তাওহীদের ঈমান (৬)

imagesতাওহীদের ঈমান (৬)

ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর অধ্যাপক, আল-হাদীস বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া চেয়ারম্যান, আস-সুন্নাহ ট্রাস্ট

ডাউনলোড করতে এখানে ক্লিক করুন

একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করতে কাফিরদের আপত্তির কারণ ও অন্যান্য বিষয়

১। কাফিরদের আপত্তির কারণ:
আমাদের মনে স্বভাবতই জাগ্রত হয় যে, মহান আল্লাহকে একমাত্র স্রষ্টা, প্রতিপালক ও সর্বশক্তিমান বলে বিশ্বাস করার পরেও কেন তারা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করতে এত কঠিনভাবে অস্বীকার করত? কেনই বা তারা এককভাবে আল্লাহর যিক্র বা আলোচনা হলে বিরক্ত হতো?
কুরআন ও হাদীসের বিবরণ থেকে বুঝা যায় যে, তারা মহান আল্লাহকে জাগতিক রাজা-মহারাজাদের মতই কল্পনা করত। তারা মনে করত যে, ফিরিশতাগণ, নবীগণ বা অনুরূপ পর্যায়ের আল্লাহর কিছু বান্দা আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করে আল্লাহর বিশেষ প্রেম ও ভালবাসা অর্জন করেছেন। ফলে মহান আল্লাহ এদেরকে বিশেষ মর্যাদা ও অধিকার প্রদান করেছেন, যে মর্যাদা ও অধিকারের ফলে এ সকল ‘প্রিয়পাত্র’ উলূহিয়্যাত’ অর্থাৎ ইবাদত বা চূড়ান্ত ও অলৌকিক ভক্তি ও বিনয় লাভের যোগ্যতা অর্জন করেছেন। একজন জাগতিক মহারাজ যেমন তার প্রিয় দাস বা খাদিমকে খুশি হয়ে রাজত্বের কিছু অংশ প্রদান করেন, অনুরূপভাবে মহান আল্লাহ এদেরকে বিশ্ব পরিচালনার কিছু ক্ষমতা প্রদান করেছেন। আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কোনো ক্ষমতা এদের নেই, তবে মহারাজ যেমন সামন্ত রাজাদের রাজ্য পরিচালনায় হস্তক্ষেপ করেন না, তেমনি আল্লাহও এদের কাজে কর্মে বাধা দেন না; কারণ তিনিই ভালবেসে এদেরকে উলূহিয়্যাত ও রবূবিয়্যাতে শরীক করেছেন। তাদের এ বিশ্বাস প্রকাশ করে হজ্জের তালবিয়া পাঠের সময় তারা বলত:
لَبَّيْكَ لا شَرِيكَ لَكَ إِلا شَرِيكًا هُوَ لَكَ تَمْلِكُهُ وَمَا مَلَكَ
লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক…আপনার কোনো শরীক নেই, তবে আপনি নিজে যাকে আপনার শরীক বানিয়েছেন সে ছাড়া। এরূপ শরীকও আপনারই মালিকানাধীন, আপনারই বান্দা, উক্ত শরীক ও তার সকল কর্তৃত্ব ও রাজত্ব আপনারই অধীন …। মুসলিম, আস-সহীহ ২/৮৪৩; তাবারী, তাফসীর ১৩/৭৮-৭৯।
এজন্য তারা বিশ্বাস করত যে, সরাসরি আল্লাহর ডাকলে বা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করলে আল্লাহর এ সকল প্রিয়পাত্রের অধিকার ও ক্ষমতা অস্বীকার করা হয় এবং বেয়াদবি হয়। আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে হলে এদের মাধ্যমেই যেতে হবে, যেমন মহারাজের নিকট আবেদন করতে ‘যথাযথ কর্তৃপক্ষে’ মাধ্যমে আবেদন করতে হবে। এদের মাধ্যম ছাড়া আল্লাহর নৈকট্য লাভ সম্ভব না। তাদের এ বিশ্বাস সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِنْ دُونِهِ أَوْلِيَاءَ مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى
আর যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য আউলিয়া (অভিভাবক বা বন্ধু ) গ্রহন করেছে তারা বলে, আমরা তো এদের শুধু এজন্যই ইবাদাত করি যে এরা আমাদেরকে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছে দেবে।’’ সূরা (৩৯) যুমার:২-৩ আয়াত।
তারা বিশ্বাস করত যে, এ সকল ‘আউলিয়া’-র রয়েছে আল্লাহর কাছে বিশেষ অধিকার, ফলে এরা আল্লাহর নিকট সুপারিশ করে দ্রুত হাজত মিটিয়ে দিতে পারেন। কাজেই এদের ডাকলে যত দ্রুত সাড়া পাওয়া যায়, সরাসরি আল্লাহকে ডেকে তা পাওয়া যায় না। এবিষয়ে আল্লাহ বল্নে:
وَيَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ مَا لا يَضُرُّهُمْ وَلا يَنْفَعُهُمْ وَيَقُولُونَ هَؤُلاءِ شُفَعَاؤُنَا عِنْدَ اللَّهِ
‘‘তারা আল্লাহ ব্যতীত যাদের ইবাদত করে তারা তাদের কোনো ক্ষতিও করতে পারে না উপকারও করতে পারে না। তারা বলে এরা আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারী (শাফায়াতকারী)।’’ সূরা (১০) ইউনুস: ১৮ আয়াত।
এখানে লক্ষণীয় যে, তাদের এ সকল দাবি ও বিশ্বাস বিবেক ও যুুক্তি বিরোধী। কারণ আল্লাহই যখ্ন একমাত্র স্রষ্টা, প্রতিপালক ও সর্বশক্তিমান তখন কেন মানুষ অন্য কারো কাছে নিজের চূড়ান্ত অসহায়ত্ব প্রকাশ করবে?
এছাড়া তাদের এ দাবিগুলি সবই মহান আল্লাহ কেন্দ্রিক। মহান আল্লাহ অমুক ব্যক্তিকে ক্ষমতা প্রদান্ করেছেন, অথবা তিনি সাধারণভাবে ফিরিশতা বা নবীগণ বা বিশেষ শ্রেণীর মানুষদেরকে উলূহিয়্যাত বা রুবূবিয়্যাতের ক্ষমতা, অধিকার বা শরিকানা প্রদান করেছেন, এবং এসকল ক্ষমতা ও অধিকার প্রাপ্ত ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে সরাসরি আল্লাহকে ডাকলে তিনি অসন্তুষ্ট হবেন বলে দাবি করতে হলে তা আল্লাহর থেকে প্রাপ্ত ওহীর মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে। এজন্য কুরআন কারীমে বারংবার তাদের নিকট কিতাবের প্রমাণ চাওয়া হয়েছে। স্বভাবতই তারা কখনো কোনো প্রমাণ দিতে পারে নি। তারা শুধু ওহীর কয়েকটি পরিভাষার অপব্যাখ্যা ও অপব্যবহার করেছে। পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে মহান আল্লাহ নেককার বান্দাদের বা নবী ও ফিরিশতাদের ভালবাসার কথা উল্লেখ করেছেন। এছাড়া নেককার বান্দাদের সুপারিশ বা শাফা‘আতের বিষয়টিও ওহীর মাধ্যমে স্বীকৃত। অনুরূপভাবে মুজিযা ও কারামতের বিষয়টিও ওহীর মাধ্যমে স্বীকৃত। মুশরিকগণ এ বিষয়গুলি বিকৃত করে তাদের শিরক প্রমাণ করতে চেষ্টা করত।
তাদের যুক্তির ধারা অনেকটা নিম্নরূপ: (১) আল্লাহ অমুক বা তমুককে ভালবাসেন, (২) যেহেতু তিনি তাঁকে ভালবাসেন সেহেতু নিশ্চয় তিনি তাকে রুবূবিয়্যাত ও উলূহিয়্যাতে শরীক বানিয়েছেন বা বিশ্ব পরিচালনার কিছু দায়িত্ব ও ক্ষমতা তাকে দিয়েছেন, (৩) এ ক্ষমতার প্রমাণ তাদের মুজিযা-কারামত বা অলৌকিক কার্যাদি, (৪) যেহেতু তিনি তাদেরকে রুবূবিয়্যাত ও উলূহিয়্যাতের কিছু ক্ষমতা ও সুযোগ দিয়েছেন সেহেতু তাদের বাদ দিয়ে সরাসরি আল্লাহর নৈকট্য পাওয়া যায় না, (৫) যেহেতু তাদের শাফা‘আতের অধিকার স্বীকৃত, কাজেই তাদের কাছেই হাজত পেশ করতে হবে এবং (৬) তাদের বাদ দিয়ে সরাসরি আল্লাহকে ডাকা হলে বা তাদের মহত্বের আলোচনা বাদ দিয়ে শুধু আল্লাহর মহত্ব ও মর্যাদা আলোচনা করলে তাদের সাথে বেয়াদবি হয় যা ক্ষমার অযোগ্য।
তাদের এ সকল যুক্তির ভিত্তিতে তারা তওহীদের প্রচারকদের ভয়-ভীতি দেখাত। তারা বলত, আল্লাহর প্রিয়পাত্র যাদের আমরা ইবাদত করি তোমরা এদের বিরুদ্ধে কথা বলা বন্ধ না করলে এরা তোমাদের ক্ষতি করে দেবে। তাওহীদের প্রচারকদের ভীতিপ্রদর্শনের ক্ষেত্রে তাদের চিন্তাধারা ছিল নিম্নরূপ:
(১) একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করতে বলার অর্থই আল্লাহর প্রিয়পাত্র ফিরিশতা, নবী, ওলী বা আল্লাহর সন্তানদের বিরুদ্ধে কথা বলা! আল্লাহ ছাড়া কারো ডাকা যাবে না, সাজদা করা যাবে না, মানত করা যাবে না ইত্যাদি বলার অর্থ এ আল্লাহর এ সকল প্রিয়পাত্রের সাথে বেয়াদবী করা!!
(২) এরূপ বেয়াদবীতে আল্লাহর এ সকল প্রিয়পাত্র বেজায় অখুশি ও নারায হন! ফলে এরূপ বেয়াদবদের তারা শাস্তি দেন!! মহান আল্লাহ তাদেরকে যে ক্ষমতা দিয়েছেন সে ক্ষমতাবলে তারা বেয়াদবদের শাস্তি দিতে পারেন!!!
মহান আল্লাহ ইবরাহীম (আ)Ñএর প্রসঙ্গে বলেন:
وَحَاجَّهُ قَوْمُهُ قَالَ أَتُحَاجُّونِّي فِي اللَّهِ وَقَدْ هَدَانِ وَلا أَخَافُ مَا تُشْرِكُونَ بِهِ إِلا أَنْ يَشَاءَ رَبِّي شَيْئًا وَسِعَ رَبِّي كُلَّ شَيْءٍ عِلْمًا أَفَلا تَتَذَكَّرُونَ وَكَيْفَ أَخَافُ مَا أَشْرَكْتُمْ وَلا تَخَافُونَ أَنَّكُمْ أَشْرَكْتُمْ بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ عَلَيْكُمْ سُلْطَانًا فَأَيُّ الْفَرِيقَيْنِ أَحَقُّ بِالأَمْنِ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ
“তার সম্প্রদায় তার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হলো। সে বলল, তোমরা কি আল্লাহ সম্বন্ধে আমার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হবে? তিনি তো আমাকে সৎপথে পরিচালিত করেছেন। তোমরা যাদেরকে তাঁর সাথে শরীক কর আমি তাদেরকে ভয় করি না, তবে আমার প্রতিপালক যদি কিছু ইচ্ছা করেন (অর্থাৎ এসকল উপাস্য আমার কোনো ক্ষতি করতে পারে বলে আমি ভয় পাই না, আমার যদি কোনো ক্ষতি বা বিপদ হয় তবে আল্লাহর ইচ্ছাতেই হবে, তোমাদের উপাস্যদের ইচ্ছাতে নয়)। সব কিছুই আমার প্রতিপালকের জ্ঞানায়ত্ব, তবে কি তোমরা অবধান কর না? তোমরা যাদেরকে আল্লাহর শরীক কর আমি তাদেরকে কিভাবে ভয় করব? অথচ আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করার কোনোরূপ অনুমতি প্রদান না করা সত্ত্বেও তেমারা আল্লাহর সাথে শরীক করতে ভয় পাও না? তাহলে তোমাদের যদি জ্ঞান থাকে তবে বল তো কোন দল নিরাপত্তা লাভের যোগ্য?” সূরা (৬) আন‘আম: ৮০-৮১।
রাসূলুল্লাহ সা. সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন:
أَلَيْسَ اللَّهُ بِكَافٍ عَبْدَهُ وَيُخَوِّفُونَكَ بِالَّذِينَ مِنْ دُونِهِ وَمَنْ يُضْلِلِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ هَادٍ وَمَنْ يَهْدِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ مُضِلٍّ أَلَيْسَ اللَّهُ بِعَزِيزٍ ذِي انْتِقَامٍ وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ قُلْ أَفَرَأَيْتُمْ مَا تَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ أَرَادَنِيَ اللَّهُ بِضُرٍّ هَلْ هُنَّ كَاشِفَاتُ ضُرِّهِ أَوْ أَرَادَنِي بِرَحْمَةٍ هَلْ هُنَّ مُمْسِكَاتُ رَحْمَتِهِ قُلْ حَسْبِيَ اللَّهُ عَلَيْهِ يَتَوَكَّلُ الْمُتَوَكِّلُونَ
“আল্লাহ কি তাঁর বান্দার জন্য যথেষ্ট নন? অথচ তারা তোমাকে আল্লাহর পরিবর্তে যারা তাদের ভয় দেখায়। আল্লাহ যাকে বিভ্রান্ত করেন তার জন্য কোনো পথ-প্রদর্শক নেই। এবং আল্লাহ যাকে হিদায়াত করেন তার জন্য কোনো পথভ্রষ্টকারী নেই। আল্লাহ কি পরাক্রমশালী, দণ্ডবিধায়ক নন? তুমি যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা কর, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী কে সৃষ্টি করেছেন? তারা অবশ্যই বলবে, ‘আল্লাহ।’ তুমি বল, তোমরা ভেবে দেখেছ কি, আল্লাহ আমার অনিষ্ট চাইলে তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে ডাক তারা কি সে অনিষ্ট দূর করতে পারবে? অথবা তিনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করতে চাইলে তারা কি সে অনুগ্রহ রোধ করতে পারবে? বল, ‘আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।’ নির্ভরকারিগণ আল্লাহর উপরেই নির্ভর করে।” সূরা (৩৯) যুমার: ৩৬-৩৮ আয়াত।
এখানে কুরআন কারীমের যুক্তি প্রদান পদ্ধতি লক্ষ্য করুন। এ সকল মুশরিক রাসূলুল্লাহ সা. -কে তাদের ভয় দেখাচ্ছে যে, তাদের বাদ দিয়ে একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের কথা বলার অর্থই তাদের সাথে বেয়াদবী করা এবং তাদের অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করা। এতে তারা নারাজ হয়ে তোমার অমঙ্গল ও ক্ষতি করবে। এখন প্রশ্ন হলো, মহান আল্লাহ যদি আমার ভাল চান তাহলে কি তারা তা ঠেকাতে পারে? যদি তিনি আমার অমঙ্গল চান তাহলে কি তারা তা রোধ করতে পারে? উভয় ক্ষেত্রে মুশরিকদের উত্তর হলো: না। আর তারা যেহেতু এতই অক্ষম তাহলে তাদের ডাকার দরকার কী? মহান আল্লাহকে ডাকলেই তো হলো। তিনিই তো তাঁর বান্দার জন্য যথেষ্ট।
এভাবে আমরা দেখছি যে, মুশরিকগণ একটি ভিত্তিহীন কল্পনার উপরেই শিরকে লিপ্ত হয়, যে মহান আল্লাহ যেহেতু এ সকল বান্দাকে ভালবাসেন, সেহেতু তিনি অবশ্যই এদেরকে কিছু ক্ষমতা দিয়েছেন এবং এদের না ডেকে সরাসরি আল্লাহকে ডাকলে এদের সাথে বেয়াদবী হয়। তাদের এ সকল যুক্তি সবই মিথ্যা ও ভিত্তিহীন কল্পনা এবং ওহীর কয়েকটি বিষয়ে বিকৃতি বৈ কিছুই নয়। শাহ ওয়ালি উল্লাহ দেহলবী বলেন: “প্রত্যেক নবীই তাঁর উম্মাতকে সুনিশ্চিতরূপে শিরকের হাকীকত বুঝিয়ে গিয়েছেন। এরপর যখন নবীর প্রিয় সহযোগীগণ এবং তাঁর দীনের বাহকগণ গত হন, তাদের পরে নতুন একটি প্রজন্ম আগমন করে, যারা সালাত বিনষ্ট করে এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করে। তখন এরা ওহীর মধ্যে ব্যবহৃত দ্ব্যর্থবোধক শব্দাবলিকে বিকৃত অর্থে ব্যবহার করে। অনুরূপভাবে আল্লাহর প্রিয়ত্ব এবং শাফা‘আতের বিষয়দুটি সকল শরীয়তেই বিশেষ মানুষদের জন্য উল্লেখ করা হয়েছে। তারা এ দুটি বিষয়েরও বিকৃত অর্থ করে। এছাড়া তারা অলৌকিক কর্মাদি এবং কাশফ-ইলহামের বিষয়টিকে ক্ষমতা ও গাইবী ইলমের প্রমাণ হিসেবে পেশ করে। যার থেকে এরূপ অলৌকিক কর্ম বা কাশফ দেখা গিয়েছে তাকে অলৌকিক ক্ষমতা ও জ্ঞানের মালিক বলে তারা দাবি করে।” শাহ ওয়ালিউল্লাহ, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা ১/১৮১-১৮২।

২। ইবাদতের তাওহীদই সকল নবী-রাসূলের দাও‘আত
ইবাদততের তাওহীদই ছিল যুগে যুগে সকল নবী-রাসূলের প্রথম ও মূল দাও‘আত। কুরআন কারীম থেকে আমরা জানতে পারি যে, সকল নবী ও রাসূল তাঁর উম্মাতকে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করতে আহ্বান করেছেন। প্রথম রাসূল নূহ (আ) সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
لَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوحًا إِلَى قَوْمِهِ فَقَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ
“আমি তো নূহকে পাঠিয়েছিলাম তার সম্প্রদায়ের নিকট এবং সে বলেছিল, ‘হে আমার সম্প্রদায়, আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ব্যতীয়ত তোমাদের অন্য কোনো ইলাহ (মাবূদ বা উপাস্য) নেই।” সূরা (৭) আরাফ: ৫৯ আয়াত। আরো দেখুন: সূরা (১১) হূদ: ২৫-২৬ আয়াত।
হূদ (আ) সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
وَإِلَى عَادٍ أَخَاهُمْ هُودًا قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ
“‘আদ জাতির নিকট তাদের ভ্রাতা হূদকে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, ‘হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোনো ইলাহ নেই।” সূরা (৭) আরাফ: ৬৫ আয়াত। আরো দেখুন: সূরা (১১) হূদ: ৪৯ আয়াত।
সালিহ (আ) সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন:
وَإِلَى ثَمُودَ أَخَاهُمْ صَالِحًا قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ
“সামূদ জাতির নিকট তাদের ভ্রাতা সালিহকে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, ‘হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোনো ইলাহ নেই।” সূরা (৭) আরাফ: ৭৩ আয়াত। আরো দেখুন: সূরা (১১) হূদ: ৬১ আয়াত।

শু‘আইব (আ) সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন:
وَإِلَى مَدْيَنَ أَخَاهُمْ شُعَيْبًا قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ
“মাদ্য়ানবাসীদের নিকট তাদের ভ্রাতা শু‘আইবকে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, ‘হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর ‘ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোনো ইলাহ নেই।” সূরা (৭) আরাফ: ৮৫ আয়াত। আরো দেখুন: সূরা (১১) হূদ: ৮৪ আয়াত।
সকল নবীকেই এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল:
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُولٍ إِلا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لا إِلَهَ إِلا أَنَا فَاعْبُدُونِ
“আমি তোমার পূর্বে কোনো রাসূলই প্রেরণ করি নি এই ওহী ব্যতীত যে, আমি ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই, সুতরাং আমারই ইবাদত কর।” সূরা (২১) আম্বিয়া: ২৫ আয়াত।
আমরা দেখেছি যে, অন্য আয়াতে এ বিষয়ে বলা হয়েছে: “আল্লাহর ইবাদত করার এবং তাগূতকে বর্জন করার নির্দেশ দিয়ে আমি প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল প্রেরণ করেছি।”

৩। তাওহীদই কুরআনের মূল আলোচনা
তাওহীদই কুরআনের মূল আলোচ্য এবং সকল আলোচনার মূল বিষয়। ইমাম আবূ হানীফার (রা) ‘আল-ফিকহুল আকবার’ গ্রন্থের ব্যাখ্যায়, তাওহীদের আলোচনাকালে মোল্লা আলী কারী (১০১৪ হি) বলেন:
“তাওহীদুল উলূহিয়্যাহ বা ইবাদতের তাওহীদ স্বীকার করলে স্বতঃসিদ্ধভাবে তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহ বা সৃষ্টি ও প্রতিপালনের তাওহীদ স্বীকার করা হয়ে যায়। (তাওহীদুল উলূহিয়্যাহ স্বীকার করার অর্থই তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহ স্বীকার করা।) কিন্তু তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহ স্বীকার করলে তাওহীদুল উলূহিয়্যাহ স্বীকার করা হয় না।…
কুরআনের অধিকাংশ সূরা ও আয়াত এই দুই প্রকারের তাওহীদের বর্ণনা সম্বলিত। বরং সত্যিকার বিষয় যে, কুরআনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব কথাই এই দুই প্রকারের তাওহীদের বিবরণ।
কারণ কুরআনে কোথাও আাল্লাহর সত্তা, নামসমূহ, গুণাবলি ও কার্যাদির বর্ণনা করা হয়েছে, আর এগুলি জ্ঞান ও সংবাদের তাওহীদ। আর কোথাও র্শিক-মুক্ত ভাবে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করতে এবং আল্লাহ ছাড়া যা কিছু ইবাদত করা হয় সব কিছু বর্জন করতে আহ্বান করা হয়েছে। এ হলো ‘আত-তাওহীদুল ইরাদী আত-তালাবী’ বা ‘ইচ্ছাধীন নির্দেশিত একত্ব’ (ইবাদতের তাওহীদ)।
আর কোথাও আদেশ, নিষেধ ও আল্লাহ আনুগত্য বজায় রাখার বর্ণনা রয়েছে। এগুলি তাওহীদের দাবি ও পরিপূরক। আর কোথাও তাওহীদের অনুসারীদের সম্মান-মর্যাদার কথা, দুনিয়াতে তাদের সাথে কিরূপ আচরণ করা হয়েছে এবং আখিরাতে তাদেরকে কিভাবে সম্মানিত করা হবে তা বলা হয়েছে। এ হলো তাওহীদের পুরস্কার। আর কোথাও র্শিকে লিপ্ত ব্যক্তিদের কথা আলোচনা করা হয়েছে, পৃথিবীতে তাদেরকে কি লাঞ্ছনা প্রদান করা হয়েছে এবং আখিরাতে তাদের জন্য কি শাস্তি ও যন্ত্রণা অপেক্ষা করছে তা বলা হয়েছে। এ হলো তাওহীদ থেকে বাইরে যাওয়ার প্রতিফল। কাজেই কুরআনের সকল আলোচনাই তাওহীদ কেন্দ্রিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *