(0177) ১. কোরবানী কি সচ্চল পরিবারের প্রধানের উপর ওয়াজিব নাকি যার কাছে নিছাব পরিমান সম্পদ আছে (জিলহজ্বের ১০-১১-১২ তারিখ পর্যন্ত) তার উপর। নিছাবের কথাটি কি হাদিস থেকে এসেছে নাকি ওলামাদের ফাতোয়া? পরিবারের সজ্ঞা কি ? ২. সামর্থ্য তাকলে পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক সকলের কি কোরবানী করতে হয়? ৩. স্বামী স্ত্রী দুইজনের কাছে আলাদাভাবে নিছাব পরিমান সম্পদ আছে কিন্তু তাদের পরিবারের প্রাপ্তবয়স্কের সংখ্যা ৫ জন। এই ৫ জনের ন্যুন্যতম কোরবানীর হকুম ক? ৪. ১টি উট বা গরু দিয়ে ৭ জনের কোরবানী বলতে কি ৭ জন নিছবের মালিক, সামর্থ্যবান পরিবারের প্রধানকে বুঝায়? নাকি প্রত্যেক নিছাবের মালিকের/সামর্থ্যবানের পরিবারের সদস্যও উন্তর্ভুক্ত? ৬. মহিষ দিয়ে কোরবানী করার হাদিস কি? ৭. মা বাবা জিবীত, বাবার সম্পদ আছে কিন্তু মা’র নাই; সন্তানের উপর এর হকুম কি? ৮. রাসুলের এবং মৃত ব্যক্তির কোরবানী করার হকুম কি? ৯. কোরবানীতে আঁকিকা দেয়া কেন বৈধ হবে বা হবে না? কয়টি কোরবানী এক ওয়াক্ত ফরজ নামাজের সমান হবে? সহী হাদিসের আলোকে উত্তর দিলে উপকৃত হব। ভিডিও ক্লিপ বা লিঙ্ক এখন অনেকের মত আমার কাছে ও বিরক্তিকর। text এ হলে তা সংগ্রহে রাখা ও শেয়ার করা সহজ হয়। কেউ আন্দজিক, অসুবিধা নাই কিংবা ফাতোয়া জাতীয় উত্তর না দিলেই খুশি হব।

উত্তর: জিলহজ্ব মাসের দশ তারিখে আল্লাহ তায়ালার কাছে সবচেয়ে উত্তম আমল হলো কোরবানী করা। কোরবানীর বিভিন্ন বিষয়ে আলেম ও ইমামগণের মাঝে মতভেদ আছে। এখানে আমরা কুরআন ও হাদীসের আলোকে বিষয়গুলো আলোচনা করছি।

১। কুরআনুল কারীমের সূরা কাওসারে আল্লাহ তায়ালা কুরবানীর আদেশ দিয়েছেন। অন্যদিকে হাদীসে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, (আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত)
من كان له مال فلم يضح فلا يقربن مصلانا و قال مرة : من وجد سعة فلم يذبح فلا يقربن مصلانا
অর্থ: “যার সাধ্য ছিল কুরবানী দেওয়ার, কিন্তু দিল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে উপস্থিত না হয়”। মুসতাদরক হাকীম, হাদীস নং ৭৫৬৫; সহীহুত তারগীব লিল আলবানী, ১/২৬৪। হাকীম ও যাহাবী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। আলবানী হাসান বলেছেন।
উপরুক্ত আয়াত ও হাদীসের ভিত্তিতে মনে হয় যে, কুরবানী করা ওয়াজিব। যদিও অনেক ইমাম ও আলেম কুরবানীকে সুন্নাত বলেছেন।

২। কুরবানী সবার উপর ওয়াজিব নয়। বরং যার সামর্থ আছে তার উপর ওয়াজিব। উপরের হাদীস থেকে আমারা তা বুঝতে পারি। এই “সামর্থ্য” শব্দটিকেই “নিসাব” শব্দে বলা হয়। সামর্থ কখন হবে কিংবা নিসাব পরিমাণ সম্পদ কতটুকু এই ব্যাপারে হাদীসে স্পষ্ট কিছু নেই। এই কারণেই আলেমগনের মধ্যে এব্যাপারে মতভেদ হয়েছে। এই বিষয়ে আলেমগণের মতামত জানতে দেখুন, আল-ফিকহুল ইসলামিয়্যু ওয়া আদিল্লাতুহু, ৩/৬০১।

৩। উপরের হাদীস থেকে আমরা জানলাম যে, সামর্থ্য আছে এমন প্রত্যেকের উপর কোরবানী ওয়াজিব। আর সামর্থ্য বলতেই নিসাব বুঝানো হয়। এ থেকে জানা যায় যে, স¦ামী এবং স্ত্রীর উভয়ের সামর্থ্য থাকলে উভয়ের উপরই কোরবানী ওয়াজিব। কারো কুরবানী অন্যের জন্য যথেষ্ট হবে না।
নিচের হাদীস দুটি লক্ষ্য করুন:
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ هِشَامٍ ، وَكَانَ قَدْ أَدْرَكَ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم وَذَهَبَتْ بِهِ أُمُّهُ زَيْنَبُ ابْنَةُ حُمَيْدٍ إِلَى رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَتْ يَا رَسُولَ اللهِ بَايِعْهُ فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم هُوَ صَغِيرٌ فَمَسَحَ رَأْسَهُ وَدَعَا لَهُ ، وَكَانَ يُضَحِّي بِالشَّاةِ الْوَاحِدَةِ عَنْ جَمِيعِ أَهْلِهِ.

অর্থ: আব্দুল্লাহ ইবনে হিশাম থেকে বর্ণিত (তিনি রাসূলুল্লাহ সা. কে পেয়েছিলেন), তারা আম্মা যায়নাব বিনতে হুমাইদ তাকে রাসূলুল্লাহ সা. এর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সা. কে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি ওকে বায়াত করুন। তখন রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, ‘সে তো ছোট’। তিনি তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন এবং তার জন্য দোয়া করলেন। আর তিনি তার পরিবারের সকলের পক্ষ থেকে একটি ছাগল দ্বারা কুরবানী করেছিলেন। সহীহ বুখারী হাদীস নং ৭২১০।

أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى الله عَليْهِ وسَلَّمَ كَانَ إِذَا أَرَادَ أَنْ يُضَحِّيَ ، اشْتَرَى كَبْشَيْنِ عَظِيمَيْنِ ، سَمِينَيْنِ ، أَقْرَنَيْنِ ، أَمْلَحَيْنِ مَوْجُوءَيْنِ ، فَذَبَحَ أَحَدَهُمَا عَنْ أُمَّتِهِ ، لِمَنْ شَهِدَ لِلَّهِ ، بِالتَّوْحِيدِ ، وَشَهِدَ لَهُ بِالْبَلاَغِ ، وَذَبَحَ الآخَرَ عَنْ مُحَمَّدٍ ، وَعَنْ آلِ مُحَمَّدٍ صَلَّى الله عَليْهِ وسَلَّمَ.

অর্থ: রাসূলুল্লাহ সা. যখন কুরবানী দেয়ার ইচ্ছা করতেন তখন দুটি বিশাল বড় সাইযের সুন্দর দেখতে খাসী করা কাটান দেওয়া পুরুষ মেষ বা ভেড়া ক্রয় করতেন। তাঁর উম্মতের যারা তাওহীদ ও তাঁর রিসালাতের সাক্ষ দিয়েছেত তাদের পক্ষ থেকে একটি কুরবানী করতেন এবং অন্যটি মুহাম্মাদ সা. এবং মুহাম¥াদ সা. এর পরিবারের পক্ষ থেকে কুরবানী করতেন। ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৩১২২; মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং ২৫৮২৫। হাদীসটি হাসান।
এই হাদীস দুটির ভিত্তিতে ইমাম মালেক, ইমাম আহমাদ প্রমুখ ফকীহ বলেন একটি পরিবারের পক্ষ থেকে একটি কুরবানী যথেষ্ট হবে। দেখুন, সুনানু তিরমিযী, হাদীস নং ১৫৮৭; তুহফাতুল আহওযী, ১৪২৫ নং হাদীসের আলোচনা; মুয়াত্তা মালিক,হাদীস নং ১০৩৩।
পরিবার বলতে স্বামী, স্ত্রী এবং সন্তানদের বুঝায়। আর সাধারনত একটি পরিবারে পরিবার প্রধানের উপরই কুরবানী ওয়াজিব হয়। সুতরাং এই হাদীস’দুটি দ্বারা স্পষ্ট ভবে প্রমাণিত হয় না যে, পরিবারের অন্য সদস্যদের সামর্থ থাকলেও একটি কুরবানীই সকলের জন্য যথেষ্ট হবে। পক্ষান্তরে প্রথম হাদীসে আমরা দেখেছি যার সামর্থ্য আছে সেই কুরবানী দিবে। এজন্য ইমাম আবূ হানীফা, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক প্রমুখ ফকীহ একই পরিবারেও একাধিক ব্যক্তির ‘সামর্থ্য’ থাকলে প্রত্যেকের জন্য কুরবানী দেওয়া প্রয়োজন বলে মত প্রকাশ করেছেন। মহান আল্লাহই ভাল জানেন।
শেষ কথা: মানুষের জীবনের সমস্যা ব্যাপক। কুরআন হাদীস সীমিত । তাই অনেক কিছুই সরাসরি কুরআন বা হাদীস থেকে পাওয়া যায় না। আর আমরা আপনার প্রশ্নের যে উত্তর দিলাম এটাই ফতোয়া। সুতরাং সবকিছু সহীহ হাদীস দ্বারা দিতে হবে, ফতোয়া দেয়া যাবে না এমন কথা না বলাই শ্রেয়। যেসব ব্যাপারে হাদীস পাওয়া যায় না সেসব বিষয়ে মুজতাহিদ আলেমগণের কথায় আমাদের মানতে হবে। আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন। তিনিই সব বিষয়ে ভাল জানেন।
এক সাথে এত প্রশ্ন করবেন না। বাকী প্রশ্নগুলো পরবর্তীর্তে আবার করবেন।