আস-সুন্নাহ শিক্ষা

(১) মসজিদ ভিত্তিক কুরআন শিক্ষা মক্তব

সুন্নাহর অন্যতম নির্দেশনা কুরআন কেন্দ্রিক জীবন ও দাওয়াত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও সাহাবীগণের পদ্ধতিতে কুরআন শিক্ষা গ্রহণ, প্রদান ও প্রচার আস-সুন্নাহ ট্রাস্টের অন্যতম কর্মসূচী। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন: “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কুরআন শিক্ষা করে এবং শিক্ষা দেয় সেই শ্রেষ্ঠ” (বুখারী) কুরআন শিক্ষা করা ও শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও সাহাবীগণের সুন্নাহ ছিল অর্থ অনুধাবন ও আমল-সহ শিক্ষা। সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ) থেকে কুরআনের দশটি আয়াত শিক্ষা করে সেগুলির মধ্যে যা ইলম ও আমল রয়েছে তা শিক্ষা না করা পর্যন্ত পরবর্তী দশটি আয়াত শুরু করতেন না। (মুসনাদ আহমদ, হাদীসটি হাসান) মহান আল্লাহ বলেছেন: “যাদেরকে আমি কিতাব প্রদান করেছি তারা তা “হক্ক তিলাওয়াত” করে, তারাই ঈমানদার” (বাকারা: ১২১) অর্থের দিকে লক্ষ্য রেখে তিলাওয়াত করা ও অর্থানুসারে কর্ম করাকে হাদীসে “হক্ক তিলাওয়াত” বলা হয়েছে (সহীহ বুখারী, মুসতাদরাক হাকিম, তাফসীর ইবন কাসীর) বিভিন্ন আয়াতে কুরআনের আয়াতগুলির অর্থ চিন্তা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (নিসা: ৮২; সাদ: ২৯; মুহাম্মাদ ২৪) কুরআনের অর্থ বুঝতে পারলে মুমিনের হৃদয় প্রশান্তি লাভ করে, ঈমান, তাকওয়া ও আল্লাহর প্রেম সুদৃঢ় ও সুগভীর হয়। অন্তত সালাতের মধ্যে যে সুরাগুলি পাঠ করা হয় সেগুলির অর্থ অনুধাবনের যোগ্যতাও একটি বড় অর্জন।
আস-সুন্নাহ ট্রাস্ট সুন্নাত পদ্ধতিতে কুরআন শিক্ষার বিভিন্ন উদ্দ্যোগ গ্রহণ করেছে। কুরআনের বিশুদ্ধ তিলাওয়াত শিক্ষার পাশাপাশি কুরআনের অর্থ সাধ্যমত অনুধাবন করার যোগ্যতা শিক্ষার্থীর মধ্যে সৃষ্টি করা ট্রাস্টের কুরআন শিক্ষা প্রকল্পগুলির অন্যতম লক্ষ্য। প্রশিক্ষিত ও যোগ্য শিক্ষকগণের দ্বারা মসজিদভিত্তিক কুরআন শিক্ষা মকতব প্রতিষ্ঠা, বিশুদ্ধ তিলাওয়াত, কিছু সূরার অর্থ ও প্রয়োজনীয় মাসাইল শিক্ষার জন্য শিশু, বয়স্ক ও মহিলাদের জন্য মক্তব প্রতিষ্ঠা আস-সুন্নাহ ট্রাস্ট-এর অন্যতম লক্ষ্য।

(২) শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক কুরআন শিক্ষা কোর্স

অধিকাংশ মুসলিম অভিভাবকই চান যে, তাদের সন্তানগণ কুরআন শিক্ষা করবে। তবে অনেকের জন্যই শিশুকালে তাদেরকে কুরআন শিক্ষা দেওয়া সম্ভব হয় নি। প্রাথমিক, মাধ্যমিক বা উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়ে লেখাপড়ায় রত সন্তানদেরকে মক্তবে পাঠানোও কষ্টকর। এজন্য “আস-সুন্নাহ ট্রাস্ট” শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক কুরআন শিক্ষা কোর্স চালু করেছে। আগ্রহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় ও সহযোগিতার মাধ্যমে সে প্রতিষ্ঠানে ১ বৎসর মেয়াদী নিয়মিত কোর্স এবং ছুটি কালীন বা পরীক্ষা পরবর্তী অবসরে ২ মাস মেয়াদী নিবিড় কোর্স চালুর ব্যবস্থা রয়েছে। এ সকল কোর্সে শিক্ষার্থীদের বিশুদ্ধ তিলাওয়াত অনুশীলন, সালাতের প্রয়োজনীয় সূরা ও দুআগুলি অর্থ-সহ মুখস্থ করানো এবং প্রয়োজনীয় মাসাইল ও আহকাম শিক্ষা দেওয়া হবে।

(৩) কুরআন শিক্ষা প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়

মকতবে শিক্ষার্থীগণ খুব কম সময় দেয়। যে কারণে শিক্ষার্থীদেরকে “সীমাবদ্ধ” বিষয়াদি শিক্ষা দেওয়া যায়। ৩/৪ বৎসর মেয়াদী প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জাতীয় পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি কুরআন, প্রয়োজনীয় সূরাগুলির অর্থ, ও জরুরী মাসাইল শিক্ষা দেওয়া সহজ হয়। এজন্য আস-সুন্নাহ ট্রাস্ট ৪ বৎসর মেয়াদী প্রাক-প্রাথমিক কুরআন শিক্ষা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এ বিদ্যালয়ে শিশু থেকে ৩য় শ্রেণী পর্যন্ত ৪ বৎসরে কুরআন শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় দীনী আহকাম শিক্ষার পাশাপাশি জাতীয় পাঠ্যক্রমের সকল বিষয় পাঠ দান করা হবে। এ বিদ্যালয় থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা যে কোনো সরকারী, বেসরকারী স্কুল বা মাদ্রাসায় ৪র্থ শ্রেণীতে ভর্তি হতে পারবে।

(৪) আল-ফারুক একাডেমী: বালক ও বালিকা শাখা

কুরআন শিক্ষা মক্তব এবং প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাধ্যমে আমরা “কুরআন পাঠ ও আংশিক অনুধাবনে সক্ষম” সচেতন ও সৎ মুসলিম তৈরি করতে পারি। পাশাপাশি কুরআনের বিশেষজ্ঞ, কুরআনের অর্থ ও আরবী ভাষায় পারদর্শী আলিম তৈরি সমাজের শান্তি ও উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত জরুরী। এজন্য “আস-সুন্নাহ ট্রাস্ট” দুটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে: (১) “আল-ফারুক একাডেমী” এবং (২) “অর্থ-সহ হিফযুল কুরআন” প্রকল্প।
জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা ও সাধারণ শিক্ষার সকল চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ইসলামী শিক্ষা ও আরবী ভাষায় দক্ষতা সম্পন্ন জনশক্তি তৈরি এবং কুরআন, হাদীস ও ইসলামী জ্ঞানে বিশেষজ্ঞ তৈরির উদ্দেশ্যে ১৯৯৮ খৃস্টাব্দে আল-ফারুক একাডেমীর প্রতিষ্ঠা। বাংলাদেশের জাতীয় পাঠ্যক্রমের সাথে সঙ্গতি রেখে শিক্ষার্থীদেরকে বিশুদ্ধ কুরআন তিলাওয়াত, তরজমা, হাদীস, তাফসীর, ফিকহ, আকীদা, আরবী, বাংলা ও ইংরেজি ভাষা, অংক, বিজ্ঞান ইত্যাদিতে দক্ষতা ও পারদর্শিতা অর্জনের দিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখা হয়। পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনে ইসলামী আহকাম, আদব, শিষ্টাচার ইত্যাদি প্রতিপালনে গুরুত্ব আরোপ করা হয়। বিগত বছরগুলিতে মাধ্যমিক, বৃত্তি ও সমাপনী পরীক্ষাগুলিতে, বিভিন্ন জাতীয় প্রতিযোগিতা ও কুচকাওয়াজে আল-ফারুক একাডেমীর ছাত্র-ছাত্রীরা বিশেষ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে। একই পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসূচীতে পর্দার সাথে বালিকাদের লেখাপড়ার জন্য আল-ফারুক একাডেমী বালিকা মাদ্রাসার কার্যক্রম শুরু হয়েছে ২০১১ সাল থেকে।

(৫) অর্থ-সহ হিফজুল কুরআন বিদ্যালয়

মাদ্রাসা বা স্কুল থেকে তৃতীয় শ্রেণী পাস করা ৯/১০ বৎসরের শিশুদেরকে এ মাদ্রাসার তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি করা হবে। এরপর মোট ৬ বৎসরে তাকে আরবী ভাষা, ব্যাকরণ ও কুরআনের অর্থ-সহ কুরআন কারীম হিফয করানো হবে। প্রথম ৩ বৎসর পড়ার পরে শিক্ষার্থী মাদ্রাসা বোর্ডের পঞ্চম শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষা দিবে। পরের ৩ বৎসর পড়ার পর সে মাদ্রাসা বোর্ডের অষ্টম শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষা দিবে। প্রথম ৪ বৎসরে কুরআন হিফয সম্পন্ন হবে। পরের দু বৎসর শুনানো চলবে। অষ্টম শ্রেণী পাসের পরে এরা যে কোনো ভাল মাদ্রাসা বা স্কুলে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হতে পারবে।

(৬) শিক্ষার্থীদের জন্য ভাষা শিক্ষা কোর্স

মাদ্রাসা ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষারত শিক্ষার্থীদের আরবী ভাষার দুর্বলতা তাদের কষ্ট দেয়। এতে তাদের পরীক্ষার ফল যেমন খারাপ হয়, তেমনি মান-সম্পন্ন শিক্ষা গ্রহণের পথেও তাদের বড় প্রতিবন্ধক আরবী ভাষার দুর্বলতা। পাশাপাশি অধিকাংশ শিক্ষার্থী ইংরেজি ও বাংলা ভাষায়ও দুর্বল। এদের জন্য আস-সুন্নাহ ট্রাস্ট আরবী, ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় পারদর্শিতা অর্জনের জন্য বিভিন্ন কোর্স চালু করেছে।

(৭) মাদ্রাসা শিক্ষিতদের জন্য আরবী ভাষা কোর্স

দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির মানগত অবক্ষয় সর্বজন বিদিত। ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিও এর ব্যতিক্রম নয়। মাদ্রাসা ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতি বৎসর অনেক ছাত্র-ছাত্রী উত্তীর্ণ হয়ে বের হলেও এদের মধ্যে আরবী গ্রন্থাদি পাঠে সক্ষম, কুরআন, হাদীস ও ফিকহের জ্ঞানে পারদর্শী খুব কমই পাওয়া যায়। অনেক আলিম কর্মজীবনে আরবী ভাষার দুর্বলতা অনুভব করেন এবং কষ্ট বোধ করেন। কিন্তু দুর্বলতা দূর করার কোনো পথ পান না। তাদের জন্য আস-সুন্নাহ ট্রাস্ট একটি বিশেষ “আরবী ভাষা কোর্স” প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এ কোর্সের আওতায় আগ্রহী আলিম বা মাদ্রাসা শিক্ষিত ব্যক্তিগণ এক বৎসর ব্যাপী প্রতি সপ্তাহে তিন দিন ২ ঘন্টা করে শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে আরবী “ইবারত” পাঠ, অনুধাবন, আরবী কথোপকথন, রচনা ইত্যাদি বিষয়ে পারদর্শিতা অর্জন করবেন। আগ্রহী সংস্থা, প্রতিষ্ঠান বা মাদ্রাসায় এ কোর্সটি চালু করার বিষয়ে সহযোগিতা করা হবে।

(৮) শিক্ষিতদের জন্য অর্থ-সহ কুরআন শিক্ষা কোর্স

সহজে কুরআনের ভাষা আয়ত্ব করতে পারা কুরআনের একটি অলৌকিক দিক। মহান আল্লাহ বারংবার বলেছেন: “আমি অনুধাবনের জন্য কুরআনকে সহজ করেছি।” (কামার: ১৭, ২২, ৩২, ৪০) অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আমরা দেখেছি যে, বাংলা/ইংরেজিতে অভিজ্ঞ একজন শিক্ষিত মানুষ খুব সহজেই আরবী ব্যাকরণের প্রয়োজনীয় বিষয়-সহ কুরআনের শব্দভাণ্ডার শিখে কুরআনের অর্থ বুঝতে পারেন। শিক্ষিত মানুষদেরকে বিশুদ্ধ তিলাওয়াত-সহ অর্থ বুঝে কুরআন পাঠে সক্ষম করতে বিশেষ কোর্স তৈরি করেছে আস-সুন্নাহ ট্রাস্ট।

(৯) কর্মজীবীদের জন্য নৈশ মাদ্রাসা

কর্মজীবী অনেক মানুষই ইসলামী জ্ঞানে পারদর্শিতা অর্জন করতে চান। বয়স ও কর্মব্যস্ততার কারণে নিয়মিত মাদ্রাসায় লেখাপড়া তাদের জন্য সম্ভব নয়। তাদের জন্য “নৈশ মাদ্রাসা” প্রকল্প গ্রহণ করেছে আস-সুন্নাহ ট্রাস্ট।

(১০) গ্রন্থ ভিত্তিক ‘হালাকা’ বা ইলমী মাজলিস

কুরআন-সুন্নাহর বিশুদ্ধ জ্ঞান অর্জন ও প্রসারের জন্য সাহাবী-তাবিয়ীগণের যুগ থেকে প্রচলিত পদ্ধতি গ্রন্থ ভিত্তিক ‘হালাকা’ বা শিক্ষা মাজলিস। উন্মুক্ত আলোচনার চেয়ে গ্রন্থ কেন্দ্রিক মাজলিসের উপকারিতা বেশি। এজন্য আস-সুন্নাহ ট্রাস্ট নিজস্ব উদ্দ্যোগে বা আগ্রহী ইমাম, মুআজ্জিন বা আলিমের মাধ্যমে মসজিদ, বাড়ি, খানকা বা মাজলিসে সর্বজন স্বীকৃত ইসলামী মৌলিক গ্রন্থগুলির দরসের প্রকল্প গ্রহণ করেছে।

(১১) অর্থ-সহ কুরআন মুখস্থ প্রতিযোগিতা

কুরআন শিক্ষায় উৎসাহ প্রদানের জন্য নির্ধারিত কিছু সূরা অর্থ-সহ মুখস্থ করার প্রতিযোগিতা ও সফল প্রতিযোগীদের জন্য আকর্ষণীয় পুরস্কার প্রদানের প্রকল্প গ্রহণ করেছে আস-সুন্ন্হা ট্রাস্ট। ছাত্র-ছাত্রী ও বয়স্কদের জন্য পৃথক প্রতিযোগিতার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।

(১২) অর্থ-সহ হাদীস মুখস্থ প্রতিযোগিতা

সুন্নাতে নববীর বিশুদ্ধ আলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য “অর্থ-সহ হাদীস মুখস্থ প্রতিযোগিতা” নির্ধারিত সংখ্যক হাদীস অর্থ-সহ মুখস্থ করে প্রতিযোগিরা প্রতিযোগিতায় অংশ নিবে। ছাত্র-ছাত্রী ও বয়স্কদের জন্য পৃথক প্রতিযোগিতা এবং আকর্ষণীয় পুরস্কার দেওয়া হবে।