। পঞ্চম মীকাত যাতু ইরক। মক্কা শরীফ থেকে ১০০ কি. মিন. উত্তর-পূর্বে। ইরাকের দিক থেকে আগত হাজীরা এখান থেকে ইহরাম করবেন।

ইহরামের নিয়ম

উপরোক্ত কোন মীকাতে পৌঁছালে হজ্জ বা উমরা পালনকারীকে নিুের নিয়মে ইহরাম করতে হবে। শরীরের ময়লা সাফ করে, নাভির নিচের পশম পরিষ্কার করে, গোঁফ কেটে ও শরীরের দুর্গন্ধ দূর করে নিজেকে পরিচ্ছন্ন করুন। গোসল করুন। পুরুষেরা দুটি সেলাইবিহীন সাদা থান কাপড়  পরবেন। মহিলারা যে কোন কাপড় পরতে পারেন। সেলাই বিহীন বলতে বুঝানো হয় শরীরের মাপে সেলাই করা কোন পোশাক হবে না। এমননি থান কাপড়, চাদর, গামছা, ইত্যাদিতে কোন সেলাই বা জোড়া থাকলে কোন অসুবিধা নেই। যানবাহনে আরোহণের পর যাত্রা শুরু হলে ইহরামের নিয়্যাত করে উচ্চৈঃস্বরে তালবিয়াহ বলতে হবে: “লাব্বাইকা আল্লা-হুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা- শারীকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল ‘হামদা, ওয়ানি‘œয়মাতা লাকা ওয়াল মুলক, ল-শারীকা লাকা।  অর্থাৎ ঃ “হে আল্লাহ্, আমি আপনার আহ্বানে সাড়া দিয়ে উপস্থিত হয়েছি, আমি উপস্থিত হয়েছি। আপনার কোন শরীক নেই, আমি আপনার ডাকে সাড়া দিয়ে উপস্থিত হয়েছি। নিশ্চয় সকল প্রশংসা আপনারই জন্য। সকল নেয়ামতের মালিক আপনি। সকল ক্ষমতা ও আধিপত্য আপনারই। আপনার কোন শরীক নেই।” ইহরামের পর থেকে সর্বদা  উচ্চস্বরে তালবিয়া বলা উচিত, বিশেষত উঁচুতে উঠতে ও নিচুতে নামতে।

যাঁরা বিমানে হজ্জে বা উমরায় আসেন তাঁরা বিমানে আরোহণের আগেই ইহরামের প্রস্তুতি সেরে ইহরামের কাপড় পরে নিতে পারেন। বিমান মীকাতের কাছাকাছি পৌঁছালে ইহরামের নিয়েত করে তালবিয়া বলবেন।

ইহরাম অবস্থায় নি¤œলিখিত কাজগুলো নিষিদ্ধ ও বর্জনীয়

প্রথম, পুরুষ মহিলা সবার জন্য বর্জনীয় : স্বামী-স্ত্রীর মিলন। শরীরে কোন চুল বা পশম কাটা, ছাঁটা বা উঠান। হাত বা পায়ের নখ কাটা। শরীরে বা কাপড়ে সুগন্ধি ব্যবহার করা। কোন জীব-জানোয়ার শিকার করা।

দ্বিতীয়, শুধু পুরুষদের জন্য বর্জনীয়: শরীরের মাপে  বানানো বা সেলাই করা পোশাক পরা। মাথার সাথে লেগে থাকে এমন কিছু দিয়ে মুখ ঢাকা।

তৃতীয়, মহিলারা বর্জন করবেন: নেকাব বা বোরকার মুখাবরণ দিয়ে মুখ ঢাকা। হাত মোজা ব্যবহার করা।

উপরে বর্ণিত বর্জনীয় কাজগুলোর কোনটা করলে ক্ষতিপুরণ দিতে হয় যাকে ফিদইয়া বলে। যদি কেউ স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে কোন বর্জনীয় কাজ করেন, যেমন চুল কাটেন, নখ কাটেন, সুগন্ধি ব্যবহার করেন, কোন মহিলা যদি মুখে নেকাব বা হাতে হাতমোজ ব্যবহার করেন, তাহলে তাকে প্রত্যেক অপরাধের জন্য একটি ছাগল/ভেড়া/দুম্বা জবেহ করতে হবে, অথবা ৬ জন দরিদ্রকে খাওয়াতে হবে, অথবা ৩ দিন রোজা রাখতে হবে।

তিন প্রকার হজ্জের নিয়মাবলী

হজ্জের মাসে, অর্থাৎ শাওয়াল, যিলকাদ বা যিলহাজ্জ মাসের শুরুতে যে ব্যক্তি উপরে বর্ণিত কোন এক মীকাতে পৌঁছান তিনি নিচের তিন প্রকার হজ্জের যে কোন এক প্রকারের নিয়্যাতে ইহরাম করবেন :

তামাত্তু হজ্জ: মিকাত থেকে শুধুমাত্র উমরার নিয়েতে ইহরাম করবেন, বলবেন: “লাব্বাইকা উমরাতান” মক্কায় পৌঁছে উমরার তাওয়াফ ও সাঈ করে মাথার চুল চেঁছে বা ছেঁটে ফেলবেন। তারপর যিলহাজ্জ মাসের ৮ তারিখে শুধুমাত্র হজ্জের নিয়েতে ইহরাম করবেন, বলবেন: “লাব্বাইকা হাজ্জান” ও হজ্জের বিধানাবলী পালন করবেন। তামাত্তু হজ্জ পালনকারীকে “হাদয়ী” অর্থাৎ হজ্জের কুরবানী দিতে হবে।

ইফরাদ হজ্জ: মীকাত থেকে শুধুমাত্র হজ্জের নিয়্যাতে ইহরাম করবেন বলবেন: “লাব্বাইকা হাজ্জান” মক্কা  পৌঁছে তাওয়াফে কুদুম আদায় করবেন। তিনি এ সময় হজ্জের সাঈ করতে পারেন। চুল ছাঁটবেন না বা কাটবেন না বা ইহরাম ভাঙবেন না। বরং ইহরাম অবস্থায় মক্কায় অবস্থান করবেন। যিলহাজ্জ মাসের ৮, ৯, ১০ তারিখে হজ্জের বিধানাবলী  পালনের পর তিনি চুল কাটবেন বা ছাঁটবেন এবং হালাল হবেন। (ইফরাদকারী ইচ্ছা করলে সায়ী তাওয়াফে কুদুমের পরে না করে হজ্জের শেষে ফরজ তাওয়াফের পরেও করতে পারেন।) ইফরাদ কারীকে হাদী বা হজ্জের কুরবানী দিতে হবে না।

কিরান হজ্জ: মীকাত থেকে একত্রে হজ্জ ও উমরার নিয়্যাতে ইহরাম করবেন, বলবেন: “লাব্বাইকা উমরাতান ও হাজ্জান” যদি শুধুমাত্র উমরার ন্যিাতে মক্কায় পৌঁছান  এবং উমরা আদায়ের আগেই উমরার সাথে হজ্জের নিয়্যাত করে নেন তাহলেও তা ক্কিরান হজ্জ বলে গণ্য হবে। ক্কিরান হজ্জ পালনকারী অনেকটা ইফরাদ হজ্জ পালন করার মত হজ্জ করবেন। মক্কায় পৌঁছে তাওয়াফ ও সাঈর মাধ্যমে উমরা আদায় করে ইহরাম অবস্থায় হজ্জের জন্য অপেক্ষা করবেন। জিলহজ্জ মাসের ৮, ৯ ও ১০ হজ্জের বিধানগুলো পালন করবেন। ক্কিরান হজ্জ পালনকারীকে কামাত্তু হজ্জ পালনকরীর ন্যায় “হাদীয়া বা দমের কুরবানী দিতে হবে। তারপর তিনি মাথা মুণ্ডন করাবেন।

হজ্জের কর্মাবলীর সংক্ষিপ্ত ধারণা

হজ্জপালনকারীর জন্য প্রথম মক্কা মুকাররামায় পৌঁছে পবিত্র কাবা ঘরকে সাতবার তাওয়াফ করবেন। তারপর দুই রাক‘আত তাওয়াফের সালাত আদায় করে কাবাঘরের উত্তর পূর্ব কোন সাফা পাহাড়ে যাবেন এবং সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে সাতবার সাঈ করবেন। তারপর উমরা পালনকারী বা তামাত্তু হজ্জ পালন কারী পুরুষ মাথা টাক করাবেন, অথবা চুল ছাঁটাবেন। মেয়েরা নখ পরিমাণ চুল ছাঁটবেন। চুল কাটানোর মাধ্যমে তাঁদের ইহরাম শেষ হবে। স্বাভাবিক পোশাকে স্বাভাবিক অবস্থায় তাঁরা মক্কা মুকাররামায় অবস্থান ও ইবাদত বন্দেগী করবেন। ইফরাদ বা কিরান হজ্জ পালনকারী চুল কাটাবেন না বা ইহরাম ভাঙ্গবেন না। তাঁরা ইহরাম অবস্থায় মক্কায় অবস্থান ও ইবাদত বন্দেগী করবেন।

যিলহাজ্জ মাসের ৮ তারিখ থেকে হজ্জের কর্মকাণ্ড শুরু হয়। এদিনে দুপুরের আগে তামাত্তু হজ্জ পালনকারী, যিনি ইতিপুর্বে উমরা করে ইহরাম ছেড়ে মক্কায় অবস্থান করছেন, তিনি পূর্বে ইহরামের সময়ে বর্ণিত নিয়মে মক্কা শরীফে নিজের বাসস্থান থেকে হজ্জের জন্য ইহরাম করবেন। ইফরাদ ও কিরান হজ্জ পালানকারী যেহেতু ইহরাম অবস্থায় থাকেন, সেহেতু তাঁর জন্য উপরের কিছুই করণীয় নয়, তিনি শুধু অন্যদের মত “তালবিয়া” (লাব্বাইকা..) পড়তে পড়তে মিনায় রওয়ানা দিবেন। এখন থেকে ১০ তারিখে আকাবার কাঁকর মারা পর্যন্ত বেশী বেশী তালবিয়া (লাব্বাইকা..) বলতে হবে।

৮ তারিখ মিনায় পৌঁছানর পর হাজীরা সেখানে যোহর, আসর, মাগরীব, ইশার নামায আদায় করবেন এবং রাতে মিনায় অবস্থান করবেন ও ইবাদত বন্দেগী, যিক্র আযকারে রত থাকবেন। পরদিন যিলহাজ্জ মাসের ৯ তারিখে ফজরের নামাযের পরে তালবিয়া বলতে বলতে আরাফাতের মাঠে চলে যাবেন। সারাদিন সেখানে আল্লাহ্র যিক্র দোয়া, তাওবা, ইসতিগফার ও কান্নাকাটিতে রত থাকবেন। সূর্যাস্তের পরে শান্তভাবে ও গাম্ভীর্যের সাথে মুযদালিফায় গমন করবেন এবং ফজর পর্যন্ত মুযদালিফায় অবস্থান করবেন।

যিলহাজ্জ মাসের ১০ তারিখ ঈদ ও কুরবানীর দিন সকালে ফজরের সালাতের পরে মিনায় যেয়ে মিনার জামরা নামক স্থানে সর্বশেষ জামরায় ৭টি কাঁকর ছুঁড়বেন। তারপর “হাদীয়” বা হজ্জের পশু জবেহ করবেন। তারপর সম্পূর্ণ মাথার চুল মুণ্ডন করবেন, বা ছাঁটবেন। চুল কাটাতে হজ্জের ইহরামের আংশিক সমাপ্তি হবে। ফলে হাজী সাহেবরা স্বাভাবিক পোশাকাদি  পরবেন এবং ইহরামের কারণে বর্জনীয় সকল কর্ম করতে পারবেন, শুধুমাত্র স্বামী-স্ত্রীর মিলন বর্জন করতে হবে।

তারপর মক্কায় গিয়ে হজ্জের ফরজ তাওয়াফ (ইফাদা) করবেন, তাওয়াফের ২ রাকাত নামাজ পড়বেন এবং সায়ী করবেন। তাওয়াফ ও সায়ী করার পর ইহরাম পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে এবং হজ্জ পালনকারী সম্পূর্ণ স্বাভাবিকতা অর্জন করবেন।

তারপর মিনায় ফিরতে হবে। ১০, ১১ ও ১২ তারিখ মিনায় অবস্থান করে যিক্র আযকার ও  দোয়ায় রত থাকতে হবে। ১৩ তারিখ মিনায় অবস্থান ঐচ্ছিক। মিনা ত্যাগের মাধ্যমে হজ্জের আহকাম শেষ হয়। মক্কা ত্যাগ করার পূর্বে বিদায়ী তাওয়াফ করতে হবে।

মদীনা শরীফ যিয়ারত করার সাথে হজ্জের কোন সম্পর্ক নেই। হজ্জের সব কর্ম মক্কা শরীফেই শেষ হয়ে যায়। মদীনা যিয়ারত একটি পৃথক নেক আমল। হজ্জের আগে পরে বা যে কোন সময় তা করা যেতে পারে। মহান আল্লাহ্ আমাদেরকে বারবার তাঁর পবিত্র দু’টি হারাম শরীফ নিয়ে যান, দয়া করে আমাদেরকে কবুল করে নেন। আমি!

 

দ্বিতীয় অধ্যায়

বেলায়াত, ওয়াসীলাহ, ইহসান ও ওযীফা

আমরা জানি যে, ইসলাম একটি পরিপূর্ণ ব্যবস্থা, যা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রিয় ও আন্তর্জাতিক জীবনের সকল দিক ও বিষয়কে আবৃত ও নিয়ন্ত্রিত করে। আমরা এ ক্ষুদ্র পুস্তিকাতে শুধুমাত্র ইসলামের  প্রাথমিক পরিচিতি ও প্রত্যেক মুসলিমের ব্যক্তিগত জীবনের পালনের প্রাথমিক কিছু কাজ আলোচনা করছি। আমাদের আলোচনার দ্বিতীয় পর্যায়ে আমরা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পরিভাষা ও ব্যক্তিগত কিছু প্রয়োজনীয় দোয়া, মুনাজাত ও যিক্র বিষয়ে আলোচনা করব।

বেলায়াত ও ওয়াসীলাহ বা আল্লাহ্র বন্ধুত ও নৈকট্য

“বেলায়াত” (الولاية) শব্দের অর্থ বন্ধুত্ব, নৈকট্য, অভিভাবকত্ব ইত্যাদি। “বেলায়েত” অর্জনকারীকে “ওলী” (الولي), অর্থাৎ বন্ধু, নিকটবর্তী বা অভিভাবক বলা হয়। আল্লাহ্ বলেন: “জেনে রাখ! নিশ্চয় আল্লাহ্র ওলীগণের কোনো ভয় নেই এবং তাঁরা চিন্তাগ্রস্তও হবেন না। যারা ঈমান এনেছেন এবং ‘তাকওয়া’ করেন।”

ঈমানের পরিচয় আমরা ইতিপূর্বে জেনেছি। “তাকওয়া” শব্দের অর্থ আত্মরক্ষা করা। যে কর্ম বা চিন্তা করলে আল্লাহ্ অসন্তুষ্ট হন সে কর্ম বা চিন্তা বর্জনের নাম তাকওয়া। এজন্য বেলায়াতের পথে নফল মুস্তাহাব পালনের চেয়ে হারাম-মাকরূহ বর্জনের গুরুত্ব বেশি। হাদীসের আলোকে আমরা জানতে পারি যে, “তাকওয়া” মূলত অন্তর বা হৃদয়ের অবস্থা। মুত্তাকী সে ব্যক্তি যিনি কোন কাজ করার আগেই তার হৃদয়ে চিন্তা হয়, কাজটি সম্পর্কে মহান প্রভু আল্লাহ্র নির্দেশনা কি এবং তিনি এতে সন্তুষ্ট না অসন্তুষ্ট এবং আল্লাহ্র অসন্তুষ্টিকে জাগতিক যে কোন ভয়ঙ্কর বিপদ, ধ্বংস বা মৃত্যু থেকে বেশী ভয়ানক বলে তার হৃদয় অনুভব করে।

এ আয়াতের মাধ্যমে আমরা জানছি যে, দু’টি গুণের মধ্যে ওলীর পরিচয় সীমাবদ্ধ। ঈমান ও তাকওয়া। এ দু’টি গুণ যার মধ্যে যত বেশি ও যত পরিপূর্ণ হবে তিনি বেলায়াতের পথে তত বেশি অগ্রসর ও আল্লাহ্র তত বেশি ওলী বা প্রিয় বলে বিবেচিত হবেন।

মহান আল্লাহ্ কুরআন মাজীদে অন্যত্র বলেন: “হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহ্র ‘তাকওয়া’ কর, তাঁর দিকে ‘ওয়াসীলাহ’ সন্ধান কর এবং তাঁর পথে জিহাদ কর; আশা করা যায় যে তোমরা সফল হবে।”

এখানে ঈমানের পরে তিনটি কর্মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে: ‘তাকওয়া‘, ‘ওয়াসীলাহ‘ ও ‘জিহাদ‘ জিহাদ অর্থ প্রচেষ্টা বা পরিশ্রম। আল্লাহ্র বিধান পালনের ও প্রচারের সকল প্রচেষ্টাকেই কুরআন-হাদীসে কখনো কখনো ‘জিহাদ’ বলা হয়েছে। সত্যের দাওয়াত, অন্যায়ের প্রতিবাদ, হজ্জ পালন, আল্লাহ্র আনুগত্য-মূলক বা আত্মশুদ্ধিমূলক যে কোনো কর্মের চেষ্টাকে জিহাদ বলা হয়েছে। তবে ইসলামী পরিভাষায় জিহাদ অর্থ “কিতাল” বা মুসলিম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় যুদ্ধ। “জিহাদ” সমাজের প্রতি মুমিনের দায়িত্ব। মুমিন সাধ্যমত সত্যের দাওয়াত দিবেন এবং সুযোগ থাকলে রাষ্ট্রীয় জিহাদে অংশ নিবেন।

তাকওয়ার অর্থ আমরা আগেই জেনেছি। “ওয়সীলাহ” শব্দটি যদিও বাংলা ভাষায় “উপকরণ” অর্থে ব্যহার করা হয়, তবে কুরআন-হাদীসের আরবী ভাষায় তার অর্থ “নৈকট্য”। আমরা আযানের জাওয়াব প্রসঙ্গে “ওয়াসীলাহ” শব্দের এ অর্থ জেনেছি। আমরা আযানের পরে আল্লাহ্র কাছে রাসূলুল্লাহ ()-এর জন্য “ওয়াসীলাহ” বা নৈকট্যের অবস্থান প্রার্থনা করি।

এ দুটি বিষয় পূর্বের আয়াতের তাকওয়ার দুটি পর্যায় বলা চলে। তাকওয়া মূলত আত্মরক্ষামূলক কর্ম, অর্থাৎ ফরয-ওয়াজিব কর্ম করা এবং হারাম-মাকরূহ কর্মাদি বর্জন করা। তার অতিরিক্ত আল্লাহ্র নৈকট্যমূলক কর্মই মূলত “ওয়াসীলাহ” বলে গণ্য।

তাকওয়া ও ওয়াসীলাহর এ দুটি পর্যায়কে হাদীস শরীফে ফরয ও নফল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ  বলেন, “মহান আল্লাহ্ বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি আমার কোনো ওলীর সাথে শত্র“তা করে আমি তার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করি। আমার নৈকট্য অর্জন বা ওলী  হওয়ার জন্য বান্দা যত কাজ করে তন্মধ্যে সবচেয়ে আমি বেশি ভালবাসি যে কাজ আমি ফরয করেছি। (ফরয কাজ পালন করাই আমার নৈকট্য অর্জনের জন্য সর্বপ্রথম ও সবচেয়ে প্রিয় কাজ)। তারপর বান্দা যখন সর্বদা নফল ইবাদত পালনের মাধ্যমে আমার বেলায়তের পথে অগ্রসর হতে থাকে তখন আমি তাকে ভালবাসি। আর যখন আমি তাকে ভালবাসি তখন আমি তার শ্রবণযন্ত্রে পরিণত হই, যা দিয়ে সে শুনতে পায়, আমি তার দর্শনেন্দ্রিয় হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখতে পায়, আমি তার হাত হয়ে যাই, যদ্দ¡ার সে ধরে বা আঘাত করে এবং আমি তার পা হয়ে যাই, যদ্দ¡ারা সে হাঁটে। সে যদি আমার কাছে কিছু প্রার্থনা করে তাহলে আমি অবশ্যই তাকে তা প্রদান করি। সে যদি আমার কাছে আশ্রয় চায় তাহলে আমি অবশ্যই তাকে আশ্রয় প্রদান করি।”

উপরের আয়াত ও হাদীস থেকে  আমরা বুঝতে পারি যে, প্রত্যেক মুসলিম আল্লাহ্র ওলী, তবে বেলায়াতের পর্যায়ে কমবেশি হয়। ইমাম আবু হানীফা (রাহ) ও আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আকীদা বা বিশ্বাস বর্ণনা করে ইমাম তাহাবী (৩২১হি:) বলেন:

المؤمنون كلهم أولياء الرحمن، وأكرمهم عند الله أطوعهم وأتبعهم للقرآن

“সকল মুমিন করুণাময় আল্লাহ্র ওলী। তাঁদের মধ্য থেকে যে যত বেশি আল্লাহ্র অনুগত ও কুরআনের অনুসরণকারী সে ততবেশি আল্লাহ্র কাছে সম্মানি (ততবেশি ওলী)।

এছাড়া উপরের হাদীস থেকে আমরা নিুের বিষয়গুলো বুঝতে পারি:

প্রথম, আল্লাহ্র ইবাদত করা ও আল্লাহ্র পথে চলার ক্ষেত্রে কর্ম হলো দুই প্রকার : (১) ফরয বা অত্যাবশ্যকীয় কর্ম, ও (২) ফরযের অতিরিক্ত নফল বা সুন্নাত ইবাদত। ফরয ইবাদত পালনই আল্লাহ্র বেলায়েত ও সাওয়াব অর্জনের অন্যতম কর্ম। ফরযের পরে নফল ইবাদত বান্দাকে আল্লাহ্র বন্ধুত্ব বা বেলায়েতের পর্যায়ে পৌঁছে দেয়।

দ্বিতীয়, শুধুমাত্র ফরয ইবাদত পালন আল্লাহ্র পরিপূর্ণ বেলায়াত, নৈকট্য ও বন্ধুতের কারণ নয়। ফরযের পরে অবিরত নফল ইবাদত পালনই মানুষকে তার স্রষ্টার প্রেম, ভালবাসা, নৈকট্য ও বন্ধুত্বের মহান নেয়ামতের পূর্ণ স্বাদ গ্রহণ করায়। এ বিষয়ে অনেকেই ভুল করি। কাজটি ফরয নয়, জরুরী নয় কাজেই করব না ইত্যাদি কথা আমরা বলি। এ হলো আল্লাহ্র প্রেম ও নৈকট্যে আগ্রহহীন হৃদয়ের চিন্তা। অতিরিক্ত টাকা, সম্পদ, মর্যাদা, সুবিধা ইত্যাদির জন্য মনের যতটুকু আকুতি তার চেয়ে অতিরিক্ত সাওয়াব, আখেরাতের মর্যাদা ও আল্লাহ্র নৈকট্যের আকুতি মনের মধ্যে বেশি না হলে আল্লাহ্র বন্ধুত্বের, ঈমানের বা তাকওয়ার স্বাদ পাওয়া সম্ভব নয়।

তৃতীয়, ফরয ইবাদত পালনের আগে নফল ইবাদত পালন অর্থহীন বা বাতুলতা। ফরয পালন প্রথম ধাপ ও আল্লাহ্র বেশি ভালবাসা ও সাওয়াবের মাধ্যম। এক্ষেত্রে অনেকেই কঠিন ভুলের মধ্যে নিপতিত। অগণিত ফরয ইবাদতে অবহেলা করে নফল ইবাদত পালন করছেন।

ফরয ইল্ম, আকীদা, নামায, যাকাত, রোযা, হজ্ব, হালাল উপার্জন, সাংসারিক দায়িত্ব, পিতা-মাতা, সন্তান ও স্ত্রীর দায়িত্ব, সামাজিক দায়িত্ব, সৎকাজে আদেশ, অসৎকাজ থেকে নিষেধ ইত্যাদি সকল ফরয ইবাদত (যার ক্ষেত্রে যতটুকু প্রযোজ্য) পালন না করে নফল ইবাদত পালন করা, নফল যিক্র ইত্যাদি পালন বিশেষ কোনো উপকারে লাগবে না। অবস্থা বিশেষে হয়ত নফল ইবাদত কোনো কোনো ফরয ইবাদতের ঘাটতি পূরণ করতে পারে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তা আল্লাহ্র নৈকট্য বা বেলায়েতের মাধ্যম নয়। ফরয পরিত্যাগ করলে হারামের গোনাহ হয়। হারামের গোনাহে রত অবস্থায় নফল ইবাদতের অর্থ হলোÑসর্বাঙ্গে মলমূত্র লাগানো অবস্থায় নাকে আতর মাখা।

ফরয ইবাদতের মধ্যে যে সকল নফল ইবাদত থাকে তার ফরযের বাইরের নফল ইবাদতের চেয়ে উত্তম। নামাযের মধ্যে অসংখ্য ফরয, সুন্নাত ও নফল যিক্র আযকার রয়েছে। এগুলো বিশুদ্ধভাবে পালন করা নামাযের বাইরে সারাদিন বিশুদ্ধ মাসনূন যিকিরের চেয়ে অনেক উত্তম। তার অর্থ এ নয় যে, বিশুদ্ধ নামায আদায় করলেই চলবে। তার অর্থ হলো, নফল যিক্র আযকারে রত হওয়ার আগে নামায ইত্যাদি ফরয যিক্র ও তৎসংশ্লিষ্ট নফল যিক্র বিশুদ্ধ ও সুন্দরভাবে আদায় করতে হবে। তা না হলে আমাদের যিক্র আযকার পণ্ডশ্রম ও সুন্নাত বিরোধী হয়ে যাবে। মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহ) লিখেছেন : “আল্লাহ্ তা’আলার নৈকট্য প্রদানকারী আমলসমূহ দুই প্রকার। প্রথম প্রকার ফরয কার্যসমূহ, দ্বিতীয় প্রকার নফল কার্যাবলী। নফল আমলসমূহের ফরযের সহিত কোনোই তুলনা হয় না। নামায, রোযা, যাকাত, যিক্র, মোরাকাবা ইত্যাদি যে কোনো নফল ইবাদত হউক না কেন এবং তাহা খালেছ বা বিশুদ্ধভাবে প্রতিপালিত হউক না কেন, একটি ফরয ইবাদত তাহার সময় মতো যদি সম্পাদিত হয়, তবে সহস্র বছরের উক্তরূপ নফল ইবাদত হইতে তাহা শ্রেষ্ঠতর : বরং ফরয ইবাদতের মধ্যে যে সুন্নাত , নফল ইত্যাদি আছে , অন্য নফলাদির তুলনায় উহারাও উক্ত প্রকার শ্রেষ্ঠত্ব রাখে।”

এখানে উল্লেখ্য যে, ফরজ ও নফলের দু’টি শ্রেণী রয়েছে, পালন ও বর্জন। কোনো কাজ করা যেরূপ ফরয, তেমনি কিছু কাজ বর্জন করা ফরয। এসকল কাজ করাকে হারাম বলা হয়। অনুরূপভাবে কিছু কর্ম করা নফল-মুসতাহাব বা সুন্নাত। আবার কিছু কাজ বর্জন করাও নফল-মুসতাহাব বা সুন্নাত। এ ধরনের কাজ করা মাকরুহ বা অপছন্দনীয়। মাকরুহ কখনো হারামের কাছেবর্তী হয়, যাকে মাকরুহ তাহরীমি বলা হয়। কখনো তা মাকরুহ তানযিহী বা অনুচিত পর্যায়ের হয়, যা বর্জন করা উত্তম তবে করলে গোনাহ হবে না।

আল্লাহ্র নৈকট্যের পথে কর্মের চেয়ে বর্জনের গুরুত্ব বেশি। যা করা ফরয তা করতেই হবে। আর যা বর্জন করা ফরয তা বর্জন করতেই হবে। যে ব্যক্তি তার উপরে ফরয এরূপ কোনো কর্ম পালন করছেন না, বা তার জন্য হারাম এরুপ কোনো কার্যে রত রয়েছেন, অথচ বিভিন্ন নফল মুসতাহাব কর্ম পালন করছেন তার কাজকে আমরা ইসলামের শিক্ষা বিরুদ্ধ বলতে বাধ্য। তিনি জেনে অথবা না জেনে ভণ্ডামীতে রত রয়েছেন।

দ্বিতীয় স্তরে নফল পর্যায়ে বর্জনীয় নফলের গুরুত্ব করণীয় নফলের থেকে অনেক বেশি। সাজানোর পূর্বে পরিচ্ছন্নতা। নিজেকে নোংরা, অপরিচ্ছন্নতা থেকে মুক্ত করে তারপর যতটুকু সম্ভব সাজগোজ করতে হবে। এজন্য সকল প্রকার মাকরুহ বর্জন করা নফল ইবাদতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : “আমি তোমাদেরকে কোনো কিছু নিষেধ করলে তা সর্বোতভাবে পরিত্যাগ করবে। আর তোমাদেরকে যা করতে নির্দেশ প্রদান করব তা সাধ্যমত করবে।”

উপরের আয়াত, হাদীস ও কুরআন-সুন্নাহর অন্যান্য নির্দেশনার আলোকে আমরা বেলায়াত ও ওয়াসীলাহ বা আল্লাহ্র বন্ধুত্ব ও নৈকট্য অর্জনের কর্মগুলোকে নি¤œলিখিত আটটি পর্যায়ে সাজাতে পারি:

(১)     বিশুদ্ধ ও অবিচল ঈমান।

(২) বৈধ উপার্জন। ঈমানের পরে সর্বপ্রথম দায়িত্ব হলো বৈধভাবে উপার্জিত জীবিকার উপর নির্ভর করা। সুদ, ঘুষ, ফাঁকি, ধোকা, জুলুম ইত্যাদি সকল প্রকার উপার্জন অবৈধ। অবৈধ উপার্জন দ্বারা জীবিকা নির্বাহকারীর ইবাদত আল্লাহ্র কাছে গ্রহণীয় নয়।

(৩) সৃষ্টির অধিকার সংশ্লিষ্ট হারাম বর্জন। হারাম বা যে সকল কর্ম বর্জন করা ফরয তা দুই প্রকার: এক প্রকার পৃথিবীর অন্যান্য মানুষ ও সৃষ্টির অধিকার বা পাওনা নষ্ট বা তাদের কোনো ক্ষতি করা বিষয়ক হারাম। এগুলো বর্জন করা সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ।

(৪) আল্লাহ্র অন্যান্য আদেশ নিষেধ বিষয়ক হারাম বর্জন। এগুলো দ্বিতীয় পর্যায়ের হারাম কর্ম, যা বর্জন করা ফরয।

(৫) ফরয কর্মগুলো পালন।

(৬) মাকরুহ তাহরীমি বর্জন ও সুন্নাতে মু‘আক্কাদা কর্ম পালন।

(৭) মানুষ ও সৃষ্টির সেবা ও কল্যাণমূলক সুন্নাত-নফল ইবাদত পালন।

(৮) ব্যক্তিগত সুন্নাত-নফল ইবাদত পালন।

ফরয, হারাম ও কবীরা গোনাহ

উপরের আলোচনা থেকে আমরা জানতে পারছি যে, নফল পালনের মাধ্যমে পরিপূর্ণ ঈমান, ইসলাম ও বেলায়াত অর্জন করতে হলে আগে ফরয দায়িত্বগুলো যথাযথ পালন করতে হবে। যা করা ফরয তা করতে হবে এবং যা বর্জন করা ফরয তা বর্জন করতে হবে। এককথায় “কবীরা গোনাহ” বা কঠিন পাপসমূহ বর্জন করতে হবে।

করণীয় ফরযের তালিকার চেয়ে বর্জনীয় ফরযের তালিকা প্রদান সহজ। কারণ প্রথম, কুরআন ও হাদীসে বর্জনের বিষগুলো বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। দ্বিতীয়, যেহেতু করার বিপরীত বর্জন তাই এ বর্জনের তালিকা থেকেই করণীয় ফরয বুঝা যায়। তৃতীয়, অধিকাংশ করণীয় ফরয আপেক্ষিক ও ব্যক্তির অবস্থার উপর নির্ভরশীল।

ঈমান, সালাত ও সিয়াম মূলত সর্বজনীন ফরয। পুরুষদের নাভী থেকে হাটু পর্যন্ত ও মহিলাদের মাহরাম ছাড়া পুরুষদের সামনে মাথা ও চুলসহ সমস্ত শরীর (মুখমণ্ডল ও হাতের তালু ব্যতিক্রম) আবৃত রাখা, ঈমান, আকীদা ও দ্বীন পালনকে বিশুদ্ধ রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ইলম শিক্ষা, হালাল উপার্জন ইত্যাদি কিছু বিষয় সর্বজনীন ফরয। এছাড়া অধিকংশ ফরয কারো জন্য প্রযোজ্য ও কারো জন্য প্রযোজ্য নয়।

আমরা দেখেছি যে, ইসলামের  বাকী দু’টি রুকন যাকাত ও হজ্জ সবার উপর ফরয নয়। যার পিতামাতা আছেন তার জন্য তাদের সেবা করা ফরয। যার স্ত্রী ও পরিবার রয়েছে তার জন্য এদের সাধ্যমত উত্তম ভরণপোষণ ও ইসলাম অনুযায়ী পরিচালনা ফরয। যিনি কোন অন্যায় দেখতে পাচ্ছেন যা অন্য কেউ দেখছে না, তার জন্য সাধ্যমতা তার পরিবর্তন বা প্রতিবাদ ফরয। একাধিক মানুষ তা জানতে পারলে সকলের উপর তা সামষ্টিক ফরয বা ফরযে কিফাইয়া।

অনুরূপভাবে রাষ্ট্রীয় বা সামাজিকভাবে বিচারের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তির জন্য ফরয আল্লাহ্র বিধান অনুসারে ন্যায়বিচার করা। যিনি এ দায়িত্বে নিয়োজিত নন তার উপর তা ফরয নয়। তবে এ ধরণের কেউ যদি জানতে পারেন যে, কেউ এভাবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করছে না, তাহলে তঠকে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার অনুরোধ বা আদেশ প্রদান তার উপর ফরয হতে পারে।

একারণে আমরা এ পুস্তিাকর সংক্ষিপ্ত পরিসরে শুধুমাত্র সে সকল হারাম বা বর্জনীয় ফরযের তালিকা প্রদান করছি, যে সকল কর্মের জন্য কুরআন- হাদীসে অভিশাপ, লা’নত, কঠিন শাস্তি বা উম্মতের তালিকা থেকে বহিষ্কারের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। এ সকল পাপ বা অপরাধকে আমরা দুটিভাগে ভাগ করতে পারি : ব্যক্তিগত বা হক্কুল্লাহ বিষয়ক ও সামাজিক বা হক্কুল ইবাদ বিষয়ক। যদিও উভয় প্রকার পাপই আল্লাহ্র অবাধ্যতা ও পরস্পরে স¤পৃক্ত, তবুও সংক্ষেপে বুঝার জন্য দুইভাগ করে আলোচনা করছি :

(ক) হক্কুল্লাহ বিষয়ক বা ব্যক্তিগত কবীরা গুনাহসমূহ

১.       ঈমান বিষয়ক : ইতিপূর্বে ঈমান অধ্যায়ে আলোচিত সকল প্রকার শিরক, কুফর, নিফাক, বিদ‘আত। আল্লাহ্র শাস্তি থেকে নিরাপত্তা বোধ করা, আল্লাহ্র রহমত থেকে নিরাশ হওয়া, মক্কার হারামে কোনো প্রকার অন্যায় করার ইচ্ছা, নিজের জীবন, সম্পদ, ও সকল মানুষের চেয়ে রাসূলুল্লাহ  কে বেশি ভালবাসায় ত্র“টি থাকা, রাসূলুল্লাহ  তার নামে মিথ্যা হাদীস বলা, নিজের পছন্দ-অপছন্দ রাসূলুল্লাহ -এর সুন্নাতের অনুগত না হওয়া, আত্মহত্যা করা।

২.       ফরয ইবাদত পরিত্যাগ বিষয়ক : আরকানুল ইসলাম বা যে কোন ফরয ত্যাগ করা, ধর্ম পালনে অতিশয়তা বা সুন্নাতের অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি ইবাদত করা, নামাযরত ব্যক্তি সামনে দিয়ে গমন করা।

৩.      হারাম খাদ্য ও পানীয় : মদপান, মৃত প্রাণী, প্রবাহিত রক্ত ও শূকরের গোশত ভক্ষণ করা, স্বর্ণ বা রৌপ্যের পাত্রে পান করা।

৪.       পবিত্রতা ও অন্যান্য অভ্যাস বিষয়ক : পেশাব থেকে পবিত্র না হওয়া, মিথ্যা বলার অভ্যাস, প্রাণীর ছবি তোলা বা আঁকা, কৃত্রিম চুল লাগান, শরীরে খোদায় করে উল্কি লাগান। নিয়মিত অপবিত্র অবস্থায় দাম্পত্যমিলন। পুরুষের জন্য মেয়েলী পোশাক বা চাল চলন, টাখনুর নিচে ঝুলিয়ে পোশাক পরা, সোনা ও রেশমের ব্যবহার, গোফ বেশি বড় করা, দাড়ি না রাখা। মেয়েদের জন্য পুরুষালী পোশাক বা আচরণ, সৌন্দর্য প্রকাশক পোশাক পরিধান করে, মাথা, মাথার চুল বা শরীরের কোনো অংশ অনাবৃত রেখে বা সুগন্ধি মেখে বাইরে যাওয়া।

৫.       অন্তরের বা মনের পাপ : অহংকার, গর্ব করা, নিজেকে বড় ভাবা, নিজের কর্মের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা, রিয়া, হিংসা, কোনো মুসলিমকে  হেয় বা ছোট ভাবা, কৃপণতা, দ্বীনী ইল্ম পার্থিব উদ্দেশ্যে শিক্ষা করা, ইল্ম গোপন করা।

(খ) সৃষ্টির অধিকার নষ্ট বা কষ্ট প্রদান সংক্রান্ত কবীরা গোনাহসমূহ

কুরআন ও হাদীস পর্যালোচনা করলে প্রতিভাত হয় যে, মানুষের মূল দায়িত্ব দু’টি ও পাপের সূত্রও দু’টি। প্রথম দায়িত্ব হলো মানুষ তার মহান প্রভুর প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাস, অগাধ ভালবাসা ও আস্থা পোষণ করবে এবং এ আস্থা, বিশ্বাস ও ভালবাসা বৃদ্ধি পায় এএই সকল কর্ম আল্লাহ্র মনোনীত রাসূলের শিক্ষা অনুসারে পালন করবে। আর এ দায়িত্বে অবহেলা সৃষ্টি করে এএই সকল কর্ম বা চিন্তাচেতনাই প্রথম পর্যায়ের পাপ।

মানুষের দ্বিতীয় দায়িত্ব এ পৃথিবীকে সুন্দর বসবাসযোগ্য করতে তার আশেপাশে সকল মানুষ ও জীবকে তারই মতো ভালোভাবে বাঁচতে সাহায্য করা। আর এ দায়িত্বের অবহেলাজনিত কর্মই দ্বিতীয় পর্যায়ের পাপ। আল্লাহ্র সৃষ্টির কষ্ট প্রদান, ক্ষতি করা, শান্তি বিনষ্ট করা বা অধিকার নষ্ট করাই হলো মূলত সবচেয়ে কঠিন অপরাধ। এ জাতীয় পাপগুলোকে কুরআন বা হাদীসে বেশি আলোচনা করা হয়েছে, বেশি বিশ্লেষণ ও ভাগ করা হয়েছে। একই জাতীয় পাপের শাখা প্রশাখাকে বিশেষভাবে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে তার তালিকাও অনেক বড় হয়ে গিয়েছে।

১.       ইসলাম নির্ধারিত শাস্তিযোগ্য অপরাধে অপরাধীর (চুরি, ডাকাতি, খুন, ধর্ষণ ইত্যাদি) শাস্তি মওকুফের জন্য সুপারিশ বা চেষ্টা করা।

২.       আইনের মাধ্যমে বিচার ছাড়া কোনো মানুষকে খুন বা হত্যা করা। এমনকি ডাকাতী, খুন, ধর্মদ্রোহিতা ইত্যাদি ইসলামী বিধানে যে অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বলে নির্ধারিত সে অপরাধে লিপ্ত ব্যক্তিকেও কোনো ব্যক্তি নিজের হাতে শাস্তি দিলে তা হবে খুন বা হত্যা। একমাত্র উপযুক্ত আদালতের বিচারের মাধ্যমে অপরাধীর অপরাধ, তার মাত্রা ও তার শাস্তি নির্ধারিত হবে। যথাযথ বিচারে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী মনে করা বা শাস্তি দেয়া ইসলামের দৃষ্টিতে সৃষ্টির অধিকার নষ্টকারী কঠিন অপরাধ।

৩.      রাষ্ট্রপ্রধান, প্রশাসক বা বিচারক কর্তৃক জনগণের দায়িত্ব, সম্পদ বা আমানত আদায়ে অবহেলা বা ফাঁকি দেয়া।

৪.       নাগরিক কর্তৃক রাষ্ট্রপ্রধান, শাসক, প্রশাসক বা প্রধানকে ধোঁকা দেয়া বা রাষ্ট্রের ক্ষতিকর কিছু করা।

৫.       রাষ্ট্র বা সমাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বা সশস্ত্র বিদ্রোহ।

৬.       অন্যায় দেখেও সাধ্যমতো প্রতিকার বা প্রতিবাদ না করা।

৭.       রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের বাইরে থেকে মৃত্যুবরণ করা।

৮.      রাষ্ট্র প্রশাসনের অন্যায় বা জুলুম সমর্থন বা সহযোগিতা করা।

৯.       সমাজের মানুষদেরকে কবীরা গোনাহের কারণে কাফির বলা বা মনে করা।

১০.     বিচারকের জন্য ন্যায় বিচারে একনিষ্ঠ না হওয়া বা বিচার্য বিষয়ের বাইরে কোনো কিছু দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিচার করা।

১১.     আইন প্রয়োগকারীর জন্য আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব করা ও আপনজনদের জন্য হালকাভাবে শাস্তি প্রয়োগ করা।

১২.     মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া বা প্রয়োজনের সময় সত্য সাক্ষ্য না দেয়া।

১৩.     রাষ্ট্রীয় সম্পদ অবৈধভাবে ভক্ষণ বা দখল করা, তা যত সামান্যই হোক।

১৪.     মুনাফিককে নেতা বলা।

১৫.     জিহাদের মাঠ থেকে পালিয়ে আসা।

১৬.     মুসলিমগণকে কষ্ট প্রদান ও গালি দেয়া।

১৭.     যবরদস্তি, মিথ্যা মামলা বা অবৈধভাবে কোনো মানুষ থেকে কিছু গ্রহণ করা।

১৮.     হাটবাজার, রাস্তাঘাটে টোল আদায় করা বা চাঁদাবাজী করা।

১৯.     মুসলিম সমাজে বসবাসরত অমুসলিম নাগরিককে কষ্ট প্রদান বা তার অধিকার নষ্ট। যে কোনো মানুষকে কষ্ট দেয়াই কঠিন পাপ। তবে হাদীস শরীফে সাধারণ নির্দেশনা ছাড়াও বিশেষ করে সমাজের দুর্বল শ্রেণিগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

২০.     কোনো মহিলা বা এতিমের সম্পদ ভক্ষণ করা। যে কোনো মানুষের সামান্যতম সম্পদ অবৈধভাবে গ্রহণ অন্যতম কবীরা গোনাহ। তবে মহিলা ও এতিম যেহেতু দুর্বল এজন্য হাদীস শরীফে তাদের দুর্বলতার কথা উল্লেখ করে তাদের সম্পদ অবৈধ বা জবরদস্তি দখল বা ভোগকারীর জন্য কঠিনতম শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

২১.     আল্লাহ্র প্রিয় ধার্মিক বান্দাগণকে কষ্ট প্রদান বা তাদের সাথে শত্র“তা করা।

২২.     প্রতিবেশীর কষ্ট প্রদান।

২৩.    কোনো মাজলিসে খালি জায়গা দেখে না বসে ঠেলাঠেলি করে অন্যদের কষ্ট দিয়ে মাজলিসের মাঝে বসে পড়া বা এমনভাবে মাঝে বসা যাতে অন্যদের অসুবিধা হয়।

২৪.     কারো স্ত্রী বা চাকর বাকর ফুসলিয়ে সরিয়ে দেয়া।

২৫.     কর্কশ ব্যবহার ও অশ্লীল- অশ্রাব্য কথা বলা।

২৬.     অভিশাপ বা গালি দানে অভ্যস্ত হওয়া।

২৭.     কোনো মুসলিমের দুর্বলতার সুযোগ গ্রহণ করে কিছু অর্থলাভ করা।

২৮.    দীর্ঘ দিন কোনো মুসলিমের সাথে কথাবার্তা বন্ধ রাখা।

২৯.     মুসলিমগণের তাকে অপরকে ভালো না বাসা, বা পারস্পারিক ভালবাসার অভাব থাকা।

৩০.    মুসলিমদের গোপন দোষ খোঁজা, জানা ও বলে দেয়া।

৩১.     নিজের জন্য যা পছন্দ করে অন্যের জন্য তা পছন্দ না করা।

৩২.    কোনো ব্যক্তিকে তার বংশের বিষয়ে অপবাদ দেয়া।

৩৩.    পিতামাতার অবাধ্য হওয়া বা তাঁদের কষ্ট প্রদান করা।

৩৪.    সুদ গ্রহণ করা, প্রদান করা, সুদ লেখা বা সুদের সাক্ষী হওয়া।

৩৫.    ঘুষ গ্রহণ করা, প্রদান করা ও ঘুষ আদান প্রদানের মধ্যস্থতা করা।

৩৬.    মিথ্যা শপথ করা।

৩৭.    হীলা বিবাহ করা বা করানো।

৩৮.    আমানতের খেয়ানত করা।

৩৯.    কোনো মানুষের উপকার করে পরে খোঁটা দেয়া।

৪০.     মানুষের গোপন কথা শোনা বা জানার চেষ্টা করা।

৪১.     স্ত্রীর জন্য স্বামীর অবাধ্য হওয়া।

৪২.     স্বামীর জন্য স্ত্রীর টাকা বা সম্পদ তার ইচ্ছার বাইরে ভোগ বা দখল করা।

৪৩.    চোগলখুরী করা বা একজন মানুষের কাছে অন্য মানুষের নিন্দামন্দ ও শত্র“তামূলক কথা বলে উভয়ের মধ্যে সুসম্পর্ক নষ্ট করা।

৪৪.     পরচর্চা করা বা কারো অনুপস্থিতিতে তার মধ্যে বিরাজমান দোষগুলো উল্লেখ করা।

৪৫.     জমির সীমানা পরিবর্তন করা।

৪৬.     মহান সাহাবীগণকে গালি দেয়া।

৪৭.     আনসারগণকে গালি দেয়া।

৪৮.    পাপ বা বিভ্রান্তির দিকে বা খারাপ রীতির দিকে আহ্বান করা।

৪৯.     কারো প্রতি অস্ত্র জাতীয় কিছু উঠান বা হুমকি প্রদান।

৫০.     নিজের পিতা ছাড়া অন্যকে পিতা বলা।

৫১.     জেদাজেদি ঝগড়া, বিতর্ক কলহ বা কোন্দল।

৫২.     ওজন, মাপ বা দ্রব্যে কম দেয়া বা ভেজাল দেয়া।

৫৩.    কোনো উপকারীর উপকার অস্বীকার করা বা অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।

৫৪.     নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি অন্যকে প্রদান থেকে বিরত থাকা।

৫৫.     কোনো প্রাণীর মুখে দাগ বা মার্কা দেয়া।

৫৬.     জুয়া খেলা।

৫৭.     অবৈধ ঝগড়া বা গোলযোগে সহযোগিতা করা।

৫৮.    কথাবার্তায় সংযত না হওয়া।

৫৯.     ওয়াদা ভঙ্গ করা।

৬০.     উত্তরাধিকারীকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা।

৬১.     স্বামী বা স্ত্রী কর্তৃক তাদের একান্ত গোপনীয় কথা অন্য কাউকে বলা।

৬২.     কারো বাড়ি বা ঘরের মধ্যে অনুমতি ছাড়া দৃষ্টি করা।

৬৩.    কেউ আল্লাহ্র নামে শপথ করে সাহায্য বা ক্ষমা চাইলে বিরক্ত হওয়া।

৬৪.     যা কিছু শোনা হয় যাচাই ও সত্যাসত্য নির্ধারণ না করে তা বলা।

৬৫.     বঞ্চিত ও দরিদ্রদেরকে খাদ্য বা সাহায্য প্রদানে উৎসাহ না দেয়া।

৬৬.     ব্যভিচার, সমকামিতা বা যৌন অনাচার ও অশ্লীলতা।

৬৭.     নিরপরাধ মানুষকে, বিশেষত মহিলাকে ব্যভিচার বা অনৈতিকতার অপবাদ দেয়া।

৬৮.    মুসলিম সমজে অশ্লীলতা প্রসার করতে পারে এমন কোনো গল্পগুজব বা কথাবার্তা, বই, ছবি ইত্যাদি বলা বা প্রচার করা।

 

ইহসান বা সৌন্দর্য ও পূর্ণতা

“ইহসান” শব্দের অর্থ কোন বিষয় সুন্দর করে পালন করা বা কারো উপকার ও কল্যাণ করা। যিনি “ইহসান” পালন করেন তিনি “মুহসিন” কুরআন ও হাদীসে এ দুটি অর্থে “ইহসান” ও “মুহসিন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। তন্মধ্যে একটি হাদীসে “ইহসান” বা সুন্দর ও পূর্ণ ইসলামের  অধিকারী মুসলিমের পরিচয় দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ  বলেন: “ইহসান হলো, তুমি এমনভাবে আল্লাহ্র ইবাদত করবে, যেন তুমি তাকে দেখছ। কারণ তুমি তাকে না দেখলেও তিনি তোমাকে দেখছেন।”

এ হলো মুত্তাকী হৃদয়ের পূর্ণতার অবস্থা। আর এভাবে নিজের যাবতীয় ইবাদত-বন্দেগী ও জীবন পরিচালনাকারী মুমিনই বেলায়াত, স্রষ্টার প্রেম ও নৈকট্যের মহান নেয়ামতের অতুলনীয় স্বাদ অনুভব করেন।

সুন্নাত ও ইত্তিবায়ে সুন্নাত

বেলায়াত, ওয়াসীলাহ ও ইহসান, অর্থাৎ আল্লাহ্র বন্ধুত্ব, নৈকট্য ও পূর্ণতা অর্জনের অন্যতম বিষয় রাসূলুল্লাহ ()-এর অনুসরণ-অনুকরণ, বা “ইত্তিবায়ে সুন্নাত” ঈমান, তাকওয়া ও ওয়াসীলাহ- সকল পর্যায়েই ‘ইত্তিবা’ অন্যতম বিষয়। আমরা দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ ()-এর নিঃশর্ত, পরিপূর্ণ ও অবিমিশ্র (ধনংড়ষঁঃব) অনুসরণ-অনুকরণ রিসালাতের ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাকওয়া অর্জনও ইত্তিবা ছাড়া সম্ভব নয়। রাসূলুল্লাহ ()-এর অনুকরণের ব্যতিক্রম ইবাদত করাকে বিভ্রান্তি ও শাস্তির কারণ বলে হাদীসে বারংবার বলা হয়েছে। ওয়াসীলাহ বা নৈকট্য অর্জনের সবচেয়ে সহজ পথ “সুন্নাত” পদ্ধতিতে আমল করা। এভাবে আমরা দেখছি যে, আল্লাহ্র ভালবাসা, বন্ধুত্ব ও নৈকট্য লাভের একমাত্র পথ ইত্তিবায়ে সুন্নাত। মহান আল্লাহ্ বলেন: “তোমরা যদি আল্লাহ্কে মহব্বত কর তবে আমার অনুসরণ-অনুকরণ কর; তাহলে আল্লাহ্ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন।”  এ কারণে আমরা সুন্নাত, ইত্তিবায়ে সুন্নাত, খেলাফে সুন্নাত ও বিদআত সম্পর্কে এখানে সংক্ষেপে আলোচনা করছি।

(ক). সুন্নাত বনাম খেলাফে সুন্নাত

সুন্নাত শব্দের অর্থ, ব্যবহার, সুন্নাতের গুরুত্ব, মর্যাদা, সুন্নাতের খেলাফ চলার ভয়াবহ পরিণতি ইত্যাদি বিষয়ে “এহ্ইয়াউস সুনান” Ñগ্রন্থে আলোচনা করেছি। সংক্ষেপে সুন্নাত শব্দের অর্থ: ছবি, জীবন পদ্ধতি, কর্মধারা ইত্যাদি।  ইসলামী শরীয়তে ‘সুন্নাত’ শব্দের দু ধরনের প্রয়োগ রয়েছে:

(১). রাসূলুল্লাহ ()-এর সকল প্রকারের নির্দেশ, কথা, কর্ম, অনুমোদন বা এক কথায় তাঁর সামগ্রিক জীবনাদর্শ। এছাড়া তাঁর সাহাবীদের কর্ম ও আদর্শও এ অর্থে ‘সুন্নাত’ বলে অভিহিত হয়।

(২). সুন্নাতের দ্বিতীয় ও প্রচলিত অর্থ, ফরয ও ওয়াজিব-তার পরবর্তী পর্যায়ের কর্ম, যা করা প্রয়োজন, বা করা উত্তম।

সাধারণভাবে দ্বিতীয় অর্থটিই প্রচলিত। তবে কুরআন, হাদীসে ও উলামায়ে কেরামের ভাষায় ইত্তেবায়ে সুন্নাত বা সুন্নাতের অনুসরণের নির্দেশনার ক্ষেত্রে “সুন্নাত” বলতে প্রথম অর্থ বুঝান হয়। এ অর্থে রাসূলুল্লাহ  এর সামগ্রিক জীবন পদ্ধতিই সুন্নাত।

যে কাজ রাসূলুল্লাহ  ফরয হিসাবে করেছেন তা ফরয হিসাবে করাই তাঁর সুন্নাত। যা তিনি নফল হিসাবে করেছেন তা নফল হিসাবে করাই তাঁর সুন্নাত। যা তিনি  সর্বদা নিয়মিতভাবে করেছেন তা সর্বদা নিয়মিতভাবে করাই তাঁর সুন্নাত। যা তিনি মাঝে মাঝে করেছেন তা মাঝে মাঝে করাই তাঁর সুন্নাত। যা তিনি কখনো করেননি, অর্থাৎ সর্বদা বর্জন করেছেন তা সর্বদা বর্জন করাই তাঁর সুন্নাত। যা তিনি মাঝে মাঝে বর্জন করেছেন তা মাঝে মাঝে বর্জন করাই তাঁর সুন্নাত।

যে কাজ রাসূলুল্লাহ  করতে নির্দেশ দিয়েছেন বা উৎসাহ প্রদান করেছেন তা পালনের ক্ষেত্রে তাঁর পালনপদ্ধতিই সুন্নাত। যে কাজ তিনি করতে নিরুৎসাহিত করেছেন বা বর্জন করতে উৎসাহ প্রদান করেছেন তা তাঁর কর্মপদ্ধতির আলোকে বর্জন করাই সুন্নাত।

যে কাজ রাসূলুল্লাহ  শর্তসাপেক্ষে বা নির্দিষ্ট কোনো পরিস্থিতিতে, সময়ে, স্থানে বা পদ্ধতিতে করেছেন বা করতে বলেছেন তাকে ঐসব শর্তসাপেক্ষে বা নির্দেশনা সাপেক্ষে পালন করাই সুন্নাত। যা তিনি উন্মুক্তভাবে বা সাধারণভাবে করেছেন বা করতে বলেছেন, কোনো বিশেষ সময়, স্থান, পরিস্থিতি বা পদ্ধতি নির্ধারণ করেননি তাকে কোনোরূপ বিশেষ পদ্ধতি, সময় বা পরিস্থিতি বা স্থান নির্ধারণ ব্যতিরেকে উন্মুক্তভাবে পালন করাই সুন্নাত।

কোনো কর্ম পালন বা বর্জনের ক্ষেত্রে গুরুত্ব, পদ্ধতি, ক্ষেত্র, সময়, স্থান ইত্যাদি যে কোনো বিষয়ে সুন্নাতের বেশি বা কম হলে বা সুন্নাতের বাইরে গেলে তা ‘খেলাফে সুন্নাত’ হবে। অর্থাৎ, যা তিনি ফরয হিসাবে করেছেন তা নফল মনে করে পালন করা, যা তিনি নফল হিসাবে করেছেন তা ফরযের গুরুত্ব দিয়ে পালন করা, যা তিনি সর্বদা নিয়মিতভাবে করেছেন তা মাঝেমধ্যে করা, যা তিনি মাঝে মাঝে করেছেন তা সর্বদা করা, যা তিনি কখনই করেননি তা কখনই না করা, যা তিনি কোনো শর্তসাপেক্ষে বা নির্দিষ্ট কোনো পরিস্থিতিতে, সময়ে, স্থানে বা পদ্ধতিতে করেছেন বা করতে বলেছেন তঠকে শর্তহীন উন্মুক্তভাবে পালন করা, যা তিনি উন্মুক্তভাবে বা সাধারণভাবে করেছেন বা করতে বলেছেন, কোনো বিশেষ সময়, স্থান, পরিস্থিতি বা পদ্ধতি নির্ধারণ করেননি তা পালনের জন্য কোনরূপ বিশেষ পদ্ধতি, সময় বা পরিস্থিতি বা স্থান নির্ধারণ করা বা যা তিনি বর্জন করেছেন তা পালন করা সবই ‘খেলাফে সুন্নাত’।

“খেলাফে সুন্নাত” বা যে কাজ রাসূলুল্লাহ  বা সাহাবীগণ করেননি তা করা এবং তাঁরা যা করেছেন তা বর্জন করা জায়েয হতে পারে, জাগতিকভাবে বা ইবাদত পালনের উপকরণ হিসাবে জরুরিও হতে পারে, তবে কখনই তা ইবাদত, ইবাদতের অংশ বা সাওয়াবের মাধ্যম হতে পারে না। রাসূলুল্লাহ  যা করেননি বা বর্জন করেছেন তা করা এবং তিনি যা করেছেন তা বর্জন করাকে দ্বীনের অংশ বা আল্লাহ্র সন্তুষ্টির কাজ মনে করা নিষিদ্ধ।

(খ). জায়েয ও সুন্নাত

এভাবে দেখছি যে, সুন্নাতের বাইরে কোনো কাজ জায়েয হতে পারে, তবে তাক উত্তম বা সাওয়াবের মনে করলে, দ্বীনের অংশ মনে করলে বা রীতিতে পরিণত করলে বিদ‘আত হবে এবং এতে রাসূলুল্লাহ  এর সুন্নাতকে অপছন্দ করা হবে ও কঠিন গোনাহ হবে।

যেমন, তাকবীরে তাহরীমায় রাসূলুল্লাহ  সর্বদা ‘আল্লাহু আকবার’ বলতেন। ইমাম আবু হানীফা (রাহ.) আল্লাহু আ’যম’, ‘আল্লাহ্ মহান’ ইত্যাদি বাক্য দ্বারা তাহরীমা বাঁধা জায়েয বলেছেন। পশু জবেহ করার সময় রাসূলুল্লাহ  এর সুন্নাত হলো আরবিতে “বিসমিল্লাহ” বলা। সকল কেতাবে লেখা আছে এবং হানাফী মাযহাবের সকল ইমাম বলেছেন যে,  আরবিতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলতে পারলেও ইচ্ছা করে অন্য যে কোনো ভাষায় ‘আল্লাহ্’, ‘প্রভু’, ‘দয়ালু’ ইত্যাদি বললেই জবাই হয়ে যাবে এবং জবাইকারীর কাজটি জায়েয হবে। এখানে জায়েয অর্থ যদি কেউ এভাবে করে তবে তার কাজটি গোনাহের হবে না। কিন্তু যদি কেউ এভাবে এ “জায়েয” কাজতে সুন্নাতের চেয়ে বেশি ভাল বা “তাকওয়া” মনে করে, অথবা সুন্নাত ভাল জেনেও সর্বদা এ “জায়েয” পদ্ধতিতে কাজ করতে থাকে তাহলে তা বিদ‘আতে পরিণত হবে। এভাবে সে রাসূলুল্লাহ  এর সুন্নাতকে মেরে ফেলবে।

(গ). সুন্নাতের অনুসরণ বনাম উদ্ভাবন ও বিদ‘আত

সুন্নাত মেরে ফেলার ও অপছন্দ করার একটি বিশেষ কারণ হলো উদ্ভাবন। সুন্নাতের অনুসরণ অর্থ উপরের নিয়মে রাসূলুল্লাহ  -এর হুবহু ও অবিকল অনুসণে কর্ম করা। হাদীস শরীফে এ হুবহু অনুসরণকে “সুন্নাতের জীবনদান” বলা হয়েছে। কারণ যিনি হুবহু ও অবিকল সুন্নাতের অনুসরণ করেন তিনি রাসূলুল্লাহ  এর “রীতি”-কে অবিকল মানুষের মধ্যে প্রচলিত ও জীবিত রাখেন। তিনি যেভাবে পোশাক পরতেন, খানা খেতেন, নামায পড়তেন, যিক্র করতেন, কবর যিয়ারত করতেন, দোয়া করতেন, কুরআন পড়তেন অবিকল সে পদ্ধতিটিই সমাজে জীবিত থাকে।

অনুসরণের বিপরীত “উদ্ভাবন” বা বিদ‘আত। বিদ‘আত অর্থ রাসূলুল্লাহ  -এর সুন্নাত পদ্ধতির বাইরে ইবাদত বন্দেগি পালনের পদ্ধতি। বিদ‘আতের পরিচয়, পরিণতি, প্রকরণ ও কারণ সম্পর্কে পূর্বোক্ত বইয়ে আলোচনা করেছি। কোন বিদ‘আতই কুরআন ও হাদীসের দলিল ছাড়া বানানো হয় না। সুন্নাত থেকেই বিদ‘আতের উদ্ভাবন হয়। উদ্ভাবনের এ প্রক্রিয়া ও উদ্ভাবন ও অনুসরণের মধ্যে পার্থক্য বুঝার জন্য কয়েকটি উদাহারণ পেশ করা যায়।

মনে করুন আমি একজন পীর সাহেবের মুরীদ। আমি দেখতে পেলাম যে আমার পীর মাঝে মাঝে কালো পাগড়ি ও মাঝে মাঝে সাদা পাগড়ি ব্যবহার করেন। আমি ভালোকরে লক্ষ্য করে দেখতে পেলাম যে, তিনি শুক্রবারে জুম‘আর নামাযের জন্য সাদা পাগড়ী ব্যবহার করেন। অন্যান্য দিনে তিনি কালো পাগড়ি ব্যবহার করেন। এখন একজন ভক্ত অনুসারী হিসাবে যদি আমি হুবহু তাঁর মতো শুক্রবারে সাদা পাগড়ি ও অন্যান্য দিনে কালো পাগড়ি ব্যবহার করি তাহলে আমাকে প্রকৃত ও পরিপূর্ণ অনুসারী বলা হবে। কিন্তু আমি যদি এখানে নিজের বিবেক ও বিবেচনাকে কাজে লাগিয়ে সর্বদা সাদা পাগড়ি ব্যবহার করি তাহলে আমার অন্যান্য পীরভাইগণ স্বভাবতই আমাকে পূর্ণ অনুসারী বলবেন না এবং আমাকে পীরের কর্মের বিরোধিতার জন্য প্রশ্ন করবেন। তাদের প্রশ্নের জবাবে যদি আমি  বলি যে, শুক্রবার হচ্ছে সর্বোত্তম দিন এবং এ দিনে আমার পীর সাদা পাগড়ি ব্যবহার করেন। এদ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কালো পাগড়ি ব্যবহারের চেয়ে সাদা পাগড়ি ব্যবহারই উত্তম। যদিও পীর নিজে অন্যান্য সকল দিনে কালো পাগড়ি ব্যবহার করেন, তবে তিনি নিজের কর্ম দ্বারা প্রমাণ করেছেন যে, সর্বদা সাদা পাগড়ি ব্যবহারই উত্তম। তাই আমি সর্বদা সকল দিনেই সাদা পাগড়ি ব্যবহার করি। আমার যুক্তি ও দলিল যতই অকাট্য হোক আমার পীর ভাইয়েরা আমাকে পূর্ণ অনুসারী বলে মানবেন না, বরং যিনি পীরের হুবহু অনুকরণ করে শুক্রবারে সাদা পাগড়ি ও অন্য দিনে কালো পাগড়ি পরেন তাকেই হুবহু অনুসরণকারী বলবেন। আমাকে উদ্ভাবনকারী বলবেন। হয়ত কেউ বলবেন, তুমি এভাবে সাদা পাগড়ির ফযীলত আবিষ্কার করলে, অথচ তোমার পীর তা বুঝতে পারলেন না, তুমি কি তাঁর চেয়েও বেশি বোঝ?

এভাবে আমরা অনুসরণ ও উদ্ভাবনের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারছি। আমরা বুঝতে পারছি যে, উদ্ভাবন অনুসরণের বিপরীত। উদ্ভাবনকারী কখনোই পরিপূর্ণ অনুসরণকারী বলে বিবেচিত হবেন না। বরং উদ্ভাবন তাকে অনুসরণের পথ থেকে ক্রমান্বয়ে দূরে সরিয়ে নেবে। এজন্য সুন্নাতের অনুসরণ পরিত্যাগের একটি বিশেষ কারণ হলো উদ্ভাবন।

এবার সুন্নাতে নববীর উদাহারণ আমরা বিবেচনা করি। রাসূলুল্লাহ  শেষরাতে দীর্ঘক্ষণ তাহাজ্জুদ আদায়ের পরে ফজরের নামাযের পূর্বের দুই রাক‘আত সুন্নাত নামায ফজরের আযানের পরে আদায় করতেন। তারপর কখনো আয়েশার (রা.) সাথে কথাবার্তা বলতেন। কখনো ডানকাতে একটু শুয়ে পড়তেন। বেলাল এসে সাড়া দিলে বা একামত দিলে তিনি উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে মসজিদে জামাতে নামায পড়াতেন। অন্য কোনো সময়ে সুন্নাত ও ফরয নামাযের মাঝে তিনি শুতেন না। এখন কেউ যদি অবিকল তাঁরই মতো শেষরাতে দীর্ঘক্ষণ তাহাজ্জুদের পড়ে ফজরের আযানের পরে দুই রাক‘আত সুন্নাত আদায় করে ডানকাতে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকেন তাহলে তাকে অবিকল অনুসারী বলা হবে।

কিন্তু তিনি যদি ঘরের পরিবর্তে মসজিদে এসে শুয়ে থাকেন অথবা দলবদ্ধভাবে শুয়ে থাকেন তাহলে তাকে অবিকল অনুসারী বলা যাবে না। অনুরূপভাবে যদি কেউ যোহরের সুন্নাতের পরেও কিছুক্ষণ শুয়ে থাকার রীতি চালু করেন তাহলে তাকেও আমরা রাসূলুল্লাহ  -এর অবিকল অনুসারী বলতে পারব না। তিনি হয়ত উপরের পদ্ধতিতে অনেক অকাট্য যুক্তি ও দলিল পেশ করতে পারবেন। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তাঁর কাজকে সুন্নাতের অনুসরণ বলে প্রমাণিত করতে পারবেন না। তাকে মানতে হবে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ  -এর ফজরের সুন্নাতের পরে শুয়ে থাকার অনুকরণে যোহরের সুন্নাতের পরে শুয়ে থাকার উদ্ভাবন করেছেন। তাঁর উদ্ভাবন যত মহানই হোক, সুন্নাতের অনুসরণ প্রেমিক উম্মতের কাছে মনে হবে, রাসূলুল্লাহ  সাল্লাম যোহরের সুন্নাতের পরে কখনো শুতেন না এবং তাঁর সাহাবীগণ শুতেন না। কাজেই যত দলিলই দেখান হোক আমি এ নতুন উদ্ভাবিত রীতির অনুসারী না হয়ে রাসূলুল্লাহ -এর রীতির অনুসারী হয়েই থাকতে চাই।

সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ  অনেক সময় বিশেষ নেয়ামত লাভ করলে বা সুসংবাদ পেলে আল্লাহ্র দরবারে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য শুকরানা সাজদা করতেন। এখন যদি কেউ এসকল হাদীসের আলোকে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের পরে নিয়মিত একটি করে শুকরানা সাজদা দেয়ার প্রচলন করেন তাহলে তাকে কখনোই অনুসারী বলা যাবে না। তাকে উদ্ভাবক বলতে হবে। তিনি হয়ত অনেক অকাট্য দলিল পেশ করবেন। তিনি বলবেন, যে কোনো নেয়ামত লাভের পরেই শুকরিয়া সাজদা করা যায়। মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় নেয়ামত হলো নামায আদায় করতে পারা। কাজেই, এ নেয়ামত লাভের পরে যে শুকরানা সাজদা করে না সে অকৃতজ্ঞ বান্দা। যে বান্দা সন্তান লাভের সংবাদে শুকরিয়া সাজদা করে অথবা চাকরি পাওয়ার সংবাদে শুকরিয়া করে অথচ জীবনের শ্রেষ্ঠ নেয়ামত নামায আদায়ে তৌফিক পেয়ে সাজদা করে না সে কেএ বান্দা !

তিনি হয়ত বলবেন, এ সাজদা যে নিষেধ করে সে বেয়াকুফ, তাকে আবু জাহল বলা উচিত। কারণ সে, আল্লাহ্র দরবারে শুকরিয়া জানাতে বান্দাকে নিষেধ করছে। কোথাও কি আছে যে, বিশেষ কোনো নেয়ামতের জন্য সাজদায়ে শুকর আদায় করা যাবে না? রাসূলুল্লাহ  কি কখনো নামাযের পরে শুকরানা সাজদা করতে নিষেধ করেছেন ? নেয়ামতের জন্য সাজদা হাদীসে প্রমাণিত। নামায মুমিনের জীবনের অন্যতম নিয়ামত। এছাড়া সাজাদার সময়ে দোয়া কবুল হয় তার প্রমাণিত। নামাযের পরে দোয়া কবুল হয় তার প্রমাণিত। কাজেই, প্রত্যেক নামাযের পরে সাজদা করা ও সাজদার মধ্যে দোয়া করা সুন্নাত।

অনেক কথাই তিনি বলতে পারবেন। অগণিত অকাট্য প্রমাণ তিনি প্রদান করবেন। কিন্তু কখনই আমরা তাকে সুন্নাতে নববীর অনুসারী বলতে পারব না। কারণ পাঁচ ওয়াক্ত নামায নিয়মিত রাসূলুল্লাহ  আজীবন আদায় করেছেন, তাঁর সাহাবীগণও করেছেন, কিন্তু কেউ কখনোই নামায আদায়ের নেয়ামত লাভের পর শুকরিয়ার সাজদা করেননি। কাজেই, নামাযের পরে শুকরানা সাজদা না করাই তাঁদের সুন্নাত। আর সাজদার প্রথা এ সুন্নাতকে মেরে ফেলবে। অনুকরণপ্রিয় সুন্নাত প্রেমিকের প্রশ্ন হলো : আমরা কি রাসূলুল্লাহ  -এর চেয়েও বেশি কৃতজ্ঞ বান্দা হতে চাই? এ সকল অকাট্য দলিলে মাধ্যমে আমরা কি রাসূলুল্লাহ  ও তাঁর সাহাবীগণকেই অকৃতজ্ঞ ও হেয় বলে প্রমাণিত করছি না?

(ঘ) সুন্নাতের অনুসরণের গুরুত্ব

রাসূলুল্লাহ  এর অনুসরণই ইসলাম। ইসলাম অর্থ হলো রাসূলুল্লাহ  এর অনুসরণে আল্লাহ্র ইবাদত করা। কেউ তাঁর অনুসরণের বাইরে এগড়াভাবে আল্লাহ্র ইবাদত করলে সে মুসলিম বলে গণ্য হবে না। বেলায়াত ও ইহসানের পথে চলতে সুন্নাতের হুবহু অনুকরণ অতি আবশ্যক। তার অনেক ফযীলত, মর্যাদা ও গুরুত্বের কথা কুরআন ও হাদীসে বলা হয়েছে। এখানে সামান্য কয়েকটি দিক উল্লেখ করছি।

(১). সুন্নাতের অনুসরণই রহমতের ও ক্ষমার একমাত্র ওসীলা। আল্লাহ্ বলেছেন: “বলুন, যদি তোমরা আল্লাহ্কে ভালবাস, তাহলে আমাকে অনুসরণ কর, যাতে আল্লাহ্ও তোমাদিগকে ভালবাসেন এবং তোমাদিগকে তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন। আর আল্লাহ্ হলেন ক্ষমাকারী দয়ালু।  বলুন, আল্লাহ্ ও রসূলের আনুগত্য প্রকাশ কর। বস্তুত যদি তারা বিমুখতা অবলম্বন করে, তাহলে আল্লাহ্ কাফেরদেরকে ভালবাসেন না।”

(২) সুন্নাতের অনুসরণ ইবাদত কবুলের শর্ত। রাসূলুল্লাহ  বলেছেন: “আমাদের (অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহ  ও তাঁর সাহাবীদের) এ কাজের (ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের) মধ্যে যে নতুন কোনো বিষয় উদ্ভাবিত করবে তার নতুন উদ্ভাবিত কাজটি প্রত্যাখ্যান করা হবে।”  সহীহ মুসলিমের বর্ণনায়: “আমাদের কর্ম যা নয় এএই কোনো কর্ম যদি কোনো মানুষ করে তাহলে তার কর্ম প্রত্যাখ্যাত হবে (আল্লাহ্র কাছে কবুল হবে না)।”

(৩) সুন্নাতের অবিকল অনুসরণ ও জীবনদানকারী রাসূলুল্লাহ  এর সাথে জান্নাতে থাকতে পারবে ঃ রাসূলুল্লাহ  বলেছেন: “য আমার সুন্নাতকে জীবিত করবে (পালন ও প্রচারের মাধ্যমে আমার সুন্নাতকে জীবিত, প্রচলিত বা প্রতিষ্ঠিত রাখবে), সে আমাকেই ভালবাসবে। আর যে আমাকে ভালবাসবে, সে আমার সাথে জান্নাতে থাকবে।”  তিনি আরো বলেছেন: “যে ব্যক্তি হালাল খাদ্য খেয়ে জীবনযাপন করবে, সুন্নাত অনুসারে আমল করবে এবং কোনো মানুষ তাঁর দ্বারা কষ্ট পাবে না, সে ব্যক্তি জান্নাতী হবে।” একজন সাহাবী প্রশ্ন করলেন : ইয়া রাসূলুল্লাহ, এ ধরনের মানুষতো আজকাল অনেক। তিনি বললেন : আমার অনেক যুগ পরেও আমার উম্মতের মধ্যে এরূপ মানুষ থাকবে।

(৪) সুন্নাত অনুসারে অল্প ইবাদতেই অনেক বেশি সাওয়াব ঃ হাসান বসরী বলেন : রাসূলুল্লাহ  বলেছেন :“সুন্নাতের মধ্যে অল্প আমল করা বিদ‘আতের মধ্যে অনেক আমল করার চেয়ে উত্তম। যে আমার পদ্ধতির অনুসরণ করবে সে আমার উম্মত, আমার সাথে সম্পর্কিত। আর যে আমার পদ্ধতি অপছন্দ করবে তার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।”

(৫) জান্নাতের বিশেষ সুসংবাদ ঃ অনেক সময় বিভিন্ন সমাজে ইবাদতের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ  উঠে যায় এবং খেলাফে সুন্নাত পদ্ধতিতে ইবাদত পালন করা হয়। সেই সময় কোন মুমিন যদি উঠে যাওয়া ও ভুলে যাওয়া সুন্নাত অনুসারে ইবাদত পালন করেন এবং সুন্নাতকে জীবিত ও প্রচলিত করেন তাহলে তাঁর জন্য রয়েছে বিশেষ সাওয়াব। রাসূলুল্লাহ   বলেছেন: “ইসলামের শুরু হয়েছে অনাত্মীয় বান্ধবহীন প্রবাসীর মতো এবং তেমনি আত্মীয়হীন বান্ধবহীন রূপেই ইসলাম ফিরে আসবে। এ বান্ধবহীন স্বজনহীন ইসলামের  অনুসারীদের জন্য সুসংবাদ” যাঁরা আমার পরে মানুষেরা আমার যেসকল সুন্নাত নষ্ট করবে তা ঠিক করবে।”

(ঙ) বিভিন্ন ইবাদত বন্দেগি বিষয়ক কিছু সুন্নাত ও খেলাফে সুন্নাত

আমি এখানে আমাদের সমাজে প্রচলিত অনেক ইবাদত বন্দেগির ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ  ও সাহাবীগণের সুন্নাত ও আমাদের প্রচলিত খেলাফে সুন্নাত বা সুন্নাত বিরোধী পদ্ধতি সংক্ষেপে উল্লেখ করছি। এখানে শুধু রাসূলুল্লাহ  ও সাহাবীগণ কি করেছেন এবং কি করেন নি তা উল্লেখ করছি। যা করেছেন তা সুন্নাত এবং যা করেন নি তা খেলাফে সুন্নাত। খেলাফে সুন্নাত জায়েয কি না এ বিষয়টি আমাদের কাছে গৌণ। আমাদের চেষ্টা করতে হবে যথা সম্ভব সুন্নাত অনুসারে চলার। এখানে কয়েকটি বিষয়ে আলোচনা করছি। বিস্তারিত জানার জন্য পাঠককে “এহইয়াউস সুনান” গ্রন্থটি পাঠ করতে অনুরোধ করছি। এছাড়া তিলাওয়াত, দরুদ সালাম, দোয়া-মুনাজাত ইত্যাদি বিষয়ক সুন্নাত ও খেলাফে সুন্নাত বিস্তারিত জানার জন্য “রাহে বেলায়াত” পাঠ করতে অনুরোধ করছি।

(১) নামায রোযা ইত্যাদি বিষয়ক কিছু সুন্নাত ও খেলাফে সুন্নাত

এবিষয়ক অনেক কথা এ বইয়ে করা হয়েছে। বিশেষভাবে বলা যায়: তাহাজ্জুদ নামায মোটেও না পড়া খেলাফে সুন্নাত রীতি। তাহাজ্জুদের জন্য জামাত করা বা কোনো সূরা নির্ধারণ করে নেয়া খেলাফে সুন্নাত রীতি। সাধ্যমত কিছু তাহাজ্জুদ আদায় করা এবং সুবিধা মত যতবড় সম্ভব সূরা পাঠ করাই সুন্নাত। শবে কদর ও অন্যান্য রাতের নামায আদায়ের জন্যও একই নিয়ম। এজন্য বিশেষ কোনো সুরা নির্ধারণ করা খেলাফে সুন্নাত।

নফল রোযা আদায়ের ক্ষেত্রে সুন্নাত দিন ও পদ্ধতি উপরে আলোচনা করেছি। শবে মেরাজের দিনে রোযা রাখা ফযীলতে কেনো হাদীস নেই। এ দিনে বিশেষকরে রোযা রাখা খেলাফে সুন্নাত। শবে বরাতের দিনে রোযা রাখার হাদীসটি খুবই দুর্বল। শবে বরাতের নামায সমবেতভাবে আদায় করা, জাকজমকের সাথে রাতটি পালন করা, রুটি তৈরি ও বিতরণ করা, কবরে আলো দেয়া সবই খেলাফে সুন্নাত কাজ।

(২) দোয়া-মুনাজাত বিষয়ক কিছু সুন্নাত ও খেলাফে সুন্নাত

দোয়ার ক্ষেত্রে সুন্নাত হলো সর্বদা সর্বাবস্থায় আল্লাহ্র কাছে নিজের জাগতিক ও পারলৌকিক ছোটবড় সকল বিষয় চাওয়া। বিপদে পড়ে দোওয়া না করে তাওয়াক্কুল করা কঠিন অন্যায় ও খেলাফে সুন্নাত। না চাইলে আল্লাহ্ অসন্তষ্ট হন। বিপদে ও অভাবে পড়লে মানুষের কাছে না জানিয়ে আল্লাহ্র কাছে জানানো সুন্নাত। দোয়ার সুন্নাতের মধ্যে রয়েছে:

১)      দোয়ার আগে কিছু নেক আমল করা, বিশেষত কিছু যিক্র, তাসবীহ, আল্লাহ্র প্রশংসা ও রাসূলুল্লাহ  -এর উপর সালাত পাঠ করা।

২)      গভীর মনোযোগের সাথে দোয়া করা। হৃদয় থেকে সকল অবলম্বন দূর করে শুধুমাত্র আল্লাহ্র দিকে তাকে  রুজু করা। অসহায় ও কাতর হৃদয়ের দোয়া আল্লাহ্ কবুল করেন।

৩)      দোয়া আল্লাহ্ কবুল করবেন এ দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে দোয়া করা। কখনোই একথা মনে না করা যে, আমি অনেক দোয়া করেছি, বোধহয় কবুল হলো না, বা বোধহয় কবুল হবে না। এরূপ চিন্তা করা গোনাহের কাজ এবং এতে দোয়া কবুলের পথ বন্ধ হয়ে যায়।

৪)      ছোট বড় সকল বিষয়ে আল্লাহ্র কাছে প্রার্থনা করা।

৫)      দোয়া কবুলের সময়ের ও স্থানের দিকে লক্ষ্য রাখা। হাদীসের আলোকে শেষ রাতে, ফরয নামাযের পরে, কুরআন খতমের সময়, বৃষ্টির সময়, জিহাদের ময়দানে কাতারবদ্ধ হওয়ার সময় ও সফরের সময় দোয়া কবুল হয়। অনুরূপভাবে কাবাঘরের পাশে, সাফা মারওয়ার উপরে ও আরাফার মাঠের দোয়া কবুল করেন।

 

দোয়ার জন্য হাত উঠানো

সাধারণভাবে দোয়া বা মুনাজাতের জন্য দু হাত তুলে আবেগের সাথে দোয়া করা ভাল। তবে রাসূলুল্লাহ  কোনো কোনো দোয়ার সময় হাত উঠাতেন ও কখনো উঠাতেন না।  তিনি বৃষ্টির জন্য দোয়ার সময়, আরাফাতের মাঠে দোয়ার সময়, যুদ্ধের ময়দানে আল্লাহ্র সাহায্য চাওয়ার সময় ও অন্যান্য কোনো কোনো বিশেষ আবেগের সময়ে দোয়ার জন্য তিনি হাত তুলতেন। এরূপ যে সকল সময়ে তিনি হাত উঠিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে সেখানে হাত উঠানো সুন্নাত বলে গণ্য হবে। অপরদিকে অধিকাংশ সময় হাত না-উঠিয়ে শুধু মুখে দোওয়া করতেন। যেখানে ও যে সময়ে তিনি হাত উঠাননি বলে জানা গিয়েছে সেখানে হাত না-উঠানো সুন্নাত। অধিকাংশ মাসনূন দোয়া এ প্রকারের। ইস্তিঞ্জার আগে ও পরে, কাপড় পরিধান বা খোলার সময়, ওযুর পরে, মসজিদে গমনের পথে, মসজিদে প্রবেশ ও বাহির হওয়ার সময়, আযানের পরে দোয়া পাঠের সময়, পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের  পরের দোয়া পাঠের সময়, নতুন চাঁদ দেখে, ইফতারের সময় ইত্যাদি অগণিত মাসনূন দোয়া মুনাজাত পালনের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ  ও সাহাবীগণ দুই হাত তুলে দোয়া-মুনাজাত করতেন না। তাঁরা স্বাভাবিক অবস্থায় হাত না উঠিয়ে মুখে উচ্চারণের মাধ্যমে মুনাজাত আদায় করতেন। এ সকল ক্ষেত্রে এভাবে দোয়া করাই সুন্নাত। বাকি সকল ক্ষেত্রে হাত উঠানো বা না-উঠানোর কোন সুন্নাত নির্ধারিত নেই। এ সকল সাধারণ ক্ষেত্রে  সাধারণ ফযীলতের হাদীসের আলোকে আমরা হাত উঠাতে পারি। কিন্তু এ সকল হাদীস দিয়ে বিশেষ পদ্ধতি বা রীতি তৈরি করতে পারি না। বিশেষত সাধারণ ফযীলতের হাদীস দিয়ে সুন্নাত বিরোধী রীতি তৈরি করার অর্থ “সুন্নাত” অপছন্দ করা।

দোয়ার জন্য সমবেত হওয়া

দোয়া বিষয়ক খেলাফে সুন্নাতের একটি হলো দোয়ার জন্য সমবেত হওয়া। শুধুমাত্র দোয়ার জন্য সমবেত হওয়া খেলাফে-সুন্নাত। তবে যিক্র, আলোচনা, তিলাওয়াত বা অন্য কোনো শরীয়ত সঙ্গত কারণে একত্রিত হলে সেখানে দোয়া করা যেতে পারে।

বানোয়াট দোয়ার ওযীফা

রাসূলুল্লাহ  থেকে বিভিন্ন দোয়া বর্ণিত হয়েছে। দোয়ার সময় এসকল শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করা উত্তম। যে কোনো ভাষায় ও যে কোনো শব্দে দোয়া করলেই দোয়ার ইবাদত পালন হবে। তবে রাসূলুল্লাহ  -এর ব্যবহৃত বা শেখানো শব্দ ব্যবহার করলে দোয়ার ইবাদত ছাড়াও তাঁর অনুসরণের ইবাদত পালন করা হবে। এছাড়া এতে কবুলিয়তের সম্ভাবনা বাড়ে ও মহব্বত বৃদ্ধি পায়। “গাইর মাসনূন” বা সুন্নাতের বাইরে কোনো আলেম বা বুজুর্গ লিখিত দোয়াকে সর্বদা পাঠ করা বা রীতি করে নেয়া খেলাফে-সুন্নাত।

এছাড়া আমাদের সমাজে অনেক মিথ্যা ও বানোয়াট দোয়া হাদীসের নামে প্রচলিত। এগুলোর মধ্যে অন্যতম: ‘হাফত হাইকাল’, ‘দোয়া গঞ্জল আরশ’, ‘দোয়া আহাদ নামা’, ‘দোয়া হাবীবী’, ‘হিযবুল বাহার’, ‘দোয়া কাদাহ’, ‘দোয়া জামীলা’, ‘রাসূলুল্লাহ  এর মুবারাক নামসমূূহের ওযীফা’, ‘দরুদে আকবার’, ‘দরুদে লাখী’, ‘দরুদে হাজারী’, ‘দরুদে তাজ’, ‘দরুদে তুনাজ্জিনা’, ‘দরুদে রুহী’, ‘দরুদে শেফা’, ‘দরুদে নারীয়া’, ‘দরুদে গাওসিয়া’, ‘দরুদে মুহাম্মাদী’ এধরণের অগণিত বানোয়াট বা মানব রচিত দোয়া বানোয়াট চটকদার ফলাফলের কাহিনী সহ বিভিন্ন “আমল”, “ওযীফা”, “যিক্র” বা “নামায শিক্ষা” গ্রন্থে প্রচারিত হচ্ছে। এগুলোর কিছু পুরোটাই বানোয়াট এবং কিছু মাসনূন দোয়ার সাথে খেলাফে সুন্নাত দোয়ার সংমিশ্রণ। সর্বাবস্থায় এগুলোর মধ্যে কোনো নবুয়তের নূর নেই। এছাড়া এ জাতীয় অনেক দোয়ার মধ্যে আপত্তিকর, আদবের খেলাফ বা শিরকমূলক শব্দও রয়েছে। সর্বোপরি রাসূলুল্লাহ -এর শেখানো বা পালিত শব্দ বাদ দিয়ে এগুলোর নিয়মিত আমল নিঃসন্দেহে সুন্নাতের প্রতি অবহেলা।

জীবিত কারো কাছে দোয়া চাওয়া

জীবিত কারো কাছে দোয়া চাওয়া সুন্নাত সম্মত। তবে তাকে  রীতিতে পরিণত করা ভাল নয়। অনেক সাধারণ মুসলিম সাধারণত নিজের জন্য নিজে আল্লাহ্র দরবারে দোয়া চাওয়ার চেয়ে অন্য কোনো বুজুর্গের কাছে দোয়া চাওয়াকেই বেশি উপকারী বলে মনে করি। পিতামাতা, উস্তাদ, আলেম নেককার কোনো জীবিত মানুষের কাছে দোয়া চাওয়া জায়েয, আমাদের বুঝতে হবে যে, নিজের দোয়া নিজে করাই সর্বোত্তম। আমরা অনেক সময় মনে করি, আমরা গোনাহগার, আমাদের দোয়া কি আল্লাহ্ শুনবেন? আসলে গোনাহগারের দোয়াই তো তিনি শুনেন। আমার মনের বেদনা, আকুতি আমি নিজে আমার প্রেমময় প্রভুর কাছে যেভাবে জানাতে পারব সেভাবে কি অন্য কেউ তা পারবেন। এছাড়া এ দোয়া আমার জন্য সাওয়াব বয়ে আনবে এবং আমাকে আল্লাহ্র প্রেম ও করুণার পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

আয়েশা (রা.) বলেন : আমি প্রশ্ন করলাম, “হে আল্লাহ্র রাসূল, সর্বোত্তম দোয়া কি?” তিনি উত্তরে বলেন : دعاء المرء لنفسه  “মানুষের নিজের জন্য নিজে দোয়া করা”

সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ  -এর কাছে দোয়া চাইতেন। তাবেয়ীগণও সাহাবীগণের কাছে মাঝেমধ্যে দোওয়া চাইলে তাঁরা দোয়া করতেন। অপরদিকে তাঁরা এ বিষয়ে বাড়াবাড়ি বা অতিভক্তি নিষেধ করতেন। অনেক সাহাবী কেউ দোয়া চাইলে বলতেন: আমি কি নবী নাকি যে, সবার জন্য দোয়া করতে হবে বা আল্লাহ্ আমরা দোয়া কবুল করবেনই। তুমি তোমার নিজের জন্য দোয়া কর।

অন্যের কাছে দোয়া চাওয়া পরিত্যাগ করলে কোনো গোনাহ হবে না। আল্লাহ্ দয়া করে নেককার মানুষের দোয়া কবুল করতে পারেন। কিন্তু যদি কেউ চিন্তা করে যে, অমুক ব্যক্তি দোয়া করলেই আল্লাহ্ কবুল করবেন বা অমুক ব্যক্তির দোয়াই বিপদ উদ্ধারের কারণ তাহলে সে অতিভক্তি বা শিরকের মধ্যে নিপতিত হয়ে যাবে। অথবা বুজর্গগণের কাছে দোয়া চাওয়ার জন্য যদি কেউ নিজের জন্য নিজে দোয়া করার মাসনূন রীতি পরিত্যাগ করে, কোনো বিপদ, পাপ বা সমস্যায় পতিত হলেই দৌড় নেককার মানুষদের কাছে চলে যায় তাহলে সে শুধু বিদ‘আতেই লিপ্ত হবে না, উপরন্তু অফুরন্ত সাওয়াব ও মহান প্রভুকে আবেগভরে ডাকার বা প্রার্থনা করার অশেষ নেয়ামত ও আত্মিক প্রশান্তি থেকে বঞ্চিত হবে।

দোয়া অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত। দোয়ায় রত ব্যক্তি নামায, রোযা বা যিকিরে রত ব্যক্তির মতোই যতক্ষণ দোয়ায় রত থাকবেন ততক্ষণ অগণিত ও অফুরন্ত সাওয়াব পেতে থাকবেন। সর্বোপরি দোয়া মহান প্রভুর সাথে বান্দার যোগাযোগ। যে কোনো দোয়া বান্দার হৃদয়ে এনে দেয় মহান প্রভুর রহমতের অপার্থিব ছোঁয়া ও অনাবিল আনন্দ। এসকল নেয়ামত থেকে বঞ্চিত হন সে ব্যক্তি যিনি নিজের দোয়া নিজে করার চেয়ে বেশি সময় ও আবেগ ব্যয় করেন অন্যের কাছে দোয়া চাওয়ায়। আজকাল অধিকাংশ মুসলিম এ ক্ষতির মধ্যে নিপতিত।

আমাদের সর্বদা নিজের জন্য নিজে প্রভুর দরবারে দোয়া করতে হবে। যত গোনাহগার হই-না কেন, আমি তাঁরই বান্দা। তিনিই আমার একমাত্র আশ্রয়স্থল। দোয়া কবুল হোক বা না-হোক, কবুলের আশা, আবেগ ও ইবাদতের উদ্দেশ্যে নিয়ে সর্বদা দোয়া করতে হবে। তার পাশাপাশি কোনো নেককার মানুষের কাছে দোয়া চাওয়া যেতে পারে।

কোন মৃত ব্যক্তির কাছে দোয়া চাওয়া

আমাদের দেশে অনেক মুসলিমের মধ্যে প্রচলিত একটি রীতি হলো কোনো মৃত বুজুর্গ, ওলী বা আলেমের কাছে দোয়া চাওয়া বা তাকে অনুরোধ করা যে, আপনি আমার জন্য আল্লাহ্ কাছে দোয়া করুন। এ কর্মটি সম্পূর্ণ সুন্নাত-বিরোধী ও জঘন্য বিদ‘আত। রাসূলুল্লাহ  কখনোই কোন মৃত নবী বা ওলীর কবরে যেয়ে তাঁর কাছে দোয়া চান নি। সাহাবীগণ কখনোই কোন নবী, ওলী বা বুজুর্গের কবরে যেয়ে তাঁদের কাছে দোয়া চান নি। এমনকি সকল ওলীর সরদার, আল্লাহ্র হাবীব, সাহাবীগণের চোখের মনি রাসূলুল্লাহ  -এর রওযা মুবারাকায় যেয়ে তাঁর কাছে দোয়া চাওয়ার রীতিও সাহাবীগণের মধ্যে ছিল না। পরিপূর্ণ ভক্তি ও মহব্বতের সাথে যিয়ারত ও সালামের রীতি ছিল তাঁদের মধ্যে। সাহাবীগণ বিভিন্ন সমস্যায় পড়েছেন, যুদ্ধবিগ্রহ করেছেন বা বিপদগ্রস্ত হয়েছেন। কখনোই খুলাফায়ে রাশেদীন বা সাহাবীগণ দলবেঁধে বা একাকী রাসূলুল্লাহর  রওযা মুবারাকে যেয়ে তাঁর কাছে দোয়া চাননি।

আবু বকর (রা) খিলাফত গ্রহণের পরেই কঠিনতম বিপদে নিপতিত হয় মুসলিম উম্মাহ। একদিকে বাইরের শত্র“, অপরদিকে মুসলিম সমাজের মধ্যে বিদ্রোহ, সর্বোপরি প্রায় আধা ডজন ভণ্ড নবী। মুসলিম উম্মাহর অস্তিত্বের সংকট। কিন্তু একটি দিনের জন্যও আবু বকর (রা) সাহাবীগণকে নিয়ে বা নিজে রাসূলুল্লাহ  -এর রওযায় যেয়ে তাঁর কাছে দোয়া চাননি। এমনকি আল্লাহ্র কাছে দোয়া করার জন্যও রওযা শরীফে সমবেত হয়ে কোনো অনুষ্ঠান করেননি। কী কঠিন বিপদ ও যুদ্ধের মধ্যে দিন কাটিয়েছেন আলী (রা) অথচ তাঁর সবচেয়ে আপনজন রাসূলুল্লাহ  -এর রওযায় যেয়ে তাঁর কাছে দোয়া চাননি।

অনুরূপভাবে পরবর্তীতে যুগগুলোতে তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীগণ কখনো পূর্ববতী কোনো মৃত নবী, ওলী, সাহাবী বা তাবেয়ীর কবরে যেয়ে তাঁর কাছে দোয়া চান নি। সিহাহ সিত্তা ও হাদীসের অন্যান্য গ্রন্থ খুঁজে দেখুন। এ জাতীয় কোনো ঘটনা পাবেন না।

আল্লাহ্র কাছে দোয়া চাওয়ার জন্য কারো মাজারে যাওয়া

অনেকে আল্লাহ্র কাছে কিছু চাওয়ার প্রয়োজন হলে কোনো কবরে চলে যান। ওলী আউলিয়াগণের কবরে, তাঁদের স্মৃতি বিজড়িত স্থানে, তাঁদের জন্ম, মৃত্যু বা অন্য কোনো স্মৃতি বিজড়িত সময়ে দোয়া করার জন্য তাঁরা বিশেষভাবে আগ্রহী। অনেক মুসলমানের বদ্ধমূল ধারণা, ওলী বুজুর্গগণের মাযারে যেয়ে আল্লাহ্র কাছে দোয়া করলে দোয়া তাড়াতাড়ি কবুল হয়। তাঁদের এ চিন্তা ও কর্ম খেলাফে সুন্নাত, জঘন্য বিদ‘আত ও শিরকের মধ্যে নিপতিত হওয়ার অন্যতম পথ। আল্লাহ্র কাছে নিজের হাজত প্রয়োজন চাওয়ার জন্য মাজারে যাওয়া সুন্নাত বিরোধী বিদ‘আত রীতি। বিভিন্ন হাদীসে দোয়া কবুলের সময় ও স্থানের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কখনো কোথাও বলা হয়নি যে, ওলী আল্লাহ্গণের কবরে দোয়া করলে আল্লাহ্ তাড়াতাড়ি কবুল করবেন। কখনো রাসূলুল্লাহ  বা তাঁর সাহাবীগণ কোনো মাজারে বা কবরে দোয়া করতে যাননি। সুন্নাতের শিক্ষার বাইরে কোনো স্থানে বা সময়ে দোয়া করাকে কবুলের মাধ্যম মনে করা, বা সুন্নাতের শিক্ষার বাইরে কোনো স্থানে বা সময়ে দোয়া করার রীতি গ্রহণ করা খেলাফে-সুন্নাত ও বিদ‘আত।

আল্লাহ্ ছাড়া কারো কাছে প্রার্থনা করা খেলাফে-সুন্নাত ও শিরক

অনেক নামধারী মুসলিম বিপদে আপদে আল্লাহ্কে না ডেকে বা আল্লাহ্র কাছে সাহায্য না চেয়ে বিভিন্ন ওলী-আওলিয়াকে ডাকতে থাকেন ও তাঁদের কাছে প্রার্থনা করেন। এগুলো খেলাফে সুন্নাত ও শিরক।  রাসূলুল্লাহ  ও তাঁর সাহাবীগণ, তাবেয়ীগণ, তাবে-তাবেয়ীগণ কখনো কোনো অবস্থায় আল্লাহ্ ছাড়া কোনো ফিরিশতা, নবী, ওলী, সাহাবী, তাবেয়ী বা অন্য কারো কাছে প্রার্থনা করেননি। কখনোই কোনো সাহাবী রাসূলুল্লাহ  -এর রওযায় যেয়ে বলেননি যে, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমার হায়াত বাড়িয়ে দিন, সন্তান দিন, বিপদ কাটিয়ে দিন, … ইত্যাদি। কখনো তাঁরা কোনো বিপদে, যুদ্ধে, কষ্টে, দুঃখে বলেননি যে, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমাকে বা আমাদেরকে বাঁচান’।

পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামাযের পরে রাসূলুল্লাহ  ও সাহাবীগণ কখনো জামাতবদ্ধ ভাবে বা সমবেত ভাবে মুনাজাত করেন নি। প্রত্যেকে সুযোগ ও মময় অনুসারে ব্যক্তিগতভাবে যিক্র ও মুনাজাতে রত থাকতেন। এছাড়া জানাযার নামাযের পরে মুনাজাতও খেলাফে সুন্নাত বিদ‘আত। গায়েবানা জানাযার রীতি খেলাফে সুন্নাত।

(৩) কুরআন তিলাওয়াত বিষয়ক কিছু সুন্নাত ও খেলাফে সুন্নাত

কুরআন তিলওয়াতের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ  ও সাহাবীগণের অন্যতম সুন্নাত হলো: নিয়মিত তিলাওয়াত করা। থেমে থেমে টেনে টেনে ভক্তি ও ভালবাসার সাথে তিলাওয়াত করা। বুঝে পড়া। ৩ দিনের কমে খতম না করা। ৭ দিনে বা একমাসে খতম করা। যথাসম্ভব বেশি পরিমাণ বা পূর্ণ কুরআন মুখস্থ করা। অর্থ অনুধাবন করা। কুরআনের নির্দেশ অনুসারে জীবন পরিচালনা করা। কুরআন তিলাওয়াত, হিফজ, অনুধাবন ও পালন শিক্ষা দান করা।

কুরআন তিলাওয়াতের খেলাফে-সুন্নাত

(১) কুরআনের প্রতি অবহেলা ও কুরআন তিলাওয়াত না করা। আমরা অনেক বই, পুস্তক বা সংবাদ পত্র পড়ি, কিন্তু আমাদের পাঠ্য তালিকায় আল্লাহ্র কেতাব নেই! কী অদ্ভুত মুসলমান আমরা ! সবচেযে আশ্চার্য বিষয় হলো অনেক ধার্মিক মুসলমানও কুরআন পাঠ করতে পারেন না, করেন না এবং এজন্য কোনো বেদনাও অনুভব করেন-না। কোনো খেলাফে সুন্নাত বিদ‘আতে পরিণত হওয়ার একটি কারণ হলো খেলাফে-সুন্নাতকে রীতি হিসাবে গ্রহণ করা বা খেলাফে-সুন্নাাতকে সুন্নাতের চেয়ে ভালো বলে মনে করা। এধরনের দুটি বিদ‘আত আমাদের মধ্যে রয়েছে : (১) কুরআন তিলাওয়াত বাদ দিয়ে শুধুমাত্র অন্যান্য যিক্রকে ওযীফা করে নেয়া ও (২) কুরআন কারীম  পরিত্যাগ করে শুধুমাত্র অন্যান্য কেতাবাদি থেকে ইসলামী শিক্ষা গ্রহণের চেষ্টা করা।

(২) আংশিক তিলাওয়াত। অর্থাৎ কুরআনের ২/৪টি সূরা নিয়মিত ওযীফা হিসাবে তিলাওয়াত করা, বাকি কুরআন তিলাওয়াত না-করা। কিছু সূুরা দিয়ে ওযীফা তৈরি করে সেগুলো সর্বদা পড়া এবং বাকি কুরআন না পড়া।

(৩) বুঝার চেষ্টা না করে শুধু তিলাওয়াতের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখা। অনেক ধার্মিক মুসলমান সারা জীবনই না-বুঝে পড়ার রীতি তৈরি করে নিয়েছেন। বিশেষত যেখানে মাতৃভাষায় বিভিন্ন তরজমা ও তাফসীর সহজপ্রাপ্য সেখানে এ অবহেলা কুরআন কারীমেরসাথে বেয়াদবী ও আল্লাহ্র কালামের প্রতি অবহেলা। এছাড়া এ অবহেলা ও সুন্নাত বর্জনকে রীতিতে পরিণত করে আমরা বিদ‘আতের মধ্যে নিপতিত হয়েছি।

অনেক মুসলমান এ বিদ‘আত রীতিকে কুরআন বুঝার মাসনূন ইবাদতের চেয়ে উত্তম ও নিরাপদ মনে করেন। অনেকে ভাবেন যে, কুরআনের তরজমা বা তফসীর করতে গিয়ে হয়ত আলেমের ভুল হতে পারে, কাজেই তরজমা ও তাফসীর পাঠের চেয়ে মানুষের লেখা অন্যান্য বই ও বইয়ের তরজমা পড়ে ইসলাম শেখা উত্তম।

কী অপূর্ব বিচার! কুরআনের ব্যাখ্যায় ভুল হতে পারে অথচ কুরআন, হাদীস ও ফিকহের আলোকে বই লিখলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা নেই! কুরআনের তরজমার ক্ষেত্রে সবই আল্লাহ্র বাণীর তরজমা, হয়ত বা দুই একটি স্থানে বুঝার ভুল হতে পারে। আর অন্যান্য ইসলামী বই পুস্তক যারা লিখেছেন তাঁরা ভুলেভরা মানুষ, অন্যান্য ভুলেভরা মানুষের কথার উদ্ধৃতি দিয়েছেন। উদ্ধৃতি বুঝতেও ভুল হতে পারে। অন্য একজন তার তরজমা করেছেন। তরজমাতেও ভুল হতে পারে। অগণিত ভুলের সম্ভাবনা। তা সত্ত্বেও মুসলমান কুরআনের তাফসীর ও তরজমা পাঠের চেয়ে মানুষের লেখা বইয়ের তরজমা পড়তে ভালবাসেন!

(৪) রাতারাতি খতম, সবীনা খতম কুরআনের সাথে বেআদবীমূলক একটি বিদ‘আত। একরাতে খতম করা খেলাফে সুন্নাত। এজন্য মাইক ব্যবহার অতিরিক্ত গোনাহ ও পাপের কাজ। কুরআন তিলাওয়াত ও শোনা ইবাদত। পরিপূর্ণ  মহব্বত, আন্তরিকতা, ভয় ও ভক্তিসহ তিলাওয়াতে যেমন সাওয়াব, শুনলেও তেমনি সাওয়াব। কেউ যদি এভাবে তিলাওয়াত করেন এবং তাঁর কাছে বসে অন্য কিছু মানুষ তা শুনেন তাহলে তা নিঃসন্দেহে সাওয়াবের কাজ। কিন্তু অমনোযোগিতার সাথে, খেলাধুলা, গল্পগুজবের মধ্যে তিলাওয়াত করা বা শোনা অত্যন্ত বেয়াদবী। বেশি উচ্চস্বরে তিলাওয়াতও বেয়াদবী। এছাড়া কুরআন তিলাওয়াত, যিক্র, দোয়া ইত্যাদি নফল ইবাদতের জন্য কাউকে বিরক্ত করা, কারো ঘুম, নামায বা অন্যান্য কাজ নষ্ট করা তাকে বারেই না-জায়েয। এতে ‘হক্কুল ইবাদ’ বা মানুষের অধিকার নষ্ট করার জন্য কঠিন হারাম ও কবীরা গোনাহ হবে।

কেউ যদি কুরআন খতম, শোনা ও শোনানোর ইবাদত পালন করতে চান তবে তার উচিত হবে যে, কোনো মুত্তাকী হাফেজকে ডেকে আদবের সাথে বসিয়ে তিলাওয়াতের ব্যবস্থা করা। সেখানে তিনি নিজে ও অন্যান্য আগ্রহী মানুষ বসবেন। যতক্ষণ হৃদয়ের আগ্রহ ও ভক্তি থাকবে ততক্ষণ তিলাওয়াত ও শ্রবণ অব্যাহত থাকবে। ক্লান্তি আসলে কিছুক্ষণ তা বন্ধ রেখে পরে আবার শুরু করতে হবে। এভাবে কমপক্ষে তিন দিনে কুরআন খতম করতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে যে, আনুষ্ঠানিকতা ইবাদত নয়, ভক্তি, ভালবাসা, আন্তরিকতাই  ইবাদত। পরিপূর্ণ ভক্তি ও ভালবাসা নিয়ে অল্প তিলাওয়াত ও শ্রবণ অন্তরহীন প্রাণহীন অগণিত খতমের চেয়ে অগণিতবার উত্তম।

(৪) যিক্র বিষয়ক কিছু সুন্নাত ও খেলাফে সুন্নাত

সর্বদা যিকিরে ঠোট নাড়াতে থাকা, বিশেষ করে সকালে, বিকালে সন্ধ্যায় রাতে যিক্র করা ইত্যাদি সুন্নাত বিষয়ে ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি। যিকিরের সুন্নাত হলো মনে মনে বা মৃদু শব্দে আদায় করা। সমবেতভাবে, সমস্বরে, জোরে জোরে, লাফালাফি করে, গজলের সাথে সুর করে, হু, হু করে ইত্যাদি পদ্ধতিতে যিক্র করা খেলাফে সুন্নাত। রাসূলুল্লাহ  এর নাম ধরে ডেকে যিক্র করা খেলাফে সুন্নাত। এতে শিরক হতে পারে। রাসূলুল্লাহ  ও তাঁর সাহাবীগণ কখনো “ইল্লাল্লাহ” জপ করে যিক্র করেন নি বা শুধু “আল্লাহ্, আল্লাহ্” জপ করে যিক্র করেননি। যিকিরের মাজলিসে বেশি বেশি আল্লাহ্র মহব্বত, ভয় ও তাওবা উদ্রেককারী আলোচনা ও প্রত্যেকে নিজেনিজে মৃদু স্বরে যিক্র- ইস্তিগফার করা সুন্নাত। সমবেতভাবে সমস্বরে যিক্র খেলাফে সুন্নাত।

(৫) দরুদ ও সালাম বিষয়ক কিছু সুন্নাত ও খেলাফে সুন্নাত

রাসূলুল্লাহ  -এর উপর দরুদ ও সালাম পাঠ করা  অত্যন্ত বড় নেক কর্ম। তার অগণিত ও অফুরন্ত সাওয়াব রয়েছে। দরুদ-সালাম পাঠের সুন্নাতের মধ্যে রয়েছে:

প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় এবং ঘুমানর আগে, আযানের পরে, যেকোনো অবস্থায় তাঁর নাম শুনলে, শুক্রবার দিনে বেশি বেশি, যে কোনো দোয়ার আগে পরে ও মাঝে, মসজিদে প্রবেশের ও বের হওয়ার সময় দরুদ পাঠ করা সুন্নাত। যেকোনো মাজলিসে, মাহফিলে, আসরে, যেখানেই দু’এক জন মুসলমান একত্রিত হবেন, তাদের প্রত্যেকেরই উচিত মাঝে মাঝে কিছু দরুদ পাঠ করা। অন্তত আলোচনা বা মাজলিস ভাঙ্গার আগেই ২/১ বার আল্লাহ্ যিক্র ও দরুদ পাঠ না করা দুর্ভাগ্যের লক্ষণ। এছাড়া সদা সর্বদা ও সর্ববস্থায় যত বেশি সম্ভব দরুদ ও সালাম পাঠ করা সুন্নাতের নির্দেশ। রাসূলুল্লাহ  -এর নাম লিখার সময় পরিপূর্ণভাবে দরুদ ও সালাম লিখতে হবে। অনেকে কৃপণতা করে শুধুমাত্র ‘(দ:)’ বা ‘(স:)’ লিখেন। এভাবে লিখা উচিত নয়।

দরুদ সালামের সুন্নাত-পদ্ধতিসমূহ

রাসূলুল্লাহ  ও তাঁর সাহাবীগণের সুন্নাত হলো সদা সর্বদা আল্লাহ্র যিক্র ও দরুদ সালাম আদায় করা। এমনকি নাপাক অবস্থায় বা গোসল ফরয থাক অবস্থায়ও তাঁরা আল্লাহ্র যিক্র, দোয়া ও দরুদ পাঠ করতেন। এক্ষেত্রে তাঁরা কোনো বিশেষ পদ্ধতি বা নিয়ম নির্ধারণ করেননি। বসে থাকলে বসে বসে, দাঁড়িয়ে থাকলে দাঁড়িয়ে, শুয়ে থাকলে শুয়ে তাঁর সালাত ও সালামের ইবাদত আদায় করেছেন। এক্ষেত্রে তাঁদের সুন্নাতের বিশেষ দিক হলো তাঁরা সর্বদা ব্যক্তিগতভাবে সালাত ও সালাম আদায় করতেন। সকল নফল ইবাদতের মতোই যিক্র, সালাত ও সালামের সুন্নাত-পদ্ধতি হলো জামাতে বা সমবেতভাবে তা আদায় না-করা। তাঁরা মাজলিসে বসা অবস্থায় সালাত ও সালাম পাঠ করতেন, তবে জামাতে অর্থাৎ সমস্বরে বা একত্রে নয়, বরং প্রত্যেকে নিজের মতো।

দরুদ- সালামের ক্ষেত্রে খেলাফে-সুন্নত বিষয়ের মধ্যে রয়েছে

দরুদ ও সালাম আদায়ে অবহেলা করা। সমস্বরে, বানানো শব্দে বা পদ্ধতিতে দরুদ ও সালাম আদায় করা। খেলাফে-সুন্নাত সময়ে দরুদ-সালাম পাঠের রীতি বানান। বিশেষত যে সকল বিষয়ে রাসূলুল্লাহ  ও তাঁর সাহাবীগণের নির্দিষ্ট সুন্নাত রয়েছে সেক্ষেত্রে, যেমন খাওয়ার আগে, পরে, আযানের আগে, নামাযের আগে, জায়নামাযে দাঁড়ানোর সময়ে, পশু জবাই করার সময়। ঈদের নামাযের পরে সমবেত দরুদ  সালাম পাঠ করাও খেলাফে সুন্নাত। রাসূলুল্লাহ   ও সাহাবীগণ কখনো দরুদ সালাম পাঠের জন্য “মীলাদ মাহফিল” নামে সমবেত হননি। তাঁরা যিকিরের মাহফিল, সুন্নাতের মাহফিল, হাদীসের মাহফিল ইত্যাদি নামে রাসূলুল্লাহ  এর জীবন ও সুন্নাত আলোচনা করতেন এবং তাঁর উপর প্রত্যেকে ব্যক্তিগতভাবে দরুদ ও সালাম পাঠ করতেন। সালাম পাঠের জন্য কখনোই তাঁরা উঠে দাঁড়াতেন না।

(৬) জানাযা, দাফন ও কবর বিষয়ক কিছু সুন্নাত ও খেলাফে সুন্নাত

মৃত্যুর পরে যথাশীঘ্র দাফন করা সুন্নাত। দাফনের পরে কবরের কাছে আযান, তিলাওয়াত ইত্যাদি খেলাফে সুন্নাত। কবরে ফুল দেয়া খেলাফে সুন্নাত ও ইহুদি নাসারাদের অনুসরণ। রাসূলুল্লাহ  ও সাহাবীগণের সুন্নাত হলো কবর কাঁচা রাখা বা মাটির রাখা। কবর বাঁধানো, পাকা করা, কবরের উপরে ঘর, গম্বুজ ইত্যাদি বানানো, কবরের উপরে গেলাফ দেয়া একদিকে খেলাফে সুন্নাত ও অপরদিকে নিষিদ্ধ হারাম। রাসূলুল্লাহ   এ সকল কাজ করতে বারংবার নিষেধ করেছেন এবং কোথাও কোনোভাবে অনুমতি দেন নি। কোথাও তিনি বা কোনো সাহাবী বলেননি যে, কোনো ওলী, বুজুর্গ বা কোনো মানুষের কবর বাঁধালে কোনো প্রকার সাওয়াব হবে বা তা’যীম হবে। কোনো সাহাবী কখনো কোনো ওলী-বুজুর্গের কবর বাঁধাননি, গেলাফ দেন নি বা গম্বুজ বানান নি। বরং সকলেই বারংবার নিষেধ করেছেন এবং কবর বাঁধালে বা উচু করলে ভেঙ্গে ফেলেছেন।

(৭) কুলখানী, যিয়ারত ইত্যাদি বিষয়ক কিছু সুন্নাত ও খেলাফে সুন্নাত

মৃত্যু পরবর্তী জীবনের সফলতা, মুক্তি, শান্তি ও নেয়ামত লাভের ইচ্ছা ও চেষ্টা সকল ধর্মের অনুসারিগণই করেন। এ জাতীয় সকল কর্ম একান্তই ধর্মীয় ও বিশ্বাসভিত্তিক। বিভিন্ন জাতির মধ্যে ধর্মহীনতা ও অজ্ঞানতার প্রসারের ফলে এ বিষয়ে অনেক কুসংস্কার ও উদ্ভট ধারণা বিরাজমান। যেমন, অনেক সমাজে মনে করা হয়, মৃতের জীবত আত্মীয়স্বজনের দান, খাদ্য প্রদান বা কিছু অনুষ্ঠান পালনের উপরে মৃতব্যক্তির পারলৌকিক মুক্তি নির্ভরশীল।

ইসলামে এ সকল কুসংস্কারের মূলোৎপাটন করা হয়েছে। ইসলামের  শিক্ষা অনুসারে মানুষের পারলৌকিক মুক্তি, শান্তি ও সফলতা নির্ভর করে তার নিজের কর্মের উপরে। সৎকর্মশীল মানুষের মৃত্যুর পরে বিশ্বের কোথাও কিছু না করা হলে, এমনকি তাঁর দেহের সৎকার করা না হলেও তাঁর কিছুই আসে যায় না। অপরদিকে জীবদ্দশায় যিনি শিরক, কুফর, ইসলাম বিরোধিতা, ইসলামের বিধিনিষেধের ও ইসলামী কর্ম ও আচরণের প্রতি অবজ্ঞা, জুলুম, অত্যাচার, অবৈধ উপার্জন, ফাঁকি, ধোঁকা ইত্যাদিতে লিপ্ত থেকেছেন তার জন্য তার মৃত্যুর পরে বিশ্বের সকল মানুষ একযোগে সকল প্রকার ‘শ্রাদ্ধ’, অনুষ্ঠান, ‘প্রার্থনা’ ইত্যাদি করলেও তার কোনো লাভ হবে না।

তবে যদি কোনো ব্যক্তি বিশুদ্ধ ঈমানসহ ইসলামের ছায়াতলে থেকে সৎকর্ম করে মৃত্যুবরণ করেন, তাহলে জীবিত ব্যক্তিগণ তাঁর জন্য প্রার্থনা করলে প্রার্থনার কারণে দয়াময় আল্লাহ্ তাঁর সাধারণ অপরাধ ক্ষমা করতে পারেন বা তাকে সাওয়াব ও করুনা দান করতে পারেন। এছাড়া এ ধরনের মানুষের কল্যাণের উদ্দেশ্যে কোনো জীবিত মানুষ দান বা জনকল্যাণমূলক কর্ম করলে সে কর্মের সাওয়াব করুনাময় আল্লাহ্ উক্ত মৃতব্যক্তিকে প্রদান করতে পারেন। এ ধরনের কর্মকে সাধারণত আরবিতে “ঈসালে সাওয়াব” ও ফারসিতে “সাওয়াব রেসানী” বলা হয় যার অর্থ: সাওয়াব পৌঁছানো। কুরআন কারীমে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। হাদীস শরীফে মৃত ব্যক্তির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা, দোয়া ও দান-সদকা করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তাঁদের উদ্দেশ্যে জীবিত ব্যক্তির এ সকল কর্মের সাওয়াব তাঁরা লাভ করবেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া মৃতের দায়িত্বে হজ্জপালন বাকি থাকলে তা তাঁর পক্ষ থেকে পালন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

মৃত ওলী, বুজুর্গ বা আপনজনের জন্য দোয়া, দান, সাওয়াব রেসানী বা ঈসালে সাওয়াবের ক্ষেত্রে সুন্নাত হলো ব্যক্তিগতভাবে সদাসর্বদা দোয়া করা এবং সুযোগ সুবিধা ও আগ্রহ অনুযায়ী ব্যক্তিগতভাবে তাঁদের জন্য দান-সাদকা ও হজ্ব ওমরা বা কুরবানি করা। বিশেষত তাঁদের সাওয়াবের উদ্দেশ্যে স্থায়ী জনকল্যাণ মূলক কাজ করা। যেমন, জমি ওয়াকফ করা, পানির ব্যবস্থা করা ইত্যাদি। সুযোগমত কোনো প্রকারের আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া তাঁদের কবর যিয়ারত করে তাঁদেরকে সালাম দেয়া ও তাঁদের জন্য দোওয়া করা।

সকল প্রকার আনুষ্ঠানিকতা, ৩ দিন, ৭ দিন, ৪০ দিন, মৃত্যুদিন, জন্মদিন বা অনির্ধারিত কোনো দিনে খানাপিনা, দোয়ার অনুষ্ঠান, কুরআন খতম, কালেমা খতম ইত্যাদি সকল আনুষ্ঠানিকতা খেলাফে সুন্নাত। রাসূলুল্লাহ  -এর ইন্তেকালের পরে প্রায় একশত বছরের মধ্যে খুলাফায়ে রাশেদীন ও সাহাবীগণ একটিবারও তাঁর কুলখানী, ইসালে সাওয়াব, ওরস ইত্যাদি উপলক্ষ্যে তাঁর ওফাত দিনে বা অন্য কোনো দিনে, কোনো রকম দিন নির্ধারণ করে বা না-করে, মদীনায় বা অন্য কোথাও কখনোই কোনো অনুষ্ঠান, সমাবেশ, মাহফিল, খানাপিনা কিছুই করেননি। পরবর্তী যুগের মুসলিমগণও এগুলো করেন নি। শেষ যুগে ফারসি, তুর্কি ও ভারতীয় ধর্ম ও রীতির প্রভাবে এগুলো মুসলিম সমাজে প্রবেশ করেছে।

(৮) কবর যিয়ারত বিষয়ক কিছু সুন্নাত ও খেলাফে সুন্নাত

কবর যিয়ারত একটি সুন্নাত ইবাদত। তার সুন্নাত পদ্ধতি হলো মৃত্যুর কথা স্মরণ ও মৃতের জন্য দোয়া করার উদ্দেশ্যে কবর যিয়ারত করা। কবরের কাছে যেয়ে মৃতকে সালাম দেয়া ও সংক্ষেপে তাঁর জন্য দোয়া করা। আর এক্ষেত্রে খেলাফে সুন্নাত হলো মাজার বা কবরের বরকত লাভের জন্য, মাজারে যেয়ে আল্লাহ্কে ডাকার জন্য বা দোয়া করার জন্য যিয়ারতে যাওয়া। কবর যিয়ারতের সময় কবরের কাছে কোনো প্রকার দান, সাদকা, খানাপিনা, ঈসালে সাওয়াব, সাওয়াব রেসানী, ওরস ইত্যাদি সবই খেলাফে সুন্নাত।

কখনো কোনো সাহাবী, তাবেয়ী বা তাবে-তাবেয়ী মৃত্যু দিবস, জন্মদিবস হিসাব করে যিয়ারত করতে যাননি। যিয়ারত উপলক্ষে কবরে কোনো অনুষ্ঠান, আয়োজন, মানত বিতরণ বা শিরণী বিতরণ করেননি। গরু, ছাগল, উট, হাঁস, মুরগী, ফল, ফসল, শিরণী, মিঠাই, ফুল, ফুলের তোড়া ইত্যাদি সাথে নিয়ে যিয়ারতে যাননি। যিয়ারতের সময় দোয়ার পূর্বে তাঁরা কোনো কুরআন খানী, নির্দিষ্ট সূরা পাঠ, দরুদ সালাম পাঠ, দোয়া কালেমা পাঠ ইত্যাদি কোনো কিছুই করেননি। একটি সহীহ সনদের ঘটনাও নেই যে, রাসূলুল্লাহ  -এর সাহাবীগণের তাঁর ইন্তেকালের পরে খিলাফতের রাশেদার ৩০ বছরে অথবা তার পরেও সাহাবীগণের প্রায় শতাব্দীকালের মধ্যে একবারও তাঁর রওযা মুবারক যিয়ারতের জন্য বা বাকী’ গোরস্থানে “ওলীকুল শিরোমনি” উম্মুল মু’মিনীন রাসূলুল্লাহ  -এর স্ত্রী, সন্তান ও বংশধরগণ বা সাহাবীগণের কবর যিয়ারতের জন্য এ সকল অনুষ্ঠান করেছেন বা এ সব কিছু নিয়ে যিয়ারত করতে গিয়েছেন, বা কোনো প্রকারে ওরস ইত্যাদি পালন করেছেন।

(৯) তাবাররুক ও তাযীম বিষয়ক কিছু সুন্নাত ও খেলাফে সুন্নাত

নেককার মানুষ বা ওলী-বুজুর্গগণকে ভালবাসা ও ভক্তি করা সুন্নাতের নির্দেশ। এক্ষেত্রে সুন্নাতী উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ্কে খুশি করা। যেহেতু তিনি আল্লাহ্র অনুগত বান্দা ও রাসূলুল্লাহ  এর সুন্নাতের অনুসারী, সেহেতু আমি তাকে ভালবাসি ও ভক্তি করি, যেন আল্লাহ্ খুশি হন। এ ব্যক্তির কাছে আমার কোনো চাওয়া- পাওয়া নেই। কোনো ক্ষমতার তাঁর নেই। তবে আমি জানি যে, আল্লাহ্র গোলামী ও রাসূলুল্লাহ -এর অনুসরণে লিপ্ত মানুষকে ভালবাসলে আল্লাহ্ খুশি হন, তাই ভালবাসি। এজন্য যে পদ্ধতিতে এ সকল মানুষকে ভালবাসতে ও সম্মান করতে আল্লাহ্ ও তাঁর মহান রাসূল ()-কে নির্দেশ দিয়েছেন ঠিক সে পদ্ধতিতে তাঁদের ভালবেসে ও সম্মান করে আল্লাহ্র রহমত ও সন্তুষ্টি অর্জন করে ধন্য হতে চাই।

আর সুন্নাত বিরোধী শিরকী উদ্দেশ্য হলো উক্ত ব্যক্তিকে খুশি করা। একথা মনে করা যে, এ “ওলী” ব্যক্তি আমাদের কোনো অলৌকিক কল্যাণ বা অকল্যাণের মালিক। তাকে সম্মান ও ভক্তি করলে তাঁর অলৌকিক প্রভাবে আমার বিপদ কেটে যাবে বা রোগ সেরে যাবে। আমি নেককর্ম করি বা না-করি তাকে ভক্তি করলে তিনি আমাকে পরকালে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করে জান্নাতে নিয়ে যাবেন। কাজেই যেভাবে পারি, হাতে ধরে, পায়ে ধরে, সুন্নাত অনুসারে বা সুন্নাতের বাইরে, যেভাবে পারি তাকে  খুশি করতে পারলেই আমার উদ্দেশ্য হাসিল হবে। যদি কেউ এ ধরনের কোনো চিন্তা নিয়ে “ওলী”-কে সম্মান করেন তাহলে তিনি একজন মুশরিক। তিনি ভক্তির নামে একজন মানুষকে আল্লাহ্র সাথে তাঁর ক্ষমতা ও গুণাবলীতে শরীক বানিয়েছেন।

অপরদিকে ওলীর তা’যীমের ক্ষেত্রে সাহাবী-তাবেয়ীগণের সুন্নাত পদ্ধতি হলো, তাঁরা জীবিত বুজুর্গদের সাহচর্য পছন্দ করেছেন, তাঁদেরকে ভালবেসেছেন, তাঁদের কাছে থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। মৃত্যুর পরে তাঁদেরকে দাফন করেছেন। সাধারণত এলাকার গোরস্থানে অন্য সকল মুসলমানদের সাথে তাঁরা তাঁদের দাফন করতেন। সুযোগমতো তাঁদের কবর যিয়ারত করেছেন ও তাঁদের জন্য দোয়া করেছেন।

বুজুর্গগণের সাহচর্য লাভের জন্য পীরের কাছে যায় মুসলমান। পীরের কাছে যাওয়ার সুন্নাত সম্মত উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ্র পথে চলার জ্ঞানার্জন ও পালনের প্রেরণা লাভ। আর খেলাফে সুন্নাত উদ্দেশ্য হলো জাগতিক প্রয়োজনে, হাজত পূরণের জন্য, নিজে আমল না করে পীরের আমলের উপর নির্ভর করে আখেরাতে মুক্তি পাওয়ার জন্য বা অনুরূপ কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে পীরের কাছে যাওয়া।

বরকত মনে করে পীরবজুর্গের স্মৃতিবিজড়িত স্থানে, বাড়িতে বা কবরে খালিপায়ে যাওয়া, এসকল স্থানোর মাটি, ধুলা, পানি ইত্যাদি সংরক্ষণ করা, বরকত মনে করা, এসকল স্থানের মাছ, কুমির, গরুছাগল, গাছপালা ইত্যাদিকে বরকতময় মনে করা, এগুলোর গায়ের ময়লা সংগ্রহ করা ইত্যাদি সবই খেলাফে সুন্নাত ও শিরকমূলক কর্ম। রাসূলুল্লাহ , সাহাবী, তাবেয়ী ও প্রথম যুগের মুসলিমগণ কখনই এসকল কর্ম করেন নি। তাঁরা সর্বদা বুজুর্গগণের অনুসরণের মাধ্যমে বরকত লাভের চেষ্টা করতেন।

জীবিত ও মৃত ওলী ও বুজুর্গের সম্মানের একটি বিশেষ দিক হলো তাঁদের জন্য উপাধি ব্যবহার করা। এক্ষেত্রে সুন্নাত হলো কোনো প্রকার উপাধি ব্যবহার না করা। সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ  -কে তাঁর জীবদ্দশায় ডাকতে সর্বদা (ইয়া রাসূলাল্লাহ) ও (ইয়া নাবিয়্যাল্লাহ) বলেই তাকে সম্বোধন করতেন। তাকে সম্বোধন করে তাঁদের হৃদয় নিংড়ানো ভক্তি ও ভালবাসা জানাতে তাঁরা অনেক সময় বলতেন : فداك أبي وأمي  “আপনার জন্য আমার পিতামাতা কুরবানি হউন”। (ইয়া হাবীবাল্লাহ), (ইয়া খলীলাল্লাহ) ইত্যাদি বলার প্রচলন তাঁদের মধ্যে ছিল না, যদিও রাসূলুল্লাহ  বিভিন্ন হাদীসে জানিয়েছেন যে, তিনি আল্লাহ্র হাবীব ও খলীল। তাকে সম্বোধনের সময় ‘সাইয়্যেদানা’, ‘মাওলানা’ ইত্যাদি ভক্তি বা মর্যাদা-জ্ঞাপক উপাধি তাঁরা ব্যবহার করতেন না। যদিও কাউকে ‘সাইয়্যেদুনা’, ‘মাওলানা’ ইত্যাদি বলার রেওয়াজ তাঁদের মধ্যে প্রচলিত ছিল এবং এগুলোর ব্যবহার না-জায়েয নয়। রাসূলুল্লাহ  নিজেই বলেছেন যে, তিনিই মানবকুলের নেতা বা সাইয়্যেদ। সাহাবীগণ শাহাদতের জন্য বা তাঁর উপর সালাত সালাম প্রেরণ করতে তাঁর নাম নিতেন। যেমন- হে আল্লাহ্, মুহাম্মাদের উপর সালাত পাঠান, আল্লাহ্ তাঁর রাসূল মুহাম্মাদের উপর সালাত প্রেরণ করুন। আল্লাহ্ তাঁর নবী মুহাম্মাদের উপর সালাত প্রেরণ করুন। সালাত প্রেরণের ক্ষেত্রে তাঁর নামের আগে (সাইয়্যেদানা), (হাবীবানা), (মাওলানা), (শাফিয়ানা) ইত্যাদি উপাধি ব্যাবহরের নিয়ম প্রচলিত ছিল না।

অন্য কারো কাছে রাসূলুল্লাহ  এর উল্লেখ করতে হলে সাহাবীগণ সাধারণত তাঁর উপাধি (রাসূলুল্লাহ) ও (নাবিয়্যুল্লাহ) বলে তাঁর উল্লেখ করতেন। যেমন বলতেন : রাসূলুল্লাহ  বলেছেন, নবী  বলেছেন, নবীয়্যুল্লাহ  বলেছেন বা করেছেন ইত্যাদি। কখনো কখনো তাঁরা অন্যের কাছে তাঁর উল্লেখ করতে তাঁর নাম উল্লেখ করতেন।

এ ছিল রাসূলুল্লাহ  -এর ক্ষেত্রে তাঁদের রীতি। আর অন্য সকল বুজুর্গ সাহাবীগণের ক্ষেত্রে সাহাবীগণের রীতি ছিল সম্বোধনের সময় কুনিয়াত ধরে ডাকা। অর্থাৎ, (অমুকের পিতা) বলে ডাকতেন। আর তাঁদের উল্লেখ করার সময় নাম ধরে উল্লেখ করতেন।

রাসূলুল্লাহ  বা অন্য কোন সাহাবী বা বুজুর্গকে ডাকার জন্য বা তাঁর নাম বলার জন্য নামের পূর্বে বা পরে হযরত, হুজুর, কেবলা, বাবা, বাবাজান, আব্বাজান, খাজা ইত্যাদি কোনো সম্মানসূচক শব্দ তাঁরা ব্যবহার করতেন না। আর আমাদের দেশের প্রচলিত অগণিত আল্লাহ্র নৈকট্য জ্ঞাপক উপাধি তাঁরা কখনো ব্যবহার করেননি। গাওস, কুতুব ইত্যাদি শব্দের তো কোনো অস্তিত্বই ছিল না। মুহিউস সুন্নাহ, কামেউল বিদ‘আত, ইমামুল আইম্মাহ, মুজাদ্দিদে যামান, গওস, গাওসে আ’জম, গাওসে সাকালাইন, ওলীয়ে কামেল, হাদীয়ে জামান, কুতুব, কুতুবে রাব্বানী, কুতুবে দাওরান, কুতুবে এরশাদ, খাজা, আশেকে রাসূল, ওলীকুল শিরোমনি, সূফী সম্রাট, মাহবুবে ইলাহী, মাহবুবে সোবহানী, কেবলা, কাবা ইত্যাদি ইত্যাদি অগণিত উপাধির কোনোকিছুই তাঁরা কখনোই ব্যবহার করেননি। কারো জীবদ্দশায় তো নয়ই, এমনকি কারো মৃত্যুর পরেও তাঁর নামের সাথে কোনো উপাধি তাঁরা ব্যবহার করতেন না। তাঁরা নামের পরে (রাহিমাহুল্লাহ) ইত্যাদি দোয়া বলতেন।

কে আল্লাহ্র সত্যিকার ওলী, মুত্তাকী বা কার ইবাদত আল্লাহ্ কবুল করেছেন তা আল্লাহ্ ছাড়া কেউ জানেন না। এজন্য কাউকে ওলী, ওলীয়ে কামেল, ওলীয়ে বরহক ইত্যাদি উপাধি ব্যবহার কুরআন ও হাদীসের নির্দেশ অনুসারে নিষিদ্ধ। এছাড়া খাজায়ে খাজেগান, সূফীকুল সম্রাট, ওলীকুল শিরোমনি, সকল ওলীর শ্রেষ্ঠওলী, শাহেনশাহে তরীকত ইত্যাদি উপাধি শুধু নিষিদ্ধই নয় উপরন্তু অত্যন্ত বেয়াদবীমূলক। এসকল উপাধি শুধুমাত্র মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ্-এর জন্য। যদি নবীগণকে বাদ দিয়ে অন্য মুমিনগণকেও বুঝানো হয়, তাহলেও এ উপাধিগুলো শুধুমাত্র সাহাবীগণের প্রাপ্য।

বেলায়াত, ওয়াসীলাহ ও ইহসানের কিছু কর্ম

যেহেতু ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা, সেহেতু তাকে আংশিকভাবে, কাটছাঁট করে বা সংক্ষিপ্ত করে পালন করা যায় না। আল্লাহ্র পথে চলার অর্জনের উপরের আটটি পর্যায়ের কর্মগুলোকে কাটছাঁট করে কম করারও কোন উপায় নেই। ঈমানের বিশুদ্ধতা, হালাল উপার্জন, হারাম বর্জন ও ফরয পালনের ক্ষেত্রে কোন ঘাটতি, অবহেলা বা অবজ্ঞাকে অনুমোদন করার কোনরকম সুযোগ নেই। অনিচ্ছাকৃত ভুলভ্রান্তি ও মানবীয় দুর্বলতা জনিত অপরাধের জন্য তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে, তবে সেগুলোকে মুমিন হালকাভাবে দেখতে পারেন না বা অনুমোদন করতে পারেন না।

ফরয পালনের পরে “নফল” কর্মের পর্যায়। এ পর্যায়ের কর্মের ক্ষেত্রে বাছবিচার ও অগ্রাধিকার প্রদানের সুযোগ রয়েছে। কুরআন-হাদীসের আলোকে আমরা দেখতে পাই যে, কিছু কিছু “নফল” ইবাদত সহজ সাধ্য কিন্তু তার মর্যাদা ও সাওয়াব খুবই বেশী। ইতোপূর্বে আমরা দেখেছি যে, “ইত্তিবায়ে সুন্নাত” এমন একটি সহজ কিন্তু সর্বোচ্চ বেলায়াত অর্জনের পথ। আমরা এখানে এ জাতীয় আরো কিছু “নফল” ইবাদতের কথা উল্লেখ করছি। এগুলোর পরিপূর্ণ সাওয়াব ও বরকত লাভ করতেও প্রত্যেক ইবাদতের ক্ষেত্রে ইত্তিবায়ে সুন্নাতের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

১. নফল সালাত, সিয়াম, সাদাকাহ ও হজ্জ

ইতঃপূর্বে আমরা এগুলোর বিষয়ে আলোচনা করেছি।

২. যে কোনো মানুষ বা প্রাণীর উপকার করা

আল্লাহ্র রহমত, বরকত ও সাওয়াব অর্জনের সবচেয়ে সহজ ও সংক্ষিপ্ত পথ হলো আল্লাহ্র সৃষ্টির প্রতি, বিশেষত মানুষের প্রতি কল্যাণ ও উপকারের হাত বাড়িয়ে দেয়া। সকল জাগতিক প্রয়োজনে সাহায্য করা, সমাজের কিছু মানুষের মধ্যে পরস্পরে গোলমাল বা অশান্তি হলে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা, অসুস্থকে দেখতে যাওয়া, সেবা করা, বিপদে পড়লে উদ্ধার করা, মাযলূম হলে সাহায্য করা, মৃত্যুবরণ করলে কাফন-দাফনে শরীক হওয়া ইত্যাদি সকল প্রকার মানব সেবামূলক কাজের জন্য অকল্পনীয় সাওয়াব ও মর্যাদার কথা অগণিত হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।

বিভিন্ন হাদীসে বলা হয়েছে: যে ব্যক্তি দরিদ্রদেরকে সাহায্য করবে, অসুস্থদের দেখাশুনা করবে, মৃতব্যক্তির দাফনে শরীক হবে ও নফল রোযা পালন করবে সে ব্যক্তি জান্নাতী। যতক্ষণ একজন মানুষ অন্য কোনো মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত থাকবে ততক্ষণ আল্লাহ্ তার কল্যাণে রত থাকবেন। বিধবা ও এতিমদের সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তি এ সেবার মাধ্যমে সারারাত তাহাজ্জুদ, সারাদিন নফল রোযা ও আল্লাহ্র পথে জিহাদের সাওয়াব অর্জন করবে। অনাথ বা এতিমদের যিনি দেখাশুনা করেন তিনি রাসূলুল্লাহ -এর সাথে পাশাপাশি জান্নাতে স্থান পাবেন। আল্লাহ্র কাছে সবচেয়ে প্রিয় বান্দা যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে। আল্লাহ্র কাছে সবচেয়ে প্রিয় নেক আমল কোনো মুসলিমের হৃদয়ে আনন্দ প্রবেশ করান, তার বিপদ বা উৎকণ্ঠা দূর করা, তার ঋণ আদায় করা অথবা তার ক্ষুধা দূর করা। কোনো ভাইয়ের কাজে তার সাথে একটু হেঁটে যাওয়া মসজিদে এক মাস ইতেকাফ করার চেয়েও উত্তম। যে ব্যক্তি তার কোনো ভাইয়ের সাথে যেয়ে তার প্রয়োজন মিটিয়ে দেবে কেয়ামতের দিনে যেদিন সকলের পা পিছলে যাবে সেদিন আল্লাহ্ তার পা সুদৃঢ় রাখবেন। … এরূপ অগণিত হাদীস আমরা হাদীসের গ্রন্থে দেখতে পাই।

৩.  সবাইকে ভালবাসা এবং হৃদয়কে বিদ্বেষ মুক্ত করা

হৃদয়কে বিদ্বেষ, হিংসা, অন্যের অমঙ্গল কামনা ইত্যাদি কলুষিত কর্ম থেকে মুক্ত রাখা এএই একটি কর্ম যা মানুষকে অতিরিক্ত নফল ইবাদত ও যিক্র আযকার ছাড়াই জান্নাতের অধিকারী করে তোলে। আনাস (রা.) বলেন, “একদিন আমরা রাসূলুল্লাহ  এর কাছে বসে ছিলাম, এমতাবস্থায় তিনি বললেন : এখন তোমাদের এখানে একজন জান্নাতী মানুষ প্রবেশ করবেন। তখন একজন আনসারী মানুষ প্রবেশ করলেন, যাঁর দাড়ি থেকে ওযুর পানি পড়ছিল এবং তাঁর বাম হাতে তাঁর জুতাজুড়া ছিল। পরের দিনও রাসূলুল্লাহ  একই কথা বললেন এবং একই ব্যক্তি প্রবেশ করল। তৃতীয় দিনেও রাসূলুল্লাহ  প্রথম দিনের মতোই আবারো বললেন এবং আবারো একই ব্যক্তি প্রবেশ করল। তৃতীয় দিনে রাসূলুল্লাহ  মজলিস ভেঙ্গে চলে গেলে আব্দুল্লাহ ইবনু উমর উক্ত আনসারী ব্যক্তির পিছে পিছে যেয়ে বলেন, আমি আমার পিতার সাথে এ কষাকষি করেছি এবং তিন রাত বাড়িতে যাব না বলে কসম করেছি। সম্ভব হলে এ কয় রাত আপনার কাছে থাকতে দিবেন কি ? তিনি রাজি হন। (আব্দুল্লাহর ইচ্ছা হলো তিন রাত তাঁর কাছে থেকে তাঁর ব্যক্তিগত ইবাদত জেনে সে মতো আমল করা, যেন তিনিও জান্নাতী হতে পারেন)। তিনি তিন রাত তাঁর সাথে থাকেন, কিন্তু তাকে রাত্রে উঠে তাহাজ্জুদ আদায় করতে বা বিশেষ কোনো নফল ইবাদত পালন করতে দেখেন না। তবে তিন দিনের মধ্যে তাকে শুধুমাত্র ভালো কথা ছাড়া কারো বিরুদ্ধে কোনো খারাপ কথা বলতে শোনেননি। আব্দুল্লাহ বলেন, আমার কাছে তাঁর আমল খুবই নগণ্য মনে হতে লাগল। আমি বললাম : দেখুন, আমার সাথে আমার পিতার কোনো মনোমালিন্য হয়নি। তবে আমি পরপর তিনি দিন রাসূলুল্লাহ -কে বলতে শুনলাম এখন একজন জান্নাতী মানুষ আসবেন এবং তিনবারই আপনি আসলেন। এজন্য আমি আপনার আমল দেখে সে মতো আমল করার উদ্দেশ্যে আপনার কাছে তিন রাত্র কাটিয়েছি, কিন্তু আমি আপনাকে বিশেষ কোনো আমল করতে দেখলাম না! তাহলে কী কর্মের ফলে আপনাকে রাসূলুল্লাহ  জান্নাতী বললেন ? তিনি বললেন : তুমি যা দেখেছ তার বেশি কোনো আমল আমার নেই, তবে আমি আমার অন্তরের মধ্যে কোনো মুসলমানের জন্য কোনো অমঙ্গল ইচ্ছা রাখি না এবং আমি কোনো কিছুর জন্য কাউকে হিংসা করি না। তখন আব্দুল্লাহ বলেন : এ কর্মের জন্যই আপনি এ মর্যাদায় পৌঁছাতে পেরেছেন।”

অন্য হাদীসে হযরত আনাস (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ  আমাকে বলেন, “বেটা, যদি পার তবে এমনভাবে সকাল ও সন্ধ্যা করবে (জীবন কাটাবে) যে, তোমার হৃদয়ে কারো প্রতি কোনো বিদ্বেষ বা অমঙ্গল ইচ্ছা নেই। সম্ভব হলে এরূপ চলবে, কারণ এরূপ চলা আমার সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত। আর যে আমার সুন্নাতকে জীবিত করল, সে আমাকে ভালবাসল। আর যে আমাকে ভালবাসবে সে আমার সাথে জান্নাতে থাকবে।”

পাঠক হয়ত প্রশ্ন করতে পারেন যে, সংঘাতপূর্ণ জীবনে অনেক মানুষ আমাদেরকে কষ্ট দেন, হক্ব নষ্ট করেন, ক্ষতি করেন বা শত্র“তা করেন। অনেকে অকারণেও এগুলো করেন। এদের প্রতি বিদ্বেষ ও শত্র“তা থেকে হৃদয়কে কিভাবে বিরত রাখব? আসলে বিষয়টি কঠিন বলেই তো সাওয়াব বেশি। তবে চেষ্টা করলে তা কঠিন থাকে না। মানবীয় স্বভাবের কারণে আমাদের মনে বিশেষ মুহূর্তে ক্রোধ, কষ্ট বা বিরক্তি আসবেই। তবে এটা একটু শান্ত হলেই, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মনের মধ্য থেকে এ অনুভূতি দূর করার চেষ্টা করতে হবে। আল্লাহ্র কাছে নিজের জন্য ও যার কর্মে বা ব্যবহারে আমরা কষ্ট পেয়েছি তার জন্য ইস্তিগফার করতে হবে ও দোয়া করতে হবে।

প্রয়োজনে নিজের হক্ক রক্ষার জন্য চেষ্টা করতে হবে। তবে অধিকার আদায়ের চেষ্টা বা কর্ম আর মনের হিংসা ও শত্র“তা এক নয়। এক ব্যক্তি আমার অধিকার নষ্ট করেছেন, আমি তার কাছে থেকে আমার অধিকার আদায়ের চেষ্টা করছি। কিন্তু তার সাথে আমার কোনো শত্র“তা নেই। আমি আমার অধিকার ফেরৎ পাওয়া ছাড়া তার কোনো প্রকার অমঙ্গল কামনা করি না। বরং আমি সর্বদা তার জন্য দোয়া করি। এভাবে হৃদয়কে অভ্যস্ত করলে ইন্শা আল্লাহ্ আমরা উপরিউক্ত সাহাবীর মতো হতে পারব এবং রাসূলুল্লাহ -এর সুন্নাত জীবিত করার সাওয়াব অর্জন করতে পারব।

অন্যায়ের ঘৃণা বনাম হিংসা ও অহংকার

আরেকটি বিষয় আমাদেরকে গমস্যায় ফেলে দেয়। আমরা জানি যে, শিরক, কুফর, বিদ‘আত, হারাম, পাপ ইত্যাদিকে ঘৃণা করা ও যারা এগুলোতে লিপ্ত বা এগুলোর প্রচার প্রসারে লিপ্ত তাদেরকে ঘৃণা করা আমাদের জন্য অতি প্রয়োজনীয় ঈমানী দায়িত্ব। আমরা এ দায়িত্ব ও হৃদয়কে মুক্ত রাখার মধ্যে কিভাবে সমন্বয় সাধন করব?

এ বিষয়টিকে শয়তান অন্যতম ফাঁদ হিসাবে ব্যবহার করে, যা দিয়ে সে অগণিত ধার্মিক মুসলিমকে  হিংসা, হানাহানি, আত্মতৃপ্তি ও অহংকারের মত জঘন্যতম কবীরা গোনাহের মধ্যে নিপতিত করছে। এ ফাঁদ থেকে আত্মরক্ষার জন্য সংক্ষেপে নি¤েœর বিষয়গুলো স্মরণ রাখতে হবে।

প্রথম, পাপ অন্যায়, জুলুম অত্যাচার, শিরক, কুফর, বিদ‘আত বা নিফাককে অপছন্দ বা ঘৃণা করতে হবে বা অপছন্দ করতে হবে রাসূলুল্লাহ -এর অনুসরণে ও তাঁর প্রদত্ত গুরুত্ব অনুসারে। তিনি যে পাপকে যতটুকু ঘৃণা করেছেন, নিন্দা করেছেন বা যতটুকু গুরুত্ব দিয়েছেন ততটুকু গুরুত্ব দিতে হবে। তাঁর পদ্ধতি বা সুন্নাতের বাইরে এগড়াভাবে ঘৃণা করলে তা হবে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় ইসলামের  নামে নিজের ব্যক্তি আক্রোশ বা অহংকারকে প্রতিষ্ঠা করা ও শয়তানের আনুগত্য করা।

এ ক্ষেত্রে বর্তমানে অধিকাংশ ধার্মিক মানুষ কঠিন ভুলের মধ্যে নিপতিত হন। কুরআন ও সুন্নাহে বর্ণিত কঠিন পাপগুলোকে আমরা ঘৃণা করি না বা বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করি না, কিন্তু যেগুলো কোন পাপ নয় বা কম ভয়ঙ্কর পাপ সেগুলো নিয়ে প্রচণ্ড হানাহানি ও হিংসা বিদ্বেষে নিপতিত হই। ইতিপূর্বে আমি ইসলামের কর্মগুলোর পর্যায় আলোচনা করেছি এবং এগুলোকে আটটি পর্যায়ে ভাগ করেছি। একুট চিন্তা করলেই দেখতে পাবেন যে, আমাদের সমাজের ধার্মিক মুসলিমদের দলাদলি, হানাহানি, গীবতনিন্দা ও অহঙ্কারের ভিত্তি হলো শেষ দুইতিনটি পর্যায়ের সুন্নাত-নফল ইবাদত। আমরা কুফর, শিরক, হারাম উপার্জন, মানুষের ক্ষতি, সৃষ্টির অধিকার নষ্ট, ফরয ইবাদত ত্যাগ ইত্যািদ বিষয়ে তেমন কোন আলোচনা, আপত্তি, বিরোধিতা বা ঘৃণা করি না। অথচ সুন্নাত নফল নিয়ে কি ভয়ঙ্কর হিংসা ঘৃণার সয়লাব।

ফরয সালাত যে মোটে পড়ে না, তার বিষয়ে আমরা বেশি চিন্তা করি না, কিন্তু যে সুন্নাত সালাত আদায় করল না, বা সালাতের মধ্যে টুপি বা পাগড়ী পরল না, অথবা সালাতের শেষে মুনাজাত করল বা করল না, অথবা সালাতের মধ্যে হাত উঠালো বা উঠালো না ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আমরা হানাহানি ও অহঙ্কারে লিপ্ত রয়েছি। এ জাতীয় কয়েকটি উদাহারণ আমি “রাহে বেলায়াত” গ্রন্থের ভূমিকায় উল্লেখ করেছি। সেগুলো ও আমাদের জীবনের অন্যান্য বিষয় থেকে পাঠক সহজেই বুঝবেন যে, এ বিষয়ে আমরা শয়তানের ফাঁদে আষ্টেপৃষ্টে আটকা পড়েছি।

দ্বিতীয়, এ ঘৃণা একান্তই আদর্শিক ও ঈমানী। ব্যক্তিগত জেদাজেদি, আক্রোশ বা শত্র“তার পর্যায়ে যাবে না। আমি পাপটিকে  ঘৃণা করি। পাপে লিপ্ত মানুষটিকে আমি খারাপে লিপ্ত বলে জানি। তিনি যখন তা পরিত্যাগ করবেন তখন তিনি আমার প্রিয়জন হবেন। আমি তার জন্য দোয়া করি যে, আল্লাহ্ তাকে পাপ পরিত্যাগের তাওফীক দিন।

তৃতীয়, ঘৃণা ও বিরোধিতার অর্থ হিংসা নয়। ভালবাসার সাথে এ ঘৃণা একত্রিত থাকে। মা তার মলমূত্র জড়ানো শিশুকে দেখে নাক শিটকায়। ভাই তার অপরাধে লিপ্ত ভাইকে ঘৃণা করে। কিন্তু এ ঘৃণার সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে থাকে ভালবাসা। মূলত ব্যক্তি শিশু বা ব্যক্তি ভাইকে ঘিরে থাকে তার সীমাহীন ভালবাসা, আর তার গায়ে জড়ানো ময়লা বা অপরাধকে ঘিরে থাকে ঘৃণা। সাথে থাকে তাকে ঘৃণিত বিষয় থেকে মুক্ত করার আকুতি।

চতুর্থ, ঘৃণা ও অহংকার এক নয়। আমি পাপকে ঘৃণা করি। পাপীকে অন্যায়কারী মনে করি। পাপের প্রসারে লিপ্ত ব্যক্তিকে ঘৃণা করি। কিন্তু এগুলোর অর্থ এইটা নয় যে, আমি আমার নিজেকে ব্যক্তিগতভাবে অমুক পাপীর চেয়ে উন্নত, মুত্তাকী বা ভাল মনে করি। নিজেকে কারো চেয়ে ভাল মনে করা তো দূরের কথা নিজের কাজে তৃপ্ত হওয়াও কঠিন কবীরা গোনাহ ও ধ্বংসের কারণ। আমি জানি না যে, আমার ইবাদত আল্লাহ্র দরবারে কবুল হচ্ছে কিনা, আমি জানি না আমার পরিণতি কী আর উক্ত পাপীর পরিণতি কী, কিভাবে আমি নিজেকে অন্যের চেয়ে ভাল মনে করব?

পঞ্চম, সবচেয়ে বড় কথা হলো, মুমিনকে  নিজের গোনাহের চিন্তায় ও আল্লাহ্র যিকিরে ব্যস্ত থাকতে হবে। অন্যের কথা চিন্তা করা থেকে যথা সম্ভব বিরত থাকতে হবে।  আমরা অধিকাংশ সময় অন্যের শিরক, কুফর, বিদ‘আত, পাপ, অন্যায় ইত্যাদির চিন্তায় ব্যস্ত থাকি। মনে হয় আমাদের বেলায়াত, কামালাত, জান্নাত, নাজাত সবকিছু নিশ্চিত। এখন শুধু দুনিয়ার মানুষের সমালোচনা করাই আমার একমাত্র কাজ।

বাঁচতে হলে এগুলো পরিহার করতে হবে। প্রয়োজন ছাড়া পাপ বা পাপীর চিন্তায় নিজের হৃদয়কে ব্যস্ত রাখা খুবই অন্যায়। এ চিন্তা আমাদের কঠিন ও আখেরাত বিধ্বংসী পাপের মধ্যে ফেলে দেয়। তা হলো আত্মতৃপ্তি ও অহঙ্কার। যখনই আমি পাপীর চিন্তা করি তখনই আমার মনে তৃপ্তি চলে আসে, আমি তো তার চেয়ে ভাল আছি। তখন নিজের পাপ ছোট মনে হয় ও নিজের কর্মে তৃপ্তি লাগে। আর এ হলো ধ্বংসের অন্যতম পথ।

এজন্য সাধ্যমত সর্বদা নিজের সাংসারিক বা জাগতিক প্রয়োজন বা আল্লাহ্র যিক্র ও নিজের পাপের চিন্তায় নিজেকে রত রাখুন। হৃদয় পবিত্র থাকবে এবং আপনি লাভবান হবেন। আল্লাহ্ আমাদের তাওফীক প্রদান করুন।

৪. জাগতিক জীবনের অস্থায়িত্ব স্মরণ

মানব জীবনে জাগতিক, সাংসারিক কর্মকাণ্ড, ব্যস্ততা ও চিন্তাভাবনা থাকবেই। আল্লাহ্ মানুষকে এসকল কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার জন্যই সৃষ্টি করেছেন। তবে এ ব্যস্ততা ও কর্ম নিজের, পরিবারের ও সমাজের সকলের পৃথিবীতে সুন্দররূপে বাঁচার ও পারলৌকিক জীবনে মুক্তি ও আল্লাহ্র সানিধ্যে অফুরন্ত নেয়ামত লাভের জন্য। কর্মের মাধ্যমে আল্লাহ্র অফুরন্ত নেয়ামত ও বরকত অর্জন করে নিজে বাঁচতে হবে এবং অন্যকে বাঁচতে সাহায্য করতে হবে। কিন্তু শয়তানী প্ররোচনা ও মানবীয় দুর্বলতার কারণে আমরা সৃষ্টি ও কর্মের উদ্দেশ্যের তাকে বারে বিপরীতে অবস্থান গ্রহণ করি। আমরা স্বার্থপর হয়ে যাই এবং নিজের অপ্রয়োজনীয় ও অবৈধ স্বার্থরক্ষার জন্য অন্যান্যদের অকল্যাণ, ক্ষতি বা ধ্বংস কামনা করি বা সে জন্য চেষ্টা করি। এভাবে আমরা মূলত নিজেদেরকেও ধ্বংস করি। লোভ, লালসা, হিংসা, হানাহানি আমাদের হৃদয় ও জীবনকে বিষাক্ত ও কলুষিত করে, আমাদেরকে স্রষ্টার প্রেম, করুণা ও বরকত থেকে বঞ্চিত করে, তাঁর শাস্তির মধ্যে নিপতিত করে এবং সর্বোপরি আমাদের পারলৌকিক জীবনের কঠিন ধ্বংস ও ক্ষতি নিশ্চিত করে।

এ ক্ষতিকর পরিণতি থেকে আত্মরক্ষার জন্য যুগে যুগে অনেক মানুষ সন্যাস, বৈরাগ্য বা সমাজ বিচ্ছিন্ন জীবন বেছে নিয়েছেন। এভাবে সৃষ্টির উদ্দেশ্য ব্যাহত করেছেন। ইসলামে বৈরাগ্য বা সমাজ বিচ্ছিন্ন জীবন নিষিদ্ধ। সমাজের মধ্যে বসবাস করে, সকল কর্মকাণ্ডে অংশ গ্রহণ করার সাথে সাথে নিজের হৃদয়কে মোহমুক্ত রাখায় ইসলামী বৈরাগ্য। আর এ অবস্থা অর্জনের অন্যতম মাধ্যম হলো প্রতিনিয়ত এ জাগতিক জীবনের অস্থায়িত্ব, মৃত্যু ও মৃত্যু পরবর্তী জীবনের কথা নিজেকে স্মরণ করানো। কুরআন ও হাদীসে এজন্য বারবার মৃত্যুর কথা স্মরণ করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ পৃথিবীতে নিজেকে প্রবাসী বা পথিক হিসাবে গণ্য করতে বলা হয়েছে। এ স্মরণ আমাদের জন্য অগণিত সাওয়াব অর্জনের পাশাপাশি আমাদের হৃদয়গুলোকে লোভ, হিংসা, প্রতিহিংসা ইত্যাদির কঠিন ভার থেকে মুক্ত করবে। আমাদের জীবনকে হানাহানি ও হিংস্রতা থেকে মুক্ত করবে।

দিনের বিভিন্ন অবসরে ও বিশেষ করে সকালে, সন্ধ্যা বা রাতে নির্ধারিত সময়ে নিজেকে স্মরণ করান : যে মানুষের পরবর্তী নিশ্বাসের নিশ্চয়তা নেই সে কী জন্য হানাহানিতে লিপ্ত হবে? কিজন্য সে লোভ করবে। সেতো পথিক। চলার পথের প্রয়োজনীয় কাজগুলো সম্পন্ন করা ও পাথেয় সংগ্রহই তো তার কাজ। চলার পথে যদি কেউ কষ্ট দেয় তাকে সম্ভব হলে ক্ষমা করে দিই না কেন। কয়েক মুহূর্ত পরেই তো তাকে আর দেখব না। রাস্তায়, ফেরীতে, রেলস্টেশনে বা এয়ারপোর্টে বসার চেয়ার, ট্রলি, খাবারের প্লেট, সামান্য ধাক্কাধাক্কির জন্য কি আমরা সময় নষ্ট করে মারামারিতে লিপ্ত হই? এ জীবন তো এ সকল অস্থায়ী স্থানেরই একটু বি¯তৃত রূপ। চেষ্টা করি না কেন এ ক্ষণস্থায়ী জীবনকে ক্ষমা, ভালবাসা ও সেবায় ভরে দিতে। তাতে জীবন হবে আল্লাহ্র রহমতে ধন্য আর আমি অর্জন করব আখেরাতের অমূল্য পাথেয়।

পার্থিব স্বার্থপরতা বা লোভের জন্য প্রভুর নির্দেশনার বাইরে কাজ করছি? কি লাভ হবে তাতে? সে লাভ কি ভোগ করতে পারব? পারলে কতদিন। তারপর তো আমাকে প্রভুর কাছেই ফিরে যেতে হবে।

অমুকের খুশির জন্য, তমুকের কাছে বড় হওয়ার জন্য, আরেকজনের কাছে প্রিয় হওয়ার জন্য আমি এ কাজটি করতে চাচ্ছি। কি লাভ তাতে? সে আমাকে কী দেবে? যা দেবে তা থেকে কি আমি লাভবান হতে পারব? আমাকে তো আমার প্রভুর কাছে একাকীই চলে যেতে হবে। আমার তো বাস্তববাদী হওয়া উচিত। নিজের জাগতিক ও পরকালীন জীবনের জন্য যে কাজে আমার রব খুশি সেই কাজই তো আমার করা উচিত।

পাঠক, এভাবে আমাদের উচিত প্রতিদিন নিজেদের সকল কর্ম বিচার করা। ক্ষণস্থায়ী প্রবাসের জন্য ও চিরস্থায়ী আবাসের জন্য যা প্রয়োজনীয় সেগুলোই করা। এ চিন্তা আমাদেরকে উপরে বর্ণিত ক্ষমাময় ও হিংসাহীন হৃদয় অর্জনেও সাহায্য করবে। এ চিন্তাগুলো বেলায়াত ও ইহসানের পথে আমাদের মহামূল্য পাথেয়।

যিক্র ওযীফা

আল্লাহ্র পথে চলার সহজ অথচ অপরিমেয় সাওয়াব ও অতুলনীয় প্রভাবের কর্ম হলো আল্লাহ্র যিক্র বা স্মরণ।

যিকিরের অর্থ, প্রকার, ফযীলত, প্রভাব, নিয়ম ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে “রাহে বেলায়েত” গ্রন্থে। এখানে শুধু সংক্ষেপে প্রাথমিক পর্যায়ে পালনীয় যিক্র ওযীফাগুলো আলোচনা করছি।

সাধারণভাবে ইসলামের  পরিভাষায় যিক্র বলতে বুঝানো হয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক শেখানো বিভিন্ন বাক্য সদা সর্বদা বা বিভিন্ন সময়ে অনবরত বা নির্দিষ্ট সংখ্যায় জপ করার মাধ্যমে মহান আল্লাহ্র স্মরণ করা। যিকিরের মর্যাদায় অগণিত হাদীস বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ  বলেছেন : যিক্রকারীগণ সবার আগে জান্নাতের দিকে এগিয়ে যাবেন। সদা সর্বদা আল্লাহ্র যিকিরে জিহ্বাকে আর্দ্র রাখা এবং আল্লাহ্র যিকিরে জিহ্বা নাড়তে নাড়তে মৃত্যুবরণ করা আল্লাহ্র কাছে সবচেয়ে প্রিয় কর্ম। কেয়ামতের দিন আল্লাহ্ যে সকল মহান মানুষদেরকে আরশের ছায়ায় স্থান দিবেন তাঁদের অন্যতম হলেন ঐ সকল ব্যক্তি যারা নির্জনে আল্লাহ্র যিক্র করে চোখের পানিতে বুক ভাসান। যতক্ষণ বান্দা আল্লাহ্র যিক্র করবে ততক্ষণ আল্লাহ্ তার সঙ্গে থাকবেন। আযাব থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য যিকিরের চেয়ে উত্তম আমল আর কিছুই নেই। জান্নাতের অধিবাসীগণ দুনিয়ার কোনো কিছুর জন্য আফসোস করবেন না, শুধুমাত্র যে মুহূর্তগুলো আল্লাহ্র যিক্র ছাড়া অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে সেগুলোর জন্য তাঁরা আফসোস করবেন।” আল্লাহ্র যিক্র শয়তানের কবল থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায়। যিকিরের এ ধরনের অগণিত ফযীলতের কথা হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে।

 

যিকিরের প্রকারভেদ

আমাদের পালনের সুবিধার জন্য আমরা এখানে যিক্রকে দুইভাগে ভাগ করছি : প্রথম: সদা সর্বদা পালনের যিক্র। দ্বিতীয়: নির্দিষ্ট সময়ে পালনের যিক্র।

প্রথম ওযীফা: সদা সর্বদা পালনের জন্য

প্রথম পর্যায়ের ওযীফা হিসাবে নিুের ১১ টি যিক্র, মুনাজাত, দুরুদ ও ইসতিগফার সবগুলো একত্রে বা যখন যেটা সম্ভব হয় সদা সর্বদা পালন করবেন। যখন, যে অবস্থায়ই থাকুন না কেন, ওযু ছাড়া, গোসল ছাড়া, বসে, শুয়ে, দাঁড়িয়ে, হাঁটতে চলতে, বাজারে, অফিসে, মাঠে, কর্মের মধ্যে, চায়ের দোকানে, মাজলিসে সর্বত্র যখনই আপনার মুখ বা এ একটু অবসর পাবে তখনই এ যিক্রগুলো কিছু কিছু করে জপ করতে থাকুন।

আমাদের মুখ ও বিশেষ করে এ কখনই চুপ থাকে না। কোনো না কোনো কিছু নিয়ে এ ব্যস্ত থাকে। সাধারণত ব্যক্তিগত, সামাজিক, জাতীয় বা আন্তর্জাতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমরা অবসর সময়ে, কখনো কখানো ঘণ্টার পর ঘণ্টা অলস চিন্তা করে থাকি। আর একটু সুযোগ পেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এ সকল বিষয় নিয়ে গল্প, আলোচনা বা বিতর্ক করে সময় নষ্ট করি। আমরা ভাবি না যে, আমাদের এ অলস (টহঢ়ৎড়ফঁপঃরাব) চিন্তা বা অর্থহীন আলোচনা, বিতর্ক আমাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক বা জাতীয় জীবনে কোনো উপকারেই লাগছে না। বরং এগুলো আমাদের প্রভূত ক্ষতি করে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো অপ্রয়োজনী চিন্তা, ব্যথা, বিরক্তি, ক্রোধ, জিদ, হিংসা ইত্যাদি আমাদের তাকে ভারাক্রান্ত ও কলুষিত করে। সাথে সাথে আমরা আল্লাহ্র যিক্র করে অগণিত সাওয়াব ও বরকত অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হই।

একটু চেষ্টা করলেই আমরা এ ক্ষতি থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারি। মুখ বা মনের অবসর হলেই তাকে আল্লাহ্র যিকিরে রত করি। অনেক সময় বেখেয়ালে এ বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে অলস চিন্তায় মেতে উঠে। যখনই খেয়াল হবে তখনই সেগুলোকে এ থেকে বের করে আল্লাহ্র যিকিরে মুখ ও তাকে  বা শুধু তাকে  নিয়োজিত করুন। যেমন, আপনি সকালে সংবাদ শুনেছেন বা পড়েছেন Ñ অমুক স্থানে বোমাবর্ষণ হয়েছে বা অমুক ব্যক্তির মৃত্যু, শাস্তি, পদোন্নতি বা পুরস্কার দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আপনার চিন্তা বা আলোচনা উক্ত বিষয়ে কোনো পরিবর্তন আনবে না। তবুও ভাবতে ভালো লাগে। আপনি অফিসে, দোকানে, গাড়িতে, বাড়িতে বা পথে-ঘাটে নিজের অজান্তে সে বিষয়টির বিভিন্ন দিক নিয়ে ভাবতে থাকবেন। এক ভাবনা থেকে অন্য ভাবনায় সাঁতার কাটতে থাকবেন। অর্থহীন সময় নষ্ট করবেন। একটু অভ্যাস করুন। বারবার তাকে আল্লাহ্র যিকিরের দিকে ফিরিয়ে আনুন। ইন্শা আল্লাহ্, এক সময় আপনি আল্লাহ্র প্রিয় যাকিরে পরিণত হবেন।

আমাদের জীবনের অধিকাংশ উৎকণ্ঠা, উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা তাকে বারেই অর্থহীন, ভিত্তিহীন ও আমাদের ঈমান নষ্টকারী। আমাদের অধিকাংশ উৎকণ্ঠা “কি জানি কি হয়” বা ফলাফলের চিন্তা করে। মুমিনের ফলাফলের দায়িত্ব তো প্রভুর উপর ন্যস্ত। তাঁর আবার দুশ্চিন্তা কিসের? এগুলোর পরিবর্তে আল্লাহ্র যিক্র করুন।

একটি উদাহারণ বিবেচনা করুন। এক ব্যক্তি ঢাকায় থাকেন। তার গ্রামের বাড়ি খুলনা। গ্রামের বাড়িতে তার কোনো কাছে আত্মীয়ের কঠিন অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে তিনি ব্যস্ত হয়ে দেশে ফিরছেন। ঢাকা থেকে খুলনা পৌঁছাতে তার ৮/৯ ঘণ্টা সময় লাগবে। এ দীর্ঘ সময় তিনি স্বভাবতই অত্যন্ত উৎকণ্ঠা ও দুশ্চিন্তার মধ্যে কাটাবেন। সারা সময় তার মনে বিভিন্ন অমঙ্গল-চিন্তা ঘুরপাক খাবে। কথা বললেও তিনি এ বিষয়ে বিভিন্ন উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে কথা বলবেন।

কিন্তু তার এ উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা, অমঙ্গল চিন্তা কি তার বা তার অসুস্থ আপনজনের কোনো উপকারে লাগবে? কখনোই না। তিনি মূলত পুরো সময়টি নেতিবাচক চিন্তা করে নষ্ট করছেন। তিনি নিজের তাকে  নষ্ট করছেন। সর্বোপরি আল্লাহ্র যিকিরের অমূল্য সুযোগ তিনি নষ্ট করছেন। এ সময় যদি তিনি সকল দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলে আল্লাহ্র যিকিরে কাটাতেন, অথবা দোয়ার মধ্যে সময় অতিবাহিত করতেন, তাহলে তিনি সকলদিক থেকে লাভবান হতেন।

আসলে আমরা অধিকাংশ সময় অলস বা অপ্রয়োজনীয় চিন্তা অথবা ভিত্তিহীন দুশ্চিন্তা, উৎকণ্ঠা বা অমঙ্গল-চিন্তা করে সময় নষ্ট করি। একটু অভ্যাস করলে আমরা এসকল মূল্যবান সময় আল্লাহ্র যিকিরে ব্যয় করে জাগতিক, মানসিক ও পারলৌকিকভাবে অশেষ লাভবান হতে পারি। আল্লাহ্ আমাদের তাওফীক প্রদান করেন ; আমীন।

যিক্র নং ১ : لا إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ

উচ্চারণ: ‘লা- ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’

অর্থ: আল্লাহ্ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।

যিক্র নং ২ : سُبْحَانَ اللهِ

উচ্চারণ : ‘সুব‘হা-নাল্লা-হ্’, অর্থ : আল্লাহ্র পবিত্রতা ঘোষণা করছি।

যিক্র নং ৩ :        سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ

উচ্চারণ : সুব‘হা-নাল্লা-হি ওয়া বি‘হামদিহী।

অর্থ: “আল্লাহ্র পবিত্রতা ও প্রশংসা (প্রশংসাময় পবিত্রতা) ঘোষণা করছি।”

যিক্র নং ৪ :     سُبْحَانَ اللهِ الْعَظِيْم

উচ্চারণ : সুবা‘হা-নাল্লা-হিল আযীম।

অর্থ : “মহামহিম আল্লাহ্র পবিত্রতা ঘোষণা করছি।”

যিক্র নং ৫ :      اَلْحَمْدُ للهِ

উচ্চারণ : আল ‘হামদু লিল্লা-হ্। অর্থ : “সব প্রশংসা আল্লাহ্র জন্য।”

যিক্র নং ৬ :       اَللهُ أَكْبَرُ

উচ্চারণ : আল্লা-হু আকবার। অর্থ : “আল্লাহ্ সর্বশ্রেষ্ঠ।”

যিক্র নং ৭ :            لاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللّهِ

উচ্চারণ : লা- ‘হাওলা ওয়া লা- ক্বুওয়াতা ইল্লা বিল্লা-হ।

অর্থ : “কোনো অবলম্বন নেই, কোনো ক্ষমতা নেই আল্লাহ্ ছাড়া।”

যিক্র নং ৮: দরুদ শরীফ: (اللّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وآلِهِ وَسَلِّمْ)

উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা সাল্লি ‘আলা- মুহাম্মাদিন, ওয়া আ-লিহী ওয়া সাল্লিম।

অর্থ: “হে আল্লাহ্, আপনি সালাত প্রেরণ করুন মুহাম্মাদের () উপর ও তাঁর পরিজন-অনুসারীগণের উপর, এবং সালাম প্রেরণ করুন। (অথবা দরুদে ইব্রাহীমী বা অন্য দরুদ)।

যিক্র নং ৯ (ইসতিগফার) :

رَبِّ اغْفِرْ لِيْ وَتُبْ عَلَيَّ إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الْغَفُوْر

উচ্চারণ : রাব্বিগ্ ফিরলী, ওয়া তুব ‘আলাইয়্যা, ইন্নাকা আনতাত তাওয়া-বুল গাফূর।

অর্থ : “হে আমার প্রভু, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমার তাওবা কবুল করুন। নিশ্চয় আপনি মহান তাওবা কবুলকারী ও ক্ষমাকারী।”

যিক্র নং ১০: মুনাজাত ঃ

اَللّهُمَّ اغْفِرْ لِيْ وَارْحَمْنِيْ وَاهْدِنِيْ وَعَافِنِيْ وَارْزُقْنِيْ

উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মাগ্ ফিরলী, ওয়ার‘হামনী, ওয়াহদিনী, ওয়া ‘আ-ফিনী, ওয়ারযুকনী।

অর্থ: “হে আল্লাহ্, আমাকে ক্ষমা করুন, আমাকে দয়া করুন, আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন, আমাকে সার্বিক নিরাপত্তা ও সুস্থতা দান করুন এবং আমাকে রিযিক দান করুন।”

যিক্র নং ১১: মুনাজাত ঃ

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ

উচ্চারণ: “রাব্বানা- আ-তিনা- ফিদ্দুনইয়া- হাসানাতান, ওয়াফিল আ-খিরাতি হাসানাতান, ওয়াক্বিনা- ‘আযা-বান না-রা”

অর্থ: হে আমাদের প্রভু, আপনি প্রদান করুন আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ-মঙ্গল, আখেরাতে কল্যাণ-মঙ্গল এবং রক্ষা করুন আমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে।

যথাসম্ভব মনোযোগ দিয়ে ও অনুভব করে যিক্র করুন

উপরের যিক্রগুলো সব অথবা কয়েকটি বা একটি এক সময়ে পালন করতে পারেন। যে যিক্রটি যতক্ষণ ভাল লাগে জপ করুন। গণনার কোন দরকার নেই। আগে পরের হিসাব রাখতে হবে না। শুধু যথাসম্ভব অর্থের দিকে লক্ষ্য রেখে তাকে আল্লাহ্র দিকে রুজু করে যিক্রগুলো পাঠ করুন। অর্থের দিক থেকে এ সরে গেলে যখনই খেয়াল হবে আবার তাকে  অর্থের দিকে নিয়ে আসবেন। না হলে অন্তত শব্দের দিকে লক্ষ্য রাখবেন।

(লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ) জপ করার সময় নিজের মনের মধ্যে বারবার জাগরুক করুন যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন মা’বুদ নেই, ভয়ের কেউ নেই, ভক্তির কেউ নেই, চাওয়ার কেউ নেই, পাওয়ার কেউ নেই, ভাল করার কেউ নেই, মন্দ করার কেউ নেই, আমার হৃদয়ে আর কারো স্থান নেই।

সুব‘হা-নাল্লাহ… অর্থের যিক্রগুলো জপের সময় অনুভব করুন যে, আপনি আপনার প্রভুর পবিত্রতার জয়ধ্বনি করছেন। পবিত্র তিনি, সকল শিরক থেকে, অপবাদ থেকে, তুলনা থেকে, পবিত্র তিনি, মহাপবিত্র তিনি।

আল‘হামদু লিল্লা-হ জপ করার সময় নিজের তাকে আল্লাহ্র প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরে দিন। নিজের জীবনের অগণিত নেয়ামতের কথা স্মরণ করুন। আল্লাহ্ কিভাবে আপনাকে অগণিত রহমত ও নেয়ামতের মধ্যে রেখেছেন। স্মরণ করুন ও আলহামদু লিল্লাহ বলুন। জীবনের সকল কষ্ট, ব্যথা, অসুবিধা ও সমস্যার কথা ভুলে যান। অগণিত নেয়ামতের মধ্যে এগুলোর স্থান কোথায়। কিছু সমস্যা তো থাকতেই হবে। আল্লাহ্র কৃতজ্ঞতা ও প্রশংসার মাধ্যমে এগুলোও আল্লাহ্ দূর করে দেবেন।

প্রতিটি মানুষের জীবনে আল্লাহ্র অসংখ্য সাধারণ ও বিশেষ নেয়ামত রয়েছে, যা তার জীবনকে ধন্য করেছে। তার পাশাপাশি প্রত্যেকের জীবনেই কিছু কষ্ট, বেদনা ও সমস্যা আছে। যেগুলো আল্লাহ্র অগণিত নেয়ামতের তুলনায় অতি নগণ্য। কিন্তু সাধারণত মানবীয় দুর্বলতার কারণে আমরা এসকল কষ্ট ও বেদনার অনুভূতি দ্বারা বেশি প্রভাবিত হই। শত নেয়ামতের বিপরীতে দু-চারটি কষ্ট আমাদের পুরো তাকে ব্যথিত করে তোলে। ব্যর্থতা, কষ্ট, বেদনা, ক্রোধ ইত্যাদি অনুভূতি আমরা লালন করি। এসকল অনুভূতির স্থায়িত্ব আমাদের তাকে  কলুষিত ও অপবিত্র করে, মানসিক শক্তি ও প্রেরণাকে ব্যহত করে, আমাদের কর্মস্পৃহা নষ্ট করে, আমাদের জীবনকে গ্লানিময় করে এবং সর্বোপরি আল্লাহ্র রহমত ও অফুরন্ত নেয়ামত লাভের পথ থেকে আমাদের দূরে নিয়ে যায়।

আল্লাহ্র বান্দা আল্লাহ্কে যেভাবে মনে করবে, সেভাবেই তাঁকে তার পাশে পাবে। জীবনের প্রতি না-বোধক অনুভূতি আল্লাহ্র রহমত থেকে বান্দাকে নিরাশ করে, যা কঠিনতম পাপ ও অবিশ্বাস। অপরদিকে আল্লাহ্র প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে আল্লাহ্ নেয়ামত বাড়িয়ে দেন। এজন্য মুমিনকে নিজের তাকে কৃতজ্ঞতা দিয়ে আবাদ করতে হবে। সকল কষ্ট, বেদনা, ব্যর্থতা ও উৎকণ্ঠা থেকে তাকে সাফ করে আল্লাহ্র অশেষ নেয়ামতের কথা স্মরণ করে এগুলোর জন্য কৃতজ্ঞতার অনুভূতি দিয়ে হৃদয়কে ভরতে হবে। আর অবিরত সকৃতজ্ঞ চিত্তে বলতে হবে : ‘আল-হামদু লিল্লাহ।’ এ যিক্র যাকিরের তাকে ভারমুক্ত করবে, গ্লানিমুক্ত করবে, শক্তিশালী করবে এবং আল্লাহ্র রহমত, নেয়ামত ও বরকত তাঁর জীবন ভরে তুলবে।

‘আল্লাহু আকবার’, যিকিরের সময় হৃদয়কে আল্লাহ্র পবিত্রতা ও শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতিতে ভরে তুলুন। তিনিই বড়, তিনিই শ্রেষ্ঠ। আর সবই মূল্যহীন। অন্য কারো বড়ত্ব, শক্তি, মহত্ত আমার হৃদয়কে প্রভাবিত করে না। একমাত্র তাঁরই শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা করি। সকল ভয় ও হীনমন্যতার অনুভূতি থেকে মুক্ত আমার হৃদয়।

(লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা…) যিক্র করার সময় নিজের ও বিশ্বের সকল সৃষ্টির অসহায়ত্ব, ক্ষমতাহীনতা অনুভব করুন। একমাত্র আল্লাহ্র উপর অবিচল আস্থা ও নির্ভরতার অনুভূতি নিজের মনে জাগরুক করুন।

দরুদ শরীফ পাঠের সময় রাসূলুল্লাহ  এর মর্যাদা ও অধিকারের কথা অনুভব করুন। তিনি আমাদের জন্য যা করেছেন আমরা জীবন বিলিয়ে দিলেও তাঁর সামান্যতম প্রতিদানও দিতে পারব না, কারণ আমরা হয়ত আমাদের পার্থিব সংক্ষিপ্ত জীবনটা বিলিয়ে দিলাম, কিন্তু তিনি তো আমাদের পার্থিব ও পরলৌকিক অনন্ত জীবনের সফলতার পথ দেখাতে তাঁর মহান জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। আমরা তো তাঁর জন্য কিছুই করতে পারব না। শুধুমাত্র অন্তর দিয়ে আল্লাহ্র কাছে বলি, আল্লাহ্ আপনি আপনার হাবীবের উপর সালাত সালাম পাঠান, তাঁর পরিজন ও অনুসারীদের উপর। এভাবে দরুদ পাঠের সাথে সাথে রাসূলুল্লাহ  এর মহব্বত হৃদয়ে জাগরুক করতে থাকুন।

ইসতিগফারের সময় নিজের পাপের কথা স্মরণ করুন। মহান আল্লাহ্র অগণিত নেয়ামতের পরিবর্তে কিভাবে আমরা তাঁর অবাধ্যতা করি তা স্মরণ করুন। আল্লাহ্ ক্ষমা না করলে কোন উপায় নেই ধ্বংস অনির্বার্য তা অনুভব করুন এবং ইসতিগফার পাঠ করুন।

মুনাজাত হৃদয় দিয়ে অনুভব করে আবেগ ও আকুতি দিয়ে জপ করুন। আল্লাহ্  আপনি না দিলে তো কেউই কিছু দিতে পারবে না। আল্লাহ্ আপনি দয়া করে আমার কর্মের দিকে না তাকিয়ে আমাদের আবেগ ও আশার দিকে তাকিয়ে আমাকে ক্ষমা করুন, আপনার দয়া দিয়ে আমার জীবন ভরে দিন, যেন আর কারো দয়ার আর আমার দরকার না হয়।, আমাকে আপনার সন্তুষ্টির পথে প্রতিষ্ঠিত রাখুন। আল্লাহ্, আপনি আমাকে সার্বিক নিরাপত্তা ও সুস্থতা দান করুন, সকল বিপদ আপদ, সমস্যা, কষ্ট যুলুম, অত্যাচার, অশান্তি থেকে রক্ষা করুন। দয়াময় আমাকে রিযিক দান করুন, আর্থিক সমস্যা থেকে মুক্ত রাখুন। এভাবে বারবার দোয়াটি পাঠ করতে থাকুন।

দ্বিতীয় মুনাজাতেও একইভাবে হৃদয় দিয়ে আল্লাহ্র কাছে পার্থিব ও পারলৌকিক উভয় জীবনর সকল কল্যাণ, মঙ্গল, উন্নতি, সফলতা প্রার্থনা করুন।

এ সকল যিকিরের ফযীলত

বিভিন্ন হাদীসে এসকল বাক্যে বেশি বেশি যিকিরের নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং তার অপরিমেয় ফযীলত বর্ণনা করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ  বারবার (লা ইলাহা ইল্লাল্লহ) বলে ঈমানকে নবায়িত করতে বলেছেন। তিনি বলেছেন এ হলো সর্বশ্রেষ্ঠ যিক্র। তিনি বলেছেন, “আল্লাহ্র কাছে সবচেয়ে প্রিয় বাক্য চারটি : ‘সুব‘হা-নাল্লাহ’, ‘আল-হামদুলিল্লাহ’, ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এবং ‘আল্লাহু আকবার’। তুমি ইচ্ছামতো এ বাক্য চারটির যে কোনো বাক্য আগে পিছে বলতে পার। তিনি বলেন, ‘সুব‘হা-নাল্লাহ’, ‘আল-হামদুলিল্লাহ’, ‘লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এবং ‘আল্লাহু আকবার’ বলতে আমি এত বেশি পছন্দ করি যে, এগুলো বলা আমার কাছে পৃথিবীর বুকে সূর্যের নিচে যা কিছু আছে সবকিছু থেকে বেশি প্রিয়। এ বাক্যগুলো প্রতিটি বাক্য একবার বললে জান্নাতে একটি করে বৃক্ষ রোপণ করা হয়। এ বাক্যগুলোর প্রত্যেক বাক্য একবার যিক্র করা একবার আল্লাহ্র ওয়াস্তে দান করার সমতুল্য। এ বাক্যগুলো কেয়ামতের দিনে বান্দার আমল নামায় সবচেয়ে বেশি ভারী হবে। এগুলো জাহান্নামের আগুন থেকে মুমিনের ঢাল। গাছের ডালে ঝাকি দিলে যেমন পাতাগুলো ঝরে যায় অনুরূপভাবে এ যিক্রগুলো বললে বান্দার গোনাহ ঝরে যায়। এ চারটি বাক্য যিক্রকারী প্রতিটি বাক্যের প্রতিটি অক্ষরের জন্য ১০টি করে সাওয়াব লাভ করবেন। আল্লাহ্ এ চারটি বাক্যকে বেঁছে পছন্দ করে নিয়েছেন। এ বাক্যগুলোর যে কোনো একটি বাক্য একবার বললে আল্লাহ্ ২০ টি সাওয়াব প্রদান করবেন এবং ২০ টি গোনাহ ক্ষমা করবেন। আর এভাবে যে বেশি বেশি যিক্র করবে সে মুনাফিকী থেকে মুক্তি লাভ করবে। এসকল যিকিরের কারণে বান্দা রিযিকপ্রাপ্ত হয়।

তিনি বলেছেন, দু’টি বাক্য জিহ্বায় উচ্চারণের জন্য খুবই হালকা, আর কেয়ামতের দিন কর্ম পরিমাপের পাল্লায় খুবই ভারী এবং আল্লাহ্র কাছে প্রিয় : সুব‘হা-নাল্লাহি ওয়া বি‘হামদিহী, সুবহানাল্লাহিল ‘আযীম।” আরো বলেছেন, যদি কেউ ১০০ বার ‘সুব‘হা-নাল্লহি ওয়া বি‘হামদিহী’ বলে, তাহলে আল্লাহ্ তাঁর জন্য ১,২৪,০০০ (একলক্ষ চব্বিশ হাজার) সাওয়াব লিখবেন। যে ব্যক্তি ১০০ বার এ যিক্র বলবে, তাঁর সকল গোনাহ ক্ষমা করা হবে, যদিও তা সমুদ্রের ফেনার সমতুল্য হয়।”

১০০ বার ‘সুব‘হা-নাল্লাহ’ বললে ১০০ টি ক্রীতদাস মুক্ত করার সমপরিমাণ সাওয়াব দান করবেন মহান আল্লাহ্। ১০০ বার ‘আল হামদু লিল্লাহ’ বললে আল্লাহ্র রাস্তায় যুদ্ধের জন্য ১০০ টি সাজানো ঘোড়ায় মুজাহিদ প্রেরণের সমপরিমাণ সাওয়াব, ১০০ বার ‘আল্লাহু আকবার’ বললে ১০০ টি মাকবুল উট কুরবানির সমপরিমাণ সাওয়াব, ১০০ বার ‘লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ বললে আসমান ও জমিন পূর্ণ সাওয়াব প্রদান করবেন মহান আল্লাহ্। আরে বেশি যিক্র করলে এভাবে আরো বেশি সাওয়াব, মর্যাদা রহমত অর্জিত হবে।

রাসূলুল্লাহ  বলেছেন, তোমরা ‘লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ বলবে, কারণ এ হলো জান্নাতের ভাণ্ডারগুলোর মধ্যে একটি ভাণ্ডার ও জান্নাতের একটি দরজা। এ যিক্র একবার পাঠ করা হলো জান্নাতে বৃক্ষ রোপণ করা। “পৃথিবীতে যে কোনো ব্যক্তি যদি বলে : ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়া আল্লাহু আকবার, ওয়া লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ (আল্লাহ্ ছাড়া কোনো মা’বুদ নেই, আল্লাহ্ মহান, কোনো অবলম্বন নেই এবং কোনো ক্ষমতা নেই আল্লাহ্র সাহায্য ছাড়া), তাহলে তার সকল গোনাহ ক্ষমা করা হবে, যদিও তা সমুদ্রের ফেনার সমান হয়।”

এরূপ অগণিত হাদীসে এ সকল যিক্রের অভাবনীয় ফযীলত ও সাওয়াবের কথা বলা হয়েছে। এ বিষয়ে এত বেশি হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, শুধুমাত্র এ বিষয়ক সহীহ হাদীস সংকলিত করলেই একটি বড় বই হয়ে যাবে।

দরুদ শরীফ মুমিনের অন্যতম যিক্র ও হৃদয়ের সবচেয়ে বড় প্রশান্তি। রাসূলুল্লাহ  অসংখ্য হাদীসে তাঁর উপর দরুদ ও সালামের নির্দেশনা প্রদান করেছেন এবং সালাত ও সালামের অতুলনীয় পুরস্কারের বর্ণনা দিয়েছেন। হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি যে, কোন উম্মত তাঁর উপর সালাত ও সালাম পাঠ করলে আল্লাহ্ তাকে অগণিত পুরস্কার প্রদান করেন, তার গোনাহ ক্ষমা করেন, তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন, তার উপর রহমত বর্ষণ করেন, ফিরিশতাগণ তাঁর জন্য দোওয়া করেন, তার সালাত ও সালাম তার নাম ও পিতার নামসহ ফিরিশতাগণ রাসূলুল্লাহ  এর রাওযা মুবারাকায় পৌঁছে দেন, তিনি তাঁর জন্য দোওয়া করেন। সর্বোপরি যে ব্যক্তি যত বেশী সালাত ও সালাম পাঠ করবে সে কেয়ামতে ততবেশী তাঁর নৈকট্য পাবে। অধিক পরিমাণে সালাত পাঠকারীর সকল সমস্যা আল্লাহ্ মিটিয়ে দিবেন।

ইসতিগফার বা আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা বান্দার অন্যতম যিক্র ও অফুরন্ত নেয়ামতের উৎস। ইসতিগফারের মাধ্যমে বান্দা যিকিরের সকল ফযীলত ও বরকত লাভ করেন। সাথে সাথে আল্লাহ্র ক্ষমা লাভে ধন্য হন।

পাপ মানুষের হৃদয়কে কলুষিত করে। তাকে তার মহান স্রষ্টার করুণার পথ থেকে দূরে নিয়ে যায়। মহান রাব্বুল আলামীন অত্যন্ত ভালবেসে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষকে ভালবেসেছেন এবং সম্মানিত করেছেন। পাপ যেন মানুষকে কলুষিত করতে না পারে সে জন্য তিনি ক্ষমার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তাওবা ও ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনার ফলে বান্দা শুধু পাপমুক্তই হয় না, উপরন্তু সে অশেষ সাওয়াব ও মহান মর্যাদার অধিকারী হয়। যে কোনো মানুষ যখন পাপের জন্য আল্লাহ্র কাছে সর্বান্তকরণে ক্ষমা প্রার্থনা করে তখন সে আল্লাহ্র ক্ষমা লাভে সক্ষম হয়। উপরন্তু এ ক্ষমা প্রার্থনা, অনুতাপ ও ক্রন্দনের কারণে তার হৃদয় আরো পবিত্র ও মুক্ত হয়। সে আল্লাহ্র আরো বেশি নৈকট্য, সন্তুষ্টি ও সাওয়াব অর্জন করে।

মহান আল্লাহ্ বান্দাকে যে কোনো পাপের পরেই ক্ষমা প্রার্থনার নির্দেশ প্রদান করেছেন এবং ক্ষমা প্রার্থনাকারীগণের জন্য নিশ্চিত ক্ষমা, অফুরন্ত সাওয়াব ও জান্নাতের অনন্ত নেয়ামতের সুসংবাদ প্রদান করেছেন। রাসূলুল্লাহ  প্রতিদিন শতাধিকবার ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। তিনি উম্মতকে সদা সর্বদা ক্ষমা প্রার্থনা বা ইস্তিগফারের নির্দেশ দিয়েছেন।

কুরআনের বর্ণনায় আমরা দেখতে পাই যে, আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলে তিনি ক্ষমা তো করেনই, উপরন্তু জাগতিক রিযক, সম্পদ ও সন্তানসন্ততিতে বরকত অফুরন্ত বরকত ও বৃদ্ধি দান করেন। রাসূলুল্লাহ  বলেছেন : “হে মানুষেরা তোমরা আল্লাহ্র কাছে তাওবা কর। নিশ্চয় আমি একদিনের মধ্যে ১০০ বার আল্লাহ্র কাছে তারবা করি বা ইস্তিগফার করি।” তিনি একই বৈঠকে ১০০ বার ইসতিগফার করতেন।

আল্লাহ্ বলেন: হে আদম সন্তান, তুমি যতক্ষণ আমাকে ডাকবে ও আমার করুণার আশা করবে আমি তোমাকে ক্ষমা করব, তুমি যাই কর না কেন, কোনো কিছুই পরোয়া করব না। হে আদম সন্তান, যদি তোমার পাপ আসমান স্পর্শ করে তারপরও তুমি ইস্তিগফার কর বা ক্ষমা চাও আমি তোমাকে ক্ষমা করব, কোনো পরোয়া করব না। হে আদম সন্তান, তুমি যদি পৃথিবী পূর্ণ পাপ নিয়ে আমার কাছে হাজির হও, কিন্তু র্শিক থেকে মুক্ত থাক, তাহলে আমি পৃথিবী পূর্ণ ক্ষমা তোমাকে প্রদান করব।” তিনি আরো বলেন, সৌভাগ্যবান সে ব্যক্তি যার আমলনামায় অনেক ইস্তিগফার পাওয়া গিয়েছে।”

আল্লাহ্র কাছে দোয়া করা অন্যতম যিক্র ও শ্রেষ্ঠতম ইবাদত। জুতার ফিতা, লবন, ইত্যাদি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জাগতিক বিষয় সহ জাগতিক ও পারলৌকিক সবকিছুই আল্লাহ্র কাছে চাইতে হবে এবং চাওয়া ইবাদত। আল্লাহ্র কাছে দোয়া মুনাজাতের চেয়ে সম্মানিত ও প্রিয় বিষয় আর কিছুই নেই। তিনি তাঁর কাছে চাইলে আনন্দিত হন এবং না চাইলে অসন্তুষ্ট হন। বান্দার দোয়া আল্লাহ্ কবুল করবেনই। তাকে প্রার্থিত বিষয় দান করবেন, অথবা তার বদলে আরো ভালো কোন বিষয় দান করবেন, অথবা তার বিনিময়ে কোন অমঙ্গল দূর করবেন, অথবা বিনিময়ে আখেরাতে অভাবনীয় নেয়ামত প্রদান করবেন। কাজেই আমাদের সর্বদা চাইতে হবে। উপরের ওযীফার ১০ ও ১১ নং যিকিরে উল্লেখিত মুুনাজাত দু’টি সর্বদা বেশিবেশি পাঠ করতে শিক্ষা দিয়েছেন রাসূলুল্লাহ ।

দ্বিতীয় ওযীফা : সকালে, দিবসে ও সন্ধ্যায় পালনের ওযীফা

ক) ফজরের সালাতের পরে

ফজরের সালাত জামাতে আদায়ের পরে যিকিরে রত থাকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। রাসূলুল্লাহ () বলেছেন : “যে ব্যক্তি ফজরের নামায জামাতে আদায় করবে, তারপর বসে সূর্যোদয় পর্যন্ত আল্লাহ্র যিকিরে রত থাকবে। অতঃপর সে দুই রাক’আত নামায আদায় করবে, সে একটি হজ্ব ও একটি ওমরার সাওয়াব পাবে, পরিপূর্ণ, পরিপূর্ণ, পরিপূর্ণ (হজ্ব ও ওমরার সাওয়াব)।” এ অর্থে অনেক সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে।

ফজরের পরে যিকিরের দু’টি পর্যায় রয়েছে। প্রথম পর্যায় Ñ নামাযের পরে বসে, বিশেষত চারজানু হয়ে বসে সূর্যোদয়ের কিছুক্ষণ পর পর্যন্ত যিক্র করা, যখন মাকরুহ ওয়াক্ত শেষ হবে। দ্বিতীয় পর্যায় হলো Ñ মাকরুহ ওয়াক্ত শেষ হলে (সূর্যোদয়ের মোটামুটি আধাঘণ্টা পরে) অন্তত দুই রাক’আত দোহার বা চাশতের নামায আদায় করা।

রাসূলুল্লাহ  নিজে ফজরের পরে চারজানু হয়ে সূর্য পুরোপুরি উঠা পর্যন্ত বসে থাকতেন। তিনি নিশ্চুপ বসে থাকতেন অথবা চুপে চুপে যিক্র করতেন। সাহাবাীগণ অনেকে তার চারপার্শে বসতেন। তারা কখনো প্রত্যেকে নিজে নিজে চুপে চুপে যিক্র করতেন। কখনো তিনি ফজরের পরে সাহাবীগণের সাথে কথাবার্তা বলতেন বা রাত্রে কে কী স্বপ্ন দেখেছে তা আলোচনা করতেন। অনেক সময় সাহাবীগণ বিভিন্ন গল্প, জাহেলী যুগের বিভন্ন ঘটনা আলোচনা করতেন। তারা অনেক সময় হাসতেন। রাসূলুল্লাহ শুধু মুচকি হাসতেন। সাধারণত সূর্য ওঠার পরে তিনি উঠে তাঁর ঘরে আসতেন।

এ সময়ে নি¤েœর যিক্রগুলো পালন করবেন

নি¤েœর যিক্রগুলো সহীহ হাদীসের বর্ণনা অনুসারে রাসূলুল্লাহ -এর শেখানো ও আচরিত যিকিরের অন্যতম। বিস্তারিত আলোচনা পরিত্যাগ করেছি। শুধুমাত্র বিশেষ কোন ফযীলতের বর্ণনা থাকলে তা উল্লেখ করেছি। সবগুলো আদায় করতে না পারলে সাধ্যমত বেছে নিয়ে পালন করবেন।

১) তিন বার: أَسْتَغْفِرُ اللهَ (আসতা‘গফিরুল্লা-হ) “আমি আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।”

২) এক বার:

اللَّهُمَّ أَنْتَ السَّلامُ وَمِنْكَ السَّلامُ تَبَارَكْتَ ذَا الْجَلالِ وَالإِكْرَام

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা আনতাস সালা-মু ওয়া মিনকাস সালা-মু, তাবা-রাকতা ইয়া যাল জালা-লি ওয়াল ইকরা-ম।

অর্থ : “হে আল্লাহ্, আপনিই সালাম (শান্তি), আপনার থেকেই শান্তি, হে মহাসম্মানের অধিকারী ও মর্যাদা প্রদানের অধিকারী, আপনি বরকতময়।”

৩) একবার নি¤েœর দোয়াটি:

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا وَرِزْقًا طَيِّبًا وَعَمَلاً مُتَقَبَّلاً

উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা ইন্নী আসআলুকা ‘ইলমান না-ফি‘আন, ওয়া রিযক্বান ত্বাইয়িবান, ওয়া ‘আমালান মুতাক্বাব্বালান।

অর্থ : “হে আল্লাহ্, আমি আপনার কাছে চাচ্ছি কল্যাণকর জ্ঞান, পবিত্র (বরকতময় ও হালাল) রিযিক ও কবুলকৃত কর্ম।”

৪) সালামের পরে কোন কথা বলার আগে সাতবার:

اَللَّهُمَّ أَجِرْنِيْ مِنَ النَّارِ

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা, আজিরনী মিনান না-র।

অর্থ : “হে আল্লাহ্, আমাকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন।”

ফজর ও মাগরিবের সালাতের পরে কোন কথা বলার পূর্বে এ দোয়াটি ৭ বার বলে ঐ দিন বা রাতে মৃত্যু হলে আল্লাহ্ তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবেন বলে বর্ণিত হয়েছে।

৫) দশ বার, সম্ভব হলে ১০০ বার:

لا إِلَهَ إِلا اللَّهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ يُحْيِي وَيُمِيتُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

উচ্চারণ : লা- ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু, ওয়া‘হদাহু লা- শারীকা লাহু, লাহুল মুলক, ওয়া লাহুল ‘হামদ, ইউ‘হয়ী ওয়া ইউমীতু ওয়া হুআ ‘আলা- কুল্লি শাইয়িন কাদীর।

অর্থ : “আল্লাহ্ ছাড়া কোনো মা’বুদ নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক নেই। রাজত্ব তাঁরই এবং প্রশংসা তাঁরই। তিনিই জীবন দান করেন এবং তিনিই মৃত্যু দান করেন। এবং তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।”

রাসূলুল্লাহ  বলেছেন : “যে ব্যক্তি মাগরিবের নামাযের পর এবং ফজরের নামাযের পর, ঘুরে বসা বা নড়াচড়ার আগেই, পা গুটানো অবস্থাতেই, কোনো কথা বলার আগে উপরের এ যিক্রটি ১০ বার পাঠ করবে আল্লাহ্ তার প্রত্যেক বারের জন্য ১০ টি সাওয়াব লিখবেন, ১০ টি গোনাহ ক্ষমা করবেন, তাঁর ১০ টি মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন, ঐদিনের জন্য তাকে সকল অমঙ্গল ও ক্ষতি থেকে রক্ষা করা হবে, শয়তান থেকে পাহারা দেয়া হবে। অন্য হাদীসে ১০০ বার পাঠের বিশেষ ফযীলত বলা হয়েছে।

৬) একবার: আয়াতুল কুরসী :

হাদীস শরীফে বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তি প্রত্যেক নামাযের পরে আয়াতুল কুরসী পাঠ করবে তাঁর জান্নাতে প্রবেশের পথে মৃত্যু ছাড়া আর কোনো বাধা থাকবে না।” এবং “যে ব্যক্তি ফরয নামাযের শেষে আয়াতুল কুরসী পাঠ করবে সে পরবর্তী নামায পর্যন্ত আল্লাহ্র জিম্মায় থাকবে।”

৭) তিনবার করে: সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস

৮) তিনবার নি¤েœর যিক্রটি :

سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ عَدَدَ خَلْقِهِ وَرِضَا نَفْسِهِ وَزِنَةَ عَرْشِهِ وَمِدَادَ كَلِمَاتِهِ

উচ্চারণ : সুব‘হা-নাল্লা-হি ওয়াবি‘হামদিহী, ‘আদাদা খাল্ক্বিহী, ওয়ারিদ্বা- নাফ্সিহী, ওয়া যিনাতা ‘আরশিহী ওয়া মিদা-দা কালিমাতিহী।

অর্থ : “পবিত্রতা আল্লাহ্র এবং প্রশংসা তাঁরই, তাঁর সৃষ্টির সম সংখ্যক, তার নিজের সন্তুষ্টি পরিমাণে, তাঁর আরশের ওজন পরিমাণে এবং তাঁর বাক্যের কালির সমপরিমাণ।”

এ চারটি বাক্য তিনবার করে বললে সারা সকাল যিক্র করার সাওয়াব আল্লাহ্ প্রদান করবেন বলে হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে।

৯) তিনবার নি¤েœর যিক্রটি

بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ

উচ্চারণ : বিসমিল্লা-হিল লাযী লা- ইয়ার্দুরু মা‘আ ইসমিহী শাইউন ফিল আরদি ওয়া লা- ফিস সামা-ই, ওয়া হুআস সামীউল ‘আলীম।

অর্থ: “আল্লাহ্র নামে (শুরু করছি), যাঁর নামের সাথে জমিনে বা আসমানে কোনো কিছুই কোনো ক্ষতি করতে পারে না।”

রাসূলুল্লাহ  বলেছেন, যদি কেউ সকালে ও সন্ধ্যায় তিন বার করে এ দোয়াটি পাঠ করে তাহলে সে দিনে ও সে রাতে কোনো কিছুই তার ক্ষতি করতে পারবে না।

১০) সাতবার নি¤েœর যিক্রটি

حَسْبِيَ اللَّهُ لا إِلَهَ إِلا هُوَ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ

উচ্চারণ :  হাসবিয়াল্লা-হু, লা- ইলাহা ইল্লা- হুআ, ‘আলাইহি তাওয়াক্কালতু, ওয়া হুআ রাব্বুল ‘আরশিল আযীম।

অর্থ : “আল্লাহ্ই আমার জন্য যথেষ্ট, তিনি ছাড়া কোনো মা’বুদ নেই, আমি তাঁরই উপর নির্ভর করেছি, তিনি মহান আরশের প্রভু।”

সকালে ও সন্ধ্যায় ৭ বার এ আয়াতটি পাঠ করলে আল্লাহ্ সকল চিন্তা, উৎকণ্ঠা ও সমস্যা মিটিয়ে দেবেন বলে হাদীস শরীফে বলা হয়েছে।

১১) দশবার দরুদ শরীফ : দরুদে ইবরাহীমী বা যে কোন দরুদ।

রাসূলুল্লাহ  বলেছেন, “যে ব্যক্তি সকালে দশ বার ও সন্ধ্যায় দশ বার আমার উপর সালাত (দরুদ) পাঠ করবে, সে কেয়ামতের দিন আমার শাফা’আত লাভ করবে।

১২) একশতবার করে নি¤েœর চারিটি যিক্র মোট ৪০০ বার

‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আল-হামদুলিল্ল­াহ’, ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’, ‘আল্লাহু আকবার’

রাসূলুল্লাহ () বলেছেন, যে ব্যক্তি সকালে ও বিকালে সূর্যোদয়ের আগে ও সূর্যাস্তের আগে ১০০ বার ‘সুবহানাল্লাহ’ বলবে সে যেন একশতটি হজ্ব আদায় করল বা একশতটি উট আল্লাহ্র ওয়াস্তে দান করল। যে ব্যক্তি এ দুই সময়ে ১০০ বার ‘আল-হামদু লিল্লাহ’ বলল সে যেন আল্লাহ্র পথে জিহাদের জন্য ১০০ টি ঘোড়ার পিঠে মুজাহিদ প্রেরণ করলো, অথবা আল্লাহ্র রাস্তায় ১০০ টি গাযওয়া বা অভিযানে শরীক হলো। আর যে ব্যক্তি এ দুটি সময়ে ১০০ বার করে ‘লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পাঠ করলো, সে যেন ইসমাঈল বংশের একশত ব্যক্তিকে দাসত্ব থেকে মুক্তি প্রদান করলো। আর যে ব্যক্তি এ দুটি সময়ে ১০০ বার করে ‘আল্লাহু আকবার’ বলল, সে দিনে তার চেয়ে বেশি আমল আর কেউ করতে পারবে না। তবে যদি কেউ তার সমান এ যিক্রগুলো পাঠ করে বা তার চেয়ে বেশি পাঠ করে তাহলে ভিন্ন কথা। (তাহলে সেই শুধু তার উপরে উঠতে পারবে।)

১৩) একশতবার ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী’

এ তাসবীহটি সকালে ও সন্ধ্যায় ১০০ বার পাঠ করলে অপরিমেয় সাওয়াব ও সকল (সাধারণ সগীর) গোনাহের ক্ষমা লাভ করা যাবে বলে হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে।

১৪) একবার নি¤েœর যিক্রটি

اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ وَشُكْرِكَ وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা, আ‘ইননী ‘আলা- যিক্রিকা ওয়া শুকরিকা ওয়া হুসনি ‘ইবা-দাতিকা। অর্থ : “হে আল্লাহ্, আপনি আমাকে আপনার যিক্র করতে, শুকর করতে এবং আপনার ইবাদত সুন্দরভাবে করতে তাওফীক ও ক্ষমতা প্রদান করুন।”

১৫) একবার নি¤েœর যিক্র

يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ بِرَحْمَتِكَ أَسْتَغِيثُ َأَصْلِحْ لِي شَأْنِي كُلَّهُ، وَلَا تَكِلْنِي إِلَى نَفْسِي طَرْفَةَ عَيْنٍ

উচ্চারণ: ইয়া- হাইউ ইয়া কাইঊমু, বিরাহমাতিকা আসতাগীসু, আসলিহ লী শা‘নী কুল্লাহু, ওয়া লা- তাকিলনী ইলা- নাফসী তারফাতা ‘আাইন।

অর্থ: “হে চিরঞ্জীব, হে মহারক্ষক ও অমুখাপেক্ষী তত্ত্বাবধায়ক, আপনার রহমতের ওসীলা দিয়ে ত্রাণ প্রার্থনা করছি। আপনি আমার সকল বিষয়কে সুন্দর ও সাফল্যমণ্ডিত করুন। আর আমাকে একটি মুহূর্তের জন্যও, চোখের পলকের জন্যও আমার নিজের দায়িত্বে ছেড়ে দিবেন না (সর্বদা আপনার তত্ত্বাবধানে আমাকে রাখুন)।”

রাসূলুল্লাহ  ফাতেমা (রা)-কে সকাল সন্ধ্যায় দোয়াটি পড়তে নির্দেশ দেন।

১৬) একবার সাইয়িদুল ইসতিগফার

اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لا إِلَهَ إِلا أَنْتَ خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ وَأَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهُ لا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلا أَنْتَ

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা, আনতা রাব্বী, লা- ইলা-হা ইল্লা- আনতা, খালাক্বতানী, ওয়াআনা ‘আবদুকা, ওয়াআনা ‘আলা- ‘আহদিকা ওয়াওয়া‘অ্দিকা মাস তাতা‘অ্তু। আ‘ঊযু বিকা মিন শাররি মা- স্বানা‘তু, আবূউ লাকা বিনি‘মাতিকা ‘আলাইয়্যা, ওয়াআবূউ লাকা বিযামবি। ফাগ্ফিরলী, ফাইন্নাহু লা- ইয়াগফিরুয যুনূবা ইল্লা- আনতা।

অর্থ : “হে আল্লাহ্, আপনি আমার প্রভু, আপনি ছাড়া কোনো মা’বুদ নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং আমি আপনার বান্দা। আমি আপনার কাছে প্রদত্ত অঙ্গিকার ও প্রতিজ্ঞার উপরে রয়েছি যতটুকু পেরেছি। আমি আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করি আমি যে কর্ম করেছি তার অকল্যাণ থেকে। আমি আপনার কাছে প্রত্যাবর্তন করছি আপনি আমাকে যত নেয়ামত দান  করেছেন  তা-সহ  এবং আমি  আপনার কাছে  প্রত্যাবর্তন  করছি  আমার পাপ-সহ। অতএব, আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন, কারণ আপনি ছাড়া কেউ পাপ ক্ষমা করতে পারে না।”

রাসূলুল্লাহ  বলেছেন : “এ দোয়াটি সাইয়্যেদুল ইস্তিগফার বা ক্ষমা চাওয়ার শ্রেষ্ঠ দোওয়া। যে ব্যক্তি এ দোয়ার অর্থের প্রতি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস রেখে দিনের বেলায় তা পাঠ করবে সে যদি সে দিন সন্ধ্যার আগে মৃত্যুবরণ করে, তাহলে সে জান্নাতী হবে। আর যদি কেউ এ দোয়ার অর্থে সুদৃঢ় একীন ও বিশ্বাস রেখে রাত্রে তা পাঠ করবে, সে যদি সে রাতেই সকালের আগে মৃত্যুবরণ করে, তাহলে সে জান্নাতী হবে।”

১৭) সর্বদা পালনীয় যিক্র বা প্রথম ওযীফা

উপরের যিক্রগুলো পালন করার পরে সময় সুযোগ ও আবেগ অনুসারে যতক্ষণ সম্ভব হয় উপরের প্রথম ওযীফায় বর্ণিত ১১ প্রকার যিক্র সবগুলো বা কিছু উপরের নিয়মে পালন করবেন। হাদীস শরীফে এ সময়ে উপরের ১১ প্রকার যিকিরের মধ্যে ১, ২, ৫ ও ৬ নং যিক্র (‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আল-হামদুলিল্ল­াহ’, ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ ও ‘আল্লাহু আকবার’) বেশিবেশি জপ করার জন্য বিশেষ উৎসাহ দেয়া হয়েছে ও বিশেষ ফযীলত বর্ণনা করা হয়েছে। অন্তরকে যতটুকু সম্ভব সকল পার্থিব আকর্ষণ, জাগতিক চিন্তা ও ব্যস্ততা থেকে এ সময়টুকুর জন্য মুক্ত করে, আল্লাহ্র দিকে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে যিক্র করবেন। কখনো মনোযোগ পূর্ণ না হলে চিন্তিত না হয়ে যিকিরে রত থাকতে হবে। মনোযোগ ও আবেগের কম-বেশি হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে সর্বদা চেষ্টা করতে হবে পূর্ণতার জন্য।

যারা কুরআন তিলাওয়াত করতে পারেন বা কুরআনের কিছু আয়াত বা সূরা মুখস্থ আছে তাঁরা এ সময়ে কিছু সময় তিলাওয়াত করতে পারেন।

যিক্র শেষে অন্তরের আকুতি দিয়ে আল্লাহ্র দরবারে মুনাজাত করবেন। আল্লাহ্র কাছে নিজের গোনাহ, ইবাদত পালনে দুর্বলতা, অক্ষমতা ও ত্র“টির কথা উল্লেখ করে ক্ষমা ভিক্ষা করবেন। নিজের সকল মৃত মুরব্বী, পিতামাতা, সাহাবী, তাবেয়ীন ও সকল যুগের আলিম, ফকীহ, ওলী, বুজুর্গ মাশাইখ ইত্যাদি যাদের মাধ্যমে আমরা ইসলাম পেয়েছি তাঁদের জন্য প্রাণখুলে মহব্বতের সাথে দোয়া করবেন। নিজের জন্য ও জীবিত পিতামাতা, উস্তাদ, শাইখ, আল্লাহ্র ওয়াস্তের ভাই ও সকল মুসলমানের জন্য কল্যাণ চেয়ে দোয়া করবেন। সবসময় একরকম আবেগ থাকবে না। হৃদয়ের অবস্থা ও আবেগ অনুসারে যতক্ষণ সম্ভব দোয়া করবেন। দোয়া কিন্তু শুধু চাওয়া নয়। দোয়া হল শ্রেষ্ঠ যিক্র ও ইবাদত। দোয়ার মধ্যে আবেগ আসুক বা না আসুক যতক্ষণ আমরা দোয়ায় রত থাকি ততক্ষণ আমরা ইবাদত ও যিকিরে রত থাকি। আল্লাহ্র দয়া হলে দোয়ার জন্যও আমরা যিকিরের যত সাওয়াব ও ফযীলত বর্ণনা করা হয়েছে সবই লাভ করতে পারব।

সম্ভব হলে এভাবে চাশত বা দোহার সালাত আদায় পর্যন্ত যিক্র ও মুনাজাতে রত থাকবেন। না হলে মুনাজাত শেষে নিজের কাজে যাবেন। পরে সুযোগ মত দোহার সালাত আদায় করবেন।

 

খ) সারাদিনের কর্মব্যস্ততার মধ্যে করণীয়

সারাদিনের কর্মব্যস্ততার মধ্যে প্রথম ওযীফায় উল্লেখিত যিক্রগুলো যথাসাধ্য পালন করুন। সারাদিনের কর্মব্যস্ততার মাধ্যমে বিভিন্ন নেতিবাচক অনুভূতি, রাগ, বিরাগ, বিরক্তি, কষ্ট, ব্যাথ্যা, হতাশা, হিংসা ইত্যদি প্রবল শক্তি দিয়ে আমাদের মস্তিষ্ককে আক্রমণ করে ও ক্ষতবিক্ষত করে দেয়, কলুষিত ও ভারাক্রান্ত করে। মনের ও মুখের অবসর হলেই তারা হামলা চালায় ও বিরক্তি, কষ্ট ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে। এ সকল অলস (টহঢ়ৎড়ফঁপঃরাব) ও ক্ষতিকর চিন্তা কল্পনা থেকে আত্মরক্ষার সর্বোত্তম উপায় হলো উপরে বর্ণিত ভাবে আল্লাহ্র যিকিরের মুখ ও মস্তিষ্ককে ব্যস্ত রাখুন। আপনার মুখ নাড়া দেখে কে কি বলবে তা কোন সময় চিন্তা করবেন না। পৃথিবীতে কারো কিছু করার বা দেয়ার ক্ষমতা নেই। আপনার প্রভুর সাথে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন।

গ) মাগরীবের সালাতের পরে

মাগরীবের সালাতের পরে ফজরের পরে পালনীয় ১৬ প্রকার যিক্রগুলো পালন করুন। শুধুমাত্র ৩ নং যিক্র (আল্লা-হুম্মা ইন্নী আসআলুকা ‘ইলমান না-ফি‘আন)- তার পরিবর্তে নি¤েœর যিক্রটি তিনবার বলূন:

أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ

উচ্চারণ: আ‘ঊযু বিকালিমা-তিল্লা-হিত তা-ম্মা-তি, মিন র্শারি মা- খালাক্বা।

অর্থ : “আল্লাহ্র পরিপূর্ণ বাক্যসমূহের আশ্রয় গ্রহণ করছি, তিনি যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তার অকল্যাণ থেকে।”

রাসূলুল্লাহ  বলেছেন, যদি কেউ সন্ধ্যার সময় এ দোয়াটি তিন বার পাঠ করে তাহলে সে রাতে কোনো বিষ বা দংশন তাকে ক্ষতি করতে পারবে না। তিনি আরো বলেন, যদি কেউ কোনো স্থানে গমন করে বা সফরে কোথাও থামে এবং উপরের দোয়াটি বলে, তাহলে সে স্থান পরিত্যাগের আগে (সে স্থানে অবস্থান রত অবস্থায়) কোনো কিছু তার ক্ষতি করতে পারবে না।

তৃতীয় ওযীফা : যোহর, আসর ও ইশার পরে পালনীয়

যোহরের সালাতের পরে উপরের দ্বিতীয় ওযীফা বা সকালের ওযীফায় উল্লেখিত যিক্রগুলোর মধ্য থেকে নি¤েœর যিক্রগুলো পালন করুন।

১) তিন বার: أَسْتَغْفِرُ اللهَ (আসতা‘গফিরুল্লা-হ)

২) এক বার: আল্লা-হুম্মা আনতাস সালা-মু ওয়া মিনকাস সালা-মু, তাবা-রাকতা ইয়া যাল জালা-লি ওয়াল ইকরা-ম।

৩) একবার: আয়াতুল কুরসী:

৪) একবার করে: সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস

৫) একশতবার করে চারটি যিক্র মোট ৪০০ বার: ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আল-হামদুলিল্ল­াহ’, ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ ও ‘আল্লাহু আক সময় না থাকলে যোহর ও ইশার সালাতের পরে ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদু লিল্লাহ ও ৩৪ বার আল্লাহু আকবার পাঠ করবেন। আসরের সালাতের পরে ১০০ বার করে ৪টি যিক্র মোট ৪০০ বার পালন করবেন।

৬) একবার “আল্লা-হুম্মা, আ‘ইননী ‘আলা- যিক্রিকা ওয়া শুকরিকা ওয়া হুসনি ‘ইবা-দাতিকা।”

আসরের সালাতের পরে চেষ্টা করবেন উপরের যিক্র পালনের পরে কিছুক্ষণ প্রথম ওযীফার সর্বদা পালনীয় যিক্রগুলো, বা অন্তত ১, ২, ৫ ও ৬ নং যিক্র (‘সুবহানাল্লাহ’,  ‘আল-হামদুলিল্ল­াহ’, ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ ও ‘আল্লাহু আকবার’) কিছু সময় আদায় করতে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সালাতুল আসরের পর থেকে সুর্যাস্ত পর্যন্ত এ যিক্রগুলো পালন করতে বিশেষভাবে উৎসাহ প্রদান করেছেন ও বিশেষ ফযীলতের কথা জানিয়েছেন। আমাদের উচিত সাধ্যমত তা পালন করার।

বিশেষ করে শুক্রবার আসরের পর থেকে সুর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে দোয়া কবুল হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সাহাবী-তাবেয়ীগণের যুগে এসময়ে যিক্র ও দোয়া করার বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হতো।

ইশার সালাতের পরে উপরের ওযীফাগুলো আদায়ের পরে দু’টি অতিরিক্ত ওযীফা পালনের চেষ্টা করবেন: কুরআন ও দরুদ শরীফ। হাদীসের আলোকে আমরা দেখতে পাই যে, কুরআন ও দরুদ পাঠের বিশেষ ওযীফা শেষ রাত্রে পালন করা উত্তম। যিনি শেষ রাতে উঠতে পারেন না বা উঠে বেশি গময় ওযীফার জন্য ব্যয় করতে না পারেন, তিনি প্রথম রাতে ইশার সালাতের পরে বা ঘুমাতে যাওয়ার আগে এ ওযীফা দু’টি পালন করবেন।

কুরআন কারীমের ওযীফা

কুরআন কারীম মহান আল্লাহ্র বাণী। মানব জাতির জন্য আল্লাহ্র মহা নেয়ামত। কুরআন আল্লাহ্র জীবন্ত মু’জিজা। কুরআন তিলাওয়াতকারী নিজের মানবীয় মুখে মহান আল্লাহ্র বাণী ধারণ ও উচ্চারণ করে। সৃষ্টির জন্য তার চেয়ে বড় নেয়ামত আর কী হতে পারে? যে মানুষ ঈমান ও ইসলামের  দাবী করেও কুরআন তিলাওয়াত করতে শেখে নি তার চেয়ে হতভাগা আর কে হতে পারে?

সর্বশ্রেষ্ঠ আল্লাহ্র যিক্র হলো কুরআন তিলাওয়াত করা, কুরআনের অর্থ অনুধাবন করা, কুরআনের আয়াত নিয়ে চিন্তা করা, কুরআন শিক্ষা করা, কুরআন শিক্ষা দান করা, কুরআনের আলোচনা করা ও সর্বোপরি কুরআনের নির্দেশ অনুসারে কর্ম করা Ñ এগুলো সবই যিক্র। শুধু তাই নয়। এগুলোই সর্বশ্রেষ্ঠ যিক্র। উপরে “যিকিরের” যত ফযীলত ও সাওয়াবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা পূর্ণতম রূপে অর্জিত হবে কুরআন কারীম তিলাওয়াত, অনুধাবন ও চর্চার মাধ্যমে। এছাড়া কুরআন তিলওয়াত, অনুধাবন ও পালনের অতিরিক্ত অফুরন্ত সাওয়াব, পুরস্কার ও মর্যাদার কথা কুরআন ও হাদীসে ঘোষণা করা হয়েছে। সর্বোপরি কুরআন তিলাওয়াতের মধ্যে আত্মার প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভ হয় সবচেয়ে বেশি।

প্রত্যেক মুমিনের অন্যতম দায়িত্ব হলো বিশুদ্ধ কুরআন তিলাওয়াত শেখা, নিয়মিত তিলাওয়াত করা ও যথাসাধ্য অর্থ বুঝার চেষ্টা করা। প্রতিদিন আধাঘন্টা করে সময় দিলেই মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে বিশুদ্ধ কুরআন তিলাওয়াত শেখা যায়। একবার হৃদয়পটে কুরআনের মর্যাদা ছবিটা আঁকতে ও কুরআনের ভালবাসা সৃষ্টি করতে পারলে প্রতিদিন কিছু সময় কুরআনের জন্য প্রদান খুবই সহজ ও আনন্দের কাজে পরিণত হবে।

দরুদের ফযীলত ও গুরুত্ব ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি। সালাতুল ইশার পরে বা ঘুমাতে যাওয়ার আগে এ ওযীফা দু’টি পালন করবেন। এখানে ঘুমানোর আগে পালনের ওযীফার মধ্যে এ দু’টিকে উল্লেখ করব। কারণ সাধারণত আমাদের জন্য শেষ রাত্রে উঠে এগুলো পালন কষ্টকর হয়।

চতুর্থ ওযীফা : রাত্রে বিছানায় শয়ন করার আগে ও পরে

মুমিনের দিনের শুরু হয় তার প্রভুর স্মরণ ও প্রার্থনার মধ্য দিয়ে। সমাপ্তিও করতে হবে সেভাবে। তাহলে তার পুরো জীবন আল্লাহ্র করুণা ও বরকতে সিক্ত হবে। সত্যিকারের পবিত্র, উৎকণ্ঠামুক্ত ও আল্লাহ্র প্রেম ও আস্থায় ভরপুর হৃদয় ও জীবন লাভ করবেন তিনি। তার জীবনের সকল কর্মই আখেরাতের পাথেয়তে পরিণত হবে।

ক) শয়নের পূর্বে

ঘুমানোর পূর্বে অন্তত আধাঘন্টা সময় হাতে রেখে ওযু করে পবিত্র হোন। যারা শেষ রাতে তাহাজ্জুদ পালন করতে পারবেন না তাঁর এ সময়ে কয়েক রাক‘আত “রাতের সালাত” বা কিয়ামুল্লাইল (তাহাজ্জুদ) ও বিতর আদায় করে সাধ্যমত ১০/১৫ মিনিট বা আধাঘন্টা তিলাওয়াত করুন। প্রতিদিনের জন্য সাধ্যমত ২/৪ পৃষ্ঠা ওযীফা করে নিন। সম্ভব হলে তিলাওয়াতের সাথে সাথে যে কোন নির্ভরযোগ্য অনুবাদ বা তাফসীর গ্রন্থের মাধ্যমে অর্থ বুঝার চেষ্টা করুন। অসুবিধা হলে তরজমা ও তাফসীরের জন্য অন্য একটি অবসর সময় নির্ধারণ করবেন।

কুরআন কারীম নিয়মিত ধারাবাহিকভাবে পাঠ করতে হবে। যেন প্রতি মাসে বা কয়েক মাসে একবার খতম করা যায়। তবে হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ  ঘুমানোর পূর্বে নি¤েœর সূরাগুলো পাঠ করতেন :

১) সূরা বনী ইসরাঈল (কুরআন কারীমের ১৬ নং সূরা)

২) সূরা সাজদা, (কুরআন কারীমের ৩২ নং সূরা)

৩) সূরা যুমার (কুরআন কারীমের ৩৯ নং সূরা)

৪) সূরা মুলক (কুরআন কারীমের ৬৭ নং সূরা)

এজন্য আমরা এগুলোকে প্রতিদিন রাত্রে ঘুমানোর আগে ওযীফা হিসাবে পাঠ করতে পারি। ১০/১৫ মিনিট ধারাবাহিক তিলাওয়াতের পরে এ সূরাগুলো বা এগুলো থেকে দুই একটি সূরা নিয়মিত পাঠ করবেন।

যারা কুরআন তিলাওয়াত করতে পারেন না, অথচ কুরআনের কিছু বড় বা ছোট সূরা মুখস্থ আছে, যেমন সূরা রাহমান, সূরা ইয়াসিন ইত্যাদি তারা এ সময়ে সেগুলো পাঠ করতে পারেন। তবে দ্রুত কুরআন তিলাওয়াত শিখে নেয়ার চেষ্টা করতে হবে।

কুরআন তিলাওয়াতের পরে যথাসম্ভব বেশি দরুদ পাঠের চেষ্টা করুন। অন্তত, একশতবার দরুদ-সালাম পাঠ ওযীফা হিসাবে গ্রহণ করুন।

তারপর মনের আবেগ অনুসারে কমবেশি কয়েক মিনিট মুনাজাত করুন। নিজের ও জীবিত ও মৃত আপনজন, বুজুর্গ, আলেম, মাশাইখ ও আল্লাহ্র জন্য যাদের মহব্বত করেন সকলের জন্য দোয়া করুন। সারাদিনে পরিবার বা সমাজের কারো ব্যবহারে কষ্ট পেলে, বিরক্ত হলে আল্লাহ্ কাছে নিজের ও তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিজের মনের সকল ব্যথা, কষ্ট, অসুবিধা, আকুতি মহান আল্লাহ্র দরবারে পেশ করে সাহায্য ও ত্রাণ প্রার্থনা করুন। আল্লাহ্র রহমত, তাওফীক, নির্দেশনা ও কবুলিয়্যত চান। নিজেকে পরিপূর্ণভাবে তাঁর দয়ার উপর ন্যস্ত করে বিছানায় গমন করুন।

খ) শয়নের পরে

১) ১০০ তাসবীহ: ৩৩ বার  ‘সুবহানাল্লাহ’, ৩৩ বার ‘আল-হামদু লিল্লাহ’, ৩৪ বার ‘আল্লাহু আকবার’ ফাতিমা (রা) রাসূলুল্লাহ -এর কাছে সাংসারিক কাজে তাকে সাহায্য করার জন্য একজন খাদেমা চাইলে তিনি তাকে এ তাসবীহগুলো ঘুমানোর পূর্বে পাঠ করতে নির্দেশ দেন।

২) ১ বার আয়াতুল কুরসী। ঘুমানোর আগে এ আয়াতটি পাঠ করলে সারারাত আল্লাহ্র পক্ষ থেকে হেফাজত করা হবে বলে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।

৩) ১ বার সূরা বাকারার শেষ দু আয়াত। রাসূলুল্লাহ () বলেন, যদি কেউ রাতে এ দু আয়াত পাঠ করে তবে তা তাঁর জন্য যথেষ্ট হবে।

৪) ১ বার সূরা কা-ফিরূন: রাসূলুল্লাহ  এ সূরা পড়ে ঘুমাতে বলেছেন এবং বলেছেন এ হলো র্শিক থেকে বিমুক্তি।

৫) ১ বার সূরা ইখলাস:

রাসূলুল্লাহ  সাহাবীগণকে বলেন, তোমরা কি পারবে না রাতে কুরআন কারীমের একতৃতীয়াংশ তিলাওয়াত করতে? বিষয়টি তাঁদের কাছে কষ্টকর মনে হলো। তাঁরা বললেন: হে আল্লাহ্র রাসূল, আমাদের মধ্যে কে-ই বা তা পারবে? তখন তিনি বলেন: ‘কুল হুআল্লাহু আহাদ্’ সূরাটি কুরআনের এক তৃতীয়াংশ।

৬) সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পাঠ করে শরীরে বুলানো (৩ বার)

রাসূলুল্লাহ  ঘুমানোর পূর্বে ৩ বার দুটি হাত একত্রিত করে এ সূরাগুলো পাঠ করে হাতে ফুঁ দিয়ে হাত দু’টি যথাসম্ভব শরীরের সর্বত্র বুলাতেন। তিনি হাত বুলানোর সময় মাথা, মুখ ও শরীরের সামনের দিক থেকে শুরু করতেন।

৭) বিশেষ মুনাজাত একবার

اللَّهُمَّ رَبَّ السَّمَاوَاتِ وَرَبَّ الأَرْضِ وَرَبَّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ رَبَّنَا وَرَبَّ كُلِّ شَيْءٍ فَالِقَ الْحَبِّ وَالنَّوَى وَمُنْزِلَ التَّوْرَاةِ وَالإِنْجِيلِ وَالْفُرْقَانِ أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ كُلِّ شَيْءٍ أَنْتَ آخِذٌ بِنَاصِيَتِهِ اللَّهُمَّ أَنْتَ الأَوَّلُ فَلَيْسَ قَبْلَكَ شَيْءٌ وَأَنْتَ الآخِرُ فَلَيْسَ بَعْدَكَ شَيْءٌ وَأَنْتَ الظَّاهِرُ فَلَيْسَ فَوْقَكَ شَيْءٌ وَأَنْتَ الْبَاطِنُ فَلَيْسَ دُونَكَ شَيْءٌ اقْضِ عَنَّا الدَّيْنَ وَأَغْنِنَا مِنَ الْفَقْرِ

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা, রাব্বাস সামা-ওয়া-তি ওয়ারাব্বাল আরদ্বি ওয়ারাব্বাল ‘আরশিল ‘আযীম। রাব্বানা- ওয়ারাব্বা কুল্লি শাইয়িন, ফা-লিকিল হাব্বি ওয়ান নাওয়া-। ওয়া মুনযিলাত তাওরা-তি ওয়াল ইনজীলি ওয়াল ফুরকা-ন। আ‘ঊযু বিকা মিন র্শারি কুল্লি শাইয়িন আনতা আ-খিযুম বিনা-সিয়্যাতিহী। আল্লা-হুম্মা, আনতাল আউআলু, ফালাইসা ক্বাবলাকা শাইউন। ওয়া আনতাল আ-খিরু ফালাইসা বা’দাকা শাইউন। ওয়া আনতায যা-হিরু ফালাইসা ফাউক্বাকা শাইউন। ওয়া আনতাল বা-তিনু ফালাইসা দূনাকা শাইউন। ইকদ্বি আন্নাদ দাইনা ওয়া আগনিনা- মিনাল ফাক্বর।

অর্থ : “হে আল্লাহ্, আসমানসমূহ ও জমিনের প্রভু এবং মহান আরশের প্রভু, আমাদের প্রভু এবং সবকিছুর প্রভু, যিনি অঙ্কুরিত করেন শস্য বীজ ও আঁটি, যিনি নাজিল করেছেন তাওরাত, ইঞ্জিল ও ফুরকান ; আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি আপনার কাছে আপনার নিয়ন্ত্রণে যত কিছু রয়েছে সবকিছুর অকল্যাণ ও অমঙ্গল থেকে। হে আল্লাহ্, আপনিই প্রথম, আপনার পূর্বে আর কিছুই নেই। এবং আপনিই শেষ, আপনার পরে আর কিছুই নেই। এবং আপনিই প্রকাশ্য, আপনার উপরে আর কিছুই নেই। এবং আপনিই গোপন, আপনার নি¤েœ আর কিছুই নেই। আপনি আমাদের ঋণমুক্ত করুন এবং আমাদেরকে দারিদ্র থেকে মুক্তি দিয়ে সচ্ছলতা প্রদান করুন।”

রাসূলুল্লাহ  ফাতিমা (রা.) ও অন্যান্য সাহাবীকে বিছানায় শয়ন করার পরে (ডান কাতে শুয়ে) এ মুনাজাতটি পাঠ করতে শিক্ষা দিতেন।

৮) ঘুমের আগে সর্বশেষ মুনাজাত, একবার

اللَّهُمَّ أَسْلَمْتُ نَفْسِي إِلَيْكَ وَفَوَّضْتُ أَمْرِي إِلَيْكَ وَأَلْجَأْتُ ظَهْرِي إِلَيْكَ رَغْبَةً وَرَهْبَةً إِلَيْكَ لَا مَلْجَأَ وَلَا مَنْجَا مِنْكَ إِلَّا إِلَيْكَ آمَنْتُ بِكِتَابِكَ الَّذِي أَنْزَلْتَ وَبِنَبِيِّكَ الَّذِي أَرْسَلْتَ

উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা, আসলামতু নাফসী ইলাইকা, ওয়াফাওআদ্বতু আমরী ইলাইকা,ওয়া আলজা’তু যাহরী ইলাইকা, রাগবাতান ওয়ারাহবাতান ইলাইকা, লা- মালজাআ ওয়ালা- মানজা- মিনকা ইল্লা- ইলাইকা। আ-মানতু বিকিতা-বিকাল্লাযী আনযালতা, ওয়াবি নাবিয়্যিকাল্লাযী আরসালতা।

অর্থ : “হে আল্লাহ্, আমি সমর্পণ করলাম আমাকে আপনার কাছে, দায়িত্বার্পণ করলাম আপনাকে আমার যাবতীয় কর্মের, আমার পৃষ্ঠকে আপনার আশ্রয়ে সমর্পিত করলাম, আপনার প্রতি আশা ও ভয়ের সাথে। আপনার কাছে থেকে আপনি ছাড়া কোনো আশ্রয়স্থল নেই ও কোনো মুক্তির স্থান নেই। আমি ঈমান এনেছি আপনি যে কিতাব নাযিল করেছেন তার উপর এবং আপনি যে নবী () প্রেরণ করেছেন তার উপর।”

বারা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ  আমাকে বলেন, “যখন তুমি বিছানায় যাবে তখন নামাযের ওযুর মতো ওযু করবে। তারপর ডান কাতে শুয়ে বলবে: (উপরের বাক্যগুলো)। এ বাক্যগুলো তোমার শেষ কথা হবে। যে ব্যক্তি এ দোয়া পাঠের পরে সে রাত্রিতে মৃত্যুবরণ করবে সেই ব্যক্তি ফিতরাতের উপরে (নিষ্পাপভাবে) মৃত্যু বরণ করবে। আর যদি বেঁচে থাকে তাহলে কল্যাণময় দিবস শুরু করবে।”

মহান প্রভুর উপর গভীর আস্থাশীল মুমিন সাধারণত উৎকন্ঠামুক্ত হন। তাই চিন্তাহীন ভারমুক্ত হৃদয়ে অতি সহজেই ঘুমিয়ে পড়েন। তারপরও অনেক সময় সাংসারিক সামাজিক বিভিন্ন সমস্যা মস্তিষ্ককে ভারী করে। বারবার বিভিন্ন উৎকণ্ঠা বা চিন্তা মাথায় আসে এবং ঘুম আসতে দেয় না। এভাবে ঘুম আসতে দেরী হলে জাগতিক অপ্রয়োজনীয় বা হিংসা, বিদ্বেষ, বিরক্তি বা অহংকার উদ্রেককারী চিন্তা কল্পনায় তাকে  না ছুটিয়ে অর্থের দিকে লক্ষ্য রেখে নিশ্বাসের সাথে মনের মধ্যে যে কোন যিক্র অনুভব করতে পারেন। যেমন মনে মনে নিশ্বাসের সাথে সাথে “লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ” অনুভব করুন। নিজের মস্তিষ্ক, হৃদয় ও অনুভবকে এ যিক্রময় শ্বাস দিয়ে পবিত্র করার অনুভূতি মনে আনতে পারেন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ঘুম এসে যাবে।

গ) রাত্রে ঘুম ভেঙ্গে গেলে

রাত্রে যে কোনো সময় ঘুম ভাঙ্গলে তাহাজ্জুদ আদায় করা যায়, তবে শেষ রাত্রে তাহাজ্জুদ আদায় উত্তম। রাতে ঘুম ভাঙ্গলে উঠার ইচ্ছা থাক বা আবার ঘুমের রাজ্যে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা থাক সর্বাবস্থায় নি¤েœর যিক্রটি বলবেন:

لا إِلَهَ إِلا اللَّهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ الْحَمْدُ لِلَّهِ وَسُبْحَانَ اللَّهِ وَلا إِلَهَ إِلا اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ وَلا حَوْلَ وَلا قُوَّةَ إِلا بِاللَّه

উচ্চারণ : লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু, ওয়া‘হদাহু লা-শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু, ওয়া লাহুল ‘হামদ, ওয়া হুআ ‘আলা- কুল্লি শাইয়্যিন ক্বাদীর, ‘আল-‘হামদু লিল্লাহ’, ওয়া ‘সুব‘হা-নাল্লা-হ’, ওয়া লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু, ওয়া ‘আল্লা-হু আকবার’, লা-‘হাওলা ওয়া লা-ক্বুওয়াতা ইল্লা বিল্লা-হ।

অর্থ : “আল্লাহ্ ছাড়া কোনো মা’বুদ নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক নেই। রাজত্ব তাঁরই, এবং প্রশংসা তাঁরই। এবং তিনি সর্বোপরি ক্ষমতাবান। সকল প্রশংসা আল্লাহ্র। আল্লাহ্র পবিত্রতা ঘোষণা করছি। আল্লাহ্ ছাড়া কোনো মা’বুদ নেই। আল্লাহ্ সর্বশ্রেষ্ঠ। কোনো অবলম্বন নেই, কোনো ক্ষমতা নেই আল্লাহ্র (সাহায্য) ছাড়া।”

রাসূলুল্লাহ  বলেছে‘ন, “যদি কারো রাত্রে ঘুম ভেঙ্গে যায় অতঃপর সে উপরের যিকিরের বাক্যগুলো পাঠ করে এবং তারপর সে আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা চায় অথবা কোনো প্রকার দোয়া করে বা কিছু চায় তাহলে তার দোয়া কবুল করা হবে। আর যদি সে তারপর উঠে ওযু করে (তাহাজ্জুদের) নামায আদায় করে তাহলে তার নামায কবুল করা হবে।”

উপসংহার: পরিবার ও পারিবারিক জীবন

আমরা আগেই দেখেছি যে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহ্র বিধান মান্য করার নামই ইসলাম। এ গ্রন্থের সংক্ষিপ্ত পরিসরে অনেক প্রয়োজনীয় বিষয় আলোচনা করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে উপসংহারে মানব জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ পরিবার ও সমাজ সম্পর্কে অতি সংক্ষেপে কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করছি। মহান আল্লাহ্র তাওফীক ও কবুলিয়্যাত কামনা করছি।

ক. বিবাহ ও পরিবার মানব সভ্যতার ভিত্তি

মানব সভ্যতার মূল উপাদান “মানুষ” আর বিবাহ ও পরিবারের মাধ্যমে মানুষের জন্ম ও সংরক্ষণ। পরিবারের অস্তিত্বের উপরেই নির্ভর করে মানব সভ্যতার অস্তিত্ব। অতীতে বিভিন্ন সমাজে ধার্মিকতার নামে বিবাহ এবং পরিবারের সদস্যদের প্রতি দায়িত্ব পালনকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে এবং কৌমর্য ও বৈরাগ্যকে উচ্চমার্গের ধার্মিকতা বলে গণ্য করা হয়েছে।

আধুনিক যুগে সভ্যতা, নারী অধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন, সম-অধিকার ইত্যাদির নামে এবং সর্বোপরি অশ্লীলতার প্রসারের কারণে বিবাহ ও পরিবার গঠনের আগ্রহ কমে গিয়েছে। উপরন্তু গঠিত পরিবারের বিচ্ছেদ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বস্তুত আধুনিক ভোগবাদী সভ্যতায় বিবাহ ও পরিবারের অস্তিত্ব প্রায় বিপন্ন। যে জনগোষ্ঠী যত “সভ্য” বা যত “উন্নত” হচ্ছে সে সমাজের মানুষদের মধ্যে বিবাহ ও পরিবার গঠনের প্রবণতা তত হ্রাস পাচ্ছে এবং বিচ্ছেদ ও পারিবারিক সহিংসতা তত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আধুনিক “সভ্যতা”-র ছোয়া আমাদের দেশেও লেগেছে। পারিবারিক সহিংসতা ও অশান্তি বাড়ছে। এমনকি বিবাহ ও পরিবার-বিহীন অশ্লীল ও ছন্নছাড়া জীবন যাপনের প্রবণতার প্রকাশ পাচ্ছে। ধার্মিক পরিবারগুলোতে অশান্তির ছোয়া লেগে যাচ্ছে। এজন্য সুন্নাহর আলোকে পারিবারিক দায়িত্বাদি সম্পর্কে অতি সংক্ষেপে পরামর্শমূলক কয়েকটি কথা লিখছি।

খ. পরিবার গঠনে ইসলামের  নির্দেশনা

ইসলামে বিবাহ ও পারিবারিক জীবনকে অন্যতম ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ব্যক্তি মানুষ- নারী ও পুরুষ উভয়ের পার্থিব জীবনকে মানবীয় সীমাবদ্ধতা ও পার্থিব সমস্যাদির মধ্যে থেকেই উপভোগ করার জন্য, মানব জীবনের অন্যতম চাহিদা সন্তানের স্নেহ ও ভালবাসার আন্তরিক অনুভবের জন্য, মৃত্যুর পরও স্মৃতি ও দুআ অব্যাহত রাখার জন্য এবং সর্বোপরি আখিরাতের অনন্ত জীবনকে উপভোগ করার জন্য বিবাহ ও পারিবারিক জীবন আমাদের জন্য অপরিহার্য।

বর্তমানে আমরা বিভিন্ন অযুহাতে বিবাহ একটু বেশি বয়সে দেয়ার বা করার চেষ্টা করি। পক্ষান্তরে বিবাহ করার মত বয়স হলেই যথাশীঘ্র বিবাহ দেয়া ও বিবাহ করা ইসলামের  নির্দেশ। আল্লাহ্ বলেন: “তোমাদের মধ্যে যারা সঙ্গীবিহীন পুরুষ বা মহিলা তোমরা তাদেরকে বিবাহ দাও … তারা অভাবগ্রস্থ হলে আল্লাহ্ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দিবেন। আল্লাহ্ তো প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ। আর যাদের বিবাহের সামর্থ নেই, আল্লাহ্ তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে অভাবমুক্ত না করা পর্যন্ত যেন তারা সংযম অবলম্বন করে…।” (সূরা নূর ৩২-৩৩ আয়াত।)

রাসূলুল্লাহ  ()-বলেন, “হে যুবকের দল, তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহের দায়িত্বাদি পালন করতে সক্ষম তারা যেন বিবাহ করে, কারণ বিবাহ তার চক্ষুকে অধিকতর সংযত করবে এবং তার গোপন অঙ্গকে অধিকতর সংরক্ষিত রাখবে। আর যে তাতে সক্ষম হবে না সে যেন সিয়াম পালন করে, কারণ রোযা তাকে সংযত করবে।”-(বুখারী ও মুসলিম)

তিনি বলেন, “বিবাহ আমার সুন্নাত বা রীতি। কাজেই যে ব্যক্তি আমার সুন্নাত অনুযায়ী কর্ম করবে না সে আমার সাথে সম্পর্কিত নয়। তোমরা বিবাহ করো, কারণ আমি আমার উম্মতের বর্ধিত সংখ্যা দিয়ে অন্যান্য জাতির কাছে গৌরব প্রকাশ করব।” (ইবনু মাজাহ-সহীহুল জামি।)

বিবাহের পাত্রপাত্রী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ () ধার্মিকতা ও আচরণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করতে নির্দেশ দিয়েছেন। পাত্রী পছন্দের ক্ষেত্রে তিনি বলেছেন: “একজন নারীকে চারটি বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে বিবাহ করা হয়: তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য এবং তার ধার্মিকতা। তুমি ধার্মিক মেয়েকে বেঁছে নিয়ে- অন্য হাদীসে: ধার্মিক ও সুন্দর আচরণের মেয়েকে বেঁছে নিয়ে সফলতা অর্জন কর।”-(সহীহ মুসলিম)

পাত্র পছন্দের ক্ষেত্রে তিনি বলেন: “যদি এমন কোনো পাত্র তোমাদেরকে প্রস্তাব দেয় যার ধার্মিকতা এবং ব্যবহার-আচরণ তোমাদের কাছে সন্তোষজনক, তাহলে তোমরা তাকে বিবাহ দিবে। যদি তোমরা তা না কর তাহলে পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা এবং বিস্তৃত অশান্তি হবে।”-(তিরমিযী)

রাসূলুল্লাহ ()-এর নির্দেশ অমান্য করে আমরা সাধারণত সৌন্দর্য, বংশ, অর্থ-সম্পদ, প্রতিষ্ঠা ইত্যাদির প্রতি সর্বোচ্চ  গুরুত্ব আরোপ করি। ধার্মিককে সর্বনিম্ন গুরুত্ব প্রদান করি। কখনো বা ধার্মিককে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাধা মনে করি। যেমন, দাড়িওয়ালা বা স্ত্রীকে পর্দা করাতে আগ্রহী পাত্র বা শরীয়ত নির্দেশিত পর্দা পূর্ণরূপে পালনে আগ্রহী পাত্রীকে আমরা অনেকেই পছন্দ করি না। আমরা বর্তমানে পারিবারিক অশান্তি, সহিংসতা, যৌতুক, স্ত্রী-নির্যাতন, স্বামী-নির্যাতন, তালাক, হিলা ইত্যাদি যা কিছু দেখছি সবই “বিস্তৃত অশান্তি”-র অংশ। রাসূলুল্লাহ ()-এর নির্দেশ মেনে আমরা এ অশান্তি থেকে বহুলাংশে রক্ষা পেতাম।

গ. উপভোগ্য সুন্দর পারিবারিক জীবনের জন্য

পরিবার গঠন করার চেয়ে অনেক কঠিন উপভোগ্য সুন্দর পরিবারিক জীবন যাপন করা। সুন্নাহর আলোকে কয়েকটি পরামর্শ এখানে উল্লেখ করছি:

(১) বাস্তবতা অনুধাবন

দুজন “অপূর্ণ” একত্রিত হয়ে পরিবার গঠন করেন, এতে আংশিক পূর্ণতা আসে, আবার অপূর্ণতার বাড়ে। পারিবারিক জীবনে গমস্যা থাকবেই। রোমান্টিক স্বপ্ন দেখে বিবাহ করে কিছুদিন পরে কঠোর বাস্তবতার কারণে হতাশ হওয়া একটি বড় সমস্যা। আবার অনেক নারী বা পুরুষ পারিবারিক সমস্যা, সহিংসতা ইত্যাদির কথা শুনে আজীবন বিবাহ না করার চিন্তা করেন। এ হলো রাস্তায় দুর্ঘটনার ব্যাপকতার কারণে আজীবন রাস্তায় বের না হওয়ার সিদ্ধান্তের মত। অবিবাহিত জীবন মানুষকে পরিবার ও সন্তানের স্নেহ-এমনতা, সাহচার্য ও সহায়তা থেকে বঞ্চিত করে এবং শেষ জীবনে বেদনাদায়ক নিসঙ্গতায় নিপতিত করে।

একটি উপভোগ্য পরিবারের জন্য আমাদের বুঝতে হবে যে, একা থাকা জীবনের সাথে প্রতারণা করা। পাশাপাশি দাম্পত্য জীবনে শতভাগ “মনের মত ভাল” সঙ্গী কখনোই পাওয়া যায় না। শুধু যৌবন নয়, বরং জীবনকে উপভোগের জন্য আমরা পরিবার গঠন করি। জীবনের স্বাথেই আমরা কিছু পাওয়ার জন্য কিছু ত্যাগ করব, অধিকার লাভের জন্য দায়িত্ব পালন করব এবং সবাই মিলে ত্যাগ ও ভোগের মাধ্যমে সকল সীমাবদ্ধতার মধ্যেই উপভোগ্য পরিবার গড়ব।

(২) সঙ্গী নির্বাচনে সুন্নাহ অনুসরণ ও ধার্মিকতার অনুশীলন

উপভোগ্য পারিবারিক জীবনের জন্য সঙ্গীর সঠিক ধর্মীয় জ্ঞান, বিশ্বাস, হালাল-হারাম, ফরয-ওয়াজিব পালন, বান্দার হক্ক সচেতনতা ও আচরণের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করুন। প্রয়োজনে অন্যান্য দিকে কিছু ছাড় দিন। বিবাহ আজীবনের সম্পর্ক। সৌন্দর্য কিছুটা আপেক্ষিক এবং ক্ষয়িঞ্চু। অর্থ-সম্পর্দের কমতি কিছু কষ্ট দিলেও তা বহনযোগ্য। কিন্তু ধার্মিকতা ও আচরণের কোনো বিকল্প নেই। এ দুটি বিষয় না থাকলে জীবন নরকে পরিণত হতে পারে।

অনেক যুবক পূর্ণ-পর্দা পালনকারী পাত্রী পছন্দ করেন না। অথচ স্ত্রী অন্য পুরুষের সাথে আড্ডা দিলে বিরক্ত হন বা সন্দেহ করেন। অনেক মেয়ে দাড়িওয়ালা যুবককে বিবাহ করতে চান না। কিন্তু স্বামী অন্য মেয়ের সাথে আড্ডা দিলে বিরক্ত হন বা সন্দেহ করেন। এরূপ সন্দেহ ও আপত্তির মুখে অনেক পরিবার ভাঙ্গছে বা অশান্তির আগুনে জ্বলছে। জীবনের সুদীর্ঘ চলার পথে অসংখ্য বার ঝগড়া, মনোমালিন্য বা ভুলবুঝাবুঝি হবে। এ সকল ক্ষেত্রে আল্লাহ্র ভয়, আখিরাতের চেতনা বা ধার্মিকতা মানুষকে রক্ষা করে।

বিবাহিত জীবনে স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের তাকওয়া বৃদ্ধির জন্য উভয়েরই সর্বোচ্চ চেষ্টা ও সহযোগিতা করতে হবে। উভয়ে উভয়কে ধর্মীয় মূল্যবোধ, জ্ঞান ও অনুশীলন বৃদ্ধির জন্য কুরআন-হাদীস অর্থ-সহ বুঝে পড়তে, বিশুদ্ধ দীনী বই পড়তে, ফরয-নফল ইবাদত পালন করতে, ভাল আলিমদের দীনী আলোচনায় অংশ নিতে উৎসাহ ও সহযোগিতা করবেন। সম্ভব হলে পরিবারের সদস্যগণ সকলে একত্রে প্রতিদিন কিছু সময় অর্থসহ কুরআন পাঠ করবেন। সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন কয়েকটি পরিবার একত্রে সপ্তাহে একদিন কিছু সময় একজন ভাল আলিমের সান্নিধ্যে দীনী আলোচনায় শরীক হবেন। এ সকল কাজের জন্য স্বামী-স্ত্রী দুজনের বা একজনের কিছু অসুবিধা হলেও তা সহ্য করতে হবে। নিজের ও পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্যই তা করতে হবে।

স্বামী-স্ত্রী উভয়ে একত্রে তাহাজ্জুদের অভ্যাস করুন। রাসূলুল্লাহ () বলেন: যদি কোনো স্বামী বা স্ত্রী রাতে ঘুম থেকে উঠে সঙ্গীকে জাগ্রত করে এবং দুজনে একত্রে দু রাকআত সালাত আদায় করে তাহলে তাদেরকে আল্লাহ্র শ্রেষ্ঠ যাকির-আবিদ হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয়।”-(আবু দাউদ, ইবনু মাজাহ, সহীহুত তারগীব) যদি ঘুমানোর পর উঠতে না পারেন তবে ঘুমানোর আগে দুজনে একত্রে এ সালাত আদায়ের অভ্যাস করবেন। স্বামী-স্ত্রী জামাতে সালাত আদায় করলে সামনে পিছনে দাঁড়াতে হয়। কিরাত জোরে বা আস্তে পড়তে পারেন।

(৩) স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক দায়িত্ববোধ

যে কোনো ঐক্য, সঙ্ঘ বা ইউনিয়নে কাউকে নেতৃত্ব দিতে হয়। কাউকে নেতৃত্ব না দিলে বা সকলেই নেতা হলে সে সঙ্ঘ ভঙ্গ হতে বাধ্য। কাউকে নেতৃত্ব দেয়ার অর্থ তাকে স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ দেয়া বা তাকে অন্যদের প্রভু বানিয়ে দেয়া নয়। নেতৃত্ব দেয়ার অর্থ তাকে কিছু অতিরিক্ত দায়িত্ব ও অধিকার দেয়া। অন্যান্য সদস্যদের সাথে পরামর্শ ও সহযোগিতার মাধ্যমে তিনি ইউনিট পরিচালনা করবেন এবং অন্যরা স্বাভাবিক ভাবে তার আনুগত্য করবে। এখন প্রশ্ন হলো, দুজনে মিলে যে পারিবারিক ইউনিটটি গঠন করা হলো তার নেতৃত্ব কে নেবেন? স্বামী? না স্ত্রী? না কারো কোনো নেতৃত্ব থাকবে না, প্রত্যেকে যার যার ইচ্ছা মত চলবেন?

নারী-পুরুষের মনোদৈহিক গঠনের বৈজ্ঞানিক তথ্য সম্পর্কে সামান্য জ্ঞান আছে এএই সকল বিবেকবান নারী ও পুরুষ একথা মানবেন যে, দুজনের পারিবারিক ইউনিটে নেতৃত্ব অবশ্যই স্বামীকে গ্রহণ করতে হবে। নইলে পারিবারিক এ ঐক্য অনৈক্যে পরিণত হতে বাধ্য। ইসলামের  দৃষ্টিতে পরিবার গঠন অর্থ স্বামীর অধীনতা বা দাসত্ব নয়। স্বামী-স্ত্রী উভয়ের পারস্পরিক অধিকার সমান। তবে স্বামীকে নেতৃত্বের অতিরিক্ত দায়িত্ব ও অধিকার দেয়া হয়েছে। আল্লাহ্ বলেন: “নারীদের উপর (পুরুষদের) যেমন অধিকার আছে, ঠিক তেমনি ন্যয়সঙ্গত অধিকার রয়েছে (পুরুষদের উপর) নারীদের, এবং পুরুষদের রয়েছে তাদের উপর একটি মর্যাদা। (সূরা বাকারা: ২২৮ আয়াত)

আল্লাহ্ অন্যত্র বলেন: “পুরুষগণ স্ত্রীগণের সংরক্ষক; কারণ আল্লাহ্ তাদের এককে অপরের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন এবং পুরুষগণ তাদের ধনসম্পদ ব্যয় করে। সুতরাং পুণ্যবতী নারীরা অনুগত। লোকচক্ষুর অন্তরালে তারা সংরক্ষণ করে ঐ সব বিষয় যা আল্লাহ্ সংরক্ষণ করেছেন।”-(সূরা নিসা : ৩৪ আয়াত)

তাহলে পুরুষকে পরিবারের কর্তৃত্ব ও সংরক্ষণের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তার মূল কারণ হলো আল্লাহ্ সৃষ্টিগতভাবে পুরুষদেরকে কিছু অতিরিক্ত বিষয় দান করেছেন যা এ সংরক্ষণ দায়িত্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আধুনিক বিজ্ঞান কুরআনের এ বক্তব্যের সত্যতা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেছে। সৃষ্টিগতভাবে পুরুষদেরকে শারীরিক ও মানসিক কিছু শক্তি অধিক দেয়া হয়েছে যা কঠোর পরিশ্রম ও সংগ্রামের সাথে সামঞ্জস্যশীল এবং এজন্য পুরুষকে সংসারের সংরক্ষণের কর্তৃৃত্ব এবং অর্থনৈতিক দায়ভার দেয়া হয়েছে। পক্ষান্তরে নারীকে কিছু বিষয় বেশি দেয়া হয়েছে যা মাতৃত্ব, আবেগ ও মমতার সাথে সামঞ্জস্যশীল এবং কর্তৃত্ব ও কঠোর পরিশ্রমের সাথে সাংঘর্ষিক। দায়িত্ব, কর্তব্য ও অধিকারের ক্ষেত্রে এ প্রাকৃতিক পার্থক্য রক্ষা করা না হলে প্রাকৃতিক ভারসম্য নষ্ট হবে এবং পারিবাকি কাঠামো বিনষ্ট হবেই।

অর্থনৈতিক দায়িত্ব ছাড়া দ্বিতীয় যে দায়িত্বের বিষয়ে হাদীসের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে তা সর্বোত্তম আচরন। সংরক্ষক হিসেবে স্বামীর দায়িত্ব স্ত্রীর সাথে সর্বোত্তম আচরণ করা। সর্বোত্তম আচরণের বাস্তব নমুনা দেখিয়েছেন রাসূলুল্লাহ ()। তিনি স্ত্রীর ঝগড়া, রাগ বা কটু কথার প্রতিবাদে কখনোই কটু কথা বলেন নি। বেশি কষ্ট পেলে নীরবে বেরিয়ে এসেছেন। একবার এত কষ্ট পান যে, চার মাস বাড়িতে না যেয়ে মসজিদে কাটান। কিন্তু কখনোই স্ত্রীর ঝগড়ার প্রতিবাদে ঝগড়া করেন নি। এছাড়া তিনি বাড়িতে স্ত্রীকে তার কর্মে সহযোগিতা করতেন, নিজের কাজ নিজে করতেন, স্ত্রীর সাথে একত্রে পানাহার করতেন, তার সাথে খেলাধুলা করতেন এবং তাকে খেলাধুলা দেখাতে নিয়ে যেতেন।

স্ত্রীর সাথে এভাবে সর্বোত্তম আচরণ করা ভাল মুসলিম বলে গণ্য হওয়ার শর্ত। রাসূলুল্লাহ () বলেন: “তোমাদের মধ্যে সেই সর্বোত্তম যে তার স্ত্রীর সাথে আচরণের দিক থেকে সর্বোত্তম।” “তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই ভাল যে তার স্ত্রীর কাছে ভাল আর আমি আমার স্ত্রীর কাছে ভাল।”-(তিরমিযী)

স্বামীর জন্য স্ত্রীর নারী প্রকৃতির প্রতি লক্ষ্য রাখা অতীব জরুরী। রাসূলুল্লাহ () বলেন: “স্ত্রীদের সাথে উত্তম আচরণের জন্য তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছি। কারণ নারীকে বক্রতা বা আবেগ ও জিদ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। কাজেই কখনোই সে তোমার জন্য সর্বদা এক ধারায় থাকবে না। তুমি যদি তার দাম্পত্য সঙ্গ উপভোগ করতে চাও তবে তার বক্রতা বা আবেগ সহ তা করতে হবে। আর যদি তুমি তাকে একেবারে সোজা করতে চাও তাহলে তুমি তাকে ভেঙ্গে ফেলবে।”-(বুখারী ও মুসলিম)

অর্থাৎ নারী প্রকৃতির অন্যতম দিক সংবেদনশীলতা ও আবেগের আধিক্য ও ব্যাথা-কষ্ট সহ্যের ক্ষমতার কমতি। যে নারী যত বেশি নারী তার মধ্যে আবেগ তত বেশি। এ বিষয়টি বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত। (ঢ/ ণ পযৎড়সড়ংড়সব) এবং নারী-পুরুষ হরমোনের কারণে নারী-পুরুষের মধ্যে মৌলিক যে পার্থক্যগুলো সৃষ্টি হয় এগুলো তার অন্যতম। কাজেই নারীকে স্বামী নিজের মত “পুরুষ প্রকৃতির” বানাতে গেলে নারী ভেঙ্গে যাবেন; কাজেই তাকে তার নারীত্বের মধ্যে রেখেই তার সাহচার্য উপভোগ করতে হবে।

উপরে সূরা নিসার আয়াত থেকে আমরা দেখেছি যে, স্ত্রীর দায়িত্বের অন্যতম স্বামীর আনুগত্য ও দাম্পত্য বিশ্বস্ততা ও পবিত্রতা রক্ষা করা। যে সেবা স্ত্রী ছাড়া অন্য কারো থেকে গ্রহণ করা স্বামীর জন্য ইসলামে বৈধ নয় সে সেবার ক্ষেত্রে স্বামীর আনুগত্য স্ত্রীর জন্য অন্যতম ফরয ইবাদত। অন্যান্য ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা ও আনুগত্য গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। পাশাপাশি স্বামীর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পারিবারিক সংরক্ষণের দায়িত্ব পালনের জন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞতার অনুভূতি ও সহযোগিতার মনোভাব স্ত্রীর দায়িত্ব। রাসূলুল্লাহ () বলেন: “যে নারী স্বামীর মুখাপেক্ষী হওয়া সত্ত্বেও স্বামীর প্রতি কৃতজ্ঞ নয় আল্লাহ্ সে নারীর প্রতি দৃকপাত করেন না।”-(নাসাঈ, সহীহুত তারগীব)

স্ত্রী যদি নিজের নারী প্রকৃতি, স্বামীর পুরুষ প্রকৃতি, সংরক্ষকের অধিকার এবং নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হন এবং স্বামী যদি নিজের সংরক্ষণের দায়িত্বের পরিধি, স্ত্রীর নারী প্রকৃতি এবং তার প্রতি নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকেন এবং উভয়েই এ দায়িত্ব পালনে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের ঈমান বহন করেন তাহলে পারিবারিক জীবন উপভোগ্য হবেই।

(৪) ইবাদতের চেতনা

সমাজে অনেক নারী-পুরুষ নফল ইবাদত করেন, কিন্তু স্বামী বা স্ত্রীর সাথে দুর্ব্যবহার করেন বা তার জন্য পরিশ্রম, সময় ও অর্থ ব্যয়ে কার্পণ্য করেন। এ সবই ইসলামের  মূল চেতনা সম্পর্কে অজ্ঞতার ফল। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক দায়িত্ব অনেক সময় “ফরয আইন”। এমনকি স্বামী-স্ত্রীর নফল দায়িত্ব অন্যান্য নফল ইবাদতের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও বেশি সাওয়াবপূর্ণ।

আমাদের সমাজে স্বামীরা বন্ধুদের নিয়ে বিনোদন-আড্ডা দেন, স্ত্রীরা হয় গৃহবন্ধী থাকেন বা পৃথক বিনোদনে অংশ নেন। অথচ বৈধ বিনোদন যাতে সাওয়াব বা গোনাহ হয় না, সেরূপ বিনোদন-খেলাধুলা যদি স্ত্রী ও পরিবারের সাথে হয় তাহলে তা ইবাদতে পরিণত হয়। স্বামী স্ত্রীর একান্ত সম্পর্ক, ইয়ার্কি-আড্ড, খেলাধুলা, বেড়ানো-বিনোদন, স্ত্রীর জন্য অর্থ ব্যয়, স্বামীর জন্য পরিশ্রম ও সময় ব্যয়- সবকিছুই ইসলামে ইবাদত ও নেক আমল বলে গণ্য করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ () বলেন: “একটি দিনার তুমি আল্লাহ্র রাস্তায় ব্যয় করেছ, আরেকটি দিনার তুমি দাস-মুক্তিতে ব্যয় করেছ, আরেকটি দিনার তুমি দরিদ্রকে দান করেছ এবং আরেকটি দিনার তুমি তোমার স্ত্রী-পরিবারের জন্য ব্যয় করেছ-এগুলোর মধ্যে যে দিনারটি তুমি তোমার স্ত্রী পরিবারের জন্য ব্যয় করেছ এর জন্য সবচেয়ে বেশি সাওয়াব পাবে তুমি।-(সহীহ মুসলিম)

ইবাদতের এ চেতনা আমাদের দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জীবনকে সফল করবে। সর্বোপরি যদি দুজনের একজনের দায়িত্ব পালনের পরেও অন্যজন দায়িত্বে অবহেলা করেন তাহলেও দায়িত্ববানের হতাশ হওয়ার কোনো কারণ থাকে না; কারণ তিনি ইবাদতের সাওয়াব ও বরকত আল্লাহ্র কাছে অবশ্যই পাবেন।

(৫) কৃতজ্ঞতা ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি

আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপছন্দের বা কষ্টের দিককে বড় করে দেখি ও মনে রাখি আর ভাল বিষয়গুলো ভুলে যায় বা সেগুলোকে আমাদের পাওনা বলে মনে করি। ফলে সেগুলোর জন্য কৃতজ্ঞতা বা আল্লাহ্র প্রশংসার চিন্তাও করি না। এ মানসিকতা ঈমানের সাথে সাংঘর্ষিক। মুমিনের দায়িত্ব কষ্টকে জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে মেনে নিয়ে জীবনের ভাল ও আনন্দের দিকগুলোকে বড় করে দেখে আল্লাহ্র প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। এতে কষ্ট কমে এবং আনন্দ বাড়ে। আল্লাহ্ বলেন: “তোমরা যদি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর তাহলে আমি বাড়িয়ে দেব। আর যদি অকৃতজ্ঞ হও তাহলে আমার শাস্তি কঠিন।”-(সূরা ইবরাহীম: ৭ আয়াত)। এজন্য মমিনের বিশ্বাস যে, প্রতিটি মানুষের জীবনেই অনেক কষ্ট আছে। সামগ্রিক সীমাবদ্ধতার ভিতরেও আল্লাহ্ আমাকে ভাল রেখেছেন। এ চেতনায় তিনি জীবনের ছোট বড় সকল নেয়ামত বারবার স্মরণ করে আল্লাহ্র প্রতি কৃতজ্ঞতার অনুভূতি ও জীবনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বৃদ্ধি করবেন।

মহান আল্লাহ্র প্রতি কৃতজ্ঞতা ছাড়াও সকল মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশও ঈমানী দায়িত্ব। রাসূলুল্লাহ () বলেন: “যে অল্পের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে বেশির কৃতজ্ঞতার প্রকাশ করে না। যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ নয় সে আল্লাহ্র প্রতিও অকৃতজ্ঞ।” অন্য বর্ণনায়: “সেই আল্লাহ্র প্রতি সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ যে মানুষের প্রতি সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ।”-(তিরমিযী, আহমদ, মাজমাউয যাওয়ায়িদ, সাহীহাহ)

এ চেতনায় মুমিন ছোটখাট যে কোনো প্রাপ্তি, আনন্দ বা ভাললাগার অনুভূতিকে হৃদয়ে দীর্ঘসময় লালন করে বারংবার আল্লাহ্র কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবেন এবং যে মানুষের মাধ্যমে তিনি তা লাভ করলেন তাকেও কৃতজ্ঞতা জানাবেন। এ অনুভূতিতেই স্বামী ও স্ত্রী পরস্পরের ছোটখাট সকল কষ্ট, ত্যাগ, উপহার ও সহানভূতির জন্য কৃতজ্ঞ হবেন ও তা প্রকাশ করবেন।

কৃতজ্ঞতার অনুভূতির সাথেই থাকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। মহান আল্লাহ্ বলেন: “তোমরা তোমদের স্ত্রীদের সাথে সদভাবে-সুন্দরভাবে বসবাস করবে। আর যদি তোমরা তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে এমনও হতে পারে যে, তোমরা কোনো কিছুকে অপছন্দ করছ, অথচ আল্লাহ্ তার মধ্যে অনেক কল্যাণ রেখেছেন।”-(সূরা নিসা: ১৯ আয়াত)

রাসূলুল্লাহ () বলেন: “কোনো মুমিন স্বামী কোনো মুমিন স্ত্রীকে অপছন্দ বা ঘৃণা করবে না; যদি তার কোনো আচরণ তার অপছন্দ হয়, তবে পছন্দ করার মত অন্য কিছু সে তার মধ্যে পাবে।”-(সহীহ মুসলিম)

প্রতিটি মানুষই “ভাল ও মন্দের” সমন্বয়। কাজেই নির্ভেজাল “ভাল” কাউকে পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। দাম্পত্য সঙ্গীকে মহান আল্লাহ্র দেয়া “উপহার” বলে গণ্য করুন। আপনার জন্য মঙ্গলময় বলেই আল্লাহ্ এ উপহার দিয়েছেন বলে বিশ্বাস করুন। সঙ্গীর যে আচরণে বা বিষয়ে আপনি কষ্ট পেয়েছেন সেটিকে একটু ভিন্নভাবে দেখুন, অধিকাংশক্ষেত্রে আপনি নিশ্চিত হবেন যে, আপনার সঙ্গীর বয়স, পরিবেশ ও শারীরিক-মানসিক অবস্থায় থাকলে আপনি বা অন্য কেউ একইরূপ আচরণ করতো। কাজেই তাকে  অস্বাভাবিক মনে করার কারণ নেই। তারপরও যদি মনে হয় বিষয়টি সত্যিই অস্বাভাবিক তাহলে কুরআনের নির্দেশ অনুসারে গভীরভাবে বিশ্বাস করুন যে, আপনি যাতে কষ্ট পাচ্ছেন বা খুবই খারাপ মনে করছেন, হতে পারে এ বিষয়টি আপনার জন্য অতীব কল্যাণকর। তারপর হাদীসের নির্দেশনা অনুসারে অনুধাবন করুন যে, আপনার সঙ্গীর মধ্যে এ কষ্টদায়ক “খুব খারাপ” বিষয় ছাড়া আরো অনেক “পছন্দনীয়” বিষয় রয়েছে। সেগুলোর অনুভূতি হৃদয়ে জাগ্রত করুন।

(৬) ধৈর্য ও বিনম্রতা

ধৈর্য ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ধৈর্য বলতে নিষ্ক্রিয় নির্জীবতা বুঝানো হয় না, বরং সক্রিয় আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বুঝানো হয়। রাসূলুল্লাহ  বলেছেন: “ধৈর্য ও উদারতাই সর্বোত্তম ঈমান।”-(সাহীহাহ)

ধৈর্য তিন প্রকারের: (১) বিপদ-আপদ ও কষ্টে ধৈর্য, (২) পাপ ও লোভ থেকে ধৈর্য এবং (৩) ক্রোধের মধ্যে ধৈর্য। তিন প্রকারের ধৈর্যই পারিবারিক জীবনে প্রয়োজন, বিশেষত ক্রোধের মধ্যে ধৈর্য। রাসূলুল্লাহ  বলেন: “যে অপরকে মল্লযুদ্ধে পরাজিত করতে পারে সেই প্রকৃত বীর নয়, প্রকৃত বীর যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রিত রাখতে পারে।”-(বুখারী ও মুসলিম)

ক্রোধ সম্বরণ করা ও ক্রোধের সময় আত্ম নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রাসূলুল্লাহ () বিভিন্ন পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন, তন্মধ্যে রয়েছে, ক্রোধান্বিত হলে ‘আউযু বিল্লহি মিনাশ শাইতানির রাজীম’ পাঠ করা, আল্লাহ্র ক্রোধের কথা স্মরণ করা, উত্তেজিত অবস্থায় কথা না বলে চুপ করে থাকা, মুখে-মাথায় ঠাণ্ডা পানি ব্যবহার করা, ওজু করা, দাঁড়িয়ে বা বসে থাকলে শয়ন করা ইত্যাদি।

আমরা অনেক সময় সামাজিক ও কর্মজীবনে বাইরের মানুষের সাথে কষ্টকরে হলেও ধৈর্য ধারণ করি, কিন্তু দাম্পত্য জীবনে সহজেই নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাই। কখনো বা রাগ প্রকাশকে পৌরুষ বা নারী-অধিকার বলেই মনে করি। এখানে কয়েকটি বিষয় মনে রাখতে হবে:

(১) ধৈর্য ও ক্রোধ সম্বরণ সকল অবস্থায় সর্বোত্তম ঈমান ও ইবাদত। কাজেই দাম্পত্য জীবনে এ ইবাদত পরিত্যাগ করার প্রশ্ন উঠে না।

(২) দাম্পত্য জীবনে এ ইবাদত পালন অধিক গুরুত্বপূণ। আমরা আগেই দেখেছি যে, স্ত্রীর সাথে উত্তম আচরণ করা, ক্রোধ সম্বরণ করা ও তার খারাপ আচরণের প্রতিবাদে খারাপ আচরণ না করা সুন্নাতের নির্দেশনা।

(৩) যার সামনে ক্রোধ প্রকাশ করা যায় বা যাকে রাগের মাথা গালি বা শাস্তি দেয়া যায় তাকে ক্ষমা করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। আর এ বিষয়টি দাম্পত্য জীবনে সবচেয়ে বেশি কার্যকর। প্রকৃত মুমিনদের বৈশিষ্ট বর্ণনা করতে যেয়ে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন: “তারা কবীরা গোনাহ সমূহ ও অশ্লীল কর্ম বর্জন করে এবং যখন তারা ক্রোধান্বিত হয় তখন তারা ক্ষমা করে।”-(সূরা শূরা: ৩৭ আয়াত) অন্যত্র বলা হয়েছে: “তারা ক্রোধ সম্বরণ ও নিয়ন্ত্রণ করে এবং মানুষদেরকে ক্ষমা করে।”-(সূরা আল-ইতারান: ১৩৪ আয়াত) রাসূলুল্লাহ () বলেছেন: “বিরক্তি ও ক্রোধে উত্তেজিত অবস্থায় যদি কেউ রাগ প্রকাশ ও কার্যকর করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা সম্বরণ করে তবে আল্লাহ্ কেয়ামতের দিন তার হৃদয়কে পরিতৃপ্তি ও সন্তুষ্টি দ্বারা পূর্ণ করবেন।”-(মাজমাউয যাওয়াইদ)

আমরা অনেকে সামাজিক জীবনে মার্জিত কথা বললেও পারিবারিক জীবনে খাপছাড়া হয়ে যায়। আমরা ভুলে যায় যে, দাম্পত্য সঙ্গীও মানুষ, অতি আপনজনের কথাতেও মানুষ আহত হতে পারে। মহান আল্লাহ্ বলেন: “আমার বান্দাদেরকে বল, তারা যেন অধিকতর উত্তম কথা বলে; কারণ শয়তান তাদের মধ্যে মনোমালিন্য-অশান্তি-শত্র“তা সৃষ্টি করে; নিশ্চয় শয়তান মানুষের সুস্পষ্ট শত্র“।”-(সূরা বানী ইসরাঈল: ৫৩ আয়াত)

এজন্য স্বামী-স্ত্রী, পিতামাতা, সন্তানগণ সকলের সাথেই কথা বলার ক্ষেত্রে কথাটিকে সর্বোত্তমভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা মুমিনের দায়িত্ব; যাতে উপস্থাপনার ভুলে শয়তান প্রিয়জনদের মধ্যে অশান্তি সৃষ্টি করতে না পারে।

সামগ্রিকভাবে কথাবার্তা ও আচরণের বিনম্রতা আল্লাহ্র দেয়া সর্বোচ্চ নেয়ামতগুলোর অন্যতম। রাসূলুল্লাহ () বলেন: “মহান আল্লাহ্ বিনম্র-মমতাময়, তিনি বিনম্র-মমতাময় আচরণ ভালভাসেন। বিনম্রতার বিনিময়ে তিনি যা দেন, কর্কশতা, রুঢ়তা বা কঠোরতার বিনিময়ে তা দেন না, বিনম্রতা ছাড়া অন্য কোনো কিছুর বিনিময়েই তিনি তা দেন না। তিনি কোনো বান্দাকে ভালবাসলে তাকে বিনম্রতা দান করেন। যদি কোনো পরিবার বিনম্রতা থেকে বঞ্চিত হয় তাহলে তারা বঞ্চিত।-(সহীহুত তারগীব)

সকল ক্ষেত্রেই বিনম্রতার অনুশীলন করুন। যদি প্রকৃতিগতভাবে বিনম্রতা পেয়ে থাকেন তবে আল্লাহ্র কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন ও এ নিয়ামতকে অনুশীলনের মাধ্যমে বৃদ্ধি করুন। যদি প্রকৃতিতে কঠোরতা থাকে তাহলে বিনম্রতার নিয়ামত লাভের জন্য দুআ ও অনুশীলন করুন। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের বিনম্রতা ও উত্তম আচরণের সবচেয়ে বড় হক্কদার আমাদের পরিবার। সমাজের মানুষের সাথে বিনম্র ও সুন্দর আচরণে আমরা যে পরিমাণ সাওয়াব, বরকত ও শান্তি লাভ করব, এর চেয়ে অনেক বেশি সাওয়াব, বরকত ও শান্তি পাব পরিবারের সাথে বিনম্রতায়।

(৭) সন্তান, পিতামাতা, আত্মীয়-স্বজন ও সমাজের দায়িত্ব পালন

বরকতময় পরিবার লাভ করতে হলে অবশ্যই আমাদেরকে আত্মকেন্দ্রিক না হয়ে দায়িত্ব সচেতন হতে হবে। সন্তান, পিতামাতা, শ্বশুর-শ্বাশুড়ী, ভাইবোন, দেবর-ভাসুর, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালন মুমিনের ঈমানের দাবি ও দুনিয়ার জীবনে বরকত লাভের উপায়।

(ক) সন্তানগণ। পিতামাতা সাধারণত জন্ম থেকে ৬/৭ বছর পর্যন্ত সন্তানকে বেশি সময় প্রদান করেন। তারপর সন্তানদেরকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বন্ধুবান্ধব ও সমাজের হাতে ছেড়ে দেন। পিতামাতা উপার্জন, রান্নাবাড়া, সামাজিকতা, রাজনীতি ইত্যাদিতে বেশি সময় দেন। তারপর যখন ১৮/২০ বয়সের সন্তান কঠিন অন্যায়ে জড়িয়ে পড়ে তখন হাহুতাশ করেন।

সুন্নাতের নির্দেশ অনুসারে ৬/৭ থেকে ১৮/১৯ বছর পর্যন্ত সন্তানদেরকে যথাসম্ভব বেশি সময় প্রদান করুন। সন্তানদেরকে দীনী শিক্ষা দান করুন। অন্তত বিশুদ্ধ কুরআন পাঠ, সালাতে পঠিত দুআ ও সূরাগুলোর অর্থ ও দীনের মৌলিক আহকাম শিক্ষা দিন। বাড়িতে প্রাইভেট শিক্ষক দিয়ে শেখালে ফল খুবই সীমিত হয়। মহল্লা, হাউজিং বা এলাকা ভিত্তিক মকতব বা কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে এ শিক্ষা প্রদান করুন।

পিতা ছেলেদেরকে সাথে মসজিদে নিয়ে যাবেন। মাতা মেয়েদেরকে নিয়ে সালাত আদায় করবেন। সবাই মিলে একত্রে খাওয়া, বেড়ানো, বিনোদন, গল্প ইত্যাদিতে যথাসম্ভব বেশি সময় কাটান। ছেলেমেয়েদের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলন। এতে সন্তানগণ বিপথগামিতা থেকে রক্ষা পাবে এবং পিতামতার শেষ জীবনে অত্যন্ত আনন্দময় জীবন যাপন করতে পারবেন। সর্বোপরি জান্নাতের জীবনেও প্রিয় সন্তানদের সঙ্গ পাবেন।

(খ) পিতামাতা, ভাইবোন ও রক্তসম্পর্কে আত্মীয়গণ। পিতামাতা ও আত্মীয়স্বজনের খেদমত ও সুসম্পর্ক সকল বরকত ও শান্তির মূল উৎস। অনেক সময় স্ত্রী নিজের আত্মীয়দের বিষয়ে সচেতন হলেও স্বামীর আত্মীয়দের বিষয়ে বিরক্ত হন। এটি আসমানী গযবের অন্যতম কারণ। কুরআন ও হাদীসে এ বিষয়ে অগণিত নির্দেশনা রয়েছে। সংক্ষেপে দুটি হাদীস লিখছি। রাসূলুল্লাহ () বলেন: “যদি কেউ চায় যে তার আয়ু বৃদ্ধি পাক এবং রিযিকে বরকত হোক তবে সে যেন পিতামাতার সেবা করে ও রক্তসম্পর্কের আত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক রাখে।”-(সহীহুত তারগীব) তিনি আরো বলেন: “যে সকল পাপের জন্য আল্লাহ্ আখিরাতের শাস্তি ছাড়াও দুনিয়াতে দ্রুত গযব ও শাস্তি প্রদান করেন তার অন্যতম রক্তসম্পর্কের আত্মীদের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করা ও অত্যাচার করা।”-(সহীহুত তারগীব)

(গ) প্রতিবেশী। প্রতিবেশীর সাথে সুসম্পর্ক আল্লাহ্র ইবাদত এবং দুনিয়ার শান্তি ও বরকত। প্রতিবেশীর দেয়া কষ্ট সহ্য করা, প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়া, তাকে যথাসম্ভব সহযোগিতা করা, খাদ্য হাদিয়া দেয়া ইত্যাদি সুন্নাহ নির্দেশিত দায়িত্ব। রাসূলুল্লাহ () বলেন: “যার কষ্ট থেকে প্রতিবেশী নিরাপদ নয় সে মুমিন নয়।”-(বুখারী)। “যে ব্যক্তি পরিতৃপ্ত-ভরপেট থাকে অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে সে মুমিন নয়।”-(সহীহুত তারগীব) আবূ হুরাইরা (রা) বলেন, একব্যক্তি রাসূলুল্লাহ -কে বলে, অমুক মহিলা খুব বেশি সালাত ও সিয়াম পালন করে এবং দান করে, কিন্তু সে তার মুখ দ্বারা তার প্রতিবেশিনীদেরকে কষ্ট দেয়। তিনি বলেন, মহিলাটি জাহান্নামী। আরেক মহিলা সম্পর্কে বলা হয় যে, তার নফল ইবাদত- সালাত, সিয়াম, দান ইত্যাদি সামান্য, তবে সে তার মুখ দিয়ে প্রতিবেশিনীদেরকে কষ্ট দেয় না। তখন তিনি বলেন, এ মহিলা জান্নাতী।”-(সহীহুত তারগীব)

সর্বোপরি সমাজ ও উম্মাতকে ভালবাসুন। বান্দার হক্ক ও বান্দার খেদমত সম্পর্কে সচেতন ও সচেষ্ট থাকুন। দাওয়াতী কার্যক্রমে সাধ্যমত অংশগ্রহণ করুন। দীনদার মানুষদের পরিবেশে থাবুন এবং এমন পরিবেশ তৈরি করুন। পুরুষ ও মহিলারা পৃথকভাবে একান্তই আল্লাহ্র জন্য কিছু মানুষকে ভালবাসুন, বন্ধুত্ব তৈরি করুন এবং কিছু সময় তাদের সাথে কাটান। আত্মকেন্দ্রিক ভোগমুখি দম্পতির জীবন ক্রমেই কষ্টকর হয়ে উঠে। পক্ষান্তরে দায়িত্ব সচেতন, সমাজমুখি ও দীনমুখি দম্পতির জীবন কর্মব্যস্ত, বরকতময় এবং বিশেষ করে শেষ জীবন অত্যন্ত আনন্দময় হয়।

সংক্ষিপ্ত পরিসরে আর লিখতে পারছি না। মহান আল্লাহ্ আমাদেরকে জীবনকে তাঁর রহমত ও বরকত দিয়ে পরিপূর্ণ করুন। আমীন!

اللهم صل على محمد عبدك ورسولك، وصل على المؤمنين والمؤمنات والمسلمين والمسلمات

<a href=”http://www.assunnahtrust.com/dl/aff-masters.pdf”>Download Link</a>

One Response to মুসলমানী নেসাব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>